• রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮, ৪ ভাদ্র ১৪২৫
  • ||

জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দিপালীদের রক্তে লেখা দিনের একি পরিণতি!

প্রকাশ:  ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:৩৫
মনজুর রশীদ
প্রিন্ট

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় আমাদের দেশে যখন জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম দানা বাঁধতে শুরু করেছিলো তখন পাকিস্তানী শাসক শ্রেণী জাতির চেতনাকে ধ্বংস করতে বহুমাত্রিক চেষ্টা চালাতে থাকে। ভাষা-শিক্ষা-সংস্কৃতির উপর আগ্রাসনসহ তারা চেয়েছিলো আমাদের উপর বিজাতীয় ভাষা উর্দূ চাপিয়ে দিতে।

কালের ধারাবাহিকতায় ঠিক তেমনিভাবেই স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে পার্লামেন্টারী স্বৈরশাসকদের আমলে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’-এর চেতনাকে ধ্বংস করতে উদ্যত এদেশের সকল রাষ্ট্র পরিচালনাকারী শাসকগোষ্ঠীসমূহ। আর সেকারণেই সামরিক স্বৈরাচার সরকার এরশাদের শাসনামলের কয়েক বছর যেতে না যেতেই ১৪ ফেব্রুয়ারীকে 'ভ্যালেন্টাইনস ডে' হিসাবে প্রতিপালনের জন্য এক ধরনের মিডিয়া ক্যাম্পেইন শুরু হলো। যার প্রধান উদ্যোক্তা সেসময়ের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান সম্পাদক শফিক রেহমান।

তিনি তার এই পত্রিকার মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই দিবসটি 'ভালোবাসা দিবস' নামে পালনে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করলেন। আর সেই গড্ডালিকা প্রবাহে ইতিহাসের পাতা থেকে ক্রমেই মুছে যেতে শুরু হলো ১৯৮৩ সনের ১৪ ফেব্রুয়ারী ততকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে আহবান করা ছাত্র জমায়েতের দিনটির কথা। যেদিনটিতে মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দী মুক্তি ও জনগণের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে ডাকা ছাত্র জমায়েত পরিণত হয়েছিলো বুট ও বুলেটে-দমিত জনতার এক বিরাট প্রতিরোধে। জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দিপালীসহ সারাদেশে প্রাণ দিয়েছিলো ১০ জন। সেদিন সরকারী হিসাবে গ্রেপ্তার হয় ১ হাজার ৩১০ জন। যার ফলশ্রুতিতে ১৪ ফেব্রুয়ারী হয়ে ওঠে মুক্তিকামী মানুষের প্রতিরোধ চেতনার একটি বিশেষ দিন হিসাবে। সে থেকে প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারী দিনটি পালিত হয়ে আসছিলো ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ নামে!

পরবর্তীতে ডিজিটাল যুগের ব্যাপক প্রচার প্রসারের যুগে প্রায় অধিকাংশ গণমাধ্যম বিশেষত ক্যাবল আর স্যাটেলাইট চ্যানেলের কল্যাণে আর কর্পোরেট কোম্পানীসমূহের পৃষ্ঠপোষকতায় 'স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসাবে পালিত হওয়া দিনটি মুছে গিয়ে লাইমলাইটে আসতে শুরু করলো তথাকথিত 'ভ্যালেন্টাইনস ডে' পালন। মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবল জোয়ারে এদিনটি পরিণত হলো বহুজাতিক কোম্পানির পণ্য বিক্রির দিন হিসেবে। যার প্রসারতা দিন দিন এতটাই ব্যাপকতা লাভ করেছে যে, বিগত কয়েক বছরের মত এ বছরের এই দিনে কোথাও 'স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ পালনের কোন সংবাদ চোখে পড়েনি।

জনগণের কথা বলার উচ্চকিত রাজনৈতিক বুলি আওড়ানো সব রাজনৈতিক দলগুলি ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ বা দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকতে গিয়ে রক্তের অক্ষরে লেখা শহীদদের নাম দিন দিন ভুলে যেতে শুরু করেছে। আর সে জায়গাটি দখল করেছে পশ্চিমা সংস্কৃতির 'ভ্যালেন্টাইনস ডে' উদযাপনের মাধ্যমে। ‘আমি আর তুমি’র মত চরম স্বার্থপর, সমাজ-বিচ্ছিন্ন চেতনা যুব সমাজের মধ্যে চাপিয়ে দিচ্ছে এই তথাকথিত ভালোবাসা দিবসটি। প্রেম-ভালোবাসার মত স্বাভাবিক সম্পর্ককে অতিপ্রাকৃত বিষয়ে পরিণত করে আফিম নেশার মত বুঁদ করে ফেলেছে পুরো সমাজ। ভোগবাদ আজ হয়ে উঠছে নতুন প্রজন্মের আদর্শ। এ ব্যক্তিগত ভালোবাসার একপিঠে কাম, আরেক পিঠে কর্পোরেট কালচারের উস্কানী। যৌনতা ও অশ্লীলতার মাদকতায় আসক্তি আজ সর্বব্যাপী রূপ নিয়েছে। বিজ্ঞাপন, ফ্যাশন শো, লাক্স-চ্যানেল আই সুপার স্টার, সিনেমা, নাটক, যাত্রা, অশ্লীল নৃত্যের সিডি, ইন্টারনেটে পর্ণগ্রাফির ছড়াছড়ি, এফএম রেডিও-র মধ্যরাতের অশ্লীল অনুষ্ঠান ইত্যাদি সব মিলিয়ে বিকৃত যৌনতা-অশ্লীলতার চর্চা যেন বাঁধভাঙ্গা জোয়ারে পরিণত হয়েছে। এরই পরিণতিতে আমরা দেখছি, সারা দেশে যৌন নিপীড়ন ও উত্যক্ত করা, ধর্ষণ ও হত্যার মত ঘটনা বেড়েই চলেছে। আর ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ উদযাপনের সংস্কৃতি ঠিক এ জোয়ারকেই জোরদার করছে। সব শাসক শ্রেণী এ থেকে লাভ তুলে নিচ্ছে দু’ভাবে - সমাজের সবচেয়ে প্রাণবন্ত লড়াকু অংশ যুব সমাজকে মুক্তির লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন ও নির্জীব করে ফেলছে এবং দিনটিকে বাণিজ্যের মহোৎসবে পরিণত করে ফেলছে।

যে বিষয়টি এখানে লক্ষ্যণীয় তা হলো শাসকদের একটি মহল অনেক কায়দা-কৌশল করে ছাত্র আন্দোলনের গৌরবময় এ ইতিহাসকে ঢেকে দেওয়ার জন্য আমাদের সংস্কৃতির সাথে একেবারেই বেমানান এই তথাকথিত ভ্যালেন্টাইনস ডে - কে ১৪ ফেব্রুয়ারীতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নতুন প্রজন্মকে রাজনৈতিক চেতনাহীন করাই যার মূল অভিপ্রায়। রক্তের অক্ষরে যাঁরা আমাদের গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন, তাঁদের জন্য অবজ্ঞা আর অবহেলা ছাড়া আমরা কি দিলাম?

লেখকঃ গবেষক ও সমাজ বিশ্লেষক।