• রবিবার, ২৭ মে ২০১৮, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
  • ||

তৃতীয় লিঙ্গের বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে!

প্রকাশ:  ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০২:১১
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট
গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের একটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে! 

যাত্রাবাড়ীর শেখদী এলাকায় ২৫ দিন বয়সী এক বাচ্চাকে তৃতীয় লিঙ্গের লোকজন হত্যা করেছে বলে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে!! ঘটনাটি নিয়ে লিখার ইচ্ছা ছিলনা কিন্তু অনেকে হুজুগে মেতে এই ঘটনা সম্পর্কিত যে পরিমান মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করছেন, আর না লিখাটা অন্যায় হয়ে যাবে।

ঘটনার বর্ণনা:
ঘটনা সংঘটিত হওয়ার কয়েকদিন আগে মোস্তাকীনদের (২৫ দিন বয়সী ছোট বাচ্চার নাম) বাসায় কয়েকজন হিজড়া সম্প্রদায়ের লোক উপস্থিত হয়ে নাচ দেখিয়ে অর্থ দাবি করেন, যা দিতে অস্বীকৃতি জানায় বাচ্চার পরিবার। তৃতীয় লিঙ্গের লোকজন হৈ চৈ করে চলে যায়। এই ঘটনার ০২ দিন পর মূল ঘটনার দিন বাচ্চার বাবা মনির ঘুমাচ্ছিলেন আর তার স্ত্রী জেগেছিলেন বাচ্চা মোস্তাকীনকে নিয়ে। একটি বিষয় বলে নেওয়া প্রয়োজন মোস্তাকীনের মা বাক-প্রতিবন্ধী। 

ঘটনার একমাত্র চাক্ষুস সাক্ষীও তিনি কিন্তু মুখে কিছু বুঝিয়ে বলার সুযোগ নেই। বাচ্চাটিকে যারা ওয়াশরুমে আটকে রেখে যায়, তাদের দেখেছেন শুধু তিনি! তার আকারে ঈঙ্গিতে যা বোঝা যায় তা হলো ০২-০৩ জন লোক এই কাজ করে চলে যায়। ঘটনাস্থল থেকে আটককৃত প্রত্যেক তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনকে তার সামনে হাজির করা হয় এবং তিনি প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই 'না সূচক' মাথা নাড়ান! ইতোমধ্যে তৃতীয় লিঙ্গের লোকজন পুলিশের সাথে নিজেরাও খোঁজা শুরু করেন অপরাধীদের। তাদেরই একজনের দেয়া তথ্যমতে আমরা একজনকে গ্রেফতারও করি।

মোস্তাকীনের বাবা উক্ত দিনে বাচ্চাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে যান এবং সেখান থেকে ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ২৫ দিন বয়সী মোস্তাকীনকে বাসায় পাঠিয়ে দেন এবং সুস্থ আছে বলে মতামতও দেন। বাচ্চা মোস্তাকীনে দিব্যি সুস্থ আছে, তার মায়ের কোলে বসে খাওয়া দাওয়াও করছে সুস্থতার সাথে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো ফেসবুকের কিছু গ্রুপ ও দুয়েকটি অনলাইন পোর্টাল বাচ্চাটিকে হত্যা করা হয়েছে মর্মে দাবি করছেন!! 

কারো কোনো মতামত নেই, কোন তথ্যসূত্র নেই কিন্তু আমরা লিখে ফেলছি মোস্তাকীনকে মেরে ফেলা হয়েছে। তথ্য প্রচারের আগে আমাদের কী বিন্দু পরিমাণ দায়বদ্ধতা নেই? আর কত? তৃতীয় লিঙ্গের যে ব্যক্তির ছবি দিয়ে নিউজটি ভাইরাল হচ্ছে তার এই ঘটনার সাথে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বরং তারা প্রকৃত অপরাধীকে ধরানোর ক্ষেত্রে সময়ে সময়ে পুলিশকেও সহায়তা করছে।

আজও যাত্রাবাড়ী থানায় সেদিন রুজু হওয়া নিয়মিত মামলার প্রেক্ষিতে একজন হিজড়াকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করলো তাদের সম্প্রদায়েরই কয়েকজন। আমি কোনভাবেই প্রমাণ করতে চাচ্ছিনা যে তারা সকলেই সু-শৃঙ্খল জীবনযাপন করেন! 

তাদের যথেষ্ঠ খামতি রয়েছে, বাড়াবাড়িও রয়েছে। ঘটনা মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধানও রয়েছে। অনেকেই খুব দৃষ্টিকটু আচরণও করেন এবং সত্যিকার অর্থে সেগুলো নেয়ার মতও নয়। তারপরও আমি বলতে চাই যে ঘটনায় যার সংশ্লিষ্টতা যতখানি তার শাস্তি ততখানিই নিশ্চিত করা উচিত। 

একটি বাচ্চার সাথে কী হলো আমরা কিছুই জানলাম না, চাক্ষুস সাক্ষী যথাযথভাবে সবকিছু বোঝাতেও সক্ষম হলেন না, কিন্তু আমরা সমান তালে পিন্ডি চটকাচ্ছি সকল হিজড়াদের!! মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে এবং এর ধারাবাহিকতায় প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে। যে কারো ছোট বাচ্চার সাথে এই ঘটনা ঘটলে ঠিক থাকা অস্বাভাবিক, তবে সেই সাথে আমাদের এটাও খেয়াল রাখতে হবে প্রকৃত আসামিরা যেন এই তথ্যবিহীন আলোচনায় বাদ না পড়ে যায়।

তৃতীয় লিঙ্গের সমস্যার বীজ অনেক গভীরে প্রোথিত, তার সমাধান তাই সময় সাপেক্ষ। বাংলাদেশ পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমান বিপিএম (বার) স্যার সাভারের হিজড়া সম্প্রদায়ের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন এরকম করে আরও অনেকে এগিয়ে আসলে আস্তে আস্তে সেই গভীরের সমস্যার সমাধান হয়তো কখনো আসবে! কিন্তু সেটি অচিরেই নয় বলেই আমি মনে করি কারণ জন্মের সাথে সাথেই তৃতীয় লিঙ্গের এই সকল মানুষজন আমাদের সমাজের কাছ থেকে উপহার পায় একটি বিশাল চপেটাঘাত! তাই সমস্যার আশু সমাধান খুব সহজেই আসবে বলে মনে হয়না।

এর সমাধাণ সমাজ ও তৃতীয় লিঙ্গের দুই পক্ষ থেকেই আসতে হবে। আধুনিক এই সমাজে বাসায় যেয়ে যেয়ে নেচে গেয়ে অর্থ আদায়ের জায়গা থেকে বের হওয়ার সময় যে এসেছে, সেটি তাদের বুঝতে হবে এবং মূল স্রোতে মেশার চেষ্টা করতে হবে। নিজেদের অবস্থান মেনে নিয়েই এই চেষ্টাটুকু চালাতে হবে নয়তো সবচেয়ে বড় ক্ষতি তাদেরই হবে। 

অন্যদিকে আমরাও যেন ঢালাওভাবে সকলকে অপরাধী না বানাই সেই সহনশীলতাটুকু আমাদের অবস্থান থেকে আমরা যেন দেখাই। জানি তাদের অনেকের আচরণই অনিয়ন্ত্রিত। কিন্তু একটু যদি মনে করি বা রাখি যে এর পেছনেও রয়েছে বিশাল এক না পাওয়া ও বঞ্চনার ইতিহাস অথবা তাদের কেউ হয়তো হতে পারতো আমাদেরও পরিবারের কেউ তবে আমাদের মনে তাদের জন্য কিছুটা হলেও সহনশীল প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আর প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করলেই আপনাদের হাতের কাছেই রয়েছে ৯৯৯ নম্বরে কল করার সুবিধা। মুহূর্তেই পুলিশ পৌঁছে যাবে আপনার কাছে।

সাম্প্রতিক হুজুগে নেচে ঘটনা না জেনেই শেয়ার করে ফেলে একটি মিথ্যা ঘটনাকে সিটিজেন জার্নালিস্টরা যদি সত্য বানাতে প্রভাবিত করেন, তাতে আসলে প্রকৃত সত্য ও প্রকৃত অপরাধীই ঢাকা পড়ে যাবে যেটি আমাদের কারোরই কাম্য নয়। আমাদের অস্থিরতা প্রকৃত সত্য প্রকাশে প্রতিবন্ধক যেন না হয়- এটুকুই চাওয়া।

লেখক: সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (ডেমরা জোন)।

(লেখকের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত)