• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

শাহনাজ মুন্নীর গল্প: ডানা বিসর্জন

প্রকাশ:  ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০২:৩৪ | আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০২:৫০
পূর্বপশ্চিম সাহিত্য ডেস্ক
প্রিন্ট

[লেখক পরিচিতি: শাহনাজ মুন্নীর জন্ম ১৯৬৯-এর ৮ ফেব্রুয়ারি, ঢাকায়। সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি পেশায় টেলিভিশন সাংবাদিক। নিউজ২৪ টিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক। সাংবাদিক হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা পেলেও তিনি মূলত লেখক। এ পর্যন্ত গল্প উপন্যাস গবেষণা মিলিয়ে তার বইয়ের সংখ্যা কুড়িটি।]

জীবনে সবাই কত কিছুই তো হতে চায়, আর আমি হতে চাইলাম একজন পরিপূর্ণ, নিখুঁত সুখী মানুষ—হ্যাপি দ্য ম্যান। পঁচিশ বছর বয়সে, চারপাশের সবাইকে জানিয়ে আমি আমার জীবনের লক্ষ্য পূরণের জন্য কাজ শুরু করলাম।

ছোটবেলায় শুনেছিলাম অথবা পড়েছিলাম, সুখী মানুষের নাকি কোনো জামা থাকে না। বন্ধুরা সেটা মনে করিয়ে দিয়ে বলল, ‘তুই সুখী হবি কীভাবে, তোর তো অনেকগুলো জামা।’

দেখলাম, শার্ট, টি-শার্ট মিলিয়ে আমার প্রায় বত্রিশটা জামা। সুখী মানুষ হওয়ার প্রথম ধাপে পা রাখার জন্য মাকে বললাম, ‘সমস্ত জামা দান করে দেব। কারণ, সুখী মানুষদের জামা থাকতে নেই।’

মা জিবে কামড় দিয়ে বলল, ‘সর্বনাশ, অত বড় একটা পোলা জামাকাপড় ছাড়া বাড়ির মধ্যে ঘুরবে, সেইটা কেমন দেখাবে?’

মাকে আশ্বস্ত করলাম যে, লজ্জা নিবারণের জন্য একটি কাপড় অবশ্যই রাখব। দান-পর্ব শুরু হলো। বাসার সামনে ভিড় করে দাঁড়াল জামা-আকাঙ্ক্ষী মানুষজন। তারা পছন্দমতো শার্ট, টি-শার্ট নিয়ে বিদায় হলো। বেগুনি রঙের একটা রঙচটা শার্ট শুধু কেউ পছন্দ না করায় অবহেলায় পড়ে রইল। লোকসমাজে খালি গায়ে থাকা যায় না বলে সেটি গায়ে দিলাম। মা-বাবা-ভাই-বোন প্রশংসার চোখে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে।

বাবা বলল, ‘যাক, আমার একটা ছেলে অন্তত সুখী হওয়ার মহান ব্রত নিয়েছে। এটা একটা ঐতিহাসিক ব্যাপার।’

সুখী মানুষের হাতে মোবাইল ফোন থাকে না। মোবাইলটা ত্যাগ করার আগে ঝরাকে ফোন দিলাম।

‘হ্যালো, ঝরা, সুখী মানুষ হওয়ার পথে যাত্রা শুরু করেছি। তোমার সঙ্গে কথা বলে ফোনটা চিরতরে ছোট বোনকে দিয়ে দেব।’

আমার কণ্ঠ শুনে ঝরা খুব খুশি। বলল, ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য পূর্ণ হোক। মানবসমাজে তুমি দৃষ্টান্ত স্থাপন কোরো। আফসোস শুধু তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা থাকল না। যা হোক, তুমি সুখী হলে আমিও তোমার সুখে সুখী হব।’

ঝরাকে আন্তরিক ধন্যবাদ, জানালাম আমি। তারপর ফোনটা দিয়ে দিলাম ছোট বোনকে। বোন বলল, ‘তোমার মিশন যাতে সাফল্যমণ্ডিত হয়, সে জন্য ল্যাপটপটাও দান করে দাও।’

ল্যাপটপ দান করলাম ছোট ভাইকে। তারপর ভেবে দেখলাম, এই সভ্য সমাজে বসবাস করে আমি কিছুতেই নির্মল সুখ অনুভব করতে পারব না। সবাই মিলে আমাকে খোঁচাতে থাকবে, তোমার ভালো জামা কই, মোবাইল ফোন কই, ল্যাপটপ কই, ফেসবুক কই, কেডস কই, মানিব্যাগ কই, মানিব্যাগে টাকা কই, চাকরি কই, গাড়ি কই, গার্লফ্রেন্ড কই? তাদের এসব খোঁচাখুঁচি অবশ্যই আমার সুখী হওয়ার পথে বাধা তৈরি করবে। মাকে বললাম, ‘মা, জ্ঞানী হওয়ার জন্য মানুষ চীনে যায়, আমি সুখী হওয়ার জন্য জঙ্গলে যেতে যাই।’

মা বলল, ‘কিছু টাকা নিয়া যা।’

আমি দার্শনিকদের মতো বললাম, ‘অর্থ অনর্থের মূল। সকল সুখের শত্রু। অর্থবিহীন অর্থপূর্ণ জীবন কাটাতে পারলেই প্রকৃত সুখী হওয়া যায়।’

মা বললেন, ‘তা নাহয় বুঝলাম, কিন্তু জঙ্গলে যাইতে গাড়ি ভাড়া লাগবে না? জঙ্গল পর্যন্ত পৌঁছাবি কীভাবে?’

‘পায়ে হেঁটে।’ মাকে দুই শব্দে সিদ্ধান্ত জানিয়ে খালি পকেটেই রওনা দিলাম। সুখের পথে এ আমার প্রথম অভিযান। কিন্তু পথে নেমে বুঝলাম, সুখী হওয়া আসলে খুব সহজ নয়। পঁচিশ বছরের আদর-কদর পাওয়া শরীর প্রথমেই নানা কায়দায় জানান দিল, এত কষ্ট তার সহ্য হচ্ছে না। মনকে বোঝালাম, মানুষ তার জীবনের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কত কষ্ট করে, হিমালয়ে ওঠে, ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়, ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোতে বই পড়ে আর আমি হেঁটে হেঁটে জঙ্গল অবধি যেতে পারব না, তা কি হয়?

আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকি এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ি। পকেটে পয়সা নাই। লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে যদি মানুষের কাছে হাত পাতি, তখন তারা তো অর্থ দেবেই। অথচ আমি অর্থ না নেওয়ার পণ করেছি। শেষ পর্যন্ত থাকতে না পেরে এক খাবারের দোকানে গিয়ে বলি, ‘আমাকে দয়া করে কিছু খাবার দেন। আমার কাছে কোনো টাকা নেই। কারণ, আমি সুখের সন্ধানে বের হইছি।’

বয়স্ক দোকানদার প্রথমে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকাল। তারপর সব কটি দাঁত বের করে হেসে বলল, ‘জীবনে একজন মানুষ পাইলাম যে সুখের সন্ধানে বের হইছে। আসেন, খাওয়া-দাওয়া করেন।’

উদর পূর্তি করে বিদায় নেওয়ার সময় দোকানদার বলল, ‘সুখের দেখা পাইলে একটু জানায়া যাইয়েন, ভাই। এই মাগিরে পাওয়ার বড় শখ ছিল আমার। কিন্তু আপনের মতো ত্যাগ স্বীকার তো করতে পারব না।’

কথা দিলাম, সুখী হতে পারলে অবশ্যই তাকে জানাব।

আবার নামলাম পথে। সুখ ব্যাপারটা খুব পুরোনো আর রহস্যময়, এটা আমি জানি। এই জগতে প্রত্যেকেই হয়তো নিজের মতো করে সুখের খোঁজ করেছেন, কেউ কেউ পেয়েছেন, কেউ কেউ পাননি। কিন্তু আমার মতো কোমর বেঁধে, দৃঢ় সংকল্প করে কেউ সুখী হতে চেয়েছেন কি না আমার জানা নেই। যদিও বুঝতে পারছি কাজটা সহজ নয়, তার পরও কঠিনেরে ভালোবাসিলাম। রাত হয়ে গেছে, গত দুই রাত রাস্তায় আর গাছের নিচে কাটিয়ে দিয়েছি, এবারও একটা চালা ঘর বা ঝাঁকড়া গাছ খুঁজছিলাম ঘুমানোর জন্য। যে যা খোঁজে, তা নাকি সে পেয়ে যায়। আমিও পেলাম, রাস্তার পাশে একটা বট বা অশ্বত্থগাছ। তার শিকড়ে বসলাম আয়েশ করে, তারপর ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলাম। বিছানা নেই, বালিশ নেই, শরীর কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু মনের মধ্যে আবার কেমন একটা পুলক অনুভব করছি। আনন্দ পাচ্ছি, অ্যাডভেঞ্চারের আনন্দ। একে কি সুখ বলে? আনন্দ পাওয়া আর সুখী হওয়ার মধ্যে পার্থক্য কী?

মশারা গুনগুন করছে চারপাশে। কয়েকটা জোনাকি জ্বলছে। আমিও এর মধ্যে বসে ঝিমাতে ঝিমাতে সুখ ও আনন্দের তফাত খুঁজছিলাম। এর মধ্যে হঠাৎ মনে হলো, কেউ একজন আমার গা ঘেঁষে বসেছে। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছি তার অস্তিত্ব।

ভূতপ্রেত কি না ভেবে একটু ভয়-ভয়ও লাগছে। ভয় সুখের শত্রু, কারণ একই সঙ্গে সুখী এবং ভীত হওয়া যায় না, সুখী মানুষের মন থাকে ভয়শূন্য। শক্ত হয়ে বসে বসে এসব ভাবছি। তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে হঠাৎ শুনি চিকন নারীকণ্ঠ, ‘এই, এই, তুমি কে?’

আমার মনেও তো একই প্রশ্ন, ‘তুমি কে, বাপু? প্রেতিনি-ট্রেতিনি নও তো?’

বেশ কিছুক্ষণের নীরবতা। খস্ খস্ শব্দ। উঠে দৌড় লাগাব কি না চিন্তা করছি। এমন সময় নারীকণ্ঠে উত্তর আসে, ‘আমি ললাটি, এক হতভাগিনী দেবদূতী।’

কী আশ্চর্য ব্যাপার! এ কী শুনছি। দেবদূতী? অন্ধকারে আশপাশের কিছু না দেখা গেলেও দিব্যচোখে, হঠাৎ আমি শুধু তাকেই—দেবদূতী অর্থাৎ ললাটিকেই দেখতে পাই, তার সারা শরীর থেকে আলোকরশ্মি ঠিকরে বেরোচ্ছে। কালো বাতাসে তার সাদা ফিনফিনে ডানা দুটো নড়ছে, গোলাপ কুঁড়ির মতো পাতলা ঠোঁট দুটি মেলে সে প্রশ্ন করে, ‘তুমি কে মানবসন্তান?’

নিজের নাম বলি। তারপর বীরদর্পে জানাই, ‘সুখের সন্ধানে বের হয়েছি।’

‘কী বলো! আমিও তো তাই।’ কিন্নর কণ্ঠে রিনিঝিনি শব্দ তুলে সে বলে।

আমার তো টাসকি খাওয়ার দশা। কে কবে কোথায় শুনেছে দেবদূতীদের সুখের অভাব? তারা তো থাকে দূরের আকাশে স্বর্গের সীমানায়, দুশ্চিন্তাহীন প্রশান্ত জীবন তাদের, সেই জীবনে প্রতিযোগিতা নাই, অপ্রাপ্তি নাই, লোভ-লালসা নাই, কামনা-বাসনা নাই, এমনকি হয়তো প্রকৃত সুখী মানুষের মতো তাদের কোনো জামাকাপড়ও নাই। জামাকাপড়ের বিষয়টা ভেবেই লজ্জা লাগতে শুরু করে আমার। এখন ওর দিকে তাকাতেও দ্বিধা হচ্ছে, কী-না-কী দেখব তাই ভেবে।

‘অদ্ভুত কথা, তোমার কেন সুখ খুঁজতে হবে? স্বর্গে কি সুখের অভাব?’ ওর দিকে না তাকিয়েই বলি আমি।

‘স্বর্গ আমার ভালো লাগে না, বোরিং, ক্লান্তিকর!’ ললাটি হতাশ গলায় বলে, ‘ওখানে সুখ নাই।’

‘খাইছে আমারে, সুখ তাইলে কই থাকে?’

‘আচ্ছা, চলো না, দুজনে মিলে সেটা খুঁজে বার করি।’ উত্তেজিত ভঙ্গিতে প্রস্তাব দেয় ললাটি। কিন্তু আমি একটু দ্বিধান্বিত। তাই বটগাছের গায়ে হেলান দিয়ে বলি, ‘তার আগে বুঝতে হবে, আমরা দুজন একই জিনিস খুঁজতেছি কি না? হয়তো দেখা যাবে, আমি যেটা খুঁজি তুমি খোঁজো ঠিক তার উল্টাটা। সে ক্ষেত্রে দুজনের পথ হবে ভিন্ন।’

ললাটিকে বুঝিয়ে বললাম, ‘আমি আসলে ত্যাগের মধ্যে প্রকৃত সুখ খুঁজছি। সমস্ত ভোগের সামগ্রী দান করে জঙ্গলের পথে চলছি সুখ অনুভব করব বলে।’

‘আমার তো দান করার মতো কিচ্ছু নেই। আমি কি তবে সুখী হব না?’ ললাটির কাঁদো কাঁদো গলা। এবার কিঞ্চিৎ বিরক্ত আমি। একটু রুষ্ট গলায় বলি, ‘দেখো, তুমি তোমার মতো চিন্তা করো, তোমার পথ দেখো, আর আমাকে আমার মতো থাকতে দাও, ভাবতে দাও, ঘুমাইতে দাও।’

সুখী মানুষদের ভালো ঘুম হয়। আমি চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে যাই অল্পক্ষণের মধ্যেই। সকালের রোদ এসে চোখে লাগলে ঘুম ভাঙে। ললাটিকে আর দেখতে পাই না। হয়তো আবার স্বর্গে চলে গেছে। যাক গে, জঙ্গল হয়তো খুব বেশি দূরে নয়। মানুষজনকে জিজ্ঞেস করি, কীভাবে যাব? তারা পরামর্শ দেয় নদীপথে গিয়ে লঞ্চ ধরার।

ছোট্ট লঞ্চ, জনা তিরিশেক মানুষ নিয়ে রওনা দিল জঙ্গলের পথে। বেশির ভাগই শ্রমিক শ্রেণির লোক—কেউ কাঠ কাটবে, কেউ মধু সংগ্রহ করবে, কেউ যাচ্ছে লতাপাতা আহরণে...সকলেই নিতে যায়, আমিও হয়তো নিতে যাই নির্জনতার সুখ...। ভালোই চলছিল সব। ঝড় এল হঠাৎ মাঝগাঙে, আকাশ কালো হয়ে গেল, বিরাট ঢেউগুলো ছোট্ট লঞ্চটাকে নিয়ে যেন শুরু করল লোফালুফি খেলা—একবার ওপরে ওঠায় আবার ধপাস করে নামিয়ে দেয়। সঙ্গীরা ভয়ে চিৎকার করে আজান দেওয়া শুরু করল, দোয়া-দরুদ পড়তে লাগল অনেকে। কেবল অদ্ভুত এক প্রতিক্রিয়া হলো আমার, এই ভয়ংকর সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ কেমন ফুর্তি লাগতে শুরু করল। গলা ছেড়ে যত রকমের জানা-অজানা গানের লাইন মনে ছিল, চিৎকার করে গাইতে লাগলাম সেই সব গান। জলের ঝাপটায় গা ভিজে যাচ্ছে, বাতাস শোঁ শোঁ শব্দ তুলে একেকবার উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। আর রেলিং আঁকড়ে ধরে সমানে চিৎকার করে গান গেয়ে যাচ্ছি আমি।

‘ওই মিয়া, চুপ করেন, আল্লাহ-খোদার নাম নেন। গান বন্ধ করেন।’

পেছন থেকে কয়েকজন আমাকে ধমকাতে থাকে। আমি ওদের দিকে তাকিয়ে বত্রিশটা দাঁত বের করে একটা কেলানো টাইপের হাসি দেই। চিৎকার করে বলি, ‘ভয় নাই। মরণরে আটকানো যায় না।’ তারপর আবার আগের মতো বেসুরো সংগীত-সাধনা চালিয়ে যাই।

শুনতে পাই লোকগুলো নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, ‘কোথাকার কোন পাগল-ছাগল এসে জুটেছে, বাদ দেন ভাই...।’

লঞ্চটা খাবি খেতে খেতে কোনোরকমে পাড়ে এসে ভিড়লে যেমন হঠাৎ করে এসেছিল, তেমন হঠাৎ করেই আবার ঝড় থেমে যায়। আমি লঞ্চ থেকে নেমে ঢুকে যাই জঙ্গলের ভেতরে। পেছন থেকে লোকগুলো আবার ডাকে, ‘ভাই, ওই দিকে যায়েন না ভাই, ওই পথে মামাদের আনাগোনা আছে, নির্ঘাত মারা পড়বেন...।’

আমি তাদের সাবধানবাণী উপেক্ষা করে বাঘের সঙ্গে মোলাকাত করার জন্য এগিয়ে যাই, জঙ্গলে এসে প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ না করলে চলে? ভাগ্য ভালো। বেশি দূর যেতে হয় না, কিছুদূর এগোতেই দেখি, একটা গাছের নিচে এক মোটা-সোটা বাঘমামা হাত-পা মেলে শুয়ে দিব্যি দিবানিদ্রা দিচ্ছেন। আমি তার ঘুম না ভাঙিয়ে পা টিপে টিপে গিয়ে পাশে শুয়ে পড়ি। সুখী মানুষ আমি, ঘুমাতে সময় লাগল না। ঘুম যখন ভাঙল তখন প্রায় সন্ধ্যা, চোখ মেলতেই দেখি, দুইটা হলুদ জ্বলজ্বলে চোখ আমার মুখের ওপরে স্থির হয়ে আছে।

‘সালাম, মামা, ভালো আছেন?’ শোয়া অবস্থাতেই আমি জিজ্ঞেস করি। মামা গর্জন করে ওঠেন, ‘হালুম!’ আমি শুনতে পাই, উনি বলছেন, ‘কে রে তুই, অদ্ভুত, দু-পেয়ে জন্তু!’

যথাসম্ভব আদব-তমিজের সঙ্গে নাম পরিচয় বলি, জঙ্গলে আসার উদ্দেশ্যও খুলে বলি। সব শুনে মামা আরেকটা হুংকার দেন। আমি শুনি, তিনি হো হো করে হাসছেন। তার সঙ্গে আশপাশের গাছে বসে থাকা বানরগুলোও খিক্ খিক্ করে হাসে। কী করব বুঝতে পারি না। মামা একটু সরে আমাকে উঠে বসার সুযোগ দেন। তারপর হাসি থামিয়ে তার ভাষায় আরেকবার গর্জন করে উঠলে বুঝতে পারি তিনি বলছেন, ‘যার যার জায়গায় সে সে সুখী হয়। ওরে বেকুব বাড়ি ফিরে যা।’ আমার পায়ের ওপর দিয়ে সুড়সুড় করে একটা সাপ চলে যায়, সেই বেটিও হিস্ হিস্ করে বলে, ‘ফিরে যা, ফিরে যা!’ কিন্তু রাতে তো আর লঞ্চ পাব না। মামাকে বলি, ‘রাতটা থাকতে দেন। সকালে চলে যাব।’

আরেকটা হুংকার দিয়ে মামা আজ্ঞা দিলেন থাকার। রাতের জঙ্গল জেগে উঠল নিজস্ব নিয়মে। দাঁতাল শুয়োর, বিশালদেহী হাতি, সরু মুখের শিয়াল, মায়াবী চোখের হরিণ, তীক্ষ্ণ দাঁতের নেকড়ে, ধূর্ত চেহারার হায়েনা—সবাই দল বেঁধে এল আমায় দেখতে। বানরগুলো কোথা থেকে কয়েকটা গাছের ডাল ভেঙে এনে আমার চারপাশে পুঁতে একটা খাঁচার মতো বানিয়ে ফেলল। হাতি সেই খাঁচার ফাঁক দিয়ে শুঁড় ঢুকিয়ে আমাকে দিল একটা সুড়সুড়ি।

শিয়াল এসে দার্শনিকের মতো বলল, ‘বনে নয় রে বোকা, সুখ থাকে মনের মধ্যে।’

হায়েনাগুলো গা হিম করা হাসি দিয়ে বলল, ‘তোরে খাইতে পারলে বড় সুখ পাইতাম রে! হি হি হি!’

যা হোক, আমি যেহেতু মামার অতিথি, তাই কেউ আর শেষ পর্যন্ত আমাকে দিয়ে ডিনার করার সাহস করল না।

সকালে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে লঞ্চঘাটে পৌঁছতেই আমার সহযাত্রীরা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। অভিব্যক্তি এমন—কিছু একটা বলতে চাইছে, তারা কিন্তু পারছে না বলতে। তারপর হঠাৎ সবাই ছুটে এসে পড়ল আমার পায়ের ওপর, ‘আপনেরে চিনতে পারি নাই বাবা, মাফ কইরা দেন।’

তাদের সমবেত কান্নাকাটিতে প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলাম আমি। বুঝলাম, এদের কবল থেকে রক্ষা নাই। তাই মহাপুরুষদের মতো আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত তুলে বললাম, ‘ভয় নাই। জীবনরেও আটকানো যায় না।’

এরপরের কাহিনি সংক্ষিপ্ত। লঞ্চে আমার আদরযত্নের সীমা নাই। চুপচাপ মৌন বাবা হয়ে সেই খাতিরের অত্যাচার সহ্য করি। ওরাই বাস-ট্রেনের টিকিট কেটে দেয়। আর আমি স্বল্প সময়ে আমার মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার বাসার দরজায় এসে কলবেল টিপি।

পরের দৃশ্য সিনেমার মিলন দৃশ্যের মতো। কালিঝুলি-নোংরা-ময়লাসহ আমাকে জড়িয়ে ধরে মা-বাবা-ভাই-বোনদের কান্না। আমার চোখও সিক্ত। অনেক সময় নিয়ে গোসল করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষে বসার পর মা বলল, ‘কয়দিন ধইরা একটা মেয়ে তোর খোঁজে আসে। নাম বলছে ললাটি।’

ললাটি? বুক ধক করে ওঠে আমার। অসুখী দেবদূতী?

‘মেয়েটা আজকেও আসছে। দেখ তো চিনিস কি না?’

ড্রইংরুমে গিয়ে দেখি, একটা মেয়ে আমার দিকে পেছন ফিরে বসে আছে। পরনে হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি। কালো চুলগুলো পিঠের ওপর খোলা। ‘কে?’ আমি জিজ্ঞেস করি। মেয়েটা ঘুরে তাকিয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিক করে একটা হাসি দেয়। এ তো সত্যিই সেই হতভাগিনী দেবদূতী ললাটি।

‘শোন, কী দেখছ? আমার ডানা দুইটা দান করে দিয়েছি। এখন তুমি চাইলে আমরা দুজন আবার একসঙ্গে সুখের খোঁজে বের হইতে পারি। বেরোবা?’

শাহনাজ মুন্নীর গল্প
apps