• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫
  • ||

ঈদ যাত্রায় বাস সংকটের আশঙ্কা

কৌশলে ভোগান্তি কমানো সম্ভব

প্রকাশ:  ১৬ আগস্ট ২০১৮, ০৯:২০
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট

অদক্ষ চালক ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়ায় সড়ক আজ অনিরাপদ। এ কারণে প্রতিদিন সড়কে প্রাণ ঝরছে গড়ে কম হলেও ১৩ ব্যক্তির। প্রতিবছরই ঈদের আগে-পরে দুর্ঘটনার হার আরো বেড়ে যায়। ঈদুল আজহা আগামী ২২ আগস্ট। এবারও নাড়ির টানে মানুষ ঝুঁকি নিয়ে হলেও কর্মস্থল থেকে ঘরমুখো হবে। আগামীকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তবে মনে করা হচ্ছে, আজ থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত এই পাঁচ দিনে যাত্রীদের চাপ পড়বে বাস, ট্রেন, নৌপথে। বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষা মতে, দেশে ৮৮ শতাংশ যাত্রীই সড়কযানে চলাচল করে, ঈদে এই চাপ আরো বেড়ে যায়। মনে করা হচ্ছে, এবার সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কড়াকড়ি থাকায় বাস সংকটের কারণে যাত্রীদের বাস সংকটে ভুগতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা সড়ক, নৌ ও রেলপথে সমন্বয়ের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহনের সুপারিশ করেছেন। যাত্রীদের প্রতিও তাঁদের অনুরোধ হচ্ছে, বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র স্বার্থ প্রয়োজনে জলাঞ্জলি দিতে হবে। এবার সড়কে যানবাহন সংকট প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার ঈদ যাত্রার মৌসুমে বৈধতা শতভাগ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় সরকার তৈরি পোশাক কারখানা ভিন্ন দিনে ছুটি দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে।

ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘ছাড়’ : বিশেষজ্ঞ ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ বলছেন, সব চালক ও গাড়িকে আইনের আওতায় আনতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার সময় বেঁধে দিতেই পারে। এ সময়ের মধ্যে যথাযথ শ্রেণির লাইসেন্স দিতে বিআরটিএ উদ্যোগ নেবে। আর চালকরাও বৈধ হতে প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে। জানা গেছে, এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব আকারে রয়েছে।

জানা যায়, গত ১১ আগস্ট বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ে এক বৈঠকে ঈদ যাত্রার যানবাহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত হালকা বা মধ্যম শ্রেণির লাইসেন্স দিয়ে বাস চালানোর সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এরপর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এ অবস্থায় যেসব চালক মধ্যম শ্রেণির লাইসেন্সে অন্তত এক বছর গাড়ি চালিয়েছে তারা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারী গাড়ি (বাস) চালাতে পারবে—এমন একটি আদেশের খসড়া তৈরি করেছে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড মো. কামরুল আহসান গতকাল বুধবার রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ঈদ যাত্রার যাত্রী ভোগান্তি কমাতে এ সুপারিশ বিআরটিএ থেকে মন্ত্রণালয়ে এসেছে।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘ঢাকা থেকে কোন পরিবহন মাধ্যমে কত যাত্রী পরিবহন করা হয়, তার হিসাব নিয়ে এবার সড়কে যত কম চাপ নেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়, ততই মঙ্গল হবে। আমাদের যাত্রীদেরও আইন প্রতিষ্ঠার জন্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। অবৈধ চালকের হাতে জীবন সঁপে দিয়ে চললে তো জীবনদীপ নিভেও যেতে পারে।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষার্থীরা যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, যাত্রীরা অবৈধ চালকের ও অবৈধ গাড়িতে না উঠে এবার আইন অমান্যকারীদের শিক্ষা দিতে পারে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পরিবহন মালিকদের শিক্ষা হয়েছে বলেই তাদেরও আমরা এখন বিআরটিএর অভিযানে গিয়ে অবৈধ চালক ধরতে সহযোগিতা করতে দেখি। পরিবহন নেতাদের প্রশ্রয় ও চাঁদাবাজির কারণেই সড়ক খাতে শৃঙ্খলা আসেনি। রেলপথ ও নৌ মন্ত্রণালয়কে এবার বেশি দায়িত্ব দিতে হবে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্লাহ বলেন, ‘লাইসেন্স দেওয়ার নিয়ম অসংগতিপূর্ণ হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা সরকারকে বলেছি—যে চালক যে ধরনের গাড়ি চালিয়ে পরীক্ষা দেবে, তাকে যেন সেই ধরনের গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেওয়া হয়। নতুন হতে যাওয়া সড়ক পরিবহন আইনে এ বিধিটি যোগ করার প্রস্তাব আমরা করেছি। আপাতত যাদের মধ্যম শ্রেণির লাইসেন্স আছে, তাদের যেন বাস চালাতে দেওয়া হয়; দরকার হলে পরীক্ষা নেওয়া হোক। তাহলে অসংগতি ও তার জন্য সৃষ্ট সংকট থেকে রেহাই মিলবে।’

মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী, পেশাদার ভারী ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে প্রার্থীকে প্রথমে হালকা ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হবে, এর তিন বছর পর সে পেশাদার মধ্যম ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবে এবং মধ্যম শ্রেণির ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার তিন বছর পর ভারী ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যায়। ভারী লাইসেন্স নেওয়ার পর ‘পিএসভি’ তথা পাবলিক সার্ভিস ভেহিকল সনদ নেওয়া যায়।

বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানান, বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহনের জন্য বাস চালাতে চালকের ভারী লাইসেন্স লাগবে। তাকে অবশ্যই পিএসভি সনদ নিতে হবে। তবে বিআরটিএ অনুমোদিত পিএসভি লাইসেন্সধারী পরিবহন চালক রাজধানীতে আছে মাত্র ১০ হাজার ২৫৬ জন। ঢাকা থেকে দূরপাল্লায় চলাচল করে, এমন চালকদের মধ্যে ৫ শতাংশের পিএসভি সনদ আছে।

বিভিন্ন বাস মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর চারটি টার্মিনাল ও বিভিন্ন স্ট্যান্ড থেকে চালক ও গাড়ির বৈধতা না থাকায় প্রায় ৬০ শতাংশ বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে রাতের আঁধারে অবৈধ চালকরা ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ে দূরের গন্তব্যে ছুটছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বাস চালাচ্ছে কিন্তু ভারী লাইসেন্স নেই—এমন চালকরা বলছে, তাদের পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দিয়ে একটা সময় বেঁধে দিলেই সংকট মিটে যাবে। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি অবশ্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে গাড়ির সব কাগজপত্র ও চালকের লাইসেন্স হালনাগাদের সময় বেঁধে দিয়ে নির্দেশনা দিয়েছে।

প্রতিবছরই ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে তিনটি মূল কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে—ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, মহাসড়কে অতিরিক্ত গতিতে যানবাহন চালনা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, গত ঈদুল ফিতর মৌসুমে যাতায়াতকালে ১৩ দিনে ২৭৭ সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। গত বছর ঈদুল ফিতরের সময় পাঁচ দিনে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৯ জন নিহত হওয়ার তথ্য জানা যায়। সংখ্যাটি ছিল ২০১৬ সালে ৫২, ২০১৫ সালে ৪০, ২০১৪ সালে ৬৭, ২০১৩ সালে ৫২ ও ২০১২ সালে ৪২ জন। এসব দুর্ঘটনা ঘটে ঈদের আগে ও পরের দিনগুলোতে।

সমিতির প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২২.২ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৭ সালে চার হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত হয় সাত হাজার ৩৯৭ জন, আহত হয় ১৬ হাজার ১৯৩ জন। পঙ্গু হয় এক হাজার ৭২২ জন। সমিতির হিসাবে, ২০১৬ সালে চার হাজার ৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ছয় হাজার ৫৫ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছিল। সূত্র: কালের কণ্ঠ

/এসএম

বিআরটিএ