• মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮, ৫ আষাঢ় ১৪২৫
  • ||
শিরোনাম

মুজিবরকে বাঁচাতে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি বন্দিকে ফিরিয়ে দেন ইন্দিরা

প্রকাশ:  ২৭ মে ২০১৮, ০৩:০৬
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট
১৯৭২-এর ২ অগাস্ট। ঠিক আট মাস আগেই শেষ হয়েছে ১৩ দিনের ভারত-পাক যুদ্ধ। এদিন দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় সিমলা চুক্তি। আর ফলে ভারত ৯৩০০০ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিকে ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়। ৭১-এর যুদ্ধ চলাকালীন এদের বন্দি করা হয়েছিল ভারতে। এটা ছিল ভারতের অত্যন্ত বিতর্কিত একটি সিদ্ধান্ত। কেন এই সময় ওই বন্দিদের হাতের তাস করে কাশ্মীর নিয়ে দরাদরি করেননি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী? হয়ত মিটে যেত সমস্যা!

কিসের জন্য পাক বন্দিদের ছেড়ে দিতে রাজি হয়ে যান ইন্দিরা? এর পিছনে আসল গল্প কি ছিল? সেটা জানলে হয়ত বিতর্কের সমাধান হত। কিন্তু সেই গল্প রয়ে গিয়েছিল গোপনেই। কোনোদিন তা প্রকাশ্যে আনা হয়নি। ৪০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে সেই যুদ্ধের। সেদিন কেন পাক বন্দিদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই রহস্য উদঘাটন করেছেন এক অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিবিদ শশাঙ্ক বন্দ্যোপাধ্যায়।

THE WIRE পত্রিকায় তিনি লিখেছেন সেই ইতিহাস। ২৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর পাক যোদ্ধারা আত্মসমর্পণ করে ঢাকায়। ভারতীয় সেনা ও বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে তারা। ভারত আর বাংলাদেশের জন্য সে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু সেইসময় ইন্দিরা গান্ধী তথা ভারত অন্য এক বিপদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। একদিকে, যুদ্ধের বিপুল খরচ, তার উপরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা প্রায় ১ কোটি শরণার্থী, যারা পাক সেনার অত্যাচারে সীমান্ত পার করে চলে এসেছিল তাদের খরচ। তার মধ্যে বাড়তি খরচ এই ৯৩০০০ পাক সেনা।

ইন্দিরা গান্ধীর মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল, কিভাবে শেখ মুজিবর রহমানকে নিরাপদে দেশে ফেরানো যায়। তার জন্য যে কোনও মূল্য দিতে রাজি ছিলেন তিনি। সেকথা তিনি একজনকেই বলেছিলেন। তিনি হলেন তৎকালীন RAW প্রধান রাম নাথ রাও। পাকিস্তানের মিলিটারি কোর্টে ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়েছিল তাঁকে, নৃশংসভাবে হত্যা করার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। সেটাই ছিল ইন্দিরা গান্ধীর সবথেকে বড় দুঃস্বপ্ন। হৃদয় দিয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন করেছিল ভারত। তাই মুজিবর রহমানকে হত্যা করা হলে, ভারতের স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। এটাই ছিল ভয়। বাংলাদেশকে ‘অনাথ’ দেখতে চাননি তিনি।

এদিকে, পরাজয়ের অপমান সহ্য করতে না পেরে পদত্যাগ করেন তৎকালীন পাক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহা খান। আমেরিকায় থাকা জুলফিকর আলি ভুট্টোকে ফোন করে সেকথা জানান। দায়িত্ব দিয়ে যান ভুট্টোকেই। তড়িঘড়ি রাওয়ালপিন্ডির বিমান ধরেন ভুট্টো।

ইন্দিরার ঐতিহাসিক কূটনীতি:

ভুট্টোর ফেরার খবর পেয়েই জরুরি মিটিং ডাকেন ইন্দিরা গান্ধী। ভুট্টোর বিমান রিফুয়েলিং-এর জন্য থামার কথা ছিল হিথরো বিমানবন্দরে। ইন্দিরা গান্ধী চেয়েছিলেন, সেইসময় সেখানে উপস্থিত থাকুক কোনও ভারতীয় প্রতিনিধি। যাতে তিনি জানতে পারেন, মুজিবর রহমানকে নিয়ে কি ভাবছেন তিনি? সেই বৈঠকে ছিলেন বিদেশমন্ত্রকের উপদেষ্টা দূর্গা প্রসাদ ধর, RAW প্রধান রাম নাথ কাও, প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি পিএন হাসকার, বিদেশ সচিব টিএন কাউল।

মুজফ্ফর হোসেন, পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি ভারতে যুদ্ধবন্দি হন এবং ডিপি ধরের বাড়িতে অতিথির মর্যাদায় ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন লন্ডনে। ফলে সেইসময় কূটনীতিকদের মাধ্যমেই যোগাযোগ করতেন স্বামী-স্ত্রী। অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিবিদ শশাঙ্ক বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনিই দু’জনের মাধ্যম হয়ে উঠেছিলেন ফলে দু’জনের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। লায়লা ছিলেন ভুট্টোর একসময়ের বান্ধবী। সেই লায়লাকেই কাজে লাগান ইন্দিরা। ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলতে পাঠান লায়লাকে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই।

মুজিবরকে নিয়ে কি ভাবছেন সেটা জানা। এই শশাঙ্ক বন্দ্যোপাধ্যায়ই লায়লাকে জানান, তিনি আতে হিথরো বিমানবন্দরে গিয়ে একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভুট্টোকে বলেন, তাঁর স্বামীকে ভারত থেকে ছাড়ার ব্যবস্থা করতে। সেইমত এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে দেখা হয় দু’জনের। কথাবার্তা শেষে লায়লাকে কাছে টেনে তাঁর কানে কানে একটা বার্তা দেন ভুট্টো। বলেন, ‘লায়লা আমি জানি, তুমি কি জানতে এসেছ। একটা মেসেজ দিও ইন্দিরা গান্ধীকে। বোলো, আমি মুজিবর রহমানকে মুক্তি দেব। কিন্তু বদলে কি চাইব? সেটা পরে জানাব।’

বার্তা জানান লায়লা। তবুও সন্দেহ দূর হয় না। ভারতকে ভুল পথে চালিত করছেন না তো ভুট্টো? কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই সন্দেহের অবসান হল। খবরটা সত্যি সেটাই জানা গেল। বদলে চাওয়া হল ৯৩০০০ যুদ্ধবন্দিকে। ১৯৭২-এর ৮ জানুয়ারি ছেড়ে দেওয়া হল মুজিবর রহমানকে। ফিরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন তিনি। এর ঠিক আট মাস পরে ছেড়ে দেওয়া হয় ওইসব পাক যুদ্ধবন্দিদের।

সূত্র: কলকাতা ২৪/৭