• বুধবার, ২০ জুন ২০১৮, ৬ আষাঢ় ১৪২৫
  • ||
শিরোনাম

দেশে ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছি: তসলিমা নাসরিন

প্রকাশ:  ২৭ মার্চ ২০১৮, ২৩:৩২ | আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৮, ২৩:৫০
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট
দুই যুগ ধরে প্রবাসী জীবন কাটাচ্ছেন আলোচিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। বর্তমানে ভারত অবস্থানকারী এই লেখিকা বিভিন্ন ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা মন্তব্য করে দেশ নিয়ে তার সচেতনতা জানান দেন। সম্প্রতি  ভারতের সংবাদমাধ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। দেশে ফেরা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন,  মৌলবাদী গোষ্ঠীদের রোষানলে ১৯৯৪ সালে দেশ ত্যাগে বাধ্য  হই। দেশে ফিরলে আমাকে হত্যা করা হবে। কয়েক দফা সরকার বদল হলেও কোনো সরকারই আমার জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। এতো বছর পর তাই দেশে ফেরার আশা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি। 
 
একপ্রশ্নের জবাবে তসলিমা নাসরিন বলেন, মুক্তমত প্রকাশই আমার অপরাধ। আমি ইসলাম ধর্মের বিধি-নিষেধ নিয়ে লিখেছি বলে মৌলবাদীরা আমার উপর ক্ষিপ্ত হয়েছে। তারা জানেনা যে, ইসলাম ছাড়াও আমি অন্য ধর্মগুলোর বিষয়েও লিখেছি। সব ধরনের পশ্চাদপদতার বিরুদ্ধেই আমি লিখে থাকি। তবে কারো বিপক্ষে যায় এমন কথা আমি লিখিনি। বরং নারীদের পক্ষে তাদের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছি, যে কথাগুলো অন্য কেউ বলে না।
 
তিনি বলেন, আমার লেখ বিভিন্ন গ্রন্থে ও সংবাদপত্রের কলামে নারীদের প্রতি মুসলিম মৌলবাদীদের শোষণের কথা লেখায় ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের মৌলবাদীরা তার সেময়ের কর্মস্থল ‘খবরের কাগজ’ পত্রিকার অফিস ভাঙচুর করে। এতেই ক্ষান্ত হয়নি  উগ্রপন্থীরা। তখন থেকেই তারা আমাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছে। ১৯৯৩ সালে তার ‘লজ্জা’  উপন্যাসে একটি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের ওপর মুসলমানদের অত্যাচারের বর্ণনা দেওয়ায়, অমর একুশে গ্রন্থমেলায় মুসলিম মৌলবাদীরা  আমাকে আক্রমণ করে। এবং বইটি  শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। ওইসময় গ্রন্থমেলা কর্তৃপক্ষ আমাকে মেলায় প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। 
 
তসলিমা নাসরিন বলেণ, ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা উত্তরপ্রদেশে বাবরি মসজিদ  গুড়িয়ে দেওয়ার প্রভাব ওইসময় বাংলাদেশের উপরও পড়ে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সূত্র ধরেই হঠাৎ করে বাংলাদেশের কোথাও কোথাও হিন্দুদের উপর উগ্র মুসলমানদের অত্যাচার শুরু হয়। এইসব বিষাদময় ঘটনা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন বলেও জানান তিনি। তসলিমা বলেন, সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের এইসব বাস্তব ঘটনার প্রতিফলনে লেখা ‘লজ্জা’ উপন্যাসটি ১৯৯৩ সালে বাজেয়াপ্ত করা হয়।
 
ময়মনসিংহে জন্ম নেওয়া এই লেখিকা জানান,  ১৯৯৪ সালের মে মাসে প্যারিসে ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইসলামি ধর্মীয় আইন শরিয়া অবলুপ্তির মাধ্যমে কুরআন সংশোধনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এর ফলে ইসলামি মৌলবাদীরা তার ফাঁসির দাবী জানাতে শুরু করে। তিন লাখ মৌলবাদী একটি জমায়েতে তাকে ইসলামের অবমাননাকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দালালরূপে অভিহিত করে। দেশ জুড়ে তার শাস্তির দাবীতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে জনগণের ধর্মীয় ভাবনাকে আঘাত করার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয় এবং জামিন-অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। গ্রেপ্তার এড়াতে পরবর্তী দুই মাস লুকিয়ে থাকার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে তার জামিন মঞ্জুর হয় এবং তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন ।
 
তসলিমা আরো জানান, দেশ ত্যাগ করলেও তিনি ভেবেছিলেন, পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এলে কিছুদিন পরেই ফের দেশে ফিরে আসতে পারবেন। কিন্তু দেখতে দেখতে অনেকটা সময় পার হয়ে গেলেও আর দেশে ফেরা হয়নি তার। 
 
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি বরাবরই দেশে ফিরতে চাই। কিন্তু আমার মাতৃভূমি আর আগের পরিস্থিতিতে নাই। বাংলাদেশ এখন পুরোপুরি ইসলামিক দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশে অহরহ বিজ্ঞানভিত্তিক ও মুক্তমনা লেখক-ব্লগার খুন হয়ে যাচ্ছেন। আর এমন এক সময়ে দেশে ফিরলে আমাকেও হত্যা করা হতে পারে।