• বুধবার, ২০ জুন ২০১৮, ৬ আষাঢ় ১৪২৫
  • ||
শিরোনাম

টনক নড়ছে না প্রশাসনের

নওগাঁয় বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে ভুল চিকিৎসায় বাড়ছে মৃত্যু

প্রকাশ:  ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ১৪:১৬
নওগাঁ প্রতিনিধি
প্রিন্ট

নওগাঁয় বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে ভুল চিকিৎসায় দিন দিন বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। এতে করে অনেকের জীবন অকালেই ঝড়ে যাচ্ছে। অনেক গরীব পরিবার তাদের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা । তবুও থামছে না এই সব অবৈধ ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা ক্লিনিকগুলো দৌড়াত্ম। সম্প্রতি বেসরকারি ক্লিনিক ‘শাহ নার্সিং হোম এন্ড ডায়াগনিষ্টিক সেন্টারে’ ভুল অপারেশনে শিশু আল এখলাস (১০) মারা গেছে। 

ঘটনার পর ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ও তার কুখ্যাত চিকিৎসকরা এখনো পলাতক রয়েছে। শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে শহরের স্টার্ফ কোয়াটারের সামনের ক্লিনিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শিশু আল এখলাস জেলার আত্রাই উপজেলার দিঘা উত্তরপাড়া গ্রামের শুকুর আলীর ছেলে। অহরহ এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও টনক নড়ছে না প্রশাসনের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার দুপুর ২টার দিকে শিশুটির গলায় টনশিল অপারেশনে সাড়ে ছয় হাজার টাকায় ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। এরপর রাত ১০টার দিকে টনশিল অপারেশন করেন নাক, গান ও গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আসাফুদৌল্লা। আধাঘন্টা পর অপারেশন শেষে রোগীকে বেডে রাখা হয়। কিন্তু দ্বিতীয়বার আবার রোগীকে অপারেশনে নেয়া হয়। রোগীর অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক বলে রাত ১২টার দিকে রেফার্ড দিয়ে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে নিজেরাই অ্যাম্বুলেন্স ডাকে। এরপর রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে উঠানোর পর ক্লিনিকের সব দরজায় তালা দিয়ে রাখা হয়। ঘটনার পর থেকে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ পালিয়ে গেছে। রোববার সকালে ক্লিনিকে রোগীর আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়রা এসে ভীড় জমায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রোগীর স্বজনরা ক্লিনিকে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। স্বজনদের অভিযোগ অপারেশন থিয়েটারে ভুল অপারেশনে শিশু আল এখলাস মারা গেছে। 

নিহতের ফুফু আলেয়া বেগম বলেন, অপারেশনের পর বাচ্চাকে বেডে রেখে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়। ডাক্তার বলেন শিশুটির শরীর দূর্বল। অথচ ক্লিনিকি ভর্তি করার আগে সুস্থ ছিল এবং সব পরীক্ষা করা হয়। কিছু সময় পর আবার তাকে অপারেশনে নেয়া। এরপর বলে রাজশাহী নিতে হবে। তারাই তড়িঘরি করে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দেয়। ভুল অপারশেনে বাচ্চার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।

ক্লিনিক মালিক শাহ মো; নুরুল ইসলাম ও ডা. আসাফুদৌল্লার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

জেলা সিভিল সার্জন পরিসংখ্যান অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় আধুনিক সদর হাসপাতাল ১টি, ১০টি উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১০টি। গতবছর ছিল ৭২টি। এবছর হয়েছে ৭৭টি বেসরকারি ক্লিনিক। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৩৭টির মতো বেসরকারি ক্লিনিক রয়েছে।

যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে বেসরকারি ক্লিনিক। ক্লিনিকে সার্বক্ষণিক একজন এমবিবিএস ডাক্তার,  তিনজন ডিপ্লোমা নার্স, অবকাঠামো অবস্থা ভাল হতে হবে। কোন নিয়মনীতি না মেনেই সিভিল সার্জনকে মোটা টাকার বিনিময়ে অনুমোদন নেয়া হয়। এতে ক্লিনিক চালুর আগে পরিবেশ দেখার প্রয়োজন হয়না সিভিল সার্জনকে। অপারেশনের জন্য প্রয়োজণীয় যন্ত্রপাতি না রেখে নোংরা পরিবেশে অপারেশন করা হয়। এছাড়া অনভিজ্ঞ ডাক্তার ও নার্সদের দিয়ে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। নিয়মিত বেসরকারি ক্লিনিকগুলো পরিদর্শন করার কথা থাকলে তা করা হয়না। আর ক্লিনিকে না গিয়ে অফিসে বসে মাস শেষে খাম পেয়ে থাকে সিভিল সার্জন।

আবার কোন ক্লিনিকে পরিদর্শনে গেলেও নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অপারেশনের জন্য অনুপযোগী ঘর দেখার পর কোন পদক্ষেপ না নিয়ে পকেটে একটা খাম নিয়ে চলে আসারও অভিযোগ আছে সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে। আবার কোন কোন ক্লিনিকে একাধিক রোগী মারার পর অভিযোগ থাকা স্বত্তেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়না। এতে করে ক্লিনিক মালিক সির্ভিল সার্জনের সাথে যোগসাজস করে দেধারছে চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের কার্যক্রম। আবার কোন ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবার আড়ালে দেহ ব্যবসা করা ও মাদক সেবনের অভিযোগ রয়েছে।

আর এসব ক্লিনিকে একপ্রকার দালাল বিভিন্ন এলাকা থেকে কমিশনের ভিত্তিতে রোগীদের নিয়ে আসা হয়। রোগীরা স্বল্প টাকায় চিকিৎসা সেবা পেতে প্রতারিত হচ্ছেন। আর ভূল চিকিৎসার কারণে শিশু আল এখলাসের মতো মৃত্যু ঘটছে প্রতিনিয়ত। ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক রোগী ভুল অপারেশন ও চিকিৎসায় মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। 

জেলা ক্লিনিক ও ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আতোয়ার রহমান খোকা বলেন, যেসব ক্লিনিক মানসম্পন্ন, যেখানে ডাক্তার এবং সেবিকা যথাসাধ্য চিকিৎসা দিতে পারবে সেসব ক্লিনিক চালু থাকুক। আর যেসব ক্লিনিক চিকিৎসার নামে ব্যবসায় নেমে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে তোলা হয়েছে সেগুলো বন্ধ করা হোক। ব্যাঙের ছাতার মতো রাতারাতি কিভাবে গড়ে উঠছে তা আমরা নিজেরাও জানিনা।

সিভিলসার্জন টাকা খেয়ে মুখ বন্ধ রাখেন এবং ক্লিনিক পরিদর্শনে যান না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা বারংবার সিভিল সার্জনকে ক্লিনিকগুলো পরিদর্শনে যাওয়ার জন্য বলেছি। তখন সির্ভিল সার্জন বলেন আমরা যথাসাধ্য কাজ করছি। এছাড়া জেলা শহর থেকে উপজেলাগুলো অনেক দূর হয় বলেও সিভিল সার্জন বলেছেন।

নওগাঁ সিভিল সার্জন ডা. মমিনুল হক বলেন, ভুল অপারেশন রোগী মৃত্যুর বিষয়টি শুনেছি। অভিযোগ পেলে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমার জানা মতে চিকিৎসা সেবায় ডা. আসাফুদৌল্লা সবচেয়ে ভাল বলে জানি। তবে কিভাবে কি হয়েছে তদন্ত না করলে কিছু বলা যাবেনা।

ক্লিনিক অব্যবস্থাপনা ও পরিদর্শন না করার বিষয়ে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি যেসব ক্লিনিকগুলো পরিদর্শন করেছি সেগুলো মোটামুটি ভাল অবস্থানে রয়েছে। তবে ‘শাহ নার্সিং হোম এন্ড ডায়াগনিষ্টিক সেন্টারে’ এখনো যাওয়া হয়নি। অথচ এটি সির্ভিল সার্জন অফিস থেকে দুই মিনিটের দুরত্ব। তবে কোন টাকা পয়সা নেয়া হয়না বলে জানান।

নওগাঁ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সমিত কুমার কুন্ড বলেন, লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।