• শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১১ ১৪২৫
  • ||
  • আর্কাইভ

গন্তব্য সুনামগন্জ সরকারী জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়

প্রকাশ:  ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২১:৫৬
রোয়াব উদ্দিন
প্রিন্ট

আমি ছিলাম ৬ষ্ট শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত সুনামগন্জ সরকারী জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। থাকতাম স্কুলের মুসলিম ছাত্রাবাসে। আমাদের ছোট চাচা এক সময় ছিলেন গভর্নমেন্ট স্কুলের ছাত্র। তাঁর কাছ থেকে শুনতাম সেই স্কুলের সব খ্যাতি কাহিনী। স্কুলে ভর্তির জন্য ছাত্রদের পরীক্ষা নেয়া হত। ডজন ডজন ছাত্র দুর-দুরান্ত থেকে এসে পরীক্ষা দিলেও ভর্তি দেয়া হত মুস্টিমেয় ক’জনকে। ছিল দারুন প্রতিযোগিতা। ১৯৭৫ সনের জানুয়ারী মাসে গন্ড গ্রামের এক ছেলে ছোট চাচার অনুপ্রেরনায় প্রস্তুতী নিলাম সিলেট জেলার অন্যতম শ্রেস্ট বিদ্যা-পীঠ সরকারী জুবিলী হাই স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিতে।

পরের দিন যাব স্বপ্নের শহর সুনামগন্জে আর দেখব কল্পনায় জাগ্রত গভমেন্ট স্কুল। উৎকন্টা আর উত্তেজনায় সারা রাত ঘুম হল না। আমাদের সময়ে প্রথম শ্রেণীর পাঠ্য বই “সবুজ সাথী”র একটি পাঠ ছিল, “গ্রাম, প্রাণ, শ্রাবণ, ছাত্র: শিহাব আমাদের পাঠশালার ছাত্র। সে উপরের শ্রেণীতে উঠিল। গ্রাম ছেড়ে একেবারে শহরে চলে গেল।” নিজেকে সেই শিহাব হিসেবে কল্পনা করে আরো বেশী উৎসাহ পেলাম। যাবার দিন সকালে আমার দাদী আমাকে ডিম, চিনি আর কলা খেতে দিলেন না। এটা নাকী অশুভ লক্ষন। এগুলি খেয়ে গেলে কোন পরীক্ষার ফলাফল ভাল হয় না। কলা, চিনি ছাড়া আনানুনে দুধ দিয়ে স্বাদহীন পান্তা ভাত খেয়ে সুনামগন্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম।

বিদায়ের প্রাক্ষালে আমার দাদী আমার চুলের ভেতর গুজে দিলেন একটি তাবিজ। সেটা ঢেকে দিলেন মাথার উপর একটি তকী দিয়ে। পায়ে আসমানী রঙের প্লাস্টিকের নাগরা জুতা, সাদা সুতি কাপড়ের পায়জামা আর বক্রম বিহীন নরম কলারের শার্ট (আমাদের গ্রামের বাজারের মনই দর্জি কর্তৃক স্বযত্নে তৈরী) আর মাথায় সাদা টুপি। আমাকে দেখাল মুটামুটি একজন আব্দুল হাসিম কালার বাপের মত। বড়দের পা ছুয়ে সালাম করে দোয়া চেয়ে বাড়ী থেকে বের হচ্ছি। বড় আম্মা (আমাদের বড় চাচী) পাঁচ টাকা আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘যা বাবা, মাথা ঠান্ডা রাইখ্যা বেশ করি ফরিছ। তর মার লাগি চিন্তা করিছ না।’ আমাকে জড়িয়ে ধরে বড় আম্মা প্রায় কেঁদে ফেললেন। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন তাঁর সোনার ছেলে বড় স্কুলে ভর্তি হয়ে গেছে। বাড়ী ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছে।

আমর বাবা-চাচারা ছিলেন আট ভাই। আট ভাইর এক-অন্নের বিরাট সংসার। বড় গৃহস্থী। কাজের লোক, প্রাথমিক স্কুলের হেড স্যার, মক্তবের হুজুর সহ পরিবারের লোক সংখ্যা ছিল প্রায় সত্তর। মেজ চাচা ছিলেন আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। এলাকায় “চেয়ারম্যান বাড়ী” নাম ডাকে ছিল আমাদের পরিবারের পরিচিতি। রান্না ঘরে রান্না-বান্না, খাবার ঘরে খাবার পরিবেশন, মেহমানদের আনাগোনা চলত দিনভর। সেটা ছিল এক এলাহী কান্ড।
আমার আব্বা ছিলেন লন্ডনী। আমি চাচা-চাচীদের কোলে-পিঠে বড় হয়েছি। আব্বার অবর্তমানে আদর আহ্লাদ পেতাম একটু বেশী। লেখাপড়ায় ছিলাম একটু ভাল। ছোট বেলায় আমি নাকী অনর্গল কথা বলতাম যা বড়দের শুনতে ভাল লাগত। বড়-আম্মার আটজন সন্তান থাকতেও আমি ছিলাম তাঁর যক্ষের ধন। ছোট বেলায় বড়-আম্মার সাথে কয়েক বার উনার বাপের বাড়ী নৌকায় চড়ে নাইওর গিয়েছি।

চাচার সাথে পায়ে হেটে গেলাম বড় সড়কে। তারপর উঠলাম আগেকার দিনের মুড়ির টিম খ্যাত ফরটি মডেলের একটি বাসে। চালকের সামনের কাঁচে খড়ি-মাটি দিয়ে কাঁচা হাতে লেখা “বিরতীহীন”। বাস নানা ধরনের লোকজনে গাদা-গাদী। তখন গাড়ীতে আপার ও লোয়ার দু’টি ক্লাসের আসন থাকত। চালকের বাম পাশে তিনটি ও পরের সারিতে পাঁচটি ছিল আপার ক্লাসের আসন। সেই আসন গুলি কাঠের তৈরী হলেও নারিকেলের আঁশ ও সবুজ বা নীল রঙের পাতলা প্লাস্টিকের ছানিতে দেখতে একটু ভদ্রলোকের আসন বলে মনে হত। বেশীর ভাগ সময়ই সেই আসন গুলি থাকত স্মার্ট পোশাক পরিহিত শহুরে যাত্রীদের দ্বারা পূর্ণ। আবার কোন কোন সময় থাকত রিজার্ভ। পেছনের সব আসন ছিল অনেকটা নগ্ন। এক পাশে ‘মহিলা আসন’ লিখা কাঠের একটি লম্বা সিট। পেছনের আসন আর আপার আসনের মধ্যখানে বেশ কিছু লোহার বেড়া। দাড়িয়ে থাকা যাত্রীদের বাইরে থেকে দেখলে মনে হত যেন হাজতের খয়েদী।

বাসের মহিলা আসনে দেখলাম বেশ ক’জন পুরুষ। একজন পুরুষ কাঁধা মাখা খালি পা সিটে তুলে বসে “গাড়ীতে ধুম পান নিষেধ”লেখা নোটিশের তুয়াক্বা না করে বিমলানন্দে নাসিরুদ্দিন বিড়ি ফুঁকছে। সেই বিশেষ আসনের একমাত্র মহিলা যাত্রী মধ্য বয়সী রুগ্ন গড়নের এক মা তার কচি শিশুকে খোলা মেলা বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। আমরা দূর পাল্লার যাত্রী, বেশী ভাড়া দেয়া হবে তাই মহিলা আসনেই ছোট চাচা একটি আসন পেলেন। আমি বাচ্চা মানুষ (বরাবরই পিচ্ছি সাইজের ছিলাম) তার উপর আবার ছাত্র। বিনা ভাড়ায় আমার সুযোগ হল ছোট চাচার পাশে দাঁড়িয়ে ভ্রমন করার। আমাদের সামনে দাঁড়ানো ছিলেন এক হিন্দু বিশিস্ট ভদ্রলোক। পড়নে বাদামী রঙের খদ্দেরের পান্জাবী, চুখে পরিস্কার কাঁচের কাল ফ্রেমে বাঁধা চশমা, ধবধবে সাদা ইস্ত্রী করা ধুতি যার এক অংশ কায়দা করে তার পান্জাবীর এক সাইড পকেটে রাখা। মাথা ভর্তি বিরাট টাক। এক পাশের লম্বা লম্বা কিছু চুল দিয়ে অতি যত্নে টাকের বিস্তীর্ণ এলাকা ঢাকার ব্যর্থ চেস্টা করেছেন। দেখেই বুঝা যাচ্ছিল তিনি একটু আগে স্নান করে সর্বাঙ্গে তৈল মর্দন করেছেন।

 তৈলাক্ত মুখমন্ডল চিক্ চিক্ করছিল। তাঁর সাথে ছোট চাচার পরিচয় ছিল। তিনি ইশারায় জানতে চাইলেন আমরা কোথায় যাচ্ছি। এক যাত্রীর হাতে খাঁচায় বন্দী একটা প্রমাদ সাইজের মুরগা। ভীত প্রাণীটি মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারিদিকে তাকাচ্ছে আর একটু পর পর তার পিছন থেকে অল্প অল্প মল ত্যাগ করছে। আমাদের পাশে বসা ছিলেন সাদা, পাতলা দাড়ি ওয়ালা, মাথায় গামছার পাগড়ি পরিহিত এক মুরব্বি। তিনি আয়েশ করে সুপারী চিবাচ্চিলেন আর ফাঁক করা আধা ভাঙ্গা কাল কাল দাঁত খিলাল করছিলেন। এক সময় ফিক্ করে রক্তিম লাল এক দলা পিক্ আমার পায়ের কাছে ফেলে দিলেন। বেশ কয়েক ফোটা লাল রং আমায় জুতায় লাগল। ছোট চাচা খুব রাগ করলেন। তবে বিশেষ সমস্যা হল না, প্লাস্টিটের নাগরা জুতায় পিকের রং স্থায়ী হল না।

বাসের নাম ছিল উল্কা। সেটা জানলাম গায়ে বড় বড় হরফের লেখা দেখে। ছাল নাই কুত্তার বাঘারাইয়া নাম। চালকের মাথার উপরে সামান্য ডান পাশে বাসের ভিতরের বডিতে ফিট করা একটি মেটালের সিংগা। বাজাতে হয় হ্রতপিন্ডের আকৃতির লাল রঙের রাবারের একটি বল টিপে। সিংগার নীচে লেখা “ভেঁপু বাজান”। 
প্রায় আধা ঘন্টা পেছনের এ্যগযস্ট পাইপ থেকে কাল ধুঁয়া নির্গত করে চারিদিক অন্ধকার করে, আর বিকট আওয়াজ তুলে আজরাইলের সিংগায় ফু দিতে দিতে কচ্ছপের গতিতে আমাদের দ্রুতযানটি পৌঁছল পাগলা বাজার। পাগলা বাজার মাছের জন্য প্রসিদ্ধ। সেখান থেকে অনেক সময় নিয়ে মৎসজীবি কিছু যাত্রীর মালামাল বাসের ছাদের উপর উঠানো হল। গাড়ী স্টার্ট দেয়ার সময় কিন্চিৎ সমস্যা হল। তখনকার বাসে অটো ইগ্নিশন ছিল না। দ আকৃতির একটি লোহার ডান্ডা দিয়ে হ্যান্ডলম্যান ইন্জিনের মটরকে ঘুরান দিত। আমাদের হ্যান্ডলম্যানের গায়ের জুড় ছিল প্রবল। সে হ্যান্ডল মারতে গিয়ে ভেঙ্গে দিল হ্যান্ডলটিকে। অনেক কস্টে জোগাড় করতে হল আরেকটি। আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম সুনাম গন্জের দিকে। 

আরো কিছুদুর গিয়ে আমি হলাম আরেক বিড়ম্বনার স্বীকার। ঝর্ণা ধারার মত ঝিরঝিরিয়ে বাসের ছাদ থেকে পড়লো মাছের চাঙ্গা থেকে ময়লা পানি। আমার পিঠে পড়ে সাদা শার্টে এঁকে দিল সুরমা নদীর মানচিত্র। একটু সরে গিয়ে গা বাঁচাবার চেস্টা করলাম। এর মধ্যে ভাড়া আদায় নিয়ে হ্যান্ডলম্যান আর কিছু জটিল যাত্রীর মধ্যে শুরু হল অকারণ পেচাল। এক যাত্রী যাবেন সুনামগন্জ। তাকে সিট দেয়ার কথা ছিল। সিট না মিলায় উনি বেঁকে বসলেন। ভাড়া দেবেন না। একজনের কাছে পন্চাশ টাকার নোট। দিল হ্যান্ডলম্যানের হাতে।

 সে কিট কিটিয়ে বলল, “ঢং ঢাং না, ভাঙতি দেউকা”। আরেক যাত্রী যাবেন পাগলা বাজার থেকে জয়কলস পর্যন্ত। তার মতে এই তিন মাইল দুরত্বের জন্য সরকার নির্ধারিত ন্যায্য ভাড়া দেড় টাকা। হ্যান্ডলম্যান অন্যায় ভাবে দাবি করছে দুই টাকা। বিরাট হট্টগোল। চালক অনেকটা ইমার্জেন্সি ব্রেক করে গাড়ী থামিয়ে সামনে থেকে চেচিয়ে বললেন, “হেই কিতা অইছে বে? ভাড়া না দিলে ধাক্কা মারি লামাইদে!”

ডাবর আর আহসান-মারা নামক দু’টি জায়গায় ছিল ফেরী পারাপার। বাস ভ্রমনের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ী থেকে পনর মাইল দুরে সুনামগন্জ শহরে পৌঁছলাম প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টায়।
(চলবে)

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)