• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

আ.লীগে জট, বিএনপিতে কোন্দল

প্রকাশ:  ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ১২:৪৩
জাকির হোসেন পিংকু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
প্রিন্ট

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্বাচনী মাঠ। অনেকটা ঝিমিয়ে পড়া রাজনীতি অক্টোবরে এসে চাঙ্গা করতে শুরু করেছে। এখন চলছে ভোটযুদ্ধের আগে মনোনয়ন যুদ্ধ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৩টি আসনই চায় আ.লীগ, বিএনপি ও জামায়াত। সে লক্ষেই কাজ করছেন তারা। সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছে এই তিন দলের প্রার্থীরা। আ.লীগ বিএনপির আঞ্চলিক রাজনীতিরও প্রভাব রয়েছে জেলায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আ.লীগ ও বিএনপির দলীয় অন্ত:কোন্দল রয়েছে। আ.লীগে কিছুটা চাপা আর বিএনপির প্রকাশ্যে। জামায়াতের এই সমস্যার কথা জানা যায় না। তবে মামলার কারণে বিএনপি, জামায়াত প্রার্থীদের মাঠে তেমন দেখা যায় না। অনেকেই এ কারণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার কথাও বলছেন।

জেলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি ও জামায়াতকে আ.লীগের তুলনায় সবসময় অনেক বেশী শক্তিশালী অবস্থানে দেখা গেলেও পট পরিবর্তন হয় ২০০৮ সালের ৯ম সংসদীয় নির্বাচনে। বিএনপি-জামায়াতের দূর্গ বলে পরিচিতি জেলায় প্রথমবারের মত সবকটি আসন পায় আ.লীগ । বলাই বাহুল্য, ২০১৪ সালেও তারই পুনরাবৃত্তি ঘটে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১

এই আসনে রয়েছে ১টি পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়ন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ ক্ষমতাসীনদের জন্য জটিল অভ্যন্তরীণ সমীকরণ আর গ্রুপিং রয়েছে। এই আসনে রয়েছে বেশ কয়েকটি ‘প্রেশার গ্রুপ’। যাদের নেতারা পেশাগত কারণে থাকেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। কিন্তু আসনের রাজনীতির ব্যাপারে তাঁরা ভেতর ভেতর যথেষ্ট সক্রিয় ও প্রভাবশালী। অনেক ভোটারের উপর এদের প্রভাবও রয়েছে।

দলীয় অন্ত:কোন্দল ও প্রায় সমপর্যায়ের ৪ জন প্রার্থী থাকায় এই আসনে আ.লীগের প্রার্থী কে হবেন সেটি জানার অপেক্ষা সকলের। সে তুলনায় অনেক আগে থেকেই একজন করে প্রার্থী নিয়ে সুবিধেজনক অবস্থায় বিএনপি ও জামায়াত।

আ.লীগের মনোনয়ন চাইবেন বর্তমান সাংসদ গোলাম রাব্বানী। যিনি ৯ম জাতীয় নির্বাচনে গণফোরামের প্রার্থী ছিলেন ও গ্রহণযোগ্য ভোট পান। রাব্বানী ঐতিহাসিক কানসাট বিদ্যুৎ আন্দোলনের নেতা হিসেবে পরিচিত। নিজে এলাকার মাঠে থাকার চেষ্টা করেন। জেলা আ.লীগের নিজস্ব রাজনীতিতে ইনি বেশ কোনঠাসা। মনোনয়ন চাইবেন জেলা আ.লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা.সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল। আ.লীগপন্থি চিকিৎসকদের বিভাগীয় নেতা।

এছাড়াও মনোনয়ন চাইছেন সাবেক সাংসদ জেলা আ.লীগের সাবেক সভাপতি ব্রি,জেনারেল (অব.) এনামুল হক। আরো যারা মনোনয়ন চাইছেন আ.লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ইঞ্জি.মাহতাব উদ্দিন।

বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইছেন পাঁচবারের সাবেক সাংসদ ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া। এছাড়াও মনোনয়ন চাইতে পারেন কেন্দ্রীয় নেতা শাহীন শওকত, যুবনেতা বেলাল ই বাকী ইদ্রিশী, সাবেক শিবগঞ্জ পৌর মেয়র শামীম কবির হেলিম, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শহীদ হায়দারী। তবে মাঠে তাঁদের তৎপরতা সামান্য। তাই মনোনয়ন চাইলেও এই আসনে বিএনপির অধ্যাপক শাহজাহান ব্যতীত অন্য কোন শক্ত প্রার্থী এ আসনে নেই।

এদিকে জামায়াত শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কেরামত আলীকে অনেক আগেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এই নেতা সাংগঠনিক শক্তি কাজে লাগিয়ে আ.লীগ বা বিএনপির প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা রাখেন বলে ধারণা করা হয়। জামায়াত আ.লীগ ও বিএনপির অন্ত:কলহের সুযোগ নিতে তৈরী। এই আসনে তিন দলের উল্লেখযোগ্য প্রার্থী। অন্য কোন দলের প্রার্থী তেমন কোন তৎপরতা এই আসনে নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২

এই আসনে রয়েছে ২টি পৌরসভা আর ১৬টি ইউনিয়ন। রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গোমস্তাপুরের রহনপুর পৌর শহরকে গণ্য করেন অনেকে। জেলার এই আসনেই আ.লীগকে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী বলে মনে করা হয়। কিন্তু তাদের একাধিক প্রার্থীর দ্বন্দ্বও চরমে।

বর্তমান সাংসদ গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস আবারও মনোনয়ন লাভের চেষ্টা করছেন। ২০১৪ সালে যেসব আসনে নির্বাচন হয় এটি তাঁর মধ্যে অন্যতম। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও মাঠের নেতা হিসেবে পরিচিতি রয়েছে জেলা আ.লীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা বিশ্বাসের। তবে তাঁকে শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন ৯ম সংসদে লড়াই করে সাংসদ হওয়া জেলা আ.লীগ সহসভাপতি জিয়াউর রহমান। সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত দক্ষ এই নেতা প্রচুর পরিশ্রম করছেন তাঁর হারানো মনোনয়ন আর আসন পূণরুদ্ধারের। মনোনয়ন চাইছেন নাচোল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের। তাঁর আক্ষেপ নাচোল থেকে কেউ কখনও আ.লীগের মনোনয়ন পায়নি। ১৯৮৬ সালে জামায়াত থেকে নির্বাচিত মীম ওবাইদুল্লাহ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আওয়ামী বা বিএনপি দলীয় সকল সাংসদই গোমস্তাপুর বা ভোলাহাটের। এটি একটি আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ বলেও তিনি দাবি করেন। দীর্ঘদিন থেকে প্রচুর পরিশ্রম করতে থাকা এই নেতা মনোনয়ন লাভকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন।

এছাড়া মনোানয়ন চাইছেন যুবলীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম। সম্প্রতি মাঠে গণসংযোগ জোরদার করেছেন দু’বার আ.লীগের মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থী আ্যাড.আফসার আলী। যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা সৈকত জোয়ার্দ্দাার অতি সম্প্রতি মাঠে নেমেছেনে।

বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে আছেন জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম। সাবেক কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ এই নেতা ২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে রেকর্ড ভোট পেলেও জয় পাননি। জেলাব্যাপী দলের একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন ঢাকায় থাকা এই নেতা। শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের সাথেও তাঁর সম্পর্ক ভাল বলে জানেন কর্মীরা। আমিনুল ইসলামকে চ্যালেঞ্জ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন গোমস্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান বাইরুল ইসলাম। দলীয় গ্রুপিং তার অন্যতম শক্তি। এই আসনে প্রার্থী হিসেবে বিএনপির আলোচিত কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক সাংসদ সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়ার নাম শোনা যায় অনেক দিন থেকেই। কিন্তু এই আসনে তাঁকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়নি কখনও। তবে গ্রুপিং এর কারণে বা প্রয়োজনে জাতীয় ইমেজ কাজে লাগিয়ে বিএনপির বিকল্প প্রার্থী তিনি হতে পারেন।

এই আসনে জামায়াতকে জেলার মধ্যে সবচেয়ে কম শক্তিশালী বলে মনে করা হলেও আ.লীগ ও বিএনপির অন্ত:কলহের সুযোগ তারা নিবে। এ আসনে অনেক আগে থেকেই প্রার্থী জামায়াতের জেলা সহ সেক্রেটারী ইয়াহিয়া খালেদ। এ আসনে অন্য কোন দলের কোন উল্লেখযোগ্য প্রার্থী মাঠে নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) ১টি পৌরসভা, ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনটি জেলার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। জেলার সকল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর। এই আসনে আ.লীগের মনোনয়নের জন্য দলীয় কোন্দল জেলার মধ্যে সবচাইতে কম। বিএনপির কোন্দল প্রকাশ্যে। জামায়াতের কোন কেন্দালের কথা জানা যায় না।

মনোনয়ন চাইবেন ক্ষমাতাসীন দলের সাংসদ ও জেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওদুদ। ২০০৪ সালে বিএনপি ছেড়ে আ.লীগে যোগ দিয়ে এই আসনে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০০৮ সালে । টানা ১০ বছরে সদর আসনের সাংসদ ও জেলায় ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতা হওয়ায় অনেকে ওদুদকেই বর্তমানে জেলার সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে গণ্য করেন। জেলার রাজনীতি নিয়ে সবচেয়ে বেশী সক্রিয় এই নেতা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে আলোচিত। নিয়মিত মাঠ চষে বেড়ান। পাশাপাশি জেলার রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে তাঁর সমালোচনাই সর্বাপেক্ষা বেশী। কিন্তু তিনি বিভিন্ন সময় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ নাকচ করে দলীয় মনোনয়ন লাভ ও নির্বাচনে জয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন। ওদুদ জামায়াত, বিএনপির নেতাকর্মীদের দলে ভেড়ানোর বিষয়টিকে ওইসব সংগঠনকে ভাঙ্গার অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করেন। সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এই নেতা ক্ষমতার প্রথম দিকে ইউনিয়নগুলিতে ও শেষদিকে শহরে উন্নয়ন কাজ ও রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন। তিনি নারী, পেশাজীবি ও তরুণ প্রজন্মের বিষযটি খেয়াল রাখেন।

এই আসনে মনোনয়ন চাইতে পারেন জেলা আ.লীগ সহসভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রুহুল আমীন। প্রবীণ এই নেতা দীর্ঘদিন মাঠে রয়েছেন। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত। অভিজ্ঞতা ও আর্থিক স্বচ্ছলতাও যথেষ্ট। কিছু নিজস্ব ভোট ব্যাংকও রয়েছে এই নেতার। সদরে মনোনয়ন চাইতে পারেন সাবেক ছাত্রনেতা ও ব্যবসায়ী সামিউল হক লিটন। গত পৌর নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে অল্পের জন্য পরাজিত হবার পর মাঠে তৎপরতা বাড়িয়েছেন।

সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রায় নিশ্চিত তিনবারের সাবেক সাংসদ ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ। সাবেক এই ছাত্রনেতা রাজনৈতিকভাবে দক্ষ হলেও জেলায় দলীয় কোন্দলের কারণে অস্থিরতায় রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে জেলা বিএনপি অবস্থান নিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ নতুন নেতৃত্ব তৈরী না করা। হারুনুর রশিদের প্রধান রাজনৈতিক সহযোগী তাঁর স্ত্রী বিএনপির আলোচিত কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক সাংসদ সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া। তবে সদর আসনে বিএনপি ও ব্যবসায়ী নেতা আব্দুল ওয়াহেদের নামও শোনা যায় কখনও। গত জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনে অল্পের জন্য আ.লীগ প্রার্থীর নিকট পরাজিত হন।

জামায়াত অনেক আগে থেকেই এই আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুলকে। তিনি দেশে ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতা ছিলেন। ইদানিং সূযোগ পেলেই এলাকায় যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। সদর আসনে প্রার্থী হবার তৎপরতা চালাচ্ছেন জাসদের (ইনু) কেন্দ্রীয় নেতা মনিরুজ্জামান মনির। ছাত্র রাজনীতি, সামাজিক আন্দোলন, পৌর ভোটে অংশ নেয়াসহ জনগণের সাথে থাকেন। রয়েছেন জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি আ্যাড.নজরুল ইসলাম সোনা। কিছু দলীয় সভা আর পোষ্টারে নিজের প্রচার চালাচ্ছেন।

/পি.এস

চাঁপাইনবাবগঞ্জ,বিএনপি,আ.লীগ
apps