• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

বিএনপির দুর্গে হানা দিতে চায় আ.লীগ

প্রকাশ:  ২২ অক্টোবর ২০১৮, ১০:২৪ | আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০১৮, ১২:৪৪
সাইফুল আলম বাদশা, কক্সবাজার
প্রিন্ট

একাদশ জাতীয় সংদস নির্বাচনকে ঘিরে কক্সবাজার জেলার সর্বত্র চলছে ভোটের আমেজ। দক্ষিণ চট্টগ্রাম একসময় বিএনপির দুর্গ হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলো। বিশেষ করে কক্সবাজার জেলাকে নিয়ে বিএনপি গর্ব করে বলতো কক্সবাজার ‘বিএনপির ঘাঁটি’। যার ফলে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজারের চারটি সংসদীয় আসনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন প্রার্থীদের জয়ের আধিক্য ছিল বেশি। বিপরীতে আওয়ামী লীগের আসন থাকত নগণ্য। এবার জাতীয় একাদশ সংসদ নির্বাচনে উন্নয়নের মেগা প্রকল্পগুলো জনগণের কাছে তুলে ধরে বিএনপির সেই দুর্গে হানা দিতে চাই আওয়ামী লীগ।

আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। নির্বাচনকে ঘিরে চলছে নানা হিসাব নিকাশ। ইতিমধ্যে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কক্সবাজারে বাস্তবায়িত হওয়া মেগা প্রকল্পগুলো তুলে ধরে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বীধীন জোট সমর্থিত নেতাকর্মীরা। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটও বসে নেই। বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের নেতারা তাকিয়ে আছেন কেন্দ্রের দিকে। কেন্দ্রের নির্দেশেই মাঠে নামার ঘোষণা তাদের। তবে নিজ নিজ জোট থেকে মনোনয়ন লাভের আশায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সংসদীয় আসনে গণসংযোগও চালিয়ে যাচ্ছেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কক্সবাজারের চারটি সংসদীয় আসনে ১৯৯১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত একটি আসন ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে আসছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চায় সব আসনেই বিজয়ী হয়ে তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট চায় বিজয় ছিনিয়ে এনে বিএনপির এ দুর্গে হানা দিতে। তবে জেলার চারটি আসনেই বিএনপির একক প্রার্থীর নাম শোনা গেলেও আওয়ামী লীগে একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন। একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকায় গ্রুপিং ও অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। নির্বাচনী মাঠে ক্ষমতাসীন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি থাকলেও, অনেকটাই নীরব বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপি আদৌ নির্বাচনে যাবে কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। এজন্য কেন্দ্রের দিকেই তাকিয়ে আছেন তারা।

কক্সবাজারের ৮টি উপজেলা নিয়ে গঠিত ৪টি আসনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের দুই ডজন নেতা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজেদের নাম ঘোষণা করে দলীয় মনোনয়ন আশায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করলেও বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থীর সংখ্যা কিছুটা কম। এ কারণে ক্ষমতাসীন দলটিকে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে সমস্যায় পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জোট কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সরকার কক্সবাজারের উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যদি ৪টি আসনে যোগ্য প্রার্থী মনোনয়নে ব্যর্থ হলে ভরাডুবি হতে পারে ক্ষমতাসীন এই দলের। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চারটি আসনেই বিজয় ছিনিয়ে এনে নিজেদের ‘ঘাটিঁ’ দখলে নিতে পারে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট।

কক্সবাজার-১

কক্সবাজার জেলার মধ্যে চকরিয়া-পেকুয়াকে বিএনপির দুর্গ বলে সবাই চেনে। বিশেষ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ এ জেলার সন্তান হওয়ায় কক্সবাজারের এই আসনটিকে বলা হয় ‘বিএনপির ঘাঁটি’। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩ সালের পর থেকে এই আসনটিতে জয়লাভ করতে পারেনি আওয়ামী লীগ।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও কৌশলগত কারণে আসনটি জোটের শরীক দল জাতীয় পার্টিকে (এরশাদ) ছেড়ে দিতে হয়। কিন্তু এবার ৪৫ বছরের ইতিহাস পাল্টাতে চায় টানা দুইবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা দলটি। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক কোন্দলে জড়িয়ে তিন মেরুতে বিভক্ত হওয়ায় এই আসন থেকে জাতীয় সংসদে আদৌ যেতে পারবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে খোদ দলের মধ্যে। এখানে বিএনপি বীরদর্পে রাজনীতি করে আসছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার তৎকালীন ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) সালাহউদ্দিন আহমেদ দলের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে। এপিএস থাকাকালীন থেকেই নিজের ইউনিয়ন পেকুয়াকে নিয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হননি সালাহউদ্দিন। পর্যায়ক্রমে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া ছাড়াও বারবার এমপি নির্বাচিত এবং সর্বশেষ প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত করা হয় তাঁকে। সেই সুযোগে সালাহউদ্দিন নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছেন পেকুয়াকে। বৃহত্তর চকরিয়ার ২৫টি ইউনিয়ন থেকে সাতটি ইউনিয়নকে আলাদা করে প্রতিষ্ঠা করেন পেকুয়া উপজেলা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উদ্বোধনের মাধ্যমে মানচিত্রে নতুন উপজেলা হিসেবে পেকুয়া ঠাঁই করে নেয়। এরপর থেকে উন্নয়নের মহাসড়কে উন্নীত হতে থাকে পেকুয়া। সর্বশেষ যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর আরো বেশি করে সাজিয়ে নেন একসময়ের অজপাড়া উপকূলীয় উপজেলা পেকুয়াকে। পাশাপাশি চকরিয়াতেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মন জয় করে নেন আমজনতার। এতে ‘বিএনপির দুর্গ’ হয়ে উঠে চকরিয়া ও পেকুয়া। তবে তিনি এখন দেশে নেই। অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশের দায়ে শিলংয়ে অবস্থান করছেন তিনি। বিএনপির দাবি, এই আসন থেকে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো বিএনপি থেকে লড়বেন তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ।

কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনটিকে আওয়ামী লীগ ঘরে তুলতে পারেনি। সর্বশেষ ১৯৭৩ এর নির্বাচনে ডাঃ শামসুদ্দিন নৌকা প্রতীক নিয়ে এ আসনে জিতেছিলেন। এরপর আর জয়লাভ করতে পারেনি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। তবে এবার সরকার কক্সবাজারে যে পরিমাণ উন্নয়ন করেছে, এই উন্নয়ন জনগণের কাছে তুলে ধরে শক্তিশালী প্রার্থী দিতে পারলে জয় আসবে আওয়ামী লীগের ঘরে।

কক্সবাজার-১ আসনটি চকরিয়া-পেকুয়া দুই উপজেলার ২৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। দুই উপজেলার বর্তমান ভোটার সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। বিএনপির শক্ত ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত এ আসন থেকে ১৯৯১ সালে জামায়াত প্রার্থী এনামুল হক মঞ্জু ও ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) ও বর্তমান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ পর পর দু’বার এমপি নির্বাচিত হন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে সালাহউদ্দিন আহমদ কারাবন্দি থাকায় স্ত্রী অ্যাডভোকেট হাসিনা আহমেদ বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে ধানের শীর্ষ প্রতীকে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সালাউদ্দিন আহমদ সিআইপিকে ৩৫ হাজার ৪০১ ভোটে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী ও কক্সবাজার জেলা জাপার সভাপতি হাজি মোহাম্মদ ইলিয়াছ।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলমকে এই আসন থেকে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন দিয়েছিল। কিন্তু জাতীয় পার্টির সঙ্গে মহাজোটের আসন ভাগাভাগি করার ফলে ভোট গ্রহণের দু’দিন আগে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন জাফর আলম।

চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আলম ছাড়াও বর্তমানে চকরিয়া-পেকুয়া আসনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মাঠ রয়েছেন ৪ প্রভাবশালী নেতা। তারা হলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ সিআইপি, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও চকরিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল করিম, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম সজিব। তাদের মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদ সিআইপি ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৬ সালে তিনবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। কিন্তু একবারও নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেননি তিনি।

দুই বড় দলের পাশাপাশি মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন জাতীয় পার্টির (এরশাদ) দলীয় বর্তমান এমপি হাজি মোহাম্মদ ইলিয়াছ। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটগত নির্বাচন হলে এবারো তিনি আসনটি পাবেন বলে ধারণা জাপা নেতাকর্মীদের।

অন্যদিকে মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি এএইচ সালাহউদ্দিন মাহমুদও নির্বাচন করবেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

কক্সবাজার-২

বর্তমান সরকার কক্সবাজারের উন্নয়নে তিন লাখ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এরমধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছে মহেশখালী-কুতুবদিয়াতে। সরকারের লাখো কোটি টাকার উন্নয়নযজ্ঞকে ভরসা করে আবারও মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনটি দখলে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। নৌকার মনোনয়ন পেতে এই আসনে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো প্রচার করে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগের ৫ জন হেভিওয়েট প্রার্থী।

এই আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন, বর্তমান সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিক, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. সিরাজুল মোস্তফা, বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আনসারুল করিম, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ওসমান গণি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপ কমিটির সদস্য ইসমত আরা ইসমু।

বিএনপি থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদকে (বর্তমানে ভারতে) ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার দাবি তুলছে। এছাড়াও বিএনপি থেকে আলোচনায় আছেন দুইবাবের সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য (প্রাক্তন) আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ, জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী।

বিএনপি জোট থেকে ২০০৮ সালে আসনটি জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই নির্বাচনে জোট থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ। বিপুল ভোটে তিনি জয়লাভ করেন। এবারও গুঞ্জন উঠছে আগামী নির্বাচনে তিনিই বিএনপির নেতৃত্বধীন ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হচ্ছেন।

অন্যদিকে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে এই আসনে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহ। দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ মুহিবুল্লাহকে লাঙল প্রতীক দিয়েছেন এবং নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন বলে জানিয়েছেন অনেক জাপার নেতাকর্মীরা।

উল্লেখ্য, মহেশখালী উপজেলার একটি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নে মোটার ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪ হাজার ৯৪৩ জন। কুতুবদিয়া উপজেলায় ৬টি ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ৮৫ হাজার ৫৭২ জন। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৯০ হাজার ৫১৫ জন।

কক্সবাজার-৩

কক্সবাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকা হচ্ছে কক্সবাজার সদর-রামু আসনটি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কক্সবাজারের চিত্র পাল্টিয়ে দিয়েছে বলে লোকে-মূখে শোনা যায়। কক্সবাজার সদর ও রামু এ দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-৩ আসনটি বরাবরই পরিচিত একটি মর্যাদার আসন হিসেবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলেরই প্রভাব রয়েছে এই আসনে। একসময় জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব থাকলেও এখন তেমন নেই বলা চলে।

তবে সার্বিক হিসাবে কক্সবাজার-৩ আসনে বিএনপির সমর্থক বেশি। বিএনপির নেতৃত্বধীন ২০ দলীয় জোট ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ আর কোনো নির্বাচনে জয়ের মুখ দেখেনি এখানে। তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী সাইমুম সরওয়ার কমল।

এ আসনে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির সুবিধার জায়গাটি হচ্ছে দলীয় একক প্রার্থী। তবে জামায়াত নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে বিএনপি। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে মহাজোটের জোয়ার বয়ে গেলেও বিপুল ভোটে বিজয়ী হন কেন্দ্রীয় বিএনপির মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক লুৎফুর রহমান কাজল। বিএনপি থেকে তিনিই একমাত্র মনোনয়ন প্রত্যাশী। বর্তমান জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল এবং কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জি এম রহিমুল্লাহ ২০ দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন চাইতে পারে বলে একটি সুত্র নিশ্চিত করেছেন

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন অনেক নেতা। এমনকি এক পরিবার থেকেই রয়েছে একাধিক প্রার্থী। এঁরা হচ্ছেন বর্তমান সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, তাঁর জ্যেষ্ঠ ভাই ও রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোহেল সরওয়ার কাজল এবং কনিষ্ঠ বোন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনিন সরওয়ার কাবেরী। এঁদের পাশাপাশি মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কানিজ ফাতেমা আহমদ ও জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইশতিয়াক আহমদ জয়।

এ আসনে গেলবার জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী কানিজ ফাতেমা আহমদ দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু নানা জটিলতায় তিনি আর এমপি হতে পারেননি। অন্যদিকে ব্যতিক্রমী ভাবে বর্তমান সরকারের বাস্তবায়িত কক্সবাজারে নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইশতিয়াক আহমদ জয়। তিনিও এ আসনে তারুণ্যের আলো ছড়িয়ে দিতে চান। তিনিও এলাকায় প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে। এছাড়া কক্সবাজার শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সংকৃতিকর্মী ও সাংবাদিক নুজিবুল ইসলামও মনোনয় পেতে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।

বিএনপি থেকে একমাত্র মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির মৎসজীবী বিষয়ক সম্পাদক লুৎফুর রহমান কাজল। এছাড়াও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (বরখাস্ত) ও বর্তমান জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল জি এম রহিমুল্লাহ মনোনয়ন চাইতে পারেন।

কক্সবাজারের এ আসন থেকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান মফিজ। কিন্তু দলীয় প্রধান এরশাদের নির্দেশে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। তিনি এবারও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন পেতে পারেন।

এ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৬২ হাজার ৬৩৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৮৬ হাজার ৯৯ জন ও মহিলা ভোটার এক লাখ ৭৬ হাজার ৫৩৭ জন। কক্সবাজার সদর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নে ভোটার রয়েছে দুই লাখ ২২ হাজার ৮৩৫ জন। রামু উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ভোটার সংখ্যা এক লাখ ৩৯ হাজার ৮১০।

কক্সবাজার ৪

কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা উখিয়া ও টেকনাফ নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-৪ সংসদীয় আসন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশের সীমান্তবর্তী এ দুই উপজেলার পরিচিতি এখন বিশ্বব্যাপী। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান সাংসদ আবদুর রহমান বদি মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে বলে সারাদেশে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত হন। তবে তিনি যে কোন অনুষ্ঠান বা সভায় গেলে তিনি যে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকেন, তাহলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দাবি করেন ‘কেউ যদি আমি মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছি প্রমাণ দিতে পারেন তাহলে এমপি’র পদ সরে দাঁড়াবো’। তবে কেউ এমপি বদি মাদক ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা প্রমাণ করতে না পারলেও, তার ভাইয়েরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী।

বড় দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়াও জাতীয় পার্টির থেকে মনোনয়ন পেতে জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য মাস্টার এম.এ মনজুর দলীয় হাইকমান্ডের সাথে লবিং করছেন। মনোনয়ন এবং প্রার্থী হিসেবে দৌড়ঝাঁপে রয়েছেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন। তবে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। তাদের শুধু একজনের নামই শোনা যায়।

কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) সীমান্তবর্তী আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের জন্য সাবেক দলীয় এমপি ও টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী, উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী এবং এমপি বদির শ্যালক ও উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরীর নামও আলোচনায় রয়েছে। আসনটিতে এই প্রথমবারের মতো একজন নারী নেত্রীও দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি হচ্ছেন তাঁতীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাধনা দাশ গুপ্তা।

আসনটিতে বিএনপি একক প্রার্থী হচ্ছেন সাবেক হুইপ ও দল থেকে চারবারের নির্বাচিত এমপি শাহজাহান চৌধুরী। তিনি বর্তমানে কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি।

যদিও ইয়াবা চোরাচালানের সাথে জড়িত রয়েছে বলে সারাদেশে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত বদি। অনেকেই তাকে বর্তমান সরকারের ভাবমুর্তি নষ্টের জন্য দায়ী করেন। কিন্তু এই আসনে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর সাথে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনা একমাত্র বদির পক্ষেই সম্ভব। কারণ ব্যক্তি কর্মকাণ্ডের জন্য বিতর্ক থাকলেও উখিয়া-টেকনাফের প্রতিটি মানুষের অন্তরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন আব্দুর রহমান বদি। একারণে অনেকেই দাবি তুলছেন পুণরায় ওই আসনে দলকে বিজয়ী করতে আ.লীগ থেকে আব্দুর রহমান বদিকে মনোয়ন দিতে।

কক্সবাজার-৪ আসনের মোট ভোটারসংখ্যা দুই লাখ ৬২ হাজার ৪৭৯ জন। টেকনাফ উপজেলায় ভোটারসংখ্যা এক লাখ ৪৪ হাজার ১৫৭ জন ও উখিয়া উপজেলায় এক লাখ ১৮ হাজার ৩২২ জন।

/পি.এস

কক্সবাজার,আ.লীগ,বিএনপি
apps