• বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮, ৯ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

দস্যু আকরামের জীবনে ফেরার গল্প

প্রকাশ:  ০৭ জুন ২০১৮, ০৯:৫২
মেহেদী হাসান, খুলনা
প্রিন্ট

সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাণ। ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে এই ব-দ্বীপ অঞ্চল রক্ষার প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ। শ্বাপদসংকুল এ অরণ্যের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে লাখ লাখ মানুষ। নিরন্তর সংগ্রাম করে চলা এই বনজীবীদের কাছে আতঙ্কের নাম দস্যুবাহিনী।

সুন্দরবন, গোলপাতা আর লতাগুল্মের নান্দনিকতা। আছে চোখ জুড়িয়ে যাওয়া রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কত শত পশু, আর পাখির কিচির-মিচির। এতসব সৌন্দর্যের লীলাভূমিতেও বাস করে ভয়, আতঙ্ক।

না, বাঘে ধরবে, সাপে কাটবে- এ আতঙ্ক নয়। আতঙ্ক মানুষ নামের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণিকে নিয়ে, সুন্দরবনে যাদের নাম দেয়া হয়েছে বনদস্যু। এরা অগ্নিশর্মা চোখে রাতবিরাতে অবিরত ছুটে চলে, হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। বারুদ পুড়িয়ে অন্যের স্বপ্ন কাড়ে, বুনে নিজের স্বপ্ন।

দিন শেষে তাদেরও ভাবনায় আসে- আমি ভাল হব, অন্য সবার মতই সংসারি হব। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখের দিন গড়ব। কিন্তু, দস্যুতা জীবনের একটিই পিছুটান- একবার যে এ পথে পা বাড়ায়, ফিরে যাওয়ার উপায় থাকে না। মরে না হয় মেরে টিকে থাকতে হয়।

এতেই কী জীবনের সমাপ্তি! না, দিনশেষে যে সুখ স্মৃতিগুলো সম্পদ, সেখান থেকেই দস্যুরাও ফিরে আসতে চায় স্বাভাবিক জীবনে? হয়ত চায়, হয়ত চায় না!

ইতোমধ্যে অনেকে ফিরেছেন। আরও অনেকে আসার প্রক্রিয়ায় আছেন। কিন্তু, তাদের ফেরানোর পথে তাকে কতশত দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। গহীন বনে না খেয়ে, না নেয়ে ঘুরতে হয়েছে।

আকরামের জীবনে ফেরার গল্প

গ্রামের বেশ স্বচ্ছল পরিবারের বড় সন্তান আকরাম। বাড়ি কয়রার চাঁদ আলী ব্রিজের কাছে। বাবার ব্যবসা-সম্পত্তি ছাড়াও ছিল নিজের তিনটি ট্রলার, ৪টি নৌকা। আবার মৌসুমে ইট ভাটার সরদারিও করত গ্রামের এই যুবক।

আকরাম এখন রিকশা চালায়। দৈনিক আড়াইশ’ টাকা জমিয়ে তা দিয়ে নিয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। খুলনা শহরের রাস্তায় রাস্তায় আকরাম যাত্রী টানে মহাসুখে।খুলনার শিব বাড়ীতে হঠাত একদিন দেখা হলো আকরামের সঙ্গে।

তিন বছর আগের কথা বলছি। অভাব ছিল না। তাই বাউন্ডুলে জীবনে জুটেছিল খারাপ সঙ্গ। এদিকে বাবার ব্যবসায় ধস নামে। ধারদেনা মেটাতে সুদে ঋণ নিয়ে সেই চক্রে সর্বশান্ত হয় পুরো পরিবার। ইট ভাটার মালিকের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে হারায় সেই ব্যবসাও।

আকরাম এখন কী করবে? সবে বিয়ে করেছে। অন্যদিকে চূড়ান্ত অভাব পুরো পরিবারে। সবচেয়ে কাছের বন্ধু জুয়েল তখন সুন্দরবনে দস্যুতা করছে। সুমন বাহিনীর উপনেতা। বন্ধুর প্রলোভনে আকরাম পা বাড়ায় সুন্দরবনে, দস্যু সুমন বাহিনীতে।

নিজের দেখা বনের হিংস্রতম দস্যু সুমন বাহিনী। আত্মসমর্পণ নিয়ে বাহিনীর সঙ্গে আলাপে গিয়ে পরিচয় আকরামের সঙ্গে। তারপর দলের সঙ্গে অস্ত্র জমা দিয়ে ফিরে আসে স্বাভাবিক জীবনে।

জেলে থাকাকালীন একবারও বাবা তাকে দেখতে আসেনি। তিন মাস জেল খেটে জামিনে বের হয় আকরাম। তারপর সোজা বাড়ি। মুখ ফিরিয়ে রাখা বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজের বাড়িতে ফেরে আকরাম। তারপর বাবার কাছে থেকে দেড়শ’ টাকা নিয়ে চলে আসে খুলনা।

দস্যুতা ছেড়ে আসা আকরাম এখন মাসের প্রথম পাঁচ দিন থাকে নিজের বাড়ি। তিন দিন শ্বশুর বাড়ি। এরপর আবার চলে আসে খুলনা শহরে। রিকশা চালিয়ে আয়-রোজগার বেশ ভালো।

বিগত নয় দিন রিকশা চালিয়ে আকরামের দুই হাজার টাকা জমেছিল। সেই টাকা পাঠিয়েছে বাবার কাছে। জীবনে ফিরে এই সামান্য আয় এ জীবনকে আবারও গড়ে তোলার চেষ্টায় আকরাম।

গল্পে গল্পে সে জানাল, জেলখানায় বসে জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছে সে। তাই আর কখনো খারাপ পথে যাওয়ার কথা চিন্তাও করে না আকরাম। সমাজে ফিরে আকরাম এখন নতুন যুদ্ধের মুখোমুখি।