• বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট ২০১৮, ১ ভাদ্র ১৪২৫
  • ||

বন কেটে বসতি

রূপগঞ্জ ৭০ বিঘা জমির দখলে ৫২ অবৈধ দখলদার

প্রকাশ:  ২২ জুলাই ২০১৮, ১৫:৪২ | আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৮, ১৬:০৩
রাসেল আহমেদ (রূপগঞ্জ)
প্রিন্ট

একসময় হাজার হাজার গজারী গাছ ছিল। ছোট-বড় মিলিয়ে কয়েক’শ প্রাকৃতিক টিলা। নির্বিবাদে এসব গজারী গাছ ও নির্বিচারে প্রাকৃতিক টিলার মাটি কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বসতি। রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নের কুলিয়াদি মৌজার বনবিভাগের ৭০ বিঘা জমি অবৈধভাবে দখলে নিয়ে প্রভাবশালীরা বসতি নির্মাণ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বনবিভাগের সৌন্দর্যমন্ডিত প্রাকৃতিক টিলার মাটি পানির দরে বিক্রি করে দিচ্ছে ঐসব দখলদাররা।

অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ বন বিভাগের জায়গা দখল করে ভূয়া দলিল ও কাগজপত্র তৈরি করে বিক্রি করে দিচ্ছে। তবে দখলদাররা দাবী করে বলেছেন, সিএস পর্চামূলে তারাই মালিক। এসএ ও আরএসে মালিক বন বিভাগ। যখন সরকার রায় পাবে তখন তারা বন বিভাগের জমি ছেড়ে দিবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রূপগঞ্জ উপজেলার দুর্গম এলাকা হিসাবে পরিচিত দাউদপুর ইউনিয়নের কুলিয়াদি মৌজার এসএ ও আরএস পর্চামূলে ২নং খতিয়ানের ২১ দাগে ৭০ বিঘা জমি বন বিভাগের। এ বন বিভাগের পুরো এলাকায় ছিল হাজার হাজার গজারী গাছ। গজারী গাছ ছাড়াও শাল, আম, জাম, নারিকেল, কাঁঠালসহ অন্যান্য ফলদ ও ঔষধি গাছও ছিল। ছিল কয়েক’শ সোন্দর্যমন্ডিত প্রাকৃতিক টিলা। নির্বিবাদে গাছপালা আর নির্বিচারে মাটি কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বসতি। ৮০’র দশকের পর স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর বনবিভাগের এসব জমির উপড় লোলুপ দৃষ্টি পড়ে। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠতে থাকে বসতি। সবমিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৫২ জন প্রভাবশালী বনবিভাগের জায়গা দখল করে বাড়ীঘর নির্মাণ করেছে।

দখলদার কারা

সরজমিনে ঘুরে ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দাউদপুর ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের কুলিয়াদি এলাকার ফজলু হক সিকদার, মহর আলী, সেরাজুল মিয়া, গেসু মিয়া, মান্নান মিয়া, ফিরোজ খান, সিরাজ ভূইয়া, আব্দুর রেজাক, আজগর হোসেন, সামসুল হক, আজহারুল ইসলাম, আয়নাল হক, মজিবুর রহমান, ইমরান মিয়া, অলিউল্লা মিয়া, জাফরউল্লা মিয়া, দ্বীন ইসলাম, হুমায়ুন মিয়া, হাকিমউদ্দিন, অখিলউদ্দিন, নাসিরউদ্দিন, বজরআলী, নুরআমিন মিয়া, সেলিনা বেগম, মালেকা বেগম, মোশারফ হোসেন, আতাবর মিয়া, জুয়েল মিয়া, ইমরান মিয়াসহ আরো অনেকে বনবিভাগের জায়গা দখল করে বসতি নির্মাণ করেছে। শুধু দখল নয়, বিক্রিও করা হচ্ছে

অনুসন্ধানে মিলে নানা তথ্য। জানা যায়, কেউ কেউ জায়গা দখল করে ভূয়া দলিল ও কাগজপত্র তৈরি করে জমি বিক্রি করে দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ বাড়ীঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে। এদেরই একজন নুর আমিন। তিনি জায়গা দখল করে বাড়ীঘর নির্মাণ করেছেন। চতুর নুর আমিন স্ট্যাম্প করে মাত্র এক লাখ টাকায় চার শতাংশ জমি জুলহাস নামে একজনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। আরেক দখলদার সেলু মিয়া। সে ৫ শতাংশ জায়গা দখল করে মাত্র ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন।

সেলু মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, যেই কয়দিন খাইতারি। সরকারে লইয়া গেলেগাতো আর পারুমনা। স্ট্যাম্প দিয়ে কিভাবে জায়গা বিক্রি করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অহন আমি দহলে আছি। তাই আমার জায়গা আমি বেচছি। স্থানীয় ইমরান মিয়া বনবিভাগের জমিতে পার্ক বানানোর চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।

ইমরান মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বহুবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। আবার দখলদারদের কেউ কেউ বাহির থেকে লোক এনে তাদের কাছ থেকে ৪০/ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়িঘর করার অনুমতি দিচ্ছে। এরপরে মাসে মাসে ভাড়া আদায় করছে। বনবিভাগের গাছপালা স্থানীয় করাতকলের কাছে পানিরদরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। স্থানীয়রা জানান, এ বনে একসময় বানর, শিয়াল আর বনমুরগী দেখা যেতো। এখন আর কোন প্রাণীর অস্তিত্ব দেখা মেলেনা। বন কেটে ঘন ঘন বসতি হওয়ায় এসব প্রাণী এখন হারিয়ে গেছে। দখলদারদের বক্তব্য

কথা হয় দখলদার বজর আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার জায়গায় আমি বাড়ি বানাইছি। জায়গাটিতো বনবিভাগের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বনবিভাগের অইলেতো স্যারেরা আমাগো কিছু কইতোই। স্যারেতো এহানে আয়ে, আমাগোতো কিছু কয়না। কথা হয় অভিযুক্ত ফজলুল হক সিকদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি অনেক আগে থেইক্যা দহলে আছি। ভোগদহল কইরা খাইতাছি।

বনবিভাগের জায়গা দখল করেছেন কি হিসাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পূর্বপুরুষের আমলে এইসব জায়গা জোতে আছিলো। অহন এসএ ও আরএসে বনবিভাগের অইছে। বনবিভাগের হেরাতো অহনও দহল পায় নাই। মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন কেন? এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, টিলা আছিল, হেইডার মাডি কাইটা বেইচ্চা হোমান করছি। তিনি ৩৯ শতাংশ জায়গা দখল করেছেন। আরেক দখলদার জামান মিয়া। কথা হয় দখলদার আতাবুর রহমানের ছেলে জোবায়ের মিয়ার সঙ্গে।

তিনি বলেন, সিএসে মালিক ছিলাম আমরা। পরে এসে ও আরএসে মালিক হয় বনবিভাগ। তারপরও আমরা ভোগদখল করে খাচ্ছি। এ নিয়ে কোর্টে মামলাও দায়ের করেছি। রায় না পেলে জায়গা ছেড়ে দিব।

মামলার বর্তমান অবস্থা

কুলিয়াদি মৌজার বনবিভাগের এসব জায়গা দখলে নিতে প্রভাবশালীরা কোর্টে মামলা ঠুকে দিয়েছে বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে হাশেম মিয়া গং নারায়নগঞ্জ বিজ্ঞ দ্বিতীয় জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের(যার নং-৪৩৩/১২) করেছেন। সফুরা বিবি নামে আরেক দখলদার সিএস পর্চামূলে বনবিভাগের জায়গা নিজেদের দাবী করে নারায়নগঞ্জ জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের( যার নং-৩৮৪/১৩) করেছেন। ফজলুর রহমান বাদী হয়ে নারায়নগঞ্জ জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের(যার নং-৩৩৪/১২) করেছেন। এদের মতো আরো ৭/৮ জন নারায়নগঞ্জ জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। বর্তমানে মামলাগুলো আদালতে বিচারাধীন।

প্রশাসনের বক্তব্য

দাউদপুর ইউনিয়নের তহশীলদার মাহাবুবুর রহমান বলেন, যখন জরিপ হয়েছিল তখন তারা কোথায় ছিলেন। তাছাড়া দুইটা রেকর্ড হয়েছে, তখন কেন আপত্তি দেয়নি তারা। উপজেলা সহকারী কমিশনার(ভূমি) মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি। এ ব্যাপারে অবগত নই। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, যেহেতু এটা বনবিভাগের জায়গা। সেহেতু দখলদাররা যতই প্রভাবশালী হউক তাদের উচ্ছেদ করা হবে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞের অভিমত

প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট করে বসতি নির্মাণের পক্ষে নেই পরিবেশবিদরাও। পরিবেশ বাচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, জায়গাটা যেহেতু বনবিভাগের, যেহেতু যেকোন মূল্যে এটি রক্ষা করতে হবে। প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিকশিত করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কিছু নষ্ট লোকেরাই এসব করে। এদের প্রতিহত করতে হবে।

ওএফ