• রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮, ৪ ভাদ্র ১৪২৫
  • ||

হারিয়ে গেছে,খুঁজে পাবো না...

প্রকাশ:  ০৫ জুন ২০১৮, ২০:২৩ | আপডেট : ০৫ জুন ২০১৮, ২০:২৫
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট

সত্তর দশকের একেবারে শুরুতে অর্থাৎ যুদ্ধ পর্বরতী সময়ে লাকী আখন্দ, হ্যাপী আখন্দ, নিলু, মনসুর এবং সাদেককে নিয়ে গড়ে তোলেন ব্যান্ডদল ‘উচ্চারণ’।তার পরের বছর বিটিভিতে ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ ও ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দু'টি সরাসরি প্রচারিত হলে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রশংসা আর তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিঁনি।তবে ১৯৭৪ সালে ‘রেললাইনের ঐ বস্তিতে’ শিরোনামের সাড়া জাগানো গান গেয়ে দেশ ব্যাপী ব্যাপক হৈ-চৈ ফেলে দেন এই কিংবদন্তি পপ কিং।সেই সময় ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ এবং পিলু মমতাজের এর সাথে বেশ কয়েকটা জনপ্রিয় গানও করেন এই পপ গুরু।তাঁকে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেবার মতো কিছুই নেই। তিনি বাংলা পপ সঙ্গীতের পথিকৃৎ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আজম খান। দীর্ঘদিন দূরারোগ্য ব্যধি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ জুন ঢাকাস্থ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাংলা সংগীত জগতের এই মহান পপ তারকা ।

পুরো নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। কিন্তু মানুষ জানতো আজম খান নামেই।২৮ ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৫০ সালে ঢাকার আজিমপুরের ১০ নং কলোনীতে জন্ম। তাঁর বাবার নাম আফতাবউদ্দিন আহমেদ, মা জোবেদা খাতুন। বসবাস করতেন বাবার কমলাপুরের বাড়িতে। সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা বাবা, মা এবং চার ভাই ও এক বোনের সাথে। বাবা ছিলেন সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।১৯৫৬ সালে কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে শিক্ষা জীবনের শুরু। ১৯৬৮ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বাণিজ্য বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। ১৯৭০ সালে টি অ্যান্ড টি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। কিছুদিন পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় আর পড়ালেখায় অগ্রসর হতে পারেননি।

বাবার অনুপ্রেরণায় মুক্তিযুদ্ধে যাবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন আজম খান।১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে তিনি পায়ে হেঁটে আগরতলা চলে যান।তার গাওয়া গান প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণ যোগাতো।যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শেষে তিনি কুমিল্লায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সম্মূখ সমরে অংশ নেন।‘২০শে আগস্ট, ১৯৭১ একটা তাবুতে আলো জ্বলছে, আর সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের সুর: হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ- বুঝলাম আজম খান গাইছে। আজম খানের সুন্দর গলা। আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা।’ শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে এভাবেই পপ গুরু আজম খানকে খুঁজে পাওয়া যায়।

আজম খান ছিলেন দুই নম্বর সেক্টরের একটা সেকশনের ইন-চার্জ।সেকশান কমান্ডার হিসেবে ঢাকা ও এর আশেপাশে বেশ কয়েকটি গেরিলা আক্রমণে অংশ নেন। আজম খান যাত্রাবাড়ি-গুলশান এলাকার গেরিলা অপারেশনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পান।তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত "অপারেশান তিতাস" বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অপারেশনের লক্ষ্য ছিল ঢাকার কিছু গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমান রুপসী বাংলা হোটেল) এবং হোটেল পূর্বাণী'র গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানো। কারণ ঐ সকল হোটেলে অবস্থানরত বিদেশীরা যাতে বুঝতে পারে এ দেশে একটা যুদ্ধ চলছে। তাদের লক্ষ্য, ঐ সকল হোটেলে অবস্থানরত বিদেশিরা যাতে বুঝতে পারে যে দেশে একটা যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে তিনি তাঁর বাম কানে আঘাতপ্রাপ্ত হন।

পপ গুরু আজম খানকে গানের বাইরে মাঝে মাঝে দেখা গেছে অন্য ভূমিকায়।কখনো অভিনেতা, কখনো বা মডেল, কখনো আবার ক্রিকেটার হিসেবে। শাহীন-সুমন পরিচালিত ‘গডফাদার’ নামের একটি ছবিতে নাম ভূমিকায় খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আজম খান। পরবর্তীতে আরো ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পেলেও তা গ্রহণ করেন নি। এছাড়াও আজম খান মডেল হয়েছেন এনার্জি ড্রিংক আর বাংলালিংকের দুটি বিজ্ঞাপন চিত্রে।বিটিভির একাধিক নাটকে বাউল চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন।

ক্রিকেটার হিসেবে আজম খান তৈরি করে গেছেন এক অনন্য রেকর্ড। তিনি দেশের বয়স্ক ক্রিকেটার হিসেবে ৪১ বছর বয়স থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত একটানা ১০ বছর ক্রিকেট খেলেছেন।ক্রিকেটে আজম খান ছিলেন একজন অলরাউন্ডার।গোপীবাগ ফ্রেন্ডস ক্লাবের হয়ে ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন ।

বাংলাদেশের প্রথম পপ তারকা আজম খান। । বাংলাদেশের পপ ও ব্যান্ড সঙ্গীতের অগ্রপথিক।তাঁর পথ অনুসরণ করে ব্যান্ড সংগীত বর্তমানে বাংলাদেশে একটি শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে।১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ে আজম খান ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে গণসঙ্গীত প্রচার করেন। এই মহান সংগীত তারকা বন্ধু ইশতিয়াকের পরামর্শে সৃষ্টি করেছিলেন একটি এসিড-রক ঘরানার গান ‘জীবনে কিছু পাবোনা এ হে হে!’ বাংলা গানের ইতিহাসে- এটিই প্রথম হার্ডরক হিসেবে চিন্হিত।আজম খানের পথ ধরেই পরে এসেছেন হামিন, শাফিন, মাকসুদ, জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, হাসান, বিপ্লব এবং আরও অনেকে।তার জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে- ‘আমি যারে চাইরে’, ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’, ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘একসিডেন্ট’, ‘অনামিকা’, ‘অভিমানী’, ‘আসি আসি বলে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘পাপড়ি’, ‘বাধা দিও না’, ‘যে মেয়ে চোখে দেখে না’ ইত্যাদি।

“গুরু” নামে ৮০’র দশকের তরুণদের কাছে পরিচিত হওয়া আজম খান ২০১০ সাল থেকে মুখগহ্বরের ক্যান্সারে ভোগেন।এজন্য দুবার তাঁকে সিঙ্গাপুরে নিয়েও চিকিৎসা করানো হয়। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে পরিশেষে অন্তিম শয্যায় শায়িত হন এই পপ গুরু ও বীর মুক্তিযোদ্ধা।কিংবদন্তি এই সংগীত তারকার প্রয়াণের ৭ম বৎসর হল।জানি হারিয়ে গেছো,ফিরে পাবো না...তবুও তুমি অবিনশ্বর; চির ভাস্বর বাংলা সংগীত ভুবনে!

লেখক- পান্থ আফজাল, বিনোদন সাংবাদিক

পপ গুরু,পপগুরু আজম খান,পপগুরু,আজম খান