• শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
  • ||
শিরোনাম

মার্চের বই: ইতিহাসের কাছে ফিরে যাওয়ার দরজা

প্রকাশ:  ১৫ মার্চ ২০২৪, ২৩:৪৫
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক

কেমন ছিল বাঙালির সমগ্র কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা প্রবল পরাক্রান্ত মাস- মার্চ? কেমন ছিল শোষিত মানুষের এক অনন্য নেতার মার্চ? একটি তর্জনির ইশারায় কেমন করে কেঁপে উঠেছিল বাঙালির স্বাধীনতার মাস- মার্চ?

খুঁজতে শুরু করলাম একাত্তরের মার্চের ঘটনাবলি নিয়ে লেখা ইতিহাস, আলেখ্য ও মহত্তম স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধের ওই প্রজন্মের অনেকে অনেকভাবে লিখেছেন মার্চের স্মৃতিভাষ্য। খুঁজতে গিয়ে অবাক হলাম! অনেক লেখাই লিখে গেছেন আমাদের সেই মহাকালের প্রত্যক্ষদর্শীরা। খুঁজে খুঁজে পাঠ শুরু করি ২০০৯ সাল থেকে। প্রচুর বই কিনেছি। পাঠ করেছি। পাঠ করতে করতে বুকের ভেতর আগুন জ্বলেছে। কখনো গর্বে, আনন্দে, উল্লাসে চিৎকার করেছি। ইতিহাসের প্রতিটি দিন-পর্ব-ক্ষণ মানসচক্ষে দেখতে পেয়েছি। দেখেছি আর টুপি খুলে অভিবাদন জানিয়েছি, মহামার্চের মহানায়কদের। বোধের গভীর পৃষ্ঠা থেকে কৃতজ্ঞতা নিবেদন করেছি, যারা লিখে রেখেছেন সেই রক্তদিনের ইতিহাস; তাদের প্রতি।

প্রথম যে বইটির কথা দিয়ে শুরু করছি, সেই বইটির লেখক পাকিস্তানি মেজর সিদ্দিক সালিক। সে ছিল অধিকৃত বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীর লিয়াজো অফিসার। সিদ্দিক সালিক বাংলাদেশে গোটা নয় মাসের যুদ্ধ চলাকালে নিয়াজী ও টিক্কা খানের জনসংযোগ অফিসার হিসেবেও কাজ করেছে। তার উপর বাড়তি দায়িত্ব ছিল সংবাপত্রের সংবাদ প্রকাশের সেন্সরশিপ আরোপের ক্ষমতা। এসব কারণে সিদ্দিক সালিক খুব কাছ থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কার্যাবলী ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছে। সালিক ‘নিয়াজির আত্মসপর্ণের দলিল’ বইটি লিখেছে দায়বোধ থেকে। তার জন্মভূমি পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য সে বইটি লিখেছে। বইটি প্রথম প্রকাশ পায়, ১৪ আগস্ট ১৯৭৬ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে। বইটিতে মোট ২৩টি পর্ব আছে। প্রতিটি পর্বই বাংলাদেশের জন্ম সময়ের মর্মান্তিক ঘটনাবলি যতোটা সম্ভব নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে লেখার সে চেষ্টা করেছে।

বইটি থেকে এখন যারা তরুণ, ইতিহাস জানতে আগ্রহী যারা, তারা বুঝতে ও জানতে পারবেন, কীভাবে একাত্তরের মার্চ বাঙালির চেতনায় হাজার তারের সঙ্গতে স্বাধীনতা স্পৃহায় মেতে উঠেছিল? কীভাবে ধ্বংস ও হত্যার ভেতর দিয়ে পাকিস্তানীরা একটি নিরাপদ জাতি সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল? বইটি বাঙালি পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে অনুসন্ধিৎসু গবেষক মাসুদুল হক।

আবদুর রউফ চৌধুরী অপরিচিত এক নাম। কিন্তু তিনি বাঙালির শ্রেষ্ঠ ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি ‘স্বায়ত্বশাসন স্বাধিকার ও স্বাধীনতা’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। ২০১০ সালের বইমেলায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে আলেখ্য করে এই প্রামাণ্য বইটি প্রকাশ করে কথাপ্রকাশ। প্রায় চারশ পৃষ্ঠার বইটির ভূমিকায় প্রাবন্ধিক, আন্তর্জাতিক ফোকলোরবিদ ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান এক জায়গায় লিখেছেন: ১৯৫৪-র রাজনৈতিক আন্দোলনের গভীরতা, যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং ওই বছর পূর্বে বাংলার সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে ১৯৪৮-৫২ ভাষা- আন্দোলনের পলে বাঙালি জাতিসত্তার যে ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল তার একটি মৌলিক রাজনৈতিক ভিত্তি অর্জিত হয়।

বিষয়টি উল্লেখ করার সাথে সাথে যুক্তফ্রন্ট যে কারণে ভেঙে পড়ে তার ব্যাখ্যাও আছে রউফ চৌধুরীর বইয়ে। তবে এই ভেঙে পড়ার মধ্যে দিয়ে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন রণকৌশল যে গড়ে উঠেছিল তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন লেখক। আছে তাঁর সংগ্রামের নানাপর্যায়ের বিবরণ। একদিকে সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারী নীতি, অন্যদিকে মুজিবের স্বায়ত্বশাসন থেকে স্বাধীকার আন্দোলন, অন্যান্য রাজনৈতিক মহলের ভূমিকা এবং শেষ পর্যন্ত বহু নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে শেখ মুজিবের বিপুল জনসমর্থনধন্য বীর নায়কে পরিণত হওয়া এবং তাঁরই বীরত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার এক চমৎকার দলিল হিসেবে বইটি পাঠককে বিপুলভাবে আকৃষ্ট করবে।

কাজী ফজলুর রহমান পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের আমলা হিসেবে জীবন শুরু করেন। একাত্তরের মার্চ মাসে তিনি ছিলেন চট্টগ্রামে। সেই দুঃসহকালের দিনিলিপি লিখেছেন তিনি। একাত্তরে চট্টগ্রামে অনেক দুর্ধর্ষ ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু বেদনার সঙ্গে লক্ষ্য করি- মুক্তিযুদ্ধের যা কিছু আলোচনা আয়োজন হয়, সব ঢাকাকেন্দ্রিক। মনে হয়, ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশে আর কোনো ঘটনা ঘটেনি। কেবল চট্টগ্রাম কেনো, সেই দুঃসহকালের অনেক ঘটনা ঘটেছে সারা বাংলাদেশের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সেসব ঘটনা তুলে আনা দরকার। যাই হোক, কাজী ফজলুর রহমানের মতো মানুষদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তিনি লিখেছিলেন বলে আমরা সত্য ইতিহাসের মুখোমুখি হতে পারছি। যারা এখনও বেঁচে আছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের নায়কেরা, তাদের প্রতি নিবেদন- লিখে রেখে যান আপনাদের স্মৃতিভাষ্য। যেদিন আপনি না ফেরার দেশে চলে যাবেন, সেদিনই শেষ হয়ে যাবে আপনার দেখা ও অংশ নেয়া যুদ্ধের ঘটনাবলী। কাজী ফজলুর রহমানের ‘দিনলিপি একাত্তর’ প্রকাশ করেছে মাওলা ব্রার্দাস।

‘দ্যা রেইপ অব বাংলাদেশ’ বইটি লিখেছে পাকিস্তানী নাগরিক ও সাংবাদিক অ্যান্থনী মাসকারেনহাস। বইটির ভূমিকা পাঠ করলেই যে কোনো সাধারণ পাঠক বুঝতে পারবেন, বাংলাদেশে একাত্তর সালে পাকিস্তানীরা কি নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। মাসকারেনহাস একাত্তরে বাংলাদেশ ঘুরে মে মাসে বৃটেন পৌঁছান। বৃটেনের ‘সানডে টাইমস’ পত্রিকায় তিনি বাংলাদেশের উপর পাকিস্তানীদের ম্যাসাকারের ঘটনা লেখেন। সেই লেখার আলোকে বই ‘দ্যা রেইপ অব বাংলাদেশ’। বইটি ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসেই প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাদেশে বইটির অনুবাদ করেন রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের অনেক বাঙালি গবেষণা করেছেন। বই লিখেছেন। স্মৃতিচারণ করেছেন। তাঁদের সেইসব লেখা ও ভাষ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, সংগ্রামের ইতিহাস ভিন্নমাত্রায় জায়গা করে নিয়েছে। সেইসব মহৎ লেখকদের মধ্যে অন্যতম মাসুদুল হক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ভেতর ও বাইরের অনেক ঘটনাবলী নিয়ে মাসুদুল হক লিখেছেন অনবদ্য বই ‘বাঙালি হত্যা এবং পাকিস্তানের ভাঙন’।

মাসুদুল হক ইতিহাসের মোহাফেজখানা থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক তথ্য, উপাত্ত, স্মৃতি সংগ্রহ করে বিশাল আকারে এই বই লিখেছেন। প্রায় পাঁচশ পৃষ্ঠার এই বই পাঠ করলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনা, পরের ঘটনা, আগের ঘটনা, ঘটনার ভেতরের দুর্ঘটনা, নেমকহারামদের রোজনামচা, নায়ক ও মহানায়কের কারুকাজ মর্মে উপলব্ধি করা যাবে। ইতিহাসমনস্ক যে কোনো পাঠকের কাছে বইটি হতে পারে আকর গ্রন্থ। মাসুদুল হকের ‘বাঙালি হত্যা এবং পাকিস্তানের ভাঙন’ প্রামাণ্যগ্রন্থটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৯৭ সালে। ২০০৭ সালে জাতীয় সাহিত্যপ্রকাশ বইটির দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশ করে।

জনাহানা ইমাম শহীদ জননী। আমাদের চিরকালের দ্রোহী জননী। তিনি একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজের নাড়ি ছেঁড়া ধন প্রিয় পুত্র রুমীকে পাঠিয়েছেন যুদ্ধ ময়দানে। পাঠাবার সময়ে তিনি জানতেন স্বাধীনতা যুদ্ধ রক্ত চায়। প্রিয় পুত্র আর ফিরে নাও আসতে পারে। জানার পরও তিনি নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে রুমীকে পৌঁছে দিয়েছেন জায়গামতো। রুমী যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হন। মহাত্মা জাহানারা ইমাম। তিনি ছিলেন চিরকালের আধুনিক মানুষ। করেছেন শিক্ষকতা। লিখেছেন অনেক বই। বাঙালি পাঠকদের কাছে অন্যান্য বইয়ের তুলনায় ও গ্রহণযোগ্যতায় সব বই ছাড়িয়ে গেছে তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটি।

একাত্তর, মহাকালের বুকে বাঙালির জন্য কেয়ামত হয়ে এসেছিল বাঙালির মানচিত্রে পাকিস্তান সামরিক জান্তার প্রবল বর্বর আগ্রাসনে। বাঙালি নিজের বাস্তভিটা থেকে উৎখাত হয়ে পরের জায়গায় ঘর বানিয়েছিল। কাটিয়েছে বিষাক্ত-বিষণ্ন দিনরাত্রি। যারা অবরুদ্ধ বাংলাদেশে ছিলেন, তারাও জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে কাটাতেন। জাহানারা ইমাম বাংলাদেশের অবরুদ্ধ নয়মাস ছিলেন ঢাকায়, এলিফ্যান্ট রোডের বাসায়। দেখেছেন পাকিস্তানীদের বর্বরতা। দেখেছেন মানুষ হত্যার পর পাকিস্তানীদের উল্লাস নৃত্য। মনে প্রাণে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রার্থনা করেছেন। আর লিখে রেখেছেন রক্তের অক্ষরে একাত্তরের সেই ভয়াবহ, রক্তহীম দিনের ঘটনা।

পাকিস্তানী আরেক সৈনিক লে জে গুল হাসান। সে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সর্বশেষ কমাণ্ডার ইন চীফ। জেনারেল ইয়াহিয়ার শাসনকালে সে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্ষমতাকেন্দ্রের একেবারে কাছে। দেখেছে অনেক নাটকীয় দৃশ্য। ইয়াহিয়ার উত্থান, একাত্তরে বাঙালির বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃর্শংস হত্যাকাণ্ড, পাকিস্তানের ভাঙন, স্বাধীন বাংলাদেশে অভ্যুদয়। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই Memories of Lt. Gen. Gul Hassan Khan এর শেষ দুটি অধ্যায় নিয়ে ‘পাকিস্তান যখন ভাঙল’ শিরোনামে অনুবাদ করেছেন সাংবাদিক এটিএম শামসুদ্দীন। বইটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও ব্যক্তি গুল হাসানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সম্পর্ক এবং কাজের বিবরণী রয়েছে। এই বিববরণে ভুট্টোর খামখেলালীপূর্ণ, দাম্ভিক আর রক্তপিপাসু চরিত্রের নগ্ন প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়। নিজের ক্ষমতার জন্য কতো নীচুতে নামতে পারে ভুট্টো, তার বিশদ বিবরণ রয়েছে। এই বিবরণ থেকেই একাত্তরে বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে তার ভূমিকা, ষড়যন্ত্র পরিষ্কার হয়ে যায়। এই লোকটিই একাত্তরের মার্চে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অপারশেন সার্চলাইট শুরু হওয়ার পর, লাখ লাখ বাঙালি নারী পুরষ শিশু নির্বিশেষে হত্যার পরের দিন করাচি বিমানবন্দরে নেমে বলেছিল, ‘থ্যাঙ্ক গড, হি সেভ পাকিস্তান’। বইটির অনুবাদক এটিএম শাসমুদ্দীন ও প্রকাশক ইউপিএল’র কাছে কৃতজ্ঞতা।

রশীদ হায়দার আমাদের অন্যতম কথাসাহিত্যিক। মুক্তিযুদ্ধ তাঁর নিবিড় পরিচর্যার কেন্দ্র। বাংলা একাডেমিতে থাকাকালে এক অসাধারণ কাজ করেছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে প্রিয় স্বজন হারানোর বেদনার পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছেন এবং ‘একাত্তরের স্মৃতি’ নামে প্রায় বিশ খণ্ডের বই প্রকাশ করেছেন। এই প্রকাশনায় ভেতর দিয়ে যুদ্ধের বেদনার রক্তের এবং লড়াইয়ের ঘটনা চিরকালের জন্য খোদিত হয়ে গেলো বাংলার রক্তলাল জমিনে।

রশীদ হায়দার ‘১৯৭১ : ভয়াবহ অভিজ্ঞতা’ নামে আরও একটি বই সম্পাদনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের আখরে লেখা বইটি প্রকাশ করেছে সাহিত্যপ্রকাশ। এই বইটির অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো একাত্তরের মার্চ থেকে শুরু করে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিটি মাস ধরে, পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনীর ত্রাস, আক্রমণ, আগ্রাসন, হত্যা, বিভীষিকার মর্মন্তুদ ঘটনা সংগ্রহ করেছেন, এবং বইটিতে ধারণ করে প্রকাশ করেছেন। যে কেনো পাঠক বইটি পাঠ করলে, পাবেন একাত্তরের এই বাংলাদেশে পাকিস্তানী এবং তাদের এই দেশীয় সমর্থক, দোসরেরা কি নির্মম বধ্যভূমি গড়ে তুলেছিল, তার অকাট্য দলিল।

মনে আছে, ১৯৮৫ সালে এম আর আখতার মুকুলের ‘আমি বিজয় দেখেছি’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে গোটা বাংলাদেশ আড়মোড়া ভেঙে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রায় প্রতিজন সচেতন প্রগতিশীল বাঙালি বইটি সংগ্রহ করেছেন। নিবিষ্ট মনে পাঠ করেছেন এবং প্রবল অন্ধকারের বিরুদ্ধে ঘুড়ে দাঁড়ানোর সাহস পেয়েছেন। তখনকার রুদ্ধ পরিবেশে এমন একটা বই প্রকাশ করাও ছিল সাহস এবং দ্রোহের ঘটনা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিপুল জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘চরমপত্র’র লেখক ও পাঠক হিসেবেই তিনি ছিলেন বাঙালির কাছে প্রবাদতুল্য এক পুরুষ। সেই তিনি যখন লিখলেন ‘আমি বিজয় দেখেছি’- এর চেয়ে সত্য, একমাত্র সত্য, চিরকালের সত্য আর কি হতে পারে?

মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের আদ্যপান্ত ইতিহাস নিয়ে এমন প্রামাণ্যগ্রন্থ রচনা হতে পারে, প্রকাশ হতে পারে, এম আর আখতার মুকলের ‘আমি বিজয় দেখেছি’ প্রকাশের পরই বুঝতে পেরেছিলেন অনেকে। এবং ‘আমি বিজয় দেখেছি’ বইটি অনুসরণ করে প্রচুর মুক্তিযুদ্ধের বই প্রকাশ হতে থাকে। সেই প্রকাশ এখনও অব্যাহত আছে এবং ভবিষ্যতে আরও মুক্তিযুদ্ধের বই প্রকাশিত হবে এম আর আখতার মুকলের দেখানো পথ ধরে।

এম আর আখতার মুকুল যে ভিন্ন ঘরানার, চিরকালের দ্রোহী চেতনার মানুষ ছিলেন, প্রমাণ পাওয়া যায় বইটির উৎসর্গ বাক্য পাঠ করলে। তিনি উৎসর্গ বাক্যে লিখেছেন,‘ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, যাঁরা লড়াইয়ের ময়দানে আহত হয়েছেন, যাঁরা পরবর্তীকালে বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত হচ্ছেন, যাঁরা বীরাঙ্গনা অথচ দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন এবং যাঁরা প্রতিশ্রুত বিচার লাভে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।

এই উৎসর্গ পাঠ করলেই গভীর ভেতরের এম আর আখতার মুকুলকে অনুভব করা সম্ভব। চারশ পৃষ্ঠার বিশাল বই ‘আমি বিজয় দেখেছি’তে অনেক দুর্লভ ছবি আছে। বইগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান আলেখ্য ধারণ করে পাঠকদের কাছে পৌঁছে গেছে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি থাকবে, লাল সবুজ পতাকা থাকবে- বইগুলো আমাদের কানে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কানে, তাদের প্রজন্মের কানে, হাজার প্রজন্মের কানে উচ্চারণ করবে সেই মহামন্ত্র- আমি বাঙালি। বাংলা আমার দেশ। বাংলা আমার ভাষা। জয় বাংলা।

বই,মার্চ,ইতিহাস
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close