• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

আবুল হোসেনের মন্ত্রিত্ব ফিরিয়ে দেওয়া উচিত ছিল কিন্তু কেন তা হলো না?

প্রকাশ:  ৩০ অক্টোবর ২০১৮, ০১:৪০
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
প্রিন্ট

সরকার এখন সবকিছুতেই গভীর ষড়যন্ত্র ও নৈরাজ্য দেখে। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতির নামে অ্যাম্বুলেন্স আটকে শিশু হত্যা, স্কুলের মেয়েদের গায়ে চুনকালি মাখা, ব্যক্তিগত গাড়িতে কালিঝুলি মেখে চালকের মুখ কালো করা কি জাতির ললাটে কলঙ্ক লেপন নয়? এসব কোনো নৈরাজ্য নয়? নাকি নিজেরা করলে কিছু না! সেদিন হঠাৎ সৈয়দ আবুল হোসেনের অফিসে গিয়েছিলাম। কারবালার পর বাংলাদেশে হাসান-হোসেনকে প্রথম একত্র দেখলাম। মুয়াবিয়ার পুত্র এজিদের পাঠানো সিমার কারবালায় রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৌহিত্র ইমাম হোসেনের ছিন্ন মস্তক বর্শার ডগায় গেঁথে দামেস্কে এজিদের দরবারে গিয়েছিল পুরস্কারের আশায়। আর বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের হাসান-হোসেনের দেহ দুর্নীতির অভিযোগে টুকরো টুকরো করে সারা পৃথিবীময় ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। হাসান কোনো সরকারি পদে ছিলেন না, হোসেন মন্ত্রী ছিলেন। বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগে তিনি মন্ত্রিত্ব হারান। মন্ত্রিত্ব হারানো বলা ঠিক হবে না। আত্মমর্যাদা রক্ষায় মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেছিলেন। জননেত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত অবস্থায়ও হোসেনের প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু কানাডার হাই কোর্ট যখন তাদের দুজনকেই দুর্নীতির দায় থেকে মুক্ত, অভিযোগটি সর্বৈব মিথ্যা বলে ঘোষণা করলÑ বিশ্বব্যাংক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হাসানের কাছে ক্ষমা চেয়েছে কিনা জানি না, কিন্তু হোসেনের কাছে চেয়েছে। তারপর তো তাকে মন্ত্রিত্ব ফিরিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কেন তা হলো না?

আমাদের দেশের যারা অভিযোগ এনেছিলেন তাদের তো ভুল স্বীকার করা উচিত ছিল- তা তো তারা কেউ করলেন না? আমার তো মনে হয় বাংলাদেশে একমাত্র হাসান-হোসেন এ দুজনই হিমালয়ের মতো মাথা উঁচু করে এখন বলতে পারেন, আমরা দুজন সারা বিশ্বে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, জাতির পিতা, নেতা শেখ মুজিবকে আপন করে পেয়েছি মাত্র কয়েক বছর। তাকে প্রথম দূর থেকে দেখেছিলাম সেই ১৯৫৭ সালে কাগমারী মহাসম্মেলনে। তারপর ’৬২-এর দিকে আইয়ুব খানের বুনিয়াদি গণতন্ত্রের এক নির্বাচনে টাঙ্গাইলে আমাদের বাসায়। তারপর এখানে-সেখানে সভা-সমাবেশে দেখেছি। ’৬৯-এ আগরতলা মামলা থেকে বেরোবার পর ধীরে ধীরে কাছাকাছি হয়েছি। স্বাধীনতার আগে তিনি ছিলেন আমাদের ভাই। স্বাধীনতার পর পিতার আসন নিয়েছিলেন, আমিও পুত্রের স্থান পেয়েছিলাম। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট তাঁর মৃত্যুতে কার কতটা ক্ষতি হয়েছে বলতে পারব না, কিন্তু আমার পরিবার হয়েছে সর্বস্বান্ত, আমরা হয়েছি নিঃস্ব-রিক্ত- সর্বহারা। পিতার দেওয়া বাবর রোডের যে বাড়ি থেকে ১৫ আগস্ট সকালে বেরিয়েছিলাম এখনো সে বাড়ির বৈধ বাসিন্দা হতে পারিনি। এ হচ্ছে নিয়তি! কত ঝড় গেছে তুফান গেছে সে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। নিজেরটা না হয় মেনে নেওয়া যায়, শুধু আমার জন্য মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন হয়েছে চরম নির্যাতিত। ’৭৫-এ প্রতিরোধ দুর্গ গড়ে তুলেছিলাম। প্রায় সাড়ে ১২ হাজার শিক্ষিত-অশিক্ষিত যোদ্ধা রাজনৈতিক নেতা অংশ নিয়েছিল সেই প্রতিরোধ যুদ্ধে। এর আগে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে সরকার ছিল। আমি সংসদ সদস্য ছিলাম। পিতার হত্যার প্রতিরোধে যারা শহীদ হয়েছিল তাদের নামে শোকপ্রস্তাব সংসদে পাস তো দূরের কথা উত্থাপনই করতে পারিনি। কোনো সংসদই সংসদ নেতার অসম্মতিতে কোনো প্রস্তাব পাস করা তো দূরে থাক উত্থাপনও করতে পারে না, আমিও পারিনি। সব জায়গায় যেমন কিছু সুবিধাবাদী থাকে ’৭৫-এর জাতীয় মুক্তিবাহিনীতেও দু-চার জন ঝরা যে ছিল না তা নয়, চাটুকার যে ছিল না তাও নয়। তারা সরকার এবং তার প্রধান নেত্রীকে ভুলভাল বুঝিয়ে মাঝে মাঝে টাকা-পয়সা নেয়। তার কিছু দেয় কিছু পেটে পোরে। যারা প্রতিরোধ শিবিরে রান্নাবান্না করত তারাই এখন মাদবর। এক-দুই দিন করে সময় তো কম হয়নি। এখন যাওয়ার পালা। কয়েক মাস থেকে মনটা চনমন করছিল ’৭৫-এর প্রতিরোধ সংগ্রামীদের সঙ্গে একবার একত্র হই। আগস্টের শেষের দিকে কেন যেন রাতদিন মনের ভিতর তোলপাড় করছিল। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতীয় মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ যোদ্ধাদের এক মিলনমেলার আহ্বানের চিন্তা করছিলাম। আমার জীবনটাই যেন কেমন। ’৬৭ সাল থেকে ছাত্র রাজনীতিতে যারা আমার ছায়াসঙ্গী, ’৬৯-এর গণআন্দোলনে যাদের পেয়েছি, ’৭১-র মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র সিলেটের ফারুক ছাড়া আর কাউকে প্রথম দিকে পাইনি।

যদিও আগস্টের পর দলে দলে ছাত্রবন্ধুরা কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগদান করে ভরে ফেলেছিল। আবার ’৭৫-এ যখন পিতৃহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম ’৭১-এর মুক্তিযোদ্ধা তেমন কাউকে পাওয়া যায়নি। বাড়ি বাড়ি খবর পাঠিয়েও অনেককে আনা যায়নি। অভিযোগ, স্বাধীনতার পর তারা চরম নির্যাতিত হয়েছে। রক্ষীবাহিনীর জুলুমের দাগ তারা তখনো শরীরে বহন করছে। কথাটা একেবারে অসত্য নয়, অনেকটাই সত্য। একাত্তরের তেমন কাউকে ’৭৫-এ পাইনি। সীমান্ত এলাকার অবুঝ উপজাতীয়দের নিয়ে প্রথম প্রতিরোধ শুরু করেছিলাম। বাঙালি হিন্দু-মুসলমান ছিল অতি সামান্য। সীমান্তের গারো-হাজং-কোচরা এসেই বলত খুনিরা আমাদের জাতির পিতাকে হত্যা করেছে আমরা তার বদলা নেব। সেই তাদের নিয়ে ২৮ অক্টোবর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে উপচে পড়া ভিড়ে সফল মিলনমেলা উদ্্যাপিত হয়ে গেল। সেপ্টেম্বরের গোড়া থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিরোধ সংগ্রামীদের নিয়ে আলোচনা করতে সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছিলাম। বিধিমতো বার বার কম করে ১০ বার তাগিদ দিয়েছিলাম। প্রথম তারিখ করেছিলাম ২৭-২৮ সেপ্টেম্বর। খুব কাছাকাছি হলো চিন্তা করে সেটাকে ৬ অক্টোবর নিয়েছিলাম। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট খালি না থাকায় ৭ অক্টোবর ভাড়া করেছিলাম। হল বুক করে মনে হচ্ছিল ৩ অক্টোবর সাক্ষাতের সময় প্রার্থনা করে চিঠি দেওয়া হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। ৭ তারিখের মধ্যে সময় পাওয়া খুব একটা যৌক্তিক না। তাই পরদিনই ৭ থেকে ১৪ তারিখ রবিবার করেছিলাম। তারপর ৬ অক্টোবর শেরপুর-নালিতাবাড়ী-হালুয়াঘাট-ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা-শ্যামগঞ্জ সফর করেছি। ’৭৫-এর শত শত সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের সঙ্গে কথা বলে ১৪ তারিখের মিলনমেলা ২৮ অক্টোবর নিয়ে গিয়েছিলাম। ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত একটা ধারণা ছিল ‘হ্যাঁ-না’ যাই হোক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানাবেন।

দেশের কোনো নাগরিক প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিলে তার উত্তর দেওয়া রাষ্ট্রাচার। আমাদের ক্ষেত্রে সে রাষ্ট্রাচার মানা হয়নি। ২৮ তারিখ মিলনমেলা সফলভাবে পরিসমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু তার জন্য ষড়যন্ত্রের শেষ ছিল না। কেউ যাতে আসতে না পারে তার জন্য ৪৮ ঘণ্টা সড়ক পরিবহন ধর্মঘট। কী দুর্ভাগ্য! বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ যোদ্ধারা ঢাকায় একটা মতবিনিময় করবে বঙ্গবন্ধুকন্যার সরকারের কোনো সহযোগিতা পাবে না বরং গাড়ি-ঘোড়া বন্ধ করে অসহযোগিতা করা হবে তা ছিল আমাদের কল্পনার অতীত। তার পরও কয়েক শ সহযোদ্ধা এসেছিল। চোখ জুড়িয়ে গেছে তাদের দেখে, হৃদয় ভরে গেছে কথা শুনে, বহুদিন পর বেশ উজ্জীবিত হয়েছি। মহতী সভা থেকে সরকার এবং দেশের কাছে ’৭৫-এর প্রতিরোধ সংগ্রামীদের যথাযথ স্বীকৃতি ও বীরের মর্যাদা দাবি করেছি। ’৭৫-এর জাতীয় মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ যোদ্ধারা পিতার হত্যার প্রতিবাদ করে জাতিকে যদি পিতৃহত্যার কলঙ্কের দায় থেকে মুক্ত করে থাকেন তাহলে বঙ্গবন্ধুকন্যার সরকারের আমলেই কেন প্রতিরোধ যোদ্ধারা জাতীয় স্বীকৃতি পেল না। এ স্বীকৃতি জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে নয়, আওয়ামী লীগ থেকে নয়, দেশের কাছে আমাদের প্রত্যাশা। আজ এক সরকার আছে তারা স্বীকৃতি দিল আরেক সরকার এসে তা বাতিল করল- এমন নয়। আর জাতির পিতার হত্যার প্রতিবাদ করা জাতিকে হত্যার কলঙ্ক থেকে মুক্ত করা যদি সরকারের বিবেচনায় অন্যায় হয় তাহলে তাদের বিচার করে শাস্তি দিন। যাতে ভাবীকালে ইতিহাস বলতে পারে দেশের পিতার হত্যার বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদ প্রতিরোধ করেছিল তাদের এমন করে শাস্তির মাধ্যমে জাতীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আর যদি তা না হয় তাহলে এই মিলনমেলা প্রস্তাব করছেÑ

১. ’৭৫-এর জাতীয় মুক্তিবাহিনীকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হোক। ২. প্রতিরোধযুদ্ধে শহীদদের এককালীন ২৫ লাখ এবং পরিবার-পরিজনকে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা সম্মানি প্রদান করা হোক। ৩. যারা অবহেলা ও নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেছে তাদের এককালীন ২০ লাখ এবং প্রতি মাসে ৩০ হাজার করে সম্মানি প্রদান করা হোক। ৪. যারা রোগে-শোকে দুঃখ-দৈন্যের পর এখনো বেঁচে আছে তাদের এককালীন ১৫ লাখ এবং প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা করে সম্মানি প্রদান করা হোক। ৫. এ ছাড়া তারা যাতে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের পরই বীরের সম্মান পায় এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনতিবিলম্বে ৫০ হাজার রাষ্ট্রীয় সম্মানি করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের মতো বা কাছাকাছি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধকারীদের চিকিৎসা, যাতায়াত এবং অন্যান্য সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করেছে। জানি না বঙ্গোপসাগরে অমাপা পানি থাকলেও আমাদের কর্মকর্তাদের কানে পানি যাবে কিনা। তবে বেঁচে থাকতেই যদি ’৭৫-এর প্রতিরোধ যোদ্ধাদের যথাযথ মর্যাদা ও স্বীকৃতি আদায় করে যেতে পারি তাহলে সেটা হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনা। প্রথম যখন মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় স্বীকৃতি এবং ২ হাজার টাকা সম্মানি ভাতা দাবি করেছিলাম, উত্তর পেয়েছিলাম পাগল ছাগল গালাগাল। কিন্তু আজ প্রতি মুক্তিযোদ্ধাকে ১০ হাজার টাকা করে সম্মানি দেওয়া হচ্ছে। যা নিতান্তই অপ্রতুল। আমি যখন ২ হাজার টাকা সম্মানি দাবি করেছিলাম তখনকার বাজার মূল্যে এখন ৫০ হাজারেরও বেশি হবে। গালাগাল শুনলেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা হয়েছে। আজ না হয় কাল বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ যোদ্ধাদেরও জাতীয় স্বীকৃতি হবে ইনশা আল্ল­াহ।

প্রিয় পাঠক! বড় দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে এ লেখা লিখছি। যে লেখা হওয়া উচিত ছিল চরম ও পরম আনন্দের। কারণ গত পরশু ’৭৫-এর প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মিলনমেলার আয়োজনে আমার দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গামছার দল যে অভাবনীয় সাংগঠনিক দক্ষতা দেখিয়েছে তাতে অভিভূত হয়েছি। কখনোসখনো ’৭১, ’৭৫-এর মতো সহকর্মীদের মনোবল, উদ্দীপনা ও স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ্য করেছি। মিলনমেলায় আমন্ত্রণ ছাড়াই পিতার মতো বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী, সন্তানের মতো ভাতিজা আবুল হাসান চৌধুরী কায়সারের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে এক অসাধারণ গৌরব ও মর্যাদা দিয়েছে। সর্বোপরি ছোট ভাই বাবুল সিদ্দিকী, আমার স্ত্রী নাসরীন ও আমার সব থেকে প্রিয় ভাগনি ইয়া আহমেদের ছেলে তাইফ আহমেদ জিহাদের অসাধারণ বক্তব্য সবার হৃদয় স্পর্শ করেছে।

গত শুক্রবার সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে দুষ্কৃতিকারীদের আক্রমণ। গণস্বাস্থ্যের দেয়াল ভেঙে ভিতরে ঢুকে মহিলা হোস্টেলের ছাত্রীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন ও গালাগালের কথা শুনে যারপরনাই মর্মাহত হয়েছি। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের টেবিল-চেয়ার নিয়ে নিয়েছে। মিডিয়া সেন্টারের ঘর ভেঙে চুরমার করেছে, কম্পিউটার-ল্যাপটপ ভেঙে একাকার। মেয়েরা যখন আমার সামনে একের পর এক তাদের অসহায়ত্বের কথা, তাদের শারীরিক নির্যাতন, অশ্রাব্য গালাগালের কথা শত কণ্ঠে বলছিল তখন আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছিল। একজন মুসলমান কত অসহায়। আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তার মরার শক্তিও নেই, ঘৃণায়-লজ্জায় দেহ-মন কাঁপছিল। এজন্যই কি মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম। চট্টগ্রামের জাফরুল্লাহ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে আহতদের সেবায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। যে কারণে বঙ্গবন্ধু তাকে স্বাধীনতার পরপরই সাভারে ৩৫ একর সরকারি জায়গা দিয়েছিলেন। দু-তিন জন দাতা ত্যাগী মানুষ আরও কয়েক বিঘা জমি গণস্বাস্থ্যকে দান করেছেন। গণস্বাস্থ্য কিছু জায়গা ক্রয়-বিক্রয় করেছে। জমি নিয়ে অবশ্যই বিরোধ থাকতে পারে। সত্যিকারের জমির মালিকরা যদি আমার কাছেও আসতেন কাগজপত্র দেখে যদি মন বলত তাদের চাওয়া ন্যায় আমি গণস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতাম। কিন্তু কোনো দিন কিছু হয়নি। এলাকার মানুষ গণস্বাস্থ্যের সেবার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এটা খুবই সত্য, ডা. জাফরুল্লাহ ধনী-গরিবের চিকিৎসা অনেকটাই এক করে ফেলেছেন। কোনো দিন কোনো টু-টা শোনা যায়নি। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী কয়েক হাজার, তাদের ল্যাবরেটরি বা কারখানায় কয়েক হাজার লোক কাজ করে। যেই মাত্র জাফরুল্লাহ চৌধুরী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছেন সেই একটি সুনামি প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্যের ওপর কুচক্রীরা নির্লজ্জভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। র‌্যাব তার মোবাইল কোর্ট নিয়ে গণস্বাস্থ্যের কিছু অংশ সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। ১৫ আর ১০, ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে।

অভিযোগ, ওষুধ প্রস্তুতের কিছু কিছু উপাদানের সময়সীমা পার হয়ে যাওয়া। কিন্তু কথাটা সর্বৈব মিথ্যা। ওষুধ প্রস্তুতের কোনো মালামালের সময়সীমা পার তো হয়ইনি ব্রিটেন-আমেরিকা-জার্মানি ও অন্যান্য দেশের কিছু মেটারিয়ালের যার কোনো দিন কোনো লেভেলে মেয়াদোত্তীর্ণের কথা কখনো লেখা থাকত না। আর সে জিনিসগুলো ওষুধ তৈরির নয়। যেগুলো সিজ করে মেয়াদোত্তীর্ণ বলা হয়েছে সেগুলো সবই ওষুধের গুণাগুণ পরীক্ষার কেমিক্যাল। মানুষের সামনে জাফরুল্লাহকে ছোট করতে গিয়ে গণস্বাস্থ্যকে ছোট করা এক কথা নয়, এটা দেশের জন্য অমঙ্গল। গণস্বাস্থ্যের মরফিন বা প্যাথেডিনের বিশ্বজোড়া নাম। আওয়ামী লীগের ডাক্তাররাও গণস্বাস্থ্যের উৎপাদিত মরফিন বা প্যাথেডিন ব্যবহার করে অপারেশন করতে যতটা স্বচ্ছন্দবোধ করেন ব্রিটেন-আমেরিকা-জার্মানি থেকে আনা বেদনানাশক দিয়ে অপারেশন টেবিলে অতটা স্বচ্ছন্দবোধ করে না। কিন্তু গণস্বাস্থ্যের গেটে শত শত গাছ কেটে কোনো এক টেক্সটাইলের গুণ্ডা তথাকথিত আওয়ামী লীগার সেজে ঘর তুলছেন, দালান বানাচ্ছেন প্রশাসন একটি কথাও বলছে না। আমি ফ্যাৎ কাঁদুনে নই। তবু গাছ কাটা দেখে চোখের পানি রাখতে পারিনি। মেয়েদের নির্যাতনের চিহ্ন তাদের গালাগালের কথা শুনে যেমনি অসহায়বোধ করেছি, ঠিক তেমনি পড়ে থাকা গাছগুলো দেখে বার বার মনে হয়েছে এ যেন আমার সন্তানরাই পড়ে আছে। আরও মনে হয়েছে, ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তার পরিবার-পরিজনকে যেভাবে হত্যা করে ফেলে রেখেছিল এ যেন সে রকম কারবালার এক হত্যাকান্ড। কোথায় গিয়ে বিচার পাব? তাই জননেত্রীকেই বলেছিলাম, গণস্বাস্থ্যের মতো একটি প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতির অকল্যাণ হবে।

অবাক হয়েছি, প্রাইমারি স্কুলের চার-পাঁচ শ ছাত্রছাত্রীর সরকারি স্কুলে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এমন অনাচার রাজধানীর এত কাছে হতে পারে যা ছিল আমার বিশ্বাসের অতীত। চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না। এসব করে আওয়ামী লীগের যে কত ক্ষতি হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার যে কত সর্বনাশ হচ্ছে হয়তো ক্ষমতায় থাকার কারণে কেউ বুঝতে পারছেন না বা জননেত্রীর সর্বনাশ করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা কোমর বেঁধে এসব করছে। আজ যদি নারী নিরাপদ না হয়, আজ যদি তরুলতা, গাছ-গাছড়া নিরাপদ না হয় তাহলে কীসের স্বাধীনতা কীসের বাংলাদেশ! আমি তো জানতাম গাছ বোনা সহজ কিন্তু কাটা কঠিন। গণস্বাস্থ্যের শত শত গাছ যে নির্দয়ভাবে কাটা হয়েছে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের মেয়াদোত্তীর্ণ গাছ-গাছড়াও ওভাবে কাটা হয় না। বড় বেশি খারাপ লেগেছে। আজ দু-তিন দিন যা দেখে এসেছি মেয়েদের অপমান মেয়েদের প্রতি নির্যাতন, গাছপালা-তরুলতা হত্যা। এখনো নিজেকে শান্ত-স্বাভাবিক করতে পারছি না। সত্যিই খুব খারাপ লাগছে। হাত-পা ছুড়ে প্রতিবাদ করতে পারলেও কিছুটা সান্ত্বনা পেতাম। তাই ঘটনাটা জেনেই ছুটে গিয়েছিলাম গণস্বাস্থ্যে। সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক হায়দারকে ফোন করেছিলাম। ওরা একসময় আমার খুবই গুণমুগ্ধ কর্মী ছিল। আমি ওদের খুবই ভালোবাসতাম, এখনো বাসি। কিন্তু শুনলাম সে অসহায়, ওপরের হুকুম। সভাপতি হাসিনা দৌলাকে ভালো করে জানি না, চিনি না। তাই তাকে জিজ্ঞাসা করিনি। উপজেলা চেয়ারম্যান ফিরোজ কবিরকে খুব ভালো করে চিনি। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ-প্রতিরোধে সাভারের একগাদা সোনার টুকরোর চাইতে মূল্যবান কোহিনুর পেয়েছিলাম। তার মধ্যে বৈদ্য, গৌর, মাহাবুব, গিয়াস, ফিরোজ কবির ছিল। ফিরোজ কবিরের বাবাকে মোশতাক সরকার মন্ত্রী বানাতে চেয়েছিল।

জিয়াউর রহমানও মন্ত্রী বানাতে চেয়েছিল। আমি গৌর, বৈদ্য, গিয়াসকে বলেছিলাম, ফিরোজকে বল ওর বাবা যেন এ যাত্রায় মন্ত্রী না হয়। ফিরোজের বাবা কথা রেখেছিলেন। তাই গণস্বাস্থ্যের মর্মান্তিক ঘটনা দেখে ত্যক্ত-বিরক্ত ও মর্মাহত হয়ে ফিরোজ কবিরের বাড়িতে জীবনে প্রথম গিয়েছিলাম। ১৪ বিঘার ওপর বিশাল অপূর্বসুন্দর বাড়ি। গাছপালায় ভরা। দেখলেই মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। কবিরকে বলে এসেছি এসব বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে, না হলে মারাত্মক ক্ষতি হবে। যে ক্ষতি হবে তা আন্দাজ করতেও পারছ না। জানি না ও কী করতে পারবে। কারণ আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের শত্র“। আওয়ামী লীগে কেউ শান্তিতে থাকতে পারে না। সরকারে থাকলে তো নয়ই। ক্যাকটাসের মতো চারদিকে কাঁটা। কিন্তু তবু বলেছি, কবিরকে এখনো একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে জানি বলে বলেছি। দেশবাসীর কাছে প্রত্যাশা, দেশটা যাতে একেবারে জঙ্গলের রাজ্য না হয়ে যায় সেজন্য যারা যুবক, যারা ছাত্র তাদের রুখে দাঁড়াতে আহ্বান করছি। আমার যখন যৌবন ছিল আমার যখন রুখে দাঁড়াবার সময় ছিল তখন রুখে দাঁড়াতে কোনো দ্বিধা করিনি, কৃ-পণতা করিনি। আজও যেখানে অন্যায় দেখি সেখানেই ছুটে যাই শুধু এই আশায় আর কি কোনো দিন এই বাংলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্ম হবে না, তার কাদেরের আর কি জন্ম হবে না, যারা আমার সন্তানের নিরাপত্তায় মেয়েদের সম্মান বাঁচাতে জীবনপাত করবে? সেই বিশ্বাসেই বেঁচে আছি। নিশ্চয়ই একদিন না একদিন বাংলায় আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আসবে আবার সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, লতিফ সিদ্দিকীর মতো সংগ্রামী নেতার সঙ্গে দু-চার জন কাদের সিদ্দিকীকেও খুঁজে পাওয়া যাবে- আমি সেই শুভদিনের আশায় চাতকের মতো অপেক্ষায় আছি। সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন।

লেখক : রাজনীতিক

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
apps