• রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫
  • ||

জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি, ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ

১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে বাংলাদেশে মোট ৮৫৯ জন মারা গেছেন। ওই সময়ে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার কোটি ডলার। বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশ ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে।

প্রকাশ:  ২৯ জুন ২০১৮, ২২:২৬ | আপডেট : ২৯ জুন ২০১৮, ২২:৩৩
সাধন সরকার
প্রিন্ট

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশে। বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা। ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে জীবন-জীবিকা। পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে ঋতু বৈচিত্র্যের খামখেয়ালিপনায় অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। গ্রীষ্মকাল ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। বর্ষাকাল তার সময় থেকে সরে যাচ্ছে। অসময়ে বৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে প্লাবিত হচ্ছে দেশের ব্যাপক অঞ্চল। আবার গ্রীষ্মকালে দেখা দিচ্ছে খরা। শরত্, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত ঋতুর চিরচেনা রূপের দেখা মিলছে না। এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে প্রকৃতি, ফসল ও মানুষের ওপর। ঋতুভিত্তিক ফসল উত্পাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের ওপর নতুন রোগের প্রভাব বাড়ছে। বাড়ছে লবণাক্ততা। জলবায়ুর এই ক্ষতিকর প্রভাবে দক্ষিণ - পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। মানুষজন কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য সুবিধাজনক পেশায় চলে যাচ্ছে। জলবায়ুর কারণে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে শহরগুলোতে অভিগমনের হার বাড়ছে।

জার্মানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘জার্মানওয়াচ’ গত ১৯ বছর ধরে দুর্যোগের সংখ্যা, মৃত্যু, ক্ষয়ক্ষতির মোট হিসাবের ভিত্তিতে ‘ বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক- ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, এবারও বাংলাদেশ ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। তবে শুধু গেল বছরের বিবেচনায় বাংলাদেশ রয়েছে ১৩ তম অবস্থানে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে মোট ৮৫৯ জন মারা গেছেন। ওই সময়ে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার কোটি ডলার। আর মোট ১৮৭ টি দুর্যোগ বাংলাদেশে আঘাত এনেছে। এসব দুর্যোগের মধ্যে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও পাহাড়ধস প্রধান। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের বন্যা আগের চেয়ে তীব্র হচ্ছে। অসময়ের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ। চলতি বছরের বন্যায় ৩২ জেলায় ৮০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর বন্যায় ১৪৫ জন ও পাহাড়ধসে শতাধিক ব্যক্তি মারা গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনও হুমকির মুখে রয়েছে।

উন্নত ও ধনী দেশগুলোর শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত আরাম- আয়েশের ফলে কার্বন ডাই- অক্সাইড বা গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমন বাড়ছে। এসব গ্যাস তাপ ধরে রেখে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) মতে, ২০১৬ সালে বিশ্বের বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ কার্বন ডাই- অক্সাইড জমা হয়েছে, তা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে ৩৬ কোটি কিলোটন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়। অতিমাত্রায় এই কার্বন নিঃসরণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের মত ছোট দেশগুলো। বাংলাদেশে এ বছরই শুধু দুটি বড় বন্যা ও একটি ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়েছে। বন্যায় হাওরে বোরো ফসল নষ্ট হওয়াসহ উত্তরাঞ্চলে আমন ফসল তলিয়ে গেছে। এত ব্যাপক ফসলের ক্ষতি হওয়ায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধিতে সমগ্র দেশের মানুষকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, বাংলাদেশ খাদ্য আমদানির দেশে পরিণত হতে চলেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বলতে আগে বাংলাদেশসহ ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র ও দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর নাম আসত। কিন্তু এখন বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি জার্মানির বন শহরে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন ‘কপ-২৩’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য এই সম্মেলনে উল্লেখ করার মত তেমন কোনো সুখবর আসেনি। তবে ‘প্যারিস চুক্তি’ বাস্তবায়নের জন্য একটি ‘রুলবুক’ তৈরির কাজ এ সম্মেলন থেকে অন্যতম অর্জন। যাহোক, শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বেশি নজর দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় তিন কোটি মানুষের একটি বড় অংশই পরিবেশ-উদ্বাস্তু হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একদিকে উত্তরাঞ্চলের মরুকরণ, অপরদিকে প্রতিবছর বন্যায় ফসল ও জানমালের যে ক্ষতি হয় তার ব্যাপক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়ছে ।

বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ। একদিকে খরা অন্যদিকে বন্যার এই উভয়মুখী সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হচ্ছে ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন। ‘সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়’ এটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৮০ ভাগ পানি নষ্ট হয়ে যায় মূলত অন্য জায়গায় চলে যাওয়ার কারণে। অথচ এ পানি ধরে রাখা সম্ভব হলে জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে ভালো ভূমিকা রাখবে। এছাড়া বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আরো বেশি বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি ও উদ্যোগ নিতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

জলবায়ু পরিবর্তন