• রবিবার, ২৭ মে ২০১৮, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
  • ||

ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে চান মমতা

প্রকাশ:  ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০২:০৩ | আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৯:৪১
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত
প্রিন্ট
যত দিন যাচ্ছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং সংঘ পরিবার বুঝতে পারছেন, তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। তাই মোদিজি রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে দিয়ে সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন বলিয়ে দিয়েছেন, রাজ্যগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রের একই সঙ্গে নির্বাচন হওয়া উচিত। উল্লেখ্য, এ বছরই বিজেপি-শাসিত চারটি এবং কংগ্রেস-শাসিত কর্নাটকে নির্বাচন। তাই রাজনৈতিক মহলের দৃঢ়বিশ্বাস, এ বছরের শেষ নাগাদ সংসদ ভেঙে দিয়ে লোকসভার নির্বাচনের পথে যেতে পারেন নরেন্দ্রভাই দামোদর দাম মোদি।

কিন্তু বিরোধীরা এর আঁচ পেয়েই সম্প্রতি সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে একাট্টা হয়েছে। ইউপিএ-১ বা ইউপিএ-২ ধাঁচের সরকার গঠন করার জন্য সোনিয়া গান্ধীর ডাকে বিজেপিবিরোধী সব দল একাট্টা হয়েছে। সোনিয়া ওই বৈঠকে বলেছেন, ভারতের গণতন্ত্র বিপন্ন। সংবিধান ধর্ষিত। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোর সময় এসেছে বিজেপিকে হারানোর জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। সোনিয়ার সভায় সব বিরোধী নেতা উপস্থিত থাকলেও আঞ্চলিক দলের নেত্রী বঙ্গেশ্বরী যাননি। মমতার ঘনিষ্ঠ মহল থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয় মমতা নিজেই পরবর্তী অবিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার।

কিন্তু রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এই যুক্তি নেহাতই ছেঁদো এবং বাহানা মাত্র। বাস্তবে তিনি বিজেপির রাস্তা খোলা রাখতেই চাইছেন। সে কারণে সোনিয়ার বৈঠকে গিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে চটাতে চাইছেন না। যেমন তিনি করেছিলেন ১৯৯৮-৯৯ সালে। কংগ্রেসকে ছেড়ে বিজেপি মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছিলেন।

একবার প্রণব মুখার্জির হাত ধরে ২০০১ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন। তখন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা প্রচণ্ড আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু সেদিন তাদের আপত্তি ধোপে টেকেনি। লোকসভায় তৃণমূল নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যসভায় দলের নেতা ভেরেক ও ব্রায়েন দাবি করেছেন, মমতাকেই প্রধানমন্ত্রী-মুখ হিসেবে তুলে ধরতে হবে। বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হবে এই মুহূর্তে তা বলা শক্ত। তিনি মুম্বাই উড়ে গিয়ে এনডিএ শরিক ও জাতপাতের রাজনীতির ধারক-বাহক শিবসেনা নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসেছেন।

আগাম নির্বাচন সম্পর্কে কংগ্রেস নেতা পি চিদাম্বরম রীতিমতো তুলাধোনা করেছেন বিজেপি সরকারকে। নিজের একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘এক দেশ, এক নির্বাচন মোদি সরকারের একটা গিমিক মাত্র। যেমন তার এক দেশ এক কর নীতিও একটা গিমিকই ছিল। সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম মনে করেন, সংবিধান সংশোধন না করে একই সঙ্গে লোকসভা ও বিধানসভাগুলোর নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তাতে সাংবিধানিক সংকট তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিশিষ্ট এই আইনজ্ঞ।

চিদাম্বরম প্রশ্ন তুলেছেন, যদি লোকসভার সঙ্গে ৩০টি রাজ্যের বিধানসভা ভোট হয়েও যায় তাতে কি সমস্যা মিটবে? কোনো রাজ্যের সরকার এক বছর পর কোনো কারণে পড়ে গেলে, বাকি চার বছর কি ওই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন চলবে? তিনি অভিযোগ করেছেন, একসঙ্গে নির্বাচন করে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়ার মোকাবিলা করতে চাইছে বিজেপি। এক দেশ এক নির্বাচন, তারই একটা ছক মাত্র।

কংগ্রেস মুখপাত্র রণদীপ সিং সূরযেওয়ালা বলেছেন, আমাদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য হলো ভারত থেকে গেরুয়া তালেবানদের উত্খাত করা। মমতার ঘনিষ্ঠ মহল মনে করছে, ১৯৯৬ সালে কংগ্রেস সমর্থন নিয়ে মাত্র ১৪টি আসন পেয়ে এইচ ডি দেবগৌড়াকে যেভাবে প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছিল, অন্তত সেভাবেও মমতাকে প্রধানমন্ত্রী করা হোক। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ যেন গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেলের মতো ঘটনা।

এখানে উল্লেখ করা দরকার, একদা বিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহা এবং বিশিষ্ট অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহারা মোদির বিরোধিতা করতে সরাসরি মাঠে নেমে পড়েছেন। তারা সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, মোদি ও তার ঘনিষ্ঠদের অপকর্ম ফাঁস করার জন্য শিগগিরই একটি নতুন মঞ্চ তৈরি করা হবে। শত্রুঘ্ন সিনহা অভিযোগ করেন, মোদি নির্বাচনের আগে দেশবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিদেশ থেকে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কালো টাকা উদ্ধার করে এনে সব ভারতীয়র অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ টাকা করে দিয়ে দেবেন। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হতে চলল, এখনো পর্যন্ত কেউ ১৫ পয়সাও পাননি। বিক্ষুব্ধ বিজেপি নেতাদের ওই বৈঠকে ছিলেন বিশিষ্ট প্রবীণ সাংবাদিক তথা সাবেক কেন্দ্রীয় বিলগ্নিকরণ দফতরের মন্ত্রী অরুণ শৌরীও। ১৯৯৯-২০০৪ সাল পর্যন্ত অটল বিহারি বাজপেয়ির সরকারের সময় তারা স্লোগান দিয়েছিল, ইন্ডিয়া শাইনিং। কিন্তু ২০০৪ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ভরাডুবি হয়েছিল।

বিজেপি এখন আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগছে। কথা দিয়েছিল বছরে ১ কোটি লোকের চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু কার্যত চার বছরে আড়াই লাখের বেশি লোক চাকরি পায়নি। এখন তিনি বলছেন বেকার যুবকরা পকোড়া বিক্রি করেও দিনে ২০০ টাকা রোজগার করতে পারে। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও বলেছিলেন তেলেভাজা বিক্রি করতে। তাতেও অনেক বড় শিল্প হতে পারে।

সম্প্রতি মার্কিন সমীক্ষা সংস্থা অক্সফ্যাম জানিয়েছে, ভারতের ৭৩ শতাংশ সম্পদ রয়েছে মাত্র ১ শতাংশ পুঁজিপতির হাতে। ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা কার্যত তলানিতে এসে ঠেকেছে। গত চার বছরে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোয় কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা চমকে দেওয়ার মতো। সম্প্রতি শত্রুঘ্ন সিনহা বলেছেন, নরেন্দ্র মোদির রাজত্বে দেশের কৃষিজীবী সমাজকে বাস্তবে ভিক্ষাজীবী বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মুসলিম মহিলাদের ভোট পাওয়ার জন্য তিন তালাক বিল লোকসভায় পাস হলেও রাজ্যসভায় পাস হওয়া কঠিন। কারণ সেখানে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। এমনকি বিজেপির শরিক এআইডিএমকে (তামিলনাডু), টিডিপি (অন্ধপ্রদেশ) এবং আরও কয়েকটি দল কংগ্রেসের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেছে, তালাক দেওয়ার পর মুসলিম মহিলা ও তাদের ছেলেমেয়েদের দেখাশোনার দায়িত্ব কে নেবে। সে ব্যাপারে আইন করতে হবে। পাকিস্তান সীমান্ত ও কাশ্মীরে সন্ত্রাস নিত্যদিনের ঘটনা। পরিস্থিতি সামলাতে ভারতের সেনাপ্রধান বিপিম রাওয়াতকে কয়েকবার সীমান্তে যেতে হয়েছে।

উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রাজগুলোর সরকারগুলোকে এক এক করে কিনে নিয়েছে বিজেপি। নাগাল্যান্ডের আগামী মাসের নির্বাচনে সব দল ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছে, নাগা সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারা কেউ প্রার্থী দেবেন না। তাতে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রাজ্যগুলোর পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, মোদি কি নির্বাচন এগিয়ে আনতে পারবেন? আর মমতা কি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন? এ দুই প্রশ্নেই এখন গোটা দেশ তোলপাড়। বাজেট দেখে বিরোধীরা মন্তব্য করেছেন, এটা বিজেপির নির্বাচনী উপহার। এতে মানুষের কল্যাণের কোনো কথা নেই।

লেখক : ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক

সূত্র- বাংলাদেশ প্রতিদিন