• বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট ২০১৮

হোক প্রতিবাদ, গর্জে উঠুক প্রাণ

প্রকাশ:  ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২৩:৪৫ | আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:৪৫
ছরওয়ার হোসেন, নিউ ইয়র্ক
প্রিন্ট

কয়েকদিন পূর্বে জামায়াতে ইসলামীর একজন ত্যাগী নেতার সঙ্গে আমার দীর্ঘক্ষণ রাজনৈতিক বাদানুবাদ হলো। আলোচনার এক পর্যায়ে তাকে প্রশ্ন করলাম, বলুনতো আপনার দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের সফলতা কি? তিনি উত্তরে বললেন, আওয়ামী লীগ নিজেরে মধ্যে রাখঢাক না করে আত্মসমালোচনা করে, নিজেরা বিভাজিতও হয় আবার সংকটকালে মূহুর্তে একীভূতও হয়ে যায়। যা অন্যেদের চেয়ে তাদের সাংগটনিক শক্তিকে অধিকতর মহিমান্বিত করেছে।

তিনি আমার দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের সাংগটনিক শক্তির উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে আমি বললাম, সংগঠনের কর্মীরে অধিকার সচেতনতা, যা সংগঠনকে চলার গতি নির্ণীত করে। তিনি আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করেছিলেন। কিন্তু, ইদানিং দেখছি দেশব্যাপী কোটি কোটি আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকগণ সংগঠনের তৃণমূলে তাদের নিজ অধিকারের প্রশ্নে যেন আপোষ করেছে। বিষয়টি আমাকে ব্যথিত করছে। কারণ, তা গোটা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বটে। কই গেলো সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক লসমূহের প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূল ভোটের বিরলজন্মা আনন্দ? আহ্লাদ?

এখন দেখি সব দলেরই শীর্ষ নেতৃত্বের দয়ায়-কৃপায় এমপিত্ব মনোনয়নের কুসংস্কৃতি আবার গর্জে উঠছে। যতো বড়ো নেতা হোননা কেন, সবার দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন কেবল একক বা ব্যক্তিসমষ্টির দয়ার বা অনুকম্পার উপর আবারও নির্ভরশীল হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। সব দলে একই আওয়াজ। ‘যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তার পক্ষে দলীয় কর্মীরে রাখতেই হবে’! এর মানে সৎ লোকের সাথে চোর, ছিনতাইকারী, দুর্নীতিবাজ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনকারী, বিদেশে অর্থ পাচারকারী, ঋণখেলাপী, কালো টাকার মালিক, খুনি, সুদ, মাদক ব্যবসায়ী, ইয়াবার কারবারী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, জমি দখলকারী প্রভৃতি নানা গুনে গুনান্বীত প্রথিতযষারে দলীয় মনোনয়নেও আমাদেরকে চোখ বুজে মাথা গুজে সমর্থন জানাতে হবে। তাদেরকে এমপি বানাতে দিনরাত পরিশ্রম করতে হবে, পকেটের অর্থ খরচ করতে হবে। সর্বোপরি যেন দলীয় কর্মী হওয়ার অপরাধে, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার অপরাধে সমস্ত বিবেক-মূল্যবোধকে কষ্ট করে বিসর্জন দিয়ে হলেও জেনে বুঝে কেবল দলীয় প্রার্থীতার খাতিরে আমরা একজন অসৎ মানুষকেও সমর্থন করতে বাধ্য থাকতে হবে।

কই, একটি দলেরওতো কোন কর্মীকে এ বিষয়ে মুখ খুলতে দেখছি না। দলের সমগ্র নেতাকর্মীদের জন্য আপনার এলাকার সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তি বা নেতৃত্বকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দানে দলীয় মনোনোয়ন প্রদানে নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে দলের সর্বোচ্চ ফোরামে সুপারিশের যে সুযোগ পেয়েছিলো বাংলার মানুষ আজ তা হরণ করে নিচ্ছে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, যা ছিলো দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার, যা গণতন্ত্রকে তৃণমূল থেকে উচ্ছসিত ও বলিষ্ঠ করতে ছিলো উৎকৃষ্ট সহায়ক শক্তি- তাই যখন বলা নেই, কওয়া নেই উচ্ছিষ্ট হতে চলেছে। তখন এ বিষয়ে সকল রাজনৈতিক কর্মী নিস্তব্ধ! নিথর! যেন দলের ভিতর কর্মীরে অধিকার বলে কিছু নেই।

অবশ্য কেউ এ অধিকারের ধারও ধারেনা। এ বিষয়ে আমাদের বোধদয় নেই। তবে কি আমরা লাশ আর ঢাকা থেকে কর্মীদের উপর যা চাপিয়ে দেওয়া হবে তাই সকলের পালন করা অবশ্যকর্তব্য? হ্যাঁ, বাংলাদেশের বেলায় এটাই হয়তো ঠিক। খালেদা জিয়া আগুন সন্ত্রাসের নির্দেশ দিলে আমরাও নির্দেশিত পথে চলি, কেননা নেত্রীর নির্দেশ! আবার যদি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাঘা কাদের সিদ্দিকী (বীরোত্তম)’র সমালোচনা করেন, তবে আমরাও বলবো, ‘উনি আসলে একটা রাজাকার, প্রাণ বাঁচাতে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলো’। লতিফ সিদ্দীকীর অতিবাচালতার প্রসঙ্গ বাদই দিলাম। আর মানবতাবিরোধী রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মোজাহিদ যখন বলে “এদেশে কোন মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, এটা ছিলো পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ। এদেশে কোন মুক্তিযোদ্ধা নেই, রাজাকারও নেই।” তখন আমরাও বলি ‘মারহাবা’ এতোদিনে সত্যকথাটি কইলেন তবে, সৎ সাহসের জন্য রাজাকার মুজাহিদকেও দেই বীরের উপাধি। এই হলো বাংলাদেশের ব্যাপকসংখ্যক রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের নৈতিকতাবোধ।

ক্ষুদ্র মানুষ। আমেরিকায় থাকি বলে নয়, বরাবরই স্বাধীনচেতনা ধারণ করেছি। আর এর মূল হচ্ছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলার স্বাধীনতার মহানায়ক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর জীবনীপাঠে উদ্বুদ্ধ হয়েই শিক্ষাজীবনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ করার সুযোগ হয়েছিলো বলেই হয়তো একটি প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, দেখার অভিলাষী হই।

সাম্প্রতিক সংসদে পাশ হওয়া ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ২০১৮’র মূল বিষয়গুলো পড়লাম। বুঝলাম। মনে হলো অতি কাঁচা হাতের ড্রাফ্টিং। বছর হবে বোধ হয়। বাংলাদেশের সংসদে পাশ হয়েছিলো ‘নাগরিকত্ব আইন ২০১৬’। এতে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে কিছু ধারা উপধারাকে কেন্দ্র করে দুনিয়া জুড়ে বিরাজমান অভিবাসী বাংলাশেীদের বাংলাদেশী নাগরিকত্বের বিষয়ে দেশে বিদেশে এক প্রকারের ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিলো, আন্দোলন দানা বেঁধেছিলো। আমরাও নীরব থাকতে পারিনি। যুক্তরাজ্যের মতো নিউ ইয়র্কেও সভা সেমিনার করেছিলাম। লেখালেখি করেছিলাম। সরকার একসময় তা সংশোধন করে। মজার বিষয় হলো, সংশোধনের পূর্বে আইনের ধারা উপধারাগুলো পড়ে নিজের কাছে মনে হয়েছিলো যে, আইনসচিব হয়তো মাতাল অবস্থায় আইনের চুড়ান্ত ড্রাফ্টটি মন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। মনে হয়েছিলো গ্রামের শিশু কিশোর সংস্থার সাপ্তাহিক বা মাসিক সভায়ও হয়তো এর চেয়ে মানসম্মত রেজ্যুলেশন লেখা হয় বা কন্ঠভোটে পাশ হয়। আর মন্ত্রী, এমপিদের বিষয়ে না বলাই শ্রেয়। তারাতো একটানে দেশের লক্ষ লক্ষ প্রবাসীদেরকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করার পথ কুসুমাস্তীর্ণ করে দিলেন।

অপেক্ষায় ছিলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবশেষে কি করেন। যাক, তাঁকে ধন্যবাদ জানাই, তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরে সংশোধনের উদ্যোগ নেন। তাই হয়তো এখনো বাংলাদেশ নিয়ে ভাবনার সুযোগ পাচ্ছি।

এবার সংসদে পাশ হওয়া ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট ২০১৮’ও অবশ্য সংশোধন উপযোগী আইন, একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। এ আইন নিয়ে বিশ্বের মেইন ষ্ট্রীম মিডিয়ায় ফলাও করে লেখালেখি হচ্ছে। মানুষের চিন্তা চেতনার নবজাগরণের উচ্ছাসে মুখরিত বর্তমান বিশ্বে এ ধরণের আইন অতি বেমানান। সরকার তার দৃষ্টিতে আইন করে, জনগণ তারে নিজ বিচার বিবেচনায় আপন অধিকারের প্রশ্নে আইনের বিরুদ্ধাচারণ করে, প্রতিবাদ করে, আন্দোলন করে। একসময় সরকারের দিবাঘুম ভাঙ্গে।

মানুষের অধিকার ক্ষুন্নের জায়গায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনে। এভাবেই অনাদীকাল থেকে সরকারের সাথে মানুষের দেন- দরবার, জগড়া-সংঘর্ষের ফায়সালা নির্ণীত হয়েছে। এবার ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট ২০১৮কে কেন্দ্র করে সরকার-জনগণ দরবার শুরু হয়েছে। সাধারণ জনগণ এ বিষয়ে মুখ খোলে দেরীতে। এগুলো বিদগ্ধজনের বিষয় তাই এবার দেশের সাংবাদিক, লেখক, কলামিষ্টসমাজ উচ্ছকিত। কিন্তু, কেন কেবল সাংবাদিকেরা কথা বলবে? কেন দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে মুখরিত হয়না? এটাই প্রশ্ন, এটাই বাংলাদেশের রাজনীতির দুর্বলতা। এটি সংশোধিত না হলে একসময় একটি কালো আইন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা দখল করবে তা নিশ্চিত বলা যায়।

এ আইনের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হচ্ছে বৃটিশ আমলের অফিসিয়াল প্রাইভেসি এ্যাক্টকে পূনরূজ্জীবিত করা। এর মাধ্যমে প্রশাসনিক দ‚র্ণীতি বৃদ্ধি পাবে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে কাগজাত দূর্ণীতির ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রতি যে ভঁয় থাকে তা রহিত হবে। এ কেমন আইন যে, আপনি সাংবাদিক হয়েও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ তথ্যাদি প্রকাশের ক্ষেত্রে হাতবাধা থাকবেন! এ আইন বলবৎ হলে সাংবাদিকদের সরকারী বেসরকারী অফিস আদালত থেকে দু কিলোমিটার দুরত্বে অবস্থান করাই শ্রেয় বলে মনে করি। কারণ, বউ বাচ্ছাতো সকলেরই আছে। জেলে না যাওয়াই শ্রেয়। আমি একজন নাগরিক হিসেবে এ আইনের তীব্র নিন্দা ও তা সংশোধনের জোর দাবী জানাচ্ছি।

এ আইনের মাধ্যমে দেশে দূর্ণীতির বিস্তার হবে মহাসমারোহে। অসৎ উদ্দেশ্যে যে কোন সরকার চাইলেই মানুষের কন্ঠ ও কলমের গতি রোধ করতে পারবে অন্যায়ভাবে। সাংবাদিক, লেখক, সাহিত্যিক, কলামিষ্টদের সদাজাগ্রত হুমকীর সম্ম‚খে কাজ করতে হবে। দেশে আমলাতান্ত্রিক দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পাবে, সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পাবে, পুলিশী হয়রানী বৃদ্ধি পাবে, সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনার পথ সংকীর্ণ হবে। এ ধরণের আইন বর্তমান বিশ্বে মুক্ত সমাজে বেমানান। চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়। আমলাতন্ত্রের বেড়াজালে এটি আরেকটি কাঁচা ড্রাফ্টিং। অবশ্যই দেশের গণমানুষের প্রত্যাশার প্রতি সুদৃষ্টি দান করে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ন্যায় সঙ্গত দাবীকে গ্রাহ্য করে কেবল গতানূগথিক আইন প্রণয়ন নয়, একটি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘস্থায়ী গণকল্যানম‚খি আইন প্রণয়নে আলোচ্য আইনের অবশ্যই পর্যাপ্ত সংশোধনীর প্রয়োজন। প্রশ্ন, এতো জ্ঞাণীগুণী সংসদ সদস্যরা কি তবে ঘুমিয়ে ছিলেন? অবশ্যই না। তবে মনে করিয়ে দিতে চাই, এদেশে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী কয়েকঘন্টা দাড়িয়ে বাজেট বক্তৃতা করেন। কিন্তু, কয়জন সংসদ সদস্য সংশোধনী প্রস্তাব দেন? আবার অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতা শেষ করার অব্যবহিত পরেই দেশব্যাপী তাঁকে ও সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে রাস্তায় নেতাকর্মীরা মিছিল বের করে দেন। আর অনেকাংশে মিছিলের ব্যানার প‚র্বেই প্রস্তুত করা থাকে। তাই এদেশে শেষ ভরসা একজন প্রধানমন্ত্রী। বিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর উদ্যোগ গ্রহন করবেন বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

জাতিসংঘের ৭৩তম অধিবেশন উপলক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গত ২৩শে সেপ্টেম্বর, রবিবার সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্কের হিলটন হোটেল বলরমে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে। অনুষ্টানে বাংলাদেশের বাস্তবিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থায় সামাজিক মিডিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির কুটকৌশল, নামে বেনামে অনলাইন পোর্টাল খুলে সরকার ও রাষ্ট্র বিরোধী মিথ্যা অপপ্রচার চালানো প্রভৃতির প্রেক্ষিতে ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট ২০১৮ প্রণয়নের পূর্বাপর প্রয়োজনীয়তা বর্ণনাপূর্বক প্রধানমন্ত্রী ঘোষনা দেন যে, ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট ২০১৮ গণমাধ্যম কর্মী, বা সাংবাদিক, কলামিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে নয়, মূলত সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির যে কোন পাঁয়তারার বিরুদ্ধে কার্যকর হবে। তিনি এ বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের দুশ্চিন্তাগ্রস্থ না হওয়ার আহবান জানান।

আমার প্রশ্ন, এ আইনের মাধ্যমে যেখানে সামান্য চুন থেকে পান খসলেই গণমাধ্যমকর্মীদের জেলে যাবার ভঁয় থাকে, সামান্য কারণে পুলিশী হয়রানী বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের রক্তচক্ষু দর্শনের ভয় থাকে- সেখানে গণমাধ্যমকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনায় নির্ভয় হতে পারবে কি? ভয়কাঁতুরে কলম কি লিখতে পারে বা কন্ঠ কি বলতে পারে? আর কেনইবা আইনের দ্বারা হাতবাধা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের উপর নির্ভরশীল থেকে তাদের কাজ করতে হবে? এখানে কি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হবে না? এটা কি রাষ্ট্রে মানবিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাবক নয়?

এ আইনের পর্যাপ্ত সংশোধনী জরুরী। সামাজিক মিডিয়া আর মুলধারার গণমাধ্যমকে আলাদাভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। গুজব রটনাকারী, মিথ্যা সংবাদ প্রকাশকারী, সামাজিক বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী ব্যক্তি ও সংবাদকর্মীদের মধ্যে সঙ্গাগত পার্থক্য নিরুপণ করতে হবে। বৃটিশ আমলের অফিসিয়াল প্রাইভেসি এ্যাক্টের মতো কালো আইনের পূনরুজ্জীবন না ঘটিয়ে যুগের তালে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক গোপনীয়তা রক্ষা বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে বস্তুনিষ্ট নতুন আইন প্রনয়ন করতে হবে। সমগ্র দেশে পদ্মার জোয়ারের মতো উপচেপড়া দূর্ণীতির মহাজোয়ারকে চেপে ধরতে প্রশাসনের ন্য‚নতম স্তরে বরং সাংবাদিকদের অবাধ যাতায়াতের সুযোগকে অবারিত করতে হবে, তথ্য প্রাপ্তির অধিকারকে সমুন্নত করতে হবে। ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট ২০১৮ রাষ্ট্রের তথ্য অধিকার আইনের স্পষ্ট বরখেলাপ ও এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আলোচ্য আইন বাস্তবায়িত হলে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সরকারী অফিস আদালত থেকে সাংবাদিকদের শিয়াল কুকুরের মতো তাড়িয়ে দেওয়ার যথোপযুক্ত শক্তি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হস্তগত হবে। সামাজিক বাস্তবতায় যা নির্দ্ধিধায় বলা যায়।

মধ্যযুগ থেকে আজব্দী সমগ্র বিশ্বে রাষ্ট্র ও সমাজন্নোয়নে নানাবিদ বিষয়ে গণমানুষের জাগরণ ও সরকারের গৃহিত নানা রকম বিধি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই পৃথিবীতে ব্যক্তি ও বাক স্বাধীনতা, নারী পুরুষের অধিকারের সমতা, গণতন্ত্রের সৃষ্টি, মানুষের ভোটাধিকার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, রাষ্ট্র ও সমাজে মানুষের সমঅধিকারের নিশ্চয়তাসহ মানুষের সকল অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। এতে নানান দেশে, নানা পরিবেশ পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ বা আন্দোলনের গতি প্রকৃতির ভিন্নতা ছিলো। কিন্তু, সরকারের গৃহিত পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা আন্দোলনই সরকারের চক্ষু খোলে দিয়েছে এবং গণমানুষের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে।

মার্ক টোয়েন আমেরিকায় খুবই জনপ্রিয়। নিউ ইয়র্কে কোন কোন রেষ্টুরেন্টে কাষ্টমার আকৃষ্ট করতে মার্ক টোয়েনের পান করা ওয়াইন, ককটেল বা অন্যান্য বেভারেজকে মেন্যুতে উপস্থাপন করা হয়। লেখালেখির বিষয় ছাড়াও আমেরিকার নারী আন্দোলন, সার্বজনীন ভোটাধিকার আন্দোলন, সিভিল রাইটস বা সমাধিকার আন্দোলনের প্রিয় মুখ ছিলেন মার্ক টোয়েন। তাঁর বক্তৃতা মানুষকে উজ্জীবিত করতো। অনুপ্রেরণা দান করতো। মার্ক টোয়েন রিপাবলিকান বা ডেমোক্রেট উভয়ের কাছেই জনপ্রিয়। আবার তিনি উভয় দলের সরকারের বিরুদ্ধেই সোচ্চার ছিলেন। আমেরিকার প্রগতিশীল আন্দোলনে আজও মানুষ মার্ক টোয়েনকে অনুসরণ করে। আজ বাংলাদেশে নীতিহীন, নৈতিকতাহীন শুধু নয়, যুক্তিহীন বিনয় প্রদর্শনে উদ্ধত দলদাস বা দলবাজদের প্রচন্ড ভীড়ে দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে যখন দলাদলীর উর্দ্ধে উঠে কিছু মানুষকে প্রতিবাদী হতে দেখি, বলতে দেখি, লিখতে দেখি তখন ভালো লাগে। ব্যস্ততার মাঝেও তাদের কথাগুলো শুনি, লেখাগুলো পড়ি। এরা আবার আওয়ামী লীগের সাপোর্টারদের কাছে বিরোধী দলের স্পাই বা বিরোধী দলের সমর্থকদের কাছে আওয়ামী লীগের তল্পীবাহক বলে পরিগণিত। সরকারের সমালোচনায় সামান্য দরুণ তাদের চাকুরী যাবার যেমন ভয় থাকে, তেমনি বিএনপি জামাতের আগুন সন্ত্রাস বা তারেক জিয়ার দ‚র্ণীতির বিরুদ্ধে লিখলে সকালে ঘুম থেকে জেঁগে ঘরের কোনে কাঁফনের কাপড় দেখতে পায় বা পায় নৃসংশ মৃত্যুর পরোয়ানা। তারপরও তারা বলেন, লিখেন, প্রতিবাদ করেন। একটি রাষ্ট্রে যখণ এ ধরণের মানুষের অতিমাত্রায় অভাব অনুভ‚ত হয় তখন বুঝতে হবে সে রাষ্ট্র শোষক দ্বারা শাসিত হচ্ছে, সে রাষ্ট্র ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার দিকে ধাবমান।

কিন্তু, বাংলাদেশ! তৃতীয় বিশ্বের দেশসম‚হের মধ্যে একটি বিস্ময়জাগানিয়া উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আবির্ভ‚ত হয়েছে। গত দশ বছর থেকে ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকার অনেক ভ‚ল থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে না পারলেও দেশের মানুষের চিন্তা চেতনায় উন্নয়নমূখি রাজনৈতিক চিন্তার জাগরন ঘটিয়েছে বিস্ময়করভাবে। আজ বাংলাদেশ যেমন অন্যান্য উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের নিকট অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীও একজন আলোচিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। নিঃসন্দেহে যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রজ্ঞা ও দুরদর্শীতার আলোকে একটি সফল অর্জন বলে স্বীকার করতে হবে। তাঁর সমূহ সফলতার বেদীমূলে আলোচ্য ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট ২০১৮ হতে পারে একটি বিষফোঁড়া বা নিকষকালো দাগ। যা পরিত্যাজ্য। সমগ্র আইনের বিশ্লেষন ছাড়াও বলতে পারি যে, যদি এ আইন বলবৎ থাকে তবে তা বাংলাদেশের সাংবাদিক বা বুদ্ধিজীবি সমাজের জন্য শুধু নয়, বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথে একটি পাহাড়সম বাধায় পরিণত হবে। ইদুরের ফাঁদ ইদুর ও মানুষ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। ইদুর না লাগলে ভ‚লবশতঃ বা সুযোগে ঘরের শিশু ও বয়স্করাও এ ফাঁদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কথাটি মনে রাখতে হবে।

সাংবাদিক নঈম নিজামের লেখা ‘এই দিন দিন নয় আরো দিন আছে’ বা পীর হাবিবের লেখা ‘এই কালো পাহাড় সরিয়ে আমার স্বাধীনতা দাও’ সহ আরো অনেকের এ বিষয়ে লেখাগুলো পড়লাম। মঞ্জরুল আহসান বুলবুল, গোলাম মোর্তজা বা আরো অনেকের লেখনি ও বক্তৃতা মনোযোগসহকারে হৃদয়ঙ্গম করেছি। এ বিষয়ে তাদের জাগরণ ও প্রতিবাদকে দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমিও সমর্থন করি। কিন্তু, একটি জায়গায় এসে খটকা লাগছে যে, দেশের সরকারদলীয় মানুষগুলো এ বিষয়ে যুক্তিহীন নিরব। যা বেমানান। মফস্বল সংবাদকর্মীরা নিরব। যেন তারা ব্যক্তিবিশেষের কাছের মানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। হয়তো বিপদ আসলে কাছের মানুষ তাদের রক্ষায় আসবেন।

ভদ্রতার খাতিরে ক্ষিন কন্ঠে হলেও বলতে চাই, দিনের শেষান্তে আওয়ামী লীগই কিন্তু এদেশের সকল প্রগতিশীল আন্দোলনের শিকড় সংগটন, একথা মনে রাখতে হবে। প্রতিক্রিয়াশীলরা যেখানে নিরব থাকে আওয়ামী লীগ সেখানে থাকে সরব। এটাই আওয়ামী লীগের সফলতা। কিন্তু, দৈবাৎক্রমে কাল যদি আওয়ামী লীগকে বিরোধী দলে আসতে হয় তবে এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ই হবে অন্যের দ্বারা দেশবাসীকে শোষনের হাতিয়ার। তাই বলছি, ইদুরের ফাঁদ ক্ষেত্র বিশেষে মানুষেরও ব্যাপক ক্ষতি ডেকে আনে। আমি মনে করি, এ আইনের বিরুদ্ধে জাগ্রত হওয়া কেবল গণমাধ্যম কর্মীদের কাজ নয়, দলমত নির্বিশেষে সকলকেই জাগ্রত হতে হবে। তবেই সরকার এর সংশোধন ত্বরান্বীত করবে।

সৎপথে, সৎ উদ্দেশ্যে, রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যানে দলমত নির্বিশেষে সকলের জাগরণ ও অংশগ্রহন অব্যাহত থাকুক। তবেই আমরা দেশের দূর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও পরিমন্ডল ভেদ করে একটি আলোকিত, প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি রচনা করতে পারবো। নবজাতকের কাছে যেমন আমাদের দৃঢ় অঙ্গিকার রয়েছে তার জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রচনা করে যাওয়ার, তেমনি তা বাস্তবায়নের জন্য সকলকে সৎ সাহসী ও প্রয়োজনে দলমতের উর্দ্ধে উঠার সংস্কৃতি লালন করতে হবে। প্রতিবাদ করা মানেই দলবিরোধিতা নয়, প্রতিবাদ করা মানেই বিদ্রোহ নয়। প্রতিবাদ হচ্ছে আমার ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তির হাতিয়ার। প্রতিবাদ ব্যতিত রাজনীতি অন্ধ। তাই সরকারের চক্ষু না খোলা পর্যন্ত হোক প্রতিবাদ।

-একে

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন