• মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫
  • ||

১৮ বছর ধরে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে বয়স্ক ভাতা উত্তোলন

প্রকাশ:  ১০ জুলাই ২০১৮, ১৫:০২
এস এ প্রিন্স, নীলফামারী
প্রিন্ট

নীলফামারীর সৈয়দপুরে একই কার্ডে দুই ব্যক্তির বয়স্কভাতা উত্তোলন করার অনিয়ম ধরা পড়েছে। কার্ডধারী জীবিত জবান উদ্দিনকে ভূয়া মৃত্যু সনদে মৃত এবং অপরজন সহিদা বেওয়া মৃতের কার্ডে নাম বদল করে ভাতা উত্তোলন করে আসছিলেন। দীর্ঘ ১৮ বছর মৃত জবান উদ্দিন জীবিত হিসাবে এবং নাম বদল করে সহিদা বেওয়া বয়স্ক ভাতা সুবিধা গ্রহণ করেছেন।

অথচ এই দীর্ঘ সময় ধরে এ অনিয়ম চললেও স্থানীয় সমাজসেবা দপ্তরের তা নজরে ছিলো না। বয়স্ক ভাতা প্রাপ্তদের ডাটাবেজ তৈরী করতে গিয়ে ওই অনিয়ম ধরা পড়ে।

অনিয়মের এ ঘটনা ঘটেছে উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউপির পূর্ব বেলপুকুর হাজারীহাট এলাকায়। জানা যায়, উল্লেখিত ইউপির ৪নং ওয়ার্ডে পূর্ব বেলপুকুর গ্রামের বাসিন্দা জবান উদ্দিন ১৯৯৯ সালে ৬৫ বছর বয়সে বয়স্ক ভাতাভোগী হিসাবে অন্তর্ভূক্ত হন। বর্তমানে তার বয়স ৮৪ বছর। সেই থেকে তিনি নিয়মিত ভাতা সুবিধা পেয়ে আসছেন। গত জানুয়ারি মাসে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের হাজারীহাট শাখায় ভাতা তুলতে যান।

কিন্তু তালিকায় তার নাম না থাকায় ব্যাংক তাকে ফেরত দেয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানান, সমাজসেবা দপ্তরের নথিতে তিনি মৃত বলে তার ভাতা বন্ধ করা হয়েছে। এরপর জবান উদ্দিন স্থানীয় সমাজসেবা দপ্তরে গেলে তাকে বলা হয় ২০০০ সালে জমা দেয়া মৃত্যু সনদে তাকে মৃত দেখানো হয়েছে। মৃত বলে তালিকা হালনাগাদে তার নাম বাদ পড়েছে। মৃত জবান উদ্দিনের কার্ডে নাম বদল করে সহিদা বেওয়াকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এ অবস্থায় বৃদ্ধ জবান উদ্দিন উপজেলা চেয়ারম্যান মোখছেদুল মোমিনকে ভাতা বন্ধের ঘটনাটি জানান। পরে বিষয়টি আমলে নিয়ে সমাজসেবা কর্তৃপক্ষ বৃদ্ধ জবান উদ্দিনকে নতুন করে ভাতা তালিকা অন্তর্ভূক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সরেজমিনে ঘটনাস্থল ঘুরে জানা যায়, জীবিত জবান উদ্দিনকে মৃত্যু দেখিয়ে তৎকালীন সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল কাইয়ুম একই ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ছোরতন বেওয়া, ২০০১ সালে ৭নং ওয়ার্ডের মোছা: জমিলা এবং সর্বশেষ ২০০২ সালে ওই ওয়ার্ডের সহিদা বেওয়াকে কার্ডটি প্রদান করেন। একই সঙ্গে জবান উদ্দিনের কার্ডটি বাতিল না করে বহাল রাখা হয়।

সে সময় থেকে একই কার্ডের প্রথম সুবিধাভোগী জবান উদ্দিন ও পরিবর্তিতে সহিদা বেওয়া দুজনই পাচ্ছেন বয়স্কভাতার সুবিধা। কিন্তু চলতি বছরে জবান উদ্দিন ব্যাংকে ভাতার টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে তার মৃত্যুর কারনে ভাতার টাকা না পাওয়ায় ঘটনাটি চাউর হয়ে পড়ে। জীর্ণ কুটিরের সামনে দাঁড়িয়ে জবান উদ্দিন বলেন, আমার স্ত্রী রাবেয়া বাসুরীকে নিয়ে এই টাকা দিয়ে কোন রকমে একবেলা খেয়ে বেঁচে আছি।

গত ৬ মাস থেকে টাকা না পাওয়ায় আমার স্ত্রীকে মেয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। প্রতিবেশীরা অভিযোগ করে বলেন, জীবিত মানুষকে মৃত্যুর সনদ দিয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং পরিবর্তিত সুবিধাভোগীদের তালিকাটি পাঠিয়েছেন তিনি। কিভাবে একটা জীবিত মানুষকে তিনি মৃত্যু ঘোষণা দিলেন। ওই ৫নং ওয়ার্ডের ধোপঘাট পাড়ার বৃদ্ধ তাহেরা বেওয়ার অভিযোগ, চেয়ারম্যান-মেম্বারকে এক হাজার টাকা দিয়েও মেলেনি বিধবা বা বয়স্ক ভাতার কার্ড। স্বামী পরিত্যক্ত মেয়ের শ্রমের টাকায় অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে বিধবা তাহেরা।

কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নে দায়িত্বরত সমাজসেবা অফিসের সমাজকর্মী আতাউর রহমান বলেন, বয়স্কভাতার সুবিধাভোগী মারা গেলে পুরুষের স্থলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের পুরুষ এবং মহিলার ক্ষেত্রে মহিলা হবে। এছাড়া কখনো ওয়ার্ড পরিবর্তন হবে না, এ ক্ষেত্রে তৎকালীন কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদ নীতিমালা বহির্ভূত কাজ করেছেন। বর্তমান ও তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামুল হক চৌধুরী বলেন, আমার ওয়ার্ডে জবান উদ্দিনের বাড়ী। তাকে বয়স্ক ভাতার তালিকায় আমি অন্তর্ভূক্ত করেছি। আর আমি তাকে কেন মৃত্যু ঘোষণা করবো। সমাজসেবা অফিস মৃত্যুর সনদটা আমাকে দেখাতে পারবে? সমাজসেবা অফিসই এ কাজ করছে। সৈয়দপুর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার সুকান্ত সরকার বলেন, ২০১৭ সালে আমি এখানে যোগদান করেছি।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীগুলো ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) করতে গিয়ে জবান উদ্দিনের কোন তথ্য আমাদের রেজিস্টারে নেই। যেহেতু রেজিস্টারে ওই ব্যক্তিকে মৃত্যু দেখানো হয়েছে, সেহেতু ব্যাংকে পাঠানো নতুন হালনাগাদ তালিকায় তার নাম বাদ দেয়া হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বয়স্কভাতা সুবিধাভোগীদের ডাটাবেজ তৈরি করতে গিয়ে এ বিষয়টি ধরা পড়েছে। ডাটাবেজ তৈরীর আগে মৃত জবান উদ্দিন ও সহিদা বেওয়া উভয়ে নিয়মিত ভাতা উত্তোলন করেছেন। এটা পূর্ববতী কর্মকর্তার সময়ে এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনাটি ঘটেছে।

সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বয়স্কভাতা প্রদান উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি মোখছেদুল মোমিন বলেন, জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে অন্যকে ভাতা প্রদান করায় অনিয়ম হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি জানতে পেয়ে গত ৪ জুলাই কমিটির সভায় জবান উদ্দিনকে নতুন করে বয়স্কভাতা সুবিধাভোগীর আওতায় নেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে। উল্লেখ্য ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত দেশ গড়তে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর বাস্তবায়ন করছে সরকার। চলমান কর্মসূচীর অন্যতম বয়স্কভাতা ও বিধবা ভাতা। সৈয়দপুর উপজেলায় এ কর্মসূচির আওতায় পৌরসভা ও ৫টি ইউনিয়নে ৬২১১ জনকে বয়স্কভাতা প্রদান করা হয়।

এ ব্যাপারে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সুকান্ত সরকারের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, অনিয়মের বিষয়টি ধরা পড়ায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে গত ৫ জুলাই ওই বৃদ্ধ জবান উদ্দিনের হাতে বয়স্ক ভাতার বই তুলে দেয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে তিনি ভাতা গ্রহণ করতে পারেননি। তবে ওই সময় থেকে গত জুন মাস পর্যন্ত তার প্রাপ্ত ভাতা নতুন বইয়ের মাধ্যমে দেয়া হবে।

/পি.এস

নীলফামারী