• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫
  • ||

নেপালে বিমান বিধ্বস্ত

দুই পক্ষের দোষারোপ, ভুল আসলেই কার?

প্রকাশ:  ১৪ মার্চ ২০১৮, ০১:৪১ | আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৮, ০১:৫১
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট

সোমবার নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিটে চার ক্রু ও ৬৭ আরোহী নিয়ে বাংলাদেশি ইউএস-বাংলার বিএস-২২১ ফ্লাইটটি বিধ্বস্ত হয়। এ দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট ২৬ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

এ ঘটনায় ইউএস বাংলা ও ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ পরস্পরকে দোষারোপ করলেও উভয় পক্ষের বক্তব্য থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বিমানের পাইলট ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল এটিসি টাওয়ারের মধ্যে যোগাযোগগত ত্রুটির কারণে ওই দুর্ঘটনা হয়েছে। ইউএস বাংলা দুর্ঘটনার জন্য কন্ট্রোল রুমের ভুল বার্তাকে দায়ী করলেও ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে,বিমানের পাইলট ভুল রানওয়েতে অবতরণের চেষ্টা করেছিলেন। তবে অতীতেও এই কন্ট্রোল রুমের ভুল বার্তা দেওয়ার নজির রয়েছে।

জার্মান বিমান-নিরাপত্তা বিষয়ক ওয়েবসাইট জেএসিডিইসি থেকে প্রচার হওয়া অডিওতে দুইটি রানওয়েই অবতরণে প্রস্তুত বলে নির্দেশনা শোনা গেছে। এএফপির সরবরাহকৃত আরেক অডিওতে দুই যাত্রী কন্ট্রোল রুম থেকে দেওয়া শেষ বার্তাকে ভীতিকর বলেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরাও অবতরণে অপেক্ষারত অবস্থায় বিমানটিকে রানওয়ের ওপর দিয়ে ঘুরপাক খেতে দেখেছেন।

এদিকে ঘটনার দিন ত্রিভুবন বিমানবন্দরের এয়ারট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের দায়িত্বে থাকা ৬ কর্মকর্তাকে অন্যত্র স্থানান্তরের ঘটনাকে সন্দেহজনক মনে করছে ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ। এরইমধ্যে ঘটনার তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছে নেপাল। ফাঁস হওয়া অডিও বার্তাও তদন্ত করবে তারা। তদন্তের ফলাফল যাই হোক, দুর্ঘটনার পর পাওয়া বিমানের ব্ল্যাকবক্স থেকে প্রকৃত দায়ীকে চিহ্নিত করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিমানের ধ্বংসাবশেষ

ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। কাছেই একটি ফুটবল মাঠে বিধ্বস্ত হয় বিমানটি। সেনাসূত্রে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৫০টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। সেনা মুখপাত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন,নয়জনের এখনও কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

চ্যানেল নিউজ এশিয়া ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, তারা দুর্ঘটনার দায় দিয়েছেন বিমানের পাইলটকে। বিমানবন্দরের মহাব্যবস্থাপক রাজ কুমার ছেত্রি বলেছেন, নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথ রানওয়েতে নামতে পারেনি বিমানটি। তার দাবি, কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে বারবার পাইলটকে জ্ঞিজ্ঞেস করা হয়েছে, সব ঠিক আছে কিনা। পাইলট ‘হ্যাঁ’ উত্তর দিয়েছেন।

আল জাজিরা তাকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে,জেনারেল ম্যানেজার বিমানটি কন্ট্রোল রুমের নির্দেশনা অনুসরণ করেনি। তিনি দাবি করেন, ‘বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বিমানটিকে দক্ষিণ দিকে অবতরণের অনুমোদন দিলেও তারা উত্তর দিকে অবতরণের চেষ্টা করে।’

তবে এ তথ্য মানতে নারাজ ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আফিফ। তিনি বলেন, এখনই নিশ্চিত কিছু বলতে না পারলেও আমাদের আশঙ্কা কাঠমান্ডু বিমান কর্তৃপক্ষের কন্ট্রোল রুম থেকে পাওয়া নির্দেশনায় বিভ্রান্ত হয়েই পাইলট আবিদ হাসান ভুল রানওয়েতে নেমেছিলেন। ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের সিইও আসিফ ইমরান দুর্ঘটনার আগে বিমানের ক্যাপ্টেন ও কাঠমান্ডু এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বা এটিসি-র মধ্যকার কথোপকথনের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, বিমানবন্দরের কন্ট্রোল রুম থেকে পাইলটকে ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

জার্মান বিমান-নিরাপত্তা বিষয়ক ওয়েবসাইট জেএসিডিইসি থেকে প্রচার হওয়া অডিওতে শোনা যায়,এয়ার কন্ট্রোল টাওয়ার-এটিসি থেকে পাইলটকে রানওয়ে ২০ এর দিকে এগোতে মানা করা হচ্ছে। পাইলট জানান, তিনি অপেক্ষা করছেন। কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে তাকে অবতরণ না করে অপেক্ষা করতে বলা হয়। কারণ, আরেকটি বিমান ওই রানওয়ের দিকে এগিয়ে আসছে। বিমানটি ডানদিকে ঘুরে গেলে এটিসি থেকে জানতে চাওয়া হয়, পাইলট কি রানওয়ে জিরো টুতে (উত্তর প্রান্ত) ল্যান্ড করবেন নাকি রানওয়ে টু জিরোতে (দক্ষিণ প্রান্ত)। ইউএস বাংলার পাইলট জানান, তারা রানওয়ে টু জিরোতে (২০) ল্যান্ড করবেন। এরপর জানতে চাওয়া হয় তিনি রানওয়ে দেখতে পারছেন কিনা। পাইলট নেতিবাচক উত্তর দেন। এবার এসিটি থেকে তাকে ডানদিকে ঘুরতে বলা হয়। তখন পাইলট জানান, তিনি রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন। বলেন, জিরো টু-তে অবতরণ করার জন্য প্রস্তুত।

কন্ট্রোল টাওয়ার জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশের বিমানটিকে টু-জিরোতে নামার চূড়ান্ত অনুমতি দেওয়া হয়েছে (একটু আগেই কথা হয়েছে জিরো টুর বিষয়ে)।এ সময় প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে একটি সামরিক বিমানকে অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল। এরপর ইউএস বাংলার পাইলট জানতে চান, স্যার, আমরা কি অবতরণের অনুমতি পেয়েছি? কিছুক্ষণ নীরবতার পরই কন্ট্রোলের চিৎকার শোনা যায়, আমি আবার বলছি, ঘুরে যান। এরপরই ফায়ার ওয়ানকে ডাকা হয়, যার মানে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এরপর নেপালি একজন পাইলটের প্রশ্নের জবাবে রানওয়ে বন্ধ বলে জানানো হয়।

নেপাল বিমান কর্তৃপক্ষের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সঞ্জীব গৌতম, অডিও’র সত্যতা অস্বীকার করেননি। তবে এটি প্রকাশ্যে আনাকে তিনি আইন বিরুদ্ধ কর্মকাণ্ড দাবি করেন। এরইমধ্যে নেপাল জানিয়েছে, ফাঁস হওয়া অডিওর সত্যতা নিশ্চিতে তাদের বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এগুলো তদন্ত করে দেখবে।

অপর একটি কথোপকথনের সূত্রে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, সেখানেও যোগাযোগগত ত্রুটি ঘটার আলামত মিলেছে। ফ্লাইট বিএস ২১১ নিয়ে বলতে গিয়ে একজন নেপালি বলছিলেন. ‘দেখেন, তাদের সত্যিই খুব বিচলিত মনে হচ্ছে’। আরেকজন বলে ওঠেন, ‘কী করবেন তারা তো বুঝে উঠতে পারছে না।’ অবতরণের কয়েক মুহূর্ত আগে পাইলট জানতে চেয়েছিলেন,‘আমরা কি নামতে পারি?’ একটু পরেই কন্ট্রোলার ফিরতি বার্তায় বলেন, ‘আমি আবার বলছি ঘুরে যান।’ এই নির্দেশনার সঙ্গে সঙ্গে রানওয়েতে আগুন ধরে যায়। প্রাপ্ত কথোকথন সূত্রে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে,কন্ট্রোল রুম থেকে এমন করেই শেষ কথাটা বলা হয়েছিল যা আতঙ্কিত হওয়ার মতো। এ ধরনের যোগাযোগে কখনও এমন স্বরে কেউ কথা বলে না।

২০১৬ সালের ২৭ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনে হিমালয়ান টাইমস এক পাইলটকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, তিনি (ওই পাইলট) প্রায়ই ত্রিভুবন বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে ভুল তথ্য পান। দৈনিকটির কাছে ওই পাইলট অভিযোগ করে বলেছিলেন,‘আজ সকালেও টাওয়ার থেকে আমাকে জানানো হয় বিমানবন্দরের দৃষ্টিসীমা ৩ কিলোমিটার। তবে কাঠমান্ডুর আকাশে কুয়াশা থাকায় আবহাওয়া বিভাগের আপডেট তথ্য দেখাচ্ছিল দৃষ্টিসীমা দেড় কিলোমিটারেরও কম। বিপরীতে বিধ্বস্ত বিমানের পাইলট ১৭০০ ঘণ্টা ইউএস বাংলার এই বিমানটি চালিয়েছেন। তিনি এর ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টরও ছিলেন।

নেপালে কর্মরত মার্কিনি আমান্দা সামার্স নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শীর সূত্রে এপি বলছে, প্লেনটি অবতরণের আগে এদিক-ওদিক ঘুরছিল। যখনই এটি নামতে থাকে তখনই পরপর দুইটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আগুনের ফুলকি উঠতে শুরু করে।

মিনহাজুর রহমান নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আমাদের চেকইন সব ওকে, অপেক্ষা করছিলাম উড়োজাহাজ আসার জন্য। বিমানটি ল্যান্ড করার সময় বিধ্বস্ত হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে ঘন্টার বেশি সময় লেগেছে। অনেক ধোঁয়া দেখিছি, তবে পানি স্বল্পতা ছিল। মানুষজনকে উদ্ধার করতে অনেক মানুষ দেখেছি। আগুনের কুণ্ডলী বেশি থাকায় কাছে গিয়ে কেউ উদ্ধার করতে পারেনি।যেভাবে পুড়েছে তাতে মানুষজনের বেঁচে থাকা কঠিন।

ঢাকার একটি টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিককে উদ্ধৃত করে ত্রিভুবন বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, অবতরণের যথাযথ নির্দেশনা পাওয়ার অপেক্ষায় বিমানটি দুইবার বিমান বন্দরের ওপর ঘোরাফেরা করে।

নেপাল এরইমধ্যে ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। সেই তদন্তে কী উদঘাটিত হবে এখনই তা বলা যাচ্ছে না। তবে বিধ্বস্ত বিমানের উদ্ধারকৃত ব্ল্যাকবক্স থেকে প্রকৃত দায়ীকে শনাক্ত করা যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

দুইটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত ফ্লাইট রেকর্ডার দুই ধরনের তথ্য সংরক্ষণ করে। ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার বা এফডিআর নামের অংশটি বিমানের ওড়া, ওঠানামা, বিমানের মধ্যের তাপমাত্রা, পরিবেশ, চাপ বা তাপের পরিবর্তন, সময়, শব্দ নিজস্ব সিস্টেমের অভ্যন্তরে রেকর্ড করে রাখে। অপর অংশ ককপিটভয়েস রেকর্ডারে (সিভিআর) নামের আরেকটি অংশে ককপিটের অভ্যন্তরীণ কথোপকথন আর ককপিট এর সঙ্গে এয়ার কন্ট্রোল ট্রাফিক বা বিভিন্ন বিমান বন্দরের সঙ্গে রেডিও যোগাযোগের কথা রেকর্ড হতে থাকে। পাইলট, কো পাইলট, ক্রুদের বসার কাছাকাছি জায়গায় অনেকগুলো মাইক্রোফোন বসানো থাকে। তাদের সব কথাবার্তা, নড়াচড়া বা সুইচ চাপা ইত্যাদি সব এসব মাইক্রোফোনে রেকর্ড হতে থাকে। সেগুলো এ্যাসোসিয়েটেড কন্ট্রোল ইউনিট নামের একটি ডিভাইসে পাঠায়। এরপর সেসব তথ্য ব্ল্যাক বক্সে গিয়ে জমা হয়। বিমান চলাচলের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্ল্যাক বক্স তথ্য সংরক্ষণ করে রাখে। মূলত শেষের দিকে তথ্য এটিতে জমা থাকে। একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর আগের তথ্য মুছে যেতে থাকে আর নতুন তথ্য জমা হয়। ফলে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সর্বশেষ তথ্য এটিতে পাওয়া যায়। আধুনিক ব্ল্যাকবক্সগুলোয় ২৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিমানের ফ্লাইট ডাটা ধারণ করে রাখতে পারে। তাই উদ্ধারকৃত ব্ল্যাকবক্সে সঞ্চিত কথোপকথন ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকৃত দায়ীকে শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে।