• শনিবার, ২৬ মে ২০১৮, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
  • ||

রমজানে স্বাস্থ্য সচেতনতা

প্রকাশ:  ১৭ মে ২০১৮, ১৯:২০
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

পবিত্র রমজান মাস এসে গেছে। এটি সংযমের মাস। খাওয়া থেকে শুরু করে ব্যায়াম, জীবনযাত্রা সবই হতে হয় সাধারণ এবং পরিমিত। কিন্তু রোজার মাসে মনে হয় আমরা খাবারের প্রতিযোগিতা একটু বেশি করে থাকি। রোজার সময় ভাজা-পোড়া খাওয়া স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। তবে সারাদিন রোজা রাখার পর আমাদের পাকস্থলি খুব ক্ষুধার্ত ও দুর্বল থাকে। আবার  সারাদিন   সুস্থ্য থাকতে হলে খাবার সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। কারণ সব খাবারের কার্যক্ষমতা এক রকম নয়। কোন খাবার দ্রুত হজম হয়, আবার কোন খাবার অনেক সময় নিয়ে হজম হয়। অন্যদিকে পুষ্টির বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। 

রমজান মাসে আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্যগ্রহণের সময়ে পরিবর্তন আসে, পরিবর্তিত হয় জীবনযাপন প্রণালীও। এই পরিবর্তনের কারণে অনেকেরই দেখা দেয় সাধারণ কিছু শারীরিক সমস্যা। চিকিৎসকের পরামর্শ ও খাদ্য তালিকার প্রতি মনোযোগের মাধ্যমে সহজেই এসব সমস্যা এড়ানো সম্ভব। রোজায় একটানা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে যেতে পারে। ফলে দুর্বলতা, মাথাঘোরা, ক্লান্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া, অল্পতেই ঘেমে যাওয়া, শরীরে কাঁপুনি, মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড় করা প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দিতে পারে, এমনকি অচেতনও হয়ে যেতে পারেন। ডায়াবেটিস হলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়ে। রমজানের সময় রোজাদার ডায়াবেটিস রোগীদের ওষুধের মাত্রা ও সেবন বা প্রয়োগের সময় সেহেরি ও ইফতারের সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সমন্বয় করে নিতে হবে। 

ডায়াবেটিক নন, এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও গ্লুকোজের পরিমাণ কমে যাওয়ার ব্যাপারটি ঘটতে পারে। কেউ কেউ আলস্যজনিত বা অন্য কোনো কারণে সেহেরি খান না। তাদের ক্ষেত্রেই এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটতে দেখা যায়। রক্তে গ্লুকোজের ঘাটতি এড়াতে সেহেরিতে অবশ্যই খাবার প্রতি জোর দেন চিকিৎসকরা। হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ব্যবস্থা নিতে হবে। রমজানে অন্যতম সাধারণ সমস্যা হচ্ছে মাথাব্যথা। রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে গেলে যেমন মাথাব্যথা হয়, তেমনি পানিশূন্যতার জন্যও মাথাব্যথা হতে পারে। দিনের শেষভাগে বা ইফতারের পরপরই অনেকের মাথাব্যথা শুরু হয়। মাথাব্যথা তীব্র হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেয়ে ব্যথা কমানো যায়। তবে মাথাব্যথা প্রতিরোধে সেহেরি ও ইফতারের সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পানের উপদেশ দেন চিকিৎসকরা। 

এ সময়ের আরেকটি সাধারণ সমস্যা হচ্ছে 'পেটের গোলমাল'। অনেকেরই পাকস্থলিতে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। পেট ব্যথা, ফাঁপা, জ্বালাপোড়া, গুড়গুড় করা, বদহজম, গ্যাস হওয়া প্রভৃতি সমস্যা প্রায়ই ঘটে। এসব অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, তেল-মসলা ও চর্বিযুক্ত খাবার যেমন- পেঁয়াজু, বেগুনি, বুটভুনা, হালিম ও কোলা-জাতীয় 'সফট-ড্রিংকস'-এর কুফল। তাই পেটের সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে চাইলে এসব খাবার বর্জন করে সেহেরি ও ইফতারে স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। এসব খাবার পেপটিক আলসারে আক্রান্ত রোগীদের আলসার বাড়ায় এমনকি খাদ্যনালীতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও বাড়ায়। তবে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুয়ায়ী ওষুধ সেবন করলে পেপটিক আলসারের রোগীও কোনো আশঙ্কা ছাড়াই রোজা রাখতে পারেন। 

রোজায় সারাদিন অভুক্ত থেকে ইফতারের সময় অনেকেই অতিরিক্ত খাবার খান। এই অতিভোজনের কারণেও পেটে নানা সমস্যা দেখা দেয়। কারও কারও কোষ্ঠকাঠিন্যও হতে পারে। এর কারণ পানি ও আঁশযুক্ত খাবার কম খাওয়া।

দিনের শেষভাগে এসে অনেকের রক্তচাপ কমে যেতে পারে। রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে গেলে দুর্বলতা, ক্লান্তি, মাথাঘোরা- বিশেষ করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় মাথা ঘোরানো, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘামা, মাথার ভেতর ফাঁকা ফাঁকা লাগা, ঝিম ঝিম করা প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে রক্তচাপ কমে যাওয়ার বিষয়টি যন্ত্র দিয়ে মেপে নিশ্চিত হতে হবে। অন্য অনেক উপসর্গের মতো রক্তচাপ কমে যাওয়ারও অন্যতম কারণ পানিশূন্যতা। এছাড়া খাদ্যে লবণের পরিমাণ কম থাকলেও এটি হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধের মাত্রা ও সেবনের সময় সমন্বয় করে নেওয়া উচিত। নইলে তাদেরও রক্তচাপে অসঙ্গতি দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম প্রভৃতির ঘাটতিজনিত কারণে মাসল ক্র্যাম্প হতে পারে, সোজা বাংলায় আমরা যাকে বলি মাংসপেশিতে 'খিল' ধরা।

 এ জন্য উপরোক্ত খনিজ লবণসমৃদ্ধ খাবার যেমন- শাকসবজি, ফলমূল, দুধ, খেজুর প্রভৃতি খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। মোট কথা রমজানের এই সময় সেহেরি, ইফতার ও রাতের খাদ্যতালিকা হতে হবে স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকর। শাক-সবজি ও ফলমূল খেতে হবে প্রচুর। পানি পান করতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণে। তাহলেই এসব সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো এড়িয়ে সুস্থ দেহে রমজানের রোজা পালন করতে পারবেন।