• রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮, ৪ ভাদ্র ১৪২৫
  • ||

বাংলাদেশে ভারতের দালাল কারা

প্রকাশ:  ০২ জুন ২০১৮, ২১:২২
মোহাম্মদ এ আরাফাত
প্রিন্ট

ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ আন্তর্জাতিক ফোরামে গিয়ে শেখ হাসিনাই নিষ্পত্তি করেছেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে রায় এনেছেন। বিএনপি-জামায়াত কোনো উদ্যোগই নেয়নি, তবুও রাজাকার শাবকদের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনাই ভারতপন্থি, আর পাকিপন্থি বিএনপি-জামায়াত দেশপ্রেমী! স্থলসীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ছিটমহল সমস্যার সমাধানের মধ্য দিয়ে দশ হাজার একর জমি বাংলাদেশের মধ্যে সংযুক্ত করেছেন শেখ হাসিনা, অন্য কেউ নয়। বিএনপি-জামায়াত কোনো দিন চেষ্টা পর্যন্ত করেনি সমাধানের, তবুও রাজাকার শাবকদের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনাই ভারতপন্থি, আর পাকিপন্থি বিএনপি-জামায়াত দেশপ্রেমী! ভারতের মাটি এবং গ্যাস ব্যবহার করে ভারতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ (৬০০ মেগাওয়াট) আমদানি করে বাংলাদেশের কাজে শেখ হাসিনাই লাগিয়েছেন, বিএনপি-জামায়াত ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি তো দূরের কথা, নিজ দেশেই এক কিলোওয়াট বিদ্যুৎ পর্যন্ত উৎপাদন করতে পারেনি। তবুও রাজাকার শাবকদের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনাই ভারতপন্থি, আর পাকিপন্থি বিএনপি-জামায়াত দেশপ্রেমী!

বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যের ওপর থেকে ভারতের আরোপিত ট্যারিফ প্রত্যাহার শেখ হাসিনাই করিয়েছেন এবং বাংলাদেশের বেশ কিছু পণ্য ভারতে রপ্তানিতে অন্যান্য বাধাও অপসারণের প্রক্রিয়া শেখ হাসিনাই শুরু করেছেন, যা অদূর ভবিষ্যতে সফলও হবে। বিএনপি-জামায়াত এক্ষেত্রেও কোনো উদ্যোগ নেয়নি, তবুও রাজাকার শাবকদের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনাই ভারতপন্থি, আর পাকিপন্থি বিএনপি-জামায়াত দেশপ্রেমী! অত্যাধুনিক চাইনিজ সাবমেরিন যুক্ত করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে রূপান্তর করে দেশকে সামরিকভাবে শক্তিশালী শেখ হাসিনাই করেছেন। বিএনপি-জামায়াত এ বিষয়ে কখনই কোনো উদ্যোগই নেয়নি। তবুও রাজাকার শাবকদের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনাই ভারতপন্থি, আর পাকিপন্থি বিএনপি-জামায়াত দেশপ্রেমী! গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে ভারতকে রাজি করিয়ে, গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা শেখ হাসিনাই আদায় করেছেন। আর বিএনপি নেত্রী তো গঙ্গার পানির কথা বলতেই ভুলে গিয়েছিলেন— এ কথা দেশের সবাই জানে। তবুও রাজাকার শাবকদের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনাই ভারতপন্থি, আর পাকিপন্থি বিএনপি-জামায়াত দেশপ্রেমী!

টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে ভারতকে বাধ্য শেখ হাসিনাই করেছেন। আর বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে ভারত এই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা পর্যায়ে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছিল। টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণ বন্ধে বিএনপি-জামায়াত সরকারের কোনো চেষ্টাই ছিল না। তবুও রাজাকার শাবকদের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনাই ভারতপন্থি, আর পাকিপন্থি বিএনপি-জামায়াত দেশপ্রেমী! তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির জন্য ভারতকে চাপের মধ্যে শেখ হাসিনাই রেখেছেন। এই চুক্তি হলেও শেখ হাসিনার হাত ধরেই হবে। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকতে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবুও রাজাকার শাবকদের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনাই ভারতপন্থি, আর পাকিপন্থি বিএনপি-জামায়াত দেশপ্রেমী!

ফেলানী হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে ভারতকে বাধ্য শেখ হাসিনাই করেছেন। এ বিচার এখনো চলছে। বিএনপি-জামায়াতের এ বিষয়ে কখনো কোনো সদিচ্ছা ছিল না, শুধু বড় বড় কথা বলেছে। তবুও রাজাকার শাবকদের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনাই ভারতপন্থি, আর পাকিপন্থি বিএনপি-জামায়াত দেশপ্রেমী! বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধে শেখ হাসিনাই কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন। বহুবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে। এর ফলে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড একেবারে বন্ধ না হলেও অনেকখানি কমে এসেছে। যে কোনো মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট থেকেই দেখা যাবে বিএনপি-জামায়াত আমলে সীমান্তে বছরে শতাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটত, যা এখন কমে ১২/১৩ তে নেমে এসেছে এবং শেখ হাসিনা ভারতের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছেন সীমান্তে হত্যাকাণ্ড শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য।

যথারীতি বিএনপি-জামায়াত এ বিষয় নিয়েও সস্তা রাজনীতিই ছাড়া আর কিছু করেনি, কার্যকর কোনো উদ্যোগ কখনো নেয়নি। তবুও রাজাকার শাবকদের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনাই ভারতপন্থি, আর পাকিপন্থি বিএনপি-জামায়াত দেশপ্রেমী! বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায়শই একদল আরেক দলকে হয় ভারত, অথবা পাকিস্তান এবং কখনো কখনো চীনের দালাল হিসেবে আখ্যা দেওয়ার রেওয়াজ আছে। অধুনা আবার আরেক শ্রেণির উদ্ভব হয়েছে যারা দাবি করেন তারা ভারত, পাকিস্তান কোনো দেশের পক্ষীয় মানুষ নন, তারা বাংলাদেশের পক্ষের। এই গোষ্ঠীটিকে আমার সবচেয়ে নির্বোধ বলে মনে হয়। কারণ তারা ধরেই নিয়েছেন তারা ছাড়া বাংলাদেশের অর্ধেক মানুষ ভারতের এবং অর্ধেক মানুষ পাকিস্তানের দালাল।

এই বিষয়টি নিয়ে আমি সু-গভীরভাবে ভাবার চেষ্টা করেছি এবং বাংলাদেশের জন্মের ঐতিহাসিক পটভূমি গণনায় নিয়ে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশে পাকিস্তান প্রভাবিত একটি গোষ্ঠী আছে এবং তাদের অস্তিত্বের একটি যৌক্তিক বাস্তবতা আছে এদেশে। পাকিস্তান যেহেতু দ্বিজাতি-তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট সেহেতু কিছু মানুষ পাকিস্তান মানেই তাকে ইসলামের সমার্থক মনে করে। এই চিন্তা-চেতনা থেকে তারা ১৯৭১ সালে স্বজাতি, নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি এবং নিজ দেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এখনো এই গোষ্ঠীর মানুষগুলোর কাছে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতির সবকিছুর চেয়ে পাকিস্তান অনেক প্রিয়। এরাই সত্যিকার অর্থে পাকিস্তানের দালাল।

চীনপন্থি অতি বাম এক গোষ্ঠী আছে বাংলাদেশে যারা এখনো চীনকেই তাদের প্রভু মানে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই গোষ্ঠীর মহাপ্রভু চীন পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল বলে বাংলাদেশে চীনপন্থিদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে অনেক সময় লেগেছিল। যেখানে গোটা দেশের মানুষ স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছিল সেখানে চীনপন্থিরা ২৬ মার্চ পর্যন্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে যোগদান নিয়ে। চীনপন্থিরা পাকিস্তানপন্থিদের মতো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেননি ঠিকই, কিন্তু তাদের মধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল, মূলত তাদের প্রভু-রাষ্ট্র চীনের পাকিস্তানের পক্ষে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থানের কারণেই। এই দুই গোষ্ঠীই আবার তাদের প্রভুদের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মেরুকরণের দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতবিরোধী অবস্থানের কারণে, বাংলাদেশে এদের অবস্থানও ভারত-বিরোধী। এই দুই গোষ্ঠীর বাইরে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী যে গোষ্ঠী আছে তারা মূলত বাংলাদেশ, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি এবং স্বজাতি-ভিত্তিক প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। এরাই মূল বাংলাদেশপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠী। এরা বাংলাদেশের স্বার্থে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে।

আবার বাংলাদেশের স্বার্থে ভারতের বিএসএফ সদস্যদের বর্ডারে যুদ্ধ করে প্রতিহত করে। এই বাংলাদেশপন্থি গোষ্ঠী তাদের অবস্থান নেয় বাংলাদেশের স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়ে, কোনো বিদেশি প্রভু-রাষ্ট্রের প্রভাবে নয়। তবে পাকিস্তানপন্থি এবং চীনপন্থি গোষ্ঠীর মানুষগুলো তাদের নিজেদের বিদেশি প্রভু থাকায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশপন্থি গোষ্ঠীকে ভারতপন্থী বলে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে। বাংলাদেশে ভারতপন্থি কোনো গোষ্ঠী বিকশিত হওয়ার কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বা বাস্তবতা কোনোকালেই ছিল না। কোনো যুক্তির মাপকাঠিতে মেলে না যে, বাংলাদেশে ভারতপন্থি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকতে পারে। কাজেই এটিই সত্য এবং বাস্তবতা যে এদেশে আছে পাকিস্তানপন্থি এবং চীনপন্থি গোষ্ঠী আর তারাই বাংলাদেশপন্থি গোষ্ঠী যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং বাংলাদেশে স্বাধীনতার স্বার্থেই বিভিন্ন দেশকে বন্ধু বা শত্রু বানিয়েছে, তাদের ভারতপন্থি আখ্যা দেওয়ার প্রচেষ্টায় রত। আর যে নির্বোধ গোষ্ঠীর কথা পূর্বেই উল্লেখ করেছি তারা ভেবেই বসে আছেন আসলেই এদেশে ভারতপন্থি গোষ্ঠী আছে, যেমন আছে পাকিস্তানপন্থি এবং চীনপন্থি। বাংলাদেশের সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমী, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী বাংলাদেশপন্থি গোষ্ঠীই এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষক।

এই বাংলাদেশপন্থি গোষ্ঠীই বাংলাদেশের শত্রু তথা পাকিস্তানপন্থিদের মিথ্যাচারের রাজনীতি দ্বারা আক্রান্ত। পাকিস্তানের দালালেরাই সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত বাংলাদেশপন্থিদের ভারতপন্থি বলে। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তারা সবাই পাকিস্তানিদের দ্বারা ভারতীয় দালাল হিসেবে ইতিহাসের বিভিন্ন সময় আখ্যায়িত হয়েছিলেন। পাকিস্তানিদের চোখে সব মুক্তিকামী, দেশপ্রেমী মুক্তিযোদ্ধা ভারতীয় চর ছিল। আজকের প্রেক্ষাপটও সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশপ্রেমী, ‘জয় বাংলা’র অনুসারীরা পাকিস্তানিদের রেখে যাওয়া প্রেতাত্মাদের কাছে ভারতীয় দালাল।

সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

মোহাম্মদ এ আরাফাত,ভারত