• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

আ.লীগ বিভক্ত, বিএনপি নীরব

প্রকাশ:  ১৫ অক্টোবর ২০১৮, ১২:০১
তপু আহম্মেদ, টাঙ্গাইল
প্রিন্ট

জেলায় ১২টি উপজেলা নিয়ে আটটি সংসদীয় আসন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে টাঙ্গাইল জেলার রাজনৈতিক দলগুলো এখন বেশ সক্রিয়। বিশেষ করে সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা দলের সিনিয়র নেতাদের আস্থা অর্জন করতে এবং অন্য নেতাকর্মীদের সমর্থন পেতে মাঠে নেমেছেন। কেন্দ্রেও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন অনেকেই। বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে প্রায় প্রতিটি আসনে একাধিক নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। এ লক্ষ্য নিয়ে তারা কাজও শুরু করেছেন। শুভেচ্ছা বিনিময় থেকে শুরু করে মতবিনিময়, সভা-সমাবেশ করছেন, দলের প্রতিষ্ঠাতা ও দলীয় প্রধানের ছবির সঙ্গে নিজের ছবি সংবলিত পোস্টার-ব্যানারও টানিয়েছেন কেউ কেউ।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অনেককেই মাঠে দেখা যাচ্ছে। বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যসহ বেশ কিছু নতুন মুখ এরই মধ্যে নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ শুরু করে দিয়েছেন। যদি জোটগত নির্বাচন হয় সে ক্ষেত্রেও টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়া দুই জোটের অন্য কোনো দলের প্রার্থীরই মনোনয়ন পাওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। বর্তমান সংসদে টাঙ্গাইলের আটটি আসনের এমপিই আওয়ামী লীগের।

টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী)

টাঙ্গাইল-১ আসনটিতে বিগত ১০টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ছয়বার, বিএনপি প্রার্থী দুবার, জাসদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার করে বিজয়ী হন। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ বলছে, দলটি আসন ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির লক্ষ্য আসনটি পুনরুদ্ধার করা।

উলে­খ্য, ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৩টি আসন পেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। কিন্তু এ আসনটি তাদের হাতছাড়া হয়। আওয়ামী লীগের প্রার্থী মহেন্দ্র লাল বর্মণকে প্রায় পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) মো. আবদুস সাত্তার।

জাতীয় সংসদের ১৩০ নম্বর নির্বাচনী এলাকা মধুপুর ও ধনবাড়ী ২০০১ সাল থেকে দখলে রেখেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন তিনিই পাবেন এটা সবার মুখে মুখে। এখানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত অনেক মজবুত। নেতাদের মধ্যে গোপনে বিরোধ থাকলেও তা প্রকাশ্যে দেখা যায় না । আব্দুর রাজ্জাকের নাম জোরেশোরে শোনা গেলেও এ কথাও শোনা যাচ্ছে যে তাঁকে ঢাকা অথবা জামালপুরের কোনো একটি আসন দিয়ে এখানে শামসুন নাহার চাঁপাকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে।

অন্যদিকে বিগত দুটি সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন আব্দুর রাজ্জাকের কাছে পরাজিত হন। দলীয় কোন্দলের কারণে তিনি পরাজিত হন বলে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা দাবি করে। তবে এবার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে বিএনপির প্রার্থী আসনটি পুনরুদ্ধার করতে পারবেন বলে তাদের বিশ্বাস।

বিএনপির শাসনামলে ফকির মাহবুব আনাম স্বপন নির্বাচনী এলাকায় অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। এবারও নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি এলাকায় কাজ করে যাচ্ছেন, প্রচার চালাচ্ছেন। তবে তিনি ছাড়াও বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন এ আসনে।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বর্তমান সংসদ সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক ছাড়াও দলের একাধিক নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন আব্দুর রাজ্জাক। তিনি দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য। মধুপুর-ধনবাড়ীতে তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামসুন নাহার চাঁপাও এ আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী।

কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মিজানুর রহমান দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশায় এক বছর আগে থেকেই এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন। এ ছাড়া মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সরোয়ার আলম খান আবু ও স্কয়ার হাসপাতালের পরিচালক ডা. সানোয়ার হোসেনের নামও আলোচনায় আছে। তাঁরা প্রত্যেকেই এলাকায় পোস্টার-ব্যানার টানিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। সাবেক ছাত্রনেতা রেজাউল করিমের নামও শোনা যাচ্ছে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে।

একসময় এ আসনটি বিএনপির দখলে থাকলেও স্থানীয় হেভিওয়েট প্রার্থীর অভাবে তা আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফকির মাহবুব আনাম স্বপনের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে জানা যায়। তিনি এর আগেও একাধিকবার এই আসনে দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর ভালো যোগাযোগ রয়েছে। ফকির মাহবুব বলেন, এলাকায় কাজ করতে গিয়ে অনেক ঝড়ঝাপটা সহ্য করতে হয়েছে। মানুষের জন্য সুস্থ রাজনীতির চর্চা করি। ম্যাডাম আমাকে জানেন। আমি বিশ্বাস করি, এবারও দল আমাকে মনোনয়ন দেবে এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আমি বিজয়ী হব। ফকির মাহবুব আনাম স্বপন ছাড়াও আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী, মধুপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তিনবারের সাবেক পৌর মেয়র শহিদুল ইসলাম সরকার শহিদ ও কানাডা প্রবাসী প্রকৌশলী ভুঁইয়া মাহবুব লতিফ। তাঁরা প্রত্যেকেই নানাভাবে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। মোহাম্মদ আলী ছাত্র রাজনীতি থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে গেছেন। মোহাম্মদ আলী মনোনয়ন পেলে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীর সঙ্গে তুমুল প্রতিযোগিতা গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি। মোহাম্মদ আলী বলেন, দলের প্রতি অনেক ত্যাগ রয়েছে। একাধিকবার জেল খেটেছি। মধুপুর শহরের বাসিন্দা হিসেবে মধুপুরের ভোটব্যাংকের ভোটগুলো আমার ঝুলিতে আসবে বলে আমি মনে করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা, ডাকসুর সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার আনোয়ারুল হকও এবার দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করার জন্য গণসংযোগ করছেন। তিনি ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য হওয়ার পর এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। এরপর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতাপূর্ণ সর্ম্পক রয়েছে। দীর্ঘদিন পর আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই। এলাকায় তাঁর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক ছাত্রনেতা আবু সাঈদ মন্টু দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন। এর আগেও তিনি এ আসন থেকে দলীয় মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। সদ্য জাতীয় পার্টিতে যোগদানকারী সরকার শহিদের বড় ভাই চলচ্চিত্রকার নূরুল ইসলাম রাজ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধুপুর উপজেলা শাখার সহসভাপতি মাওলানা জহিরুল ইসলাম দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর ও ভ‚ঞাপুর)

গোপালপুর ও ভ‚ঞাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-২ আসন। জাতীয় সংসদের আসন নম্বর ১৩১ আসনে গোপালপুর উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং ভ‚ঞাপুর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাতেম আলী তালুকদার ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মো. হাতেম আলী খানকে পরাজিত করেন। ১৯৭৯ সালে বিএনপি প্রার্থী আফাজ উদ্দিন ফকির জয়লাভ করেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের হাতেম আলী তালুকদার। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শামছুল হক তালুকদার ছানু আওয়ামী লীগের হাতেম আলী তালুকদারকে পরাজিত করেন। ১৯৮৮ সালে জাসদের (সিরাজ) আ. মতিন হিরু নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টির শামছুল হক তালুকদার ছানু। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুস সালাম পিন্টু আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাতেম আলী তালুকদারকে পরাজিত করেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির আব্দুস সালাম পিন্টু পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই বছরই সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আব্দুস সালাম পিন্টু আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার আসাদুজ্জামানের কাছে হেরে যান। ২০০১ সালে বিএনপি আসনটি পুনরুদ্ধার করে। আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার আসাদুজ্জামানকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন পিন্টু। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের খন্দকার আসাদুজ্জামান। আব্দুস সালাম পিন্টু ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় কারাগারে থাকায় তাঁর ছোট ভাই তৎকালীন ছাত্রদল নেতা সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বিএনপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেন এবং হেরে যান। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার আসাদুজ্জামান তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) প্রার্থী আজিজ বাঙ্গাল।

বর্তমান সংসদ সদস্য খন্দকার আসাদুজ্জামান আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে এ আসনে তিনবার নির্বাচিত হন। তাঁর বয়স হয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ। তাঁর পক্ষে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। এমন হলে আওয়ামী লীগকে নতুন প্রার্থী খুঁজতে হবে। আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আরো যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁদের মধ্যে আছেন খন্দকার মশিউজ্জামান রোমেল, মো. ইউনুছ ইসলাম তালুকদার ঠাণ্ডু, খন্দকার আশরাফউজ্জামান স্মৃতি ও তানভীর হাসান।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় কারাবন্দি আব্দুস সালাম পিন্টু এ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি চারদলীয় জোট সরকারে উপমন্ত্রীও ছিলেন। এ আসনে তিনিই বিএনপির ভরসা। বিকল্প সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁদের অন্যতম হচ্ছেন পিন্টুর ছোট ভাই শামসুল আলম তোফা ও যুবদল নেতা সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য খন্দকার আসাদুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধে বলিষ্ঠ ভ‚মিকা রাখেন। বয়স ও অসুস্থতার কারণে এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন চাইবেন না বলে দলীয় একাধিক সূত্র মনে করছে। মনোনয়ন চাইতে পারেন তাঁর ছেলে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক পরিচালক ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মশিউজ্জামান রোমেল। তিনি এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে নেতাকর্মীদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। তিনি বাবার উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে মনোনয়ন চাইব।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের আরো কয়েকজন নেতা নিজ নিজ আঙ্গিকে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন গোপালপুর উপজেলা পরিষদের দুইবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মো. ইউনুছ ইসলাম তালুকদার ঠাণ্ডু। টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আশরাফউজ্জামান স্মৃতি এবং দলের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক তানভীর হাসান মনিরও দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী। ভ‚ঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও দুইবারের পৌর মেয়র মাসুদুল হক মাসুদ দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন।

এদিকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে খন্দকার মশিউজ্জামান রোমেলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে মনোনয়ন দৌড়ে তিনি অনেকটাই এগিয়ে গেছেন বলে অনেকে মনে করেন।

টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল)

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই নির্বাচনী মাঠে সম্ভাব্য প্রার্থীরা তৎপরতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ আসনটি টাঙ্গাইলসহ সারাদেশে বহুল আলোচিত। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমানুর রহমান খান রানা আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিনাপ্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হন। এর আগে ২০১২ সালের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এ আসন থেকে তিনি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের আগস্টে পুলিশী তদন্তে আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় আমানুর রহমান খান রানা এবং তার ভাইদের জড়িত থাকার বিষয়টি বের হয়ে আসে। তার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি আদালতে আত্মসমর্পন করেন। তার পর থেকেই তিনি কারাগারে আছেন। আর এই সুবাদে আসনটি নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য মাঠে রানা এমপির বিরোধীরা অর্ধডজন প্রার্থী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর রানা এমপির জামিন না হওয়ায় তার কর্মী-সমর্থকরা হতাশ একই সাথে রানা বিরোধীরা আরো চাঙ্গা হয়ে উঠেছে এবং এলাকা ভোটের দখল নিতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এ আসনে কে হচ্ছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ নিয়ে আলোচনা চলছে।

এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থী সমান চারবার এবং জাসদ (সিরাজ) প্রার্থী ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী একবার করে বিজয়ী হন। এখানে আওয়ামী লীগে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন। এদিকে বিএনপি আছে ঝামেলামুক্ত। এ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ সদস্য হন ডা. মতিউর রহমান। তিনি মারা যাওয়ায় এ আসনের উপনির্বাচনে মনোনয়ন চান টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আমানুর রহমান খান রানা। কিন্তু দল মনোনয়ন দেয় উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা শহিদুল ইসলাম লেবুকে। রানা বিদ্রোহী প্রার্থী হন। এ সময় দল তাঁকে বহিষ্কার করলেও নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হওয়ার পর দল তাঁকে গ্রহণ করে। পরবর্তী নির্বাচন অর্থাৎ ২০১৪ সালে আমানুর রহমান খান রানাকে মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য হন। আমানুর রহমান খান রানার কারণে এ আসনটি আলোচিত। দলীয় নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি রানাকে দল থেকে আবার মনোনয়ন দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে ঘাটাইল ও টাঙ্গাইলে আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবু এর আগে মনোনয়ন পেয়ে রানার কাছে ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন।

জানা গেছে, আমানুর রহমান খান রানা কারাগারে থাকলেও তিনি মনোনয়ন চাইবেন। ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবু এবারও মনোনয়ন চাইবেন। দলের মনোনয়ন পেতে একাধিক নেতা সরব হয়ে উঠেছেন। মনোনয়নের প্রত্যাশায় আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য শিল্পপতি সৈয়দ আবু ইউসুফ আব্দুল্লাহ তুহিন। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে তিনি রয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান। সাবেক সংসদ সদস্য ডা. মতিউর রহমানের ছেলে তানভীর রহমান। তিনি বাবার আসন ফিরে পেতে এবার নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠ গোছাচ্ছেন। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী।

নাম শোনা যাচ্ছে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট এস আকবার খান, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শহিদুল ইসলাম।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে এক নম্বরে রয়েছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী এই আসনের চারবারের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান খান আজাদ। তারপরে জোরেশোরে নাম শোনা যাচ্ছে জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ শিল্পপতি মাইনুল ইসলামের নাম।

জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে অ্যাডভোকেট সুজাত আলী ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) প্রার্থী হিসেবে আতোয়ার রহমান খান নির্বাচন করতে পারেন বলে এলাকায় শোনা যাচ্ছে।

টাঙ্গাইল-৪ আসন

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে প্রার্থীরা ততই আটঘাট বেধে মাঠে নেমে গণসংযোগ ও প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা তাদের কর্মী সমর্থকদের নিয়ে বিভিন্নজনের কাছে উন্নয়নমূলক প্রতিশ্র“তি দিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। একই সাথে এই সব প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রে জোরালোভাবে লবিং এ ব্যস্ত রয়েছে। হেভিওয়েট প্রার্থী কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমও এ আসনে প্রার্থী হতে পারেন। এজন্য এলাকায় নিয়মিত সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছেন। তবে তিনি একক অথবা জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিবেন তা স্পষ্ট নয়।

এ আসনের চির প্রতিদ্বন্দ্বী স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক ও সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান সিরাজ অসুস্থতা এবং মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের সংগঠক সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কার হওয়ার পর এ আসনটি দখল নিতে আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপিসহ চারজন ও বিএনপির ছয় প্রার্থী মনোনয়ন যুদ্ধে মাঠে নেমেছে। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারী ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠান্ডুর সাথে প্রকাশ্যে বিরোধ রয়েছে।

আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর এমপি পদ থেকে পদত্যাগের পর এ আসনে ২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারি উপ-নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারী। এই উপ-নির্বাচনে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী প্রার্থী হয়ে ব্যাপক আলোচনায় উঠে আসে। কিন্তু আইনি জটিলতায় শেষ পর্যন্ত তার প্রার্থীতা বাতিল হয়ে যাওয়ায় তিনি আর নির্বাচন করতে পারেননি। আর এ উপ-নির্বাচনের পর থেকেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীতা নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। বর্তমান সংসদ সদস্য হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারীও ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও গণসংযোগের মাধ্যমে নিজের অবস্থান সংহত করেছে।

এদিকে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার লিয়াকত আলী ও এফবিসিসিআইর পরিচালক আবু নাসের।

এদিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা মামলার ভয়ে দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়েছে। দলটিতে মনোনয়ন নিয়ে বিভক্তি আছে। দলটিতে ভোটের প্রস্তুতি চলছে কৌশলে। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসাবে গণসংযোগ করছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি লুৎফর রহমান মতিন, শাজাহান সিরাজের স্ত্রী ও কেন্দ্রীয় তাঁতীবিষয়ক সহসম্পাদক রাবেয়া সিরাজ, কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা দলের সহ-সভাপতি ও ঢাকা মহানগর মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হালিম মিঞা, মালয়েশিয়ার বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার. বাদলুর রহমান বাদল, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোর ছাত্রনেতা বেনজীর আহমেদ টিটো ও এলেঙ্গা পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়ার শাফী খান।

টাঙ্গাইল-৫ (টাঙ্গাইল সদর)

টাঙ্গাইল-৫ আসনের একসময়ের সংসদ সদস্য প্রবীণ রাজনীতিক আবদুল মান্নান ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর। তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীও ছিলেন। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর স্নেহভাজন আব্দুর রহমান বিএনপির টিকিটে এ আসনের সংসদ সদস্য হয়ে ধর্মমন্ত্রী হয়েছিলেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান এই আসনে মোট চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে দুইবার এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দুইবার নির্বাচিত হন। জাতীয় পার্টির সময় মন্ত্রীও ছিলেন।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির মহাজোট হয় তাহলে কে এ আসনে প্রার্থী করা হতে পারে এটা এখনো পরিস্কার না। এছাড়া জাতীয় পার্টি একক নির্বাচন করলে দল কাকে প্রার্থী হিসাবে দেবেন সেটিও পরিস্কার না তবে পীরজাদা শফিউল্লাহ আল মুনির এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক সংসদ আবুল কাশেম এর নাম শোনা যাচ্ছে। বিএনপিতে আসতে পারেন তরুণ নেতা যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

জাতীয় পার্টির (জেপি) নির্বাহী সম্পাদক সাদেক সিদ্দিকী একাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন আশা করছেন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন বলে সৈয়দ খালেদ মোস্তফা দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী এলাকায় মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন।

টাঙ্গাইল-৬ আসন

নাগরপুর ও দেলদুয়ার উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-৬ আসন। এ আসনটিকে একসময় বিএনপির ঘাঁটি মনে করা হতো। বিএনপি প্রার্থী পাঁচবার এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন দুইবার। জাতীয় পার্টির প্রার্থী দুইবার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার নির্বাচিত হন।

এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের খন্দকার আব্দুল বাতেন। নবম সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে দলীয় প্রার্থী আহসানুল ইসলাম টিটুকে পরাজিত করেন। পরে আবার তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং দশম সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য হন।

জাতীয় সংসদের ১৩৫ নম্বর নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র কোন্দল রয়েছে। প্রধান তিনটি খণ্ডে বিভক্ত নেতাকর্মীরা। একদল খন্দকার আব্দুল বাতেন, আরেক দল আহসানুল ইসলাম টিটু এবং অন্যদল তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের পক্ষে। এ তিনজনের মধ্যেই মূলত মনোনয়ন লড়াই হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী তথ্য প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট তারানা হালিম। এলাকায় প্রতিনিয়তই বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসুচিতে অংশগ্রহণ করে নৌকার পক্ষে ভোট প্রার্থনা করছেন। অত্যন্ত ক্লিন ইমেজের অধিকারী প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বিভিন্ন সভা সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন। আর নেতাকর্মী সমর্থকদের পরামর্শ দিচ্ছেন যেই নৌকা নিয়ে আসুক তার পক্ষে কাজ করার।

নাগরপুর উপজেলায় জন্মগ্রহণকারী এ নেত্রী টিভি পর্দায় সফল অভিনেত্রী, আইন পেশায়ও সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বর্তমান সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তিনি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বড়বড় মহিলা সমাবেশ করে ভোটের মাঠে ব্যাপক আলোচনায় উঠে এসেছেন। বর্তমানে তিনি তথ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন।

এ আসনে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি ভালো অবস্থায় রয়েছে। দলের মধ্যে কোন্দল নেই। একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও তাঁরা একে অন্যকে দোষারোপ করছেন না। তাঁরা নিজেদের মতো করে গণসংযোগ করছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে অনুদান করছেন। এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির পল্লী উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী গৌতম চক্রবর্তী। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন তিনি।

এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৮৯ হাজার ৪১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৯৫ হাজার ২৪জন এবং নারী ভোটার এক লাখ ৯৪ হাজার ৩৯০জন।

টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর)

আওয়ামী লীগ নেতা ফজলুর রহমান খান ফারুকের মাধ্যমে টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনটি আওয়ামী লীগের হয়। বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ পেয়ে তিনি ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। তিনি ভোট পান ৪২ হাজার ১৯টি। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) এম এ বাসেত পান দুই হাজার ৬৩৯ ভোট। তারপর ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ফজলুর রহমান খান ফারুক বিজয়ী হন। এ নির্বাচনেও তিনি ৪২ হাজারের ওপরে ভোট পান। মির্জাপুরে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠিত করতে ফজলুর রহমান খান ফারুকের ব্যাপক ভ‚মিকা রয়েছে। তিনি মির্জাপুরে আওয়ামী লীগের ঘর গুছিয়ে দিয়ে চলে আসেন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। দীর্ঘদিন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন শেষে বর্তমানে তিনি সভাপতি হিসেবে দলের হাল ধরেছেন। ফারুক মির্জাপুর থেকে চলে আসার পর সে জায়গায় আসেন আওয়ামী লীগ নেতা একাব্বর হোসেন। তিনি এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। বর্তমান সংসদ সদস্যও তিনি।

তবে ভোটের পরিসংখ্যান বলছে, জাতীয় সংসদের ১৩৬ নম্বর আসনটি একটানা দীর্ঘদিন কেউ ধরে রাখতে পারেনি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ভাগাভাগি করে নিয়েছে। একবার জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও একবার স্বতন্ত্র প্রার্থীও বিজয়ী হন। আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, ফজলুর রহমান খান ফারুকের ছেলে খান আহমেদ শুভ। দীর্ঘদিন পর তিনি মির্জাপুরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নিতে গেলে তাঁর বাবার (ফজলুর রহমান খান ফারুক) কর্মী-সমর্থক, অনুসারী ও তৃণমূলের নেতৃবৃন্দ তাঁকে বুকে টেনে নেন। তাঁকে পেয়ে মির্জাপুর আওয়ামী লীগে প্রার্থী পরিবর্তনের সুর ওঠে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনুরোধে খান আহমেদ শুভ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশায় তিনি এলাকার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছেন ।

অন্যদিকে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সংসদের বাইরে থাকা দলটির স্থানীয় পর্যায়ে কোন্দল রয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে অভিযোগ উঠেছে, একজন প্রার্থী একাধিকবার আওয়ামী লীগের কাছে পরাজিত হওয়ায় মির্জাপুরে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। পর পর পরাজিত হওয়ায় আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর গ্রহণযোগ্যতাও তৃণমূলে কমে গেছে। তাঁর বিরোধীরা মনে করছেন, প্রার্থী পরিবর্তন হলে বিএনপি হারানো আসনটি আবার ফিরে পাবে। অবশ্য আবুল কালাম আজাদের সমর্থকদের মুখে উল্টো কথা। তাঁরা মনে করেন, এ আসন পুনরুদ্ধার করতে আবুল কালামই যোগ্য প্রার্থী। দলের কোন্দল ভুলে এক হয়ে কাজ করলে তিনি অবশ্য আওয়ামী লীগের কাছ থেকে আসনটি ছিনিয়ে আনতে পারবেন।

টাঙ্গাইল-৮

সখীপুর ও বাসাইল উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-৮ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও কাদের সিদ্দিকী বীর-উত্তম ঘুরেফিরে দখলে রেখেছেন। কাদের সিদ্দিকীকে ঘিরেই যত হিসাব বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির। সে কারণে আসনটি দেশের আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী আসন। কাদের সিদ্দিকী ও আওয়ামী লীগ-বিএনপির ত্রিমুখী লড়াইয়ের কারণেই এ আসনটি জাতীয় নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী অধ্যক্ষ হুমায়ুন খালিদ। ১৯৭৯ সালে বিএনপির প্রার্থী মোর্শেদ আলী খান পন্নী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করে ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির টিকিটে মোর্শেদ আলী খান পন্নী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে নির্বাচিত বিএনপির প্রার্থী হন হুমায়ুন খান পন্নী। ১৯৯৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে শওকত মোমেন শাহজাহান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০১৪ সালে বিজয়ী হওয়ায় দু’সপ্তাহের মধ্যেই শওকত মোমেন শাহজাহানের মৃত্যু হয়। শুন্য আসনে উপ-নির্বাচনে তার ছেলে অনুপম শাহজাহান জয় মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

এ আসনটি মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলে কাদেরিয়া বাহিনীর বীরউত্তম খেতাবধারী বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কাদের সিদ্দিকীর বিরোধ দেখা দেয়। তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন। পরে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে কাদের সিদ্দিকী তার নিজের প্রতিষ্ঠিত কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য অনুপম শাহজাহান জয় আগামী নির্বাচনেও মনোনয়নের জন্য তৎপরতা শুরু করেছেন।

অন্যদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম এলাকায় ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা জোয়াহেরুল ইসলাম জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক এবং করটিয়া সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্র সংসদের দুইবার ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন। ছাত্র রাজনীতি শেষে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সখীপুর ও বাসাইল উপজেলা আওয়ামী লীগ ও তৃণমুল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এবং জনপ্রতিনিধিরা দলমত নির্বিশেষে তার দিকে অবস্থান নিয়েছেন। বিগত তিন বছর টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যার বিচারের দাবিতে গড়ে উঠা সন্ত্রাস বিরোধী আন্দোলনে জীবনের ঝুকি নিয়ে নেতৃত্ব দেয়ায় পুরো জেলাতেই তার ভাবমূর্তি উজ্জল হয়েছে। আর তার এই সাহসী নেতৃত্ব নির্বাচনী এলাকার মানুষের মাঝে তাকে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তুলেছে।

এছাড়া এ আসনের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রার্থীরা হচ্ছেন, সখীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত শিকদার, সাবেক অতিরিক্তি সচিব ও বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান একেএম আসাদুল হক তালুকদার, জাতীয় শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম খান, ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউটের সহসভাপতি আতাউল মাহমুদ, সখীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য অধ্যক্ষ সাঈদ আজাদ, বাসাইল উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সরকার মোহামাদ আরিফুজ্জামান ফারুক। তারাও এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এখানে কাদের সিদ্দিকী তাঁর দল থেকে নির্বাচনে অংশ নেবেন এটা প্রায় নিশ্চিত। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ, বিএনপির ও জাতীয় পার্টির অনেকেই দলের মনোনয়ন প্রত্যাশায় গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিএনপি প্রার্থী কম থাকলেও নিজেদের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ রয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান থাকলেও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব কাজ করছে।

এ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খানের মনোনয়ন নিশ্চিত বলে মনে করছে তাঁর কর্মী-সমর্থকরা। বর্তমান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজী শহিদুল ইসলাম দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে প্রচার চালাচ্ছেন।

/পি.এস

টাঙ্গাইল,বিএনপি,আ.লীগ
apps