• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

শুভ জন্মদিন ‘ভারতের পিকাসো’

প্রকাশ:  ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৩:২০
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট

ফিদা মকবুল, পুরো নাম মকবুল ফিদা হুসেন। যিনি ‘ভারতের পিকাসো’ নামেও পরিচিত। তার কাজে বিষয়বৈচিত্র্য, চরিত্রের বর্ণময়তা আর সৃষ্টির নির্বিচার সমারোহ ছিল সবসময়। তিনি ১৯৭১ সালে ‘অ্যাগনি’ শিরোনামে একটি ছবি এঁকেছিলেন। এতে ঊর্ধ্বমুখ ঘোড়াটিকে দেখলে অবধারিতভাবে পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’র কথা মনে পড়ে। এ কারণেই তাকে ভারতের পিকাসো বলে আখ্যায়িত করা হয়।

১৯১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মুম্বাইয়ের খুব কাছে পান্ধারপুরে ফিদা মকবুল জন্মেছিলেন। দেড় বছর বয়সেই মাকে হারান তিনি। এরপরেই আবার বিয়ে করেন ফিতার বাবা ও তাদের পরিবার ইন্দোর চলে যান। ইন্দোরে তার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। মা হারা ফিদার কাছের মানুষ ছিলেন দাদা। দাদা স্যাকরার কাজ করতেন। আলো নিয়ে কাজ করতেন। হারিকেন, কুপি ইত্যাদি বানাতেন। পরবর্তী সময়ে ফিদার বহু ছবিতেই তার দাদার চেহারার ছাপ পাওয়া যায়। শিক্ষাজীবনে তিনি অল্প সময়ের জন্য মাদ্রসায় পড়েছিলেন। এজন্য তার অনেক ছবিতে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের ক্যালিগ্রাফিক জ্যামিতিক গড়ন, তার প্রলম্বিত এবং আনুভূমিক রেখা সরব হয়ে ওঠে।

ফিদা বাস করতেন একটি অখ্যাত পল্লিতে। তবে বেশিরভাগ সময় ফুটপাতে, রেলস্টেশনে ঘুরে বেড়াতেন। একদিন অফার এলো সিনেমার হোর্ডিংয়ের কাজের। কাজটা তিনি নিলেন,তবে শিখতে অনেক সময় লেগেছিল তার। শেখা শেষ হলে বিরাটাকৃতির সিনেমার পোস্টার আঁকতে শুরু করেন তিনি। তার হাতে সিনেমার পোস্টার আলাদাভাবে নান্দনিক মাত্রায় উত্তীর্ণ হয়ে ওঠে। এভাবে ফিদার কাছে প্রিয় হয়ে উঠলো চলচ্চিত্রের কাজ।

তিনি প্রায় বলতেন – ‘দৃশ্য চিত্ররূপের গতিময়তা’ তার কাছে সবচাইতে শক্তিশালী শিল্পভাষা। ১৯৬৭ সালে তার প্রথম চলচ্চিত্র থ্রু দ্য আইজ অব আ পেইন্টার নির্মাণ করেন। এটি বার্লিনে চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন বেয়র পুরস্কার পায়। হিন্দু পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্র, হিন্দু দেবী তার প্রিয় বিষয় ছিল। এছাড়া বিষয় হিসেবে নারী, ঘোড়া তার ছবিতে বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। তার ছবির বক্তব্য অকপট। রং, রেখা বলিষ্ঠভাবে তার ছবির আকারবিন্যাসকে জারিত করে রাখে। উজ্জ্বল লাল, নীল, বাদামি রং ইত্যাদি স্বকীয় চরিত্র পায় হুসেনের ছবিতে।

এক সময়ে তার ছবি হয়ে ওঠে ফিদার নিজস্ব ব্যক্তিত্বের সহায়ক। মহাভারত, রামায়ণ, মহাত্মা গান্ধী, মাদার তেরেসা, ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন – এ সবকিছুই তার বিবিধ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে। সমসাময়িক ঘটনা দেখে তিনি থেমে থাকতেন না। এসব ঘটনা তাকে খুব নাড়া দিত। তাই সমসাময়িক ঘটনাগুলো তার ছবিতে প্রাধান্য পেত। তিনি ভারতের সমকালীন শিল্পধারায় নিজস্ব একটি ঘরানা নির্মাণ করেছিলেন।

ফিদা হুসেন পশ্চিমকে গ্রহণ করেছেন একই সঙ্গে ভারতের ঐতিহ্যকে সমকালের প্রেক্ষাপটে অবিনশ্বর করে তুলেছেন। তিনি পশ্চিমের বাস্তববাদ, ন্যাচারালিজম এদিকে ভারতবর্ষের অবনীন্দ্র-নন্দলালের বেঙ্গল স্কুলের সুললিত সাহিত্যিক ভাবব্যঞ্জনাকে তিনি খারিজ করে দিলেন। আঁকলেন নতুন ছবি। তিনি তালগাছের মতো একটিমাত্র ঋজু রেখায় আকাশের দিকে ওঠার পক্ষপাতী নন বরং বটগাছের মতো অসংখ্য ডালপালায় নিজেকে চারদিকে বিস্তীর্ণ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন রামমোহন, বিবেকানন্দ, তিলক, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীর দর্শন; যাঁদের জীবনে ভারত, অভারত দুই-ই রয়েছে। ভারতীয়ত্বের ছাপ ত্যাগ করার ফলেই যাদের ভারতীয় শেকড় শক্ত হয়েছিল। মকবুল ফিদা সেই অর্থে ভারতীয় ছিলেন।

সাম্প্রদায়িকতা তাকে মুক্তি দেয়নি। তার ছবির প্রদর্শনীকক্ষ ভাঙচুর হয়েছে। গোঁড়া হিন্দুত্ববাদীর আন্দোলনে তিনি ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ১৯৭০ সালে আঁকা হুসেনের নগ্নিকারূপী দুর্গা ও সরস্বতীর চিত্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি ব্যবহার শুরু করে। প্রদর্শনীতে হামলা থেকে শুরু করে শারীরিক হুমকি পর্যন্ত তাকে দেওয়া হয়। মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা ইত্যাদি তাকে ঘিরে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার করেছিল। ভারতের শিল্প-সাহিত্য মহলের নাগরিক সমাজ খুব যে বেশি প্রতিবাদ করেছিল তাও নয়। ১৯৯৮ সালে উগ্র সাম্প্রদায়িক বজরং দলের লোকজন তার বাড়ি আক্রমণ করে চিত্রকর্মে অগ্নিসংযোগ করে। নানা প্রদর্শনী থেকে তার ছবি নামিয়ে ফেলা হয়। তার ‘ভারতমাতা’ ছবির জন্য ২০০৬ সালে আবার মামলা হয়। জামিন ছাড়া গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন দেশত্যাগ করেন।

প্রবাসজীবনে কাতার এবং যুক্তরাজ্যেকে বেছে নেন।তিনি। সমালোচনা নিয়ে খুব ভাবতেন না এই শিল্পী। বরং তিনি বলতেন, ‘ঈশ্বর আমার দেহের মধ্যে রয়েছেন, বাইরের কোনো ঈশ্বর আমি মানি না।’ আরও বলেছিলেন, ‘আমার কোনো ঘরানা নেই’, ‘আমি ব্যাকরণ মানি না। আমার রং মেশাবার কৌশল আমারই মতো।’

শুধু চিত্রকলা অথবা চলচ্চিত্র নয়, তিনি একজন কবিও ছিলেন। তার ছবির প্রথম প্রদর্শনীর আয়োজন হয় ১৯৫০ সালে। প্রথম প্রদর্শীতে শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান সবার কাছে। ওই বছরেই ফ্রান্সিস নিউটন সুজার আমন্ত্রণে তিনি প্রগ্রেসিভ আর্টিস্ট গ্রুপে যোগ দেন। ললিতকলা অ্যাকাডেমি আয়োজিত ১৯৫৫-তে প্রথম জাতীয় প্রদর্শনীতে প্রথম পুরস্কার পান তিনি। এরপর ১৯৭১ সালে পাওলো বিয়েনালে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার লাভের পর ভারতে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ, টোকিও বিয়েনাল পুরস্কারসহ পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। নেহরু পরিবারের কাছের একজন ছিলেন তিনি। ইন্দিরা গান্ধীর ছবি একেছেন। মাদার তেরেসা তার প্রিয় বিষয়। এই নারীকে তিনি বারবার একেছেন।

অসংখ্য নারীর চিত্রকর্মের মাধ্যমে মাতৃরূপের কল্পিত মুখখানি খুঁজে দেখার ছাপ পাওয়া যায় তার ছবিতে। মকবুল ফিদা হুসেনের অসংখ্য চিত্রকলার ভেতর উল্লেখযোগ্য হলো- বিটুইন দ্য স্পাইডার এ্যান্ড দ্য ল্যাম্প, বীণা পেস্নয়ার, গণেশ, মাদার তেরেসা, মাদার ইন্ডিয়া, দ্য ওরামা ইত্যাদি।

১৯৬৭ সালে Through the Eyes of a Painter নামে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। যা বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয় এবং গোল্ডেন বিয়ার অর্জন করে। তিনি বলিউডের নায়িকাদের কাছ থেকে ছবি আঁকার অনুপ্রেরণা পান। তার প্রিয় নায়িকার তালিকায় ছিলেন আনুশকা শর্মা, অমৃতা রাও, মাধুরী দীক্ষিত, টাবু, বিদ্যা বালান ও উর্মিলা মাতন্ডাকার। মাধুরী দীক্ষিতকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘গজগামিনী’। ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ দেখার পর বলিউডের এ শীর্ষ নায়িকার অন্ধ ভক্ত হয়ে যান তিনি। টাবুকে নিয়ে তৈরি করেছিলেন ‘মিনাক্ষী’।

মকবুল ফিদা হুসেনের শিল্পকর্ম সময়কে জয় করতে সক্ষম হয়েছিল। ২০১১ সালের ৯ জুন ৯৫ বছর বয়সে লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই শিল্পী।

/রবিউল

মকবুল ফিদা হুসেন
apps