• বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ২ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

জয় অব্যাহত রাখতে চায় আ.লীগ, পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি

প্রকাশ:  ০৪ অক্টোবর ২০১৮, ১১:১৩
ইমরুল কায়েস, বাগেরহাট
প্রিন্ট

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের উত্তাপ ছড়াচ্ছে সারাদেশে। অন্যান্য জেলার ন্যায় বাগেরহাট জেলার ৪টি সংসদীয় আসন মনোনয়ন প্রত্যাশীদের পথসভা, জনসভা, ঘরোয়া বৈঠকের মধ্যদিয়ে চলছে নির্বাচনের প্রস্তুতি। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা বা অনুষ্ঠানগুলোতে আলোচিত হচ্ছে নির্বাচন কেন্দ্রিক আলোচনা। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা প্রকাশ্যেই দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়-ঝাঁপ শুরু করলেও বিএনপি কিছুটা চুপচাপ ভাবে হলেও নির্বাচনের চন্য প্রস্তুতি চালাচ্ছে। তবে সব দলের প্রার্থীরাই নিজ নিজ জোটের মনোনয়ন লাভের আশায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে নিয়মিত। তবে বাগেরহাটের ৪টি সংসদীয় আসনে ক্ষমতাসীনদের একক আধিপত্য থাকার সুযোগে মাঠ নিজেদের দখলে রেখে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে মরীয়া ক্ষমতাসীনরা।

স্বাধীনতার পর বাগেরহাটের সব কয়টি সংসদ নির্বাচেনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে অন্যদলের প্রার্থীদের জয়ের নজির হাতে গোনা। তবে ২০০৮ সালে জেলার ৪টি আসনই দখলে নেয় আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দল তাদের সব আসন এবারও ধরে রাখতে চায় আর হারানো আসন পুনরুদ্ধারে তৎপর বিএনপি। প্রতিটি আসনে ভোটযুদ্ধ হবে প্রধান বড় দুই দলের মধ্যেই। ভোটের মাঠের শেষ পর্যবেক্ষণে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ। কারণ পর পর দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্যরা এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পেরেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাগেরহাট ১ আসন থেকে ১৯৯৬ সালে নির্বাচন করে বিজয়ী হলে জেলাটি আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসাবেই বিবেচিত হয়। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দিনের একক নিয়ন্ত্রণে বাগেরহাটের আওয়ামী লীগ বেশ শক্তিশালী অবস্থানে। অন্যদিক নির্বাচন নিয়ে কেন্দ্র থেকে পরিস্কার কোনো নির্দেশনা না থাকায় ভোটের মাঠে দোটানায় আছে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।

বাগেরহাট ১ (মোল্লাহাট-চিতলমারী-ফকিরহাট)

আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য থাকায় আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আসনটি বিরোধীদের জন্য দুর্ভেদ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। সপ্তম থেকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত টানা চারটি মেয়াদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভ্রাতুষ্পুত্র শেখ হেলাল উদ্দিন এই আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য। এলাকার সাধারণ মানুষ এই আসনে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদেরই দেখতে চান সব সময়। তবে জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিএনপি এই আসনটি আওয়ামী লীগের দখল মুক্ত করতে মরিয়া। স্থানীয় বিএনপি নেতারা মনে করেন, আগামী নির্বাচনের ভালো পরিবেশ থাকলে আসনটি তাদের দখলে আসবে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যায় স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাট -১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম এ খায়ের নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে সৈয়দ মোজাহিদুর রহমান এই আসনের কতৃত্য নেয়। তবে পরবর্তী নির্বাচনে অর্থাৎ ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের এম এ খায়ের পুনরায় আসনটি দখলে নেয়। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ডা: মোজাম্মেল হোসেন একচেটিয়া ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বিনাভোটে বিএনপির প্রার্থী মুজিবুর রহমান কয়েক মাসের জন্য এমপি নির্বাচিত হন। পরবতীর্তে একই বছরের ১২ জুন সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এই আসন থেকে নির্বাচিত হন। পরে শেখ হাসিনা আসনটি ছেড়ে দিলে তার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীন উপ নির্বাচনে বাগেরহাট -১ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে বাগেরহাটের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর ভ্রাতুষ্পুত্র শেখ হেলাল উদ্দীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বাগেরহাট -১ আসনের দায়িত্ব পান। তারপর ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে শেখ হেলাল উদ্দিন বিজয়ী হয়ে এই আসনে আওয়ামী লীগের আধিপত্য ধরে রেখেছেন।

বাগেরহাট-১ আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভোটে মূল বিভাজন এনে দেয় চিতলমারী উপজেলার সংখ্যালঘু ভোট। তাই স্থানীয়রা চিতলমারী উপজেলাকে বলে থাকেন ‘আওয়ামী লীগের ভোটব্যাঙ্ক’। এই আসনের বিগত সংসদ নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফকিরহাট ও মোল্লাহাট উপজেলায় এই দুই দলের ভোটের ব্যবধান তেমন বেশি থাকে না। ফলে বরাবরই জয়ের নিয়ামক হয়ে ওঠেন চিতলমারীর ভোটাররা। আর এখানকার সিংহভাগ ভোটই যায় আওয়ামী লীগের বাক্সে। তাই বিরোধীদের এবারের বিশেষ মনোযোগ যে চিতলমারী উপজেলার ভোটারদের দিকেই থাকবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এলাকার সার্বিক উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থে শুধু বাগেরহাট-১ আসনই না, বাগেরহাট জেলা জুড়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে শেখ হেলাল উদ্দিন এখন ক্ষমতার কেন্দ্রে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ এখনও এই আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেনি। একাদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রার্থী শেখ হেলাল উদ্দিনের বাইরে কোন প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে না।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য দলীয় প্রার্থীদের বিষয়ে জানতে চাইলে বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামরুজ্জামান টুকু বলেন, আসনওয়ারী আওয়ামী লীগের প্রার্থী এখনও নির্ধারন হয়নি। ফলে প্রার্থী নির্বাচনের সাংগঠনিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি। তাছাড়া আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন বোর্ডের প্রধান দলীয় সভনেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যাকে মনোনীত করবেন তিনিই প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন। তবে বাগেরহাট ১ আসনে প্রাধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দিনের উপর জেলা আওয়ামী লীগ আস্থা রাখে।

এদিকে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক খ্যাত বাগেরহাট-১ আসনে বিএনপির প্রাথী কে হচ্ছেন তা নিয়ে ভোটারদের মাঝে কৌতুহল রয়েছে। বিগত দিনে বিএনপির প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমান একাধিকবার এই আসনে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন। একপর্যায়ে ২০০৮ সালে বিএনপি তাদের প্রার্থী পরিবর্তন করে জেলা বিএনপির অন্যতম সহ-সভাপতি অ্যাড. শেখ ওয়াহিদুজ্জামান দিপুকে প্রার্থী করলে তিনিও পরাজিত হন। তবে তিনি এবারও এই আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে প্রচেষ্টা শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। এরই অংশ হিসেবে এলাকায় যোগাযোগ বাড়িয়েছেন এই বিএনপি নেতা। এর বাইরে কেন্দ্রীয় জাসাস নেতা মঞ্জুর মোর্শেদ স্বপন এবং রাজধানীর ধানমন্ডি থানা বিএনপির সভাপতি শেখ রবিউল ইসলামের নাম শোনা যাচ্ছে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে। তবে একাধিকবার এই আসনে পরাজিত জেলা বিএনপির উপদেষ্টা শেখ মুজিবুর রহমানের নামও শোনা যাচ্ছে।

বড় দুই দলের বাইরে জাতীয় পার্টি অথবা ইসলামী আন্দোলনের কোন প্রার্থীর নাম তেমন শোনা না গেলেও গণফোরামের এ্যাডভোকেট এস এম এ সবুরের নামও শোনা যাচ্ছে।

বাগেরহাট ১ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৪ হাজার ৯০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৭শ ৭১ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৫১ হাজার ৭শ ২৯ জন।

বাগেরহাট ২ (বাগেরহাট সদর -কচুয়া)

কথিত রয়েছে হযরত খানজাহান (র:)’এর পূণ্য ভুমি বাগেহরহাট সদর আসন ও হযরত শাহজালাল (র:) পূণ্য ভুমি সিলেট থেকে যে দলের প্রার্থী বিজয়ী হয় তারাই সরকার গঠন করে থাকে। ইতিপূর্বে এমনটি ঘটে আসছে। তাই স্বাভাবিক কারণেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ জেলার বড় দুই দল থেকে কে প্রার্থী হবেন তা নিয়ে চলছে ভোটার, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে চুলচেরা বিশ্নেষণ।

বাগেরহাট- ২ আসনটি বাগেরহাট সদর ও কচুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত। দুই উপজেলার রয়েছে ১৭ টি ইউনিয়ন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচতি হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মীর সাখাওয়াত আলী দারু। এরপর ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী আ.স.ম মোস্তাফিজুর রহমান এমপি হন। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে শেখ আব্দুর রহমান এমপি হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী আ.স.ম মোস্তাফিজুর রহমান আওয়ামী লীগের প্রার্থী মীর সাখাওয়াত আলী দারুকে পরাজিত করে আবারও এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা ভোটে বিএনপি’র প্রাথী আ.স.ম মোস্তাফিজুর রহমান কয়েক মাসের জন্য এমপি নির্বাচিত হন।

এরপর একই বছরের ১২ জুন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মীর সাখাওয়াত আলী দারু পুনরায় এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের বাগেরহাট সদর আসন থেকে বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রথমবারের মতো এমপি হন ব্যবসায়ী এম.এ এইচ সেলিম। তবে ২০০৮ সালের অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মীর শওকাত আলী বাদশা জয়লাম করে পুনরায় আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে আনে।

এদিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাট সদর আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীর মধ্যে আওয়ামী লীগের মীর শওকাত আলী বাদশার সাথে নিজ দলের নেতাকর্মীদের রয়েছে বিরোধ। বর্তমান পেক্ষাপটে নিজদলের নেতাদের মধ্যকার বিরোধ কতটা নিরসন করতে পারবেন সে প্রশ্ন সবার। অন্যদিকে জেলা বিএনপি’র সভাপতি এম.এ. সালামের সাথে তার দলের নেতাদের বিরোধ থাকলেও ততটা প্রকট নয়। বর্তমান প্রেক্ষপটে মর্যাদাপূর্ণ এ আসনে বর্তমান এমপি মীর শওকাত আলী বদশা ছাড়াও আওয়ামী লীগ দলীয় সম্ভাব্য প্রাথী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছেন বঙ্গবন্ধুর ভ্রাতুস্পুত্র বাগেরহাট -১ আসনের এমপি শেখ হেলাল উদ্দিনের ছেলে শেখ সারহান নাসের তন্ময়, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও বাগেরহাট পৌর মেয়র খান হাবিবুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি ও সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা শেখ আলী আহমেদ খোকন, সাবেক এমপি বর্তমানে অসুস্থ মীর সাখাওয়াত আলী দারুর সহধর্মীনি বঙ্গবন্ধুর নিকট আত্মীয় ফরিদা আক্তার বানু লুচি।

অন্যদিকে বিএনপি’র দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বাগেরহাট জেলা বিএনপি’র সভাপতি এম.এ সালাম এবং ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সহ দপ্তর সম্পাদক ও বাগেরহাট জেলা বিএনপির সহ সভাপতি মনিরুল ইসলাম খান। এছাড়া জাতীয় পার্টির হাজরা জাহিদুল ইসলাম বাবলু, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের এ্যাডভোকেট শেখ আতিয়ার রহমান আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। গত পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমান আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েক নেতা ও তাদের অনুসারী অসংখ্য নেতা কর্মীদের মধ্যে বিরোধ বিদ্যমান। বর্তমান প্রেক্ষপটে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে এ বিরোধ কতটুকু নিরসন হবে তা দেখার বিষয়। অন্যথায় এই বিরোধের সুফল বিএনপি’র পক্ষে যেতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারনা। মর্যাদাপূর্ণ বাগেহরহাট সদর আসন থেকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উদ্ভুত এ পরিস্থিতিতে বিএনপি’র প্রার্থী আনেকটা নিশ্চিত হলেও আওয়ামী লীগ থেকে কে মনোনয়ন পাচ্ছেন তা নিয়ে রয়েছে কৌতুহল।

বাগেরহাট-২ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৮৫ হাজার ৮’শ ৭৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪২ হাজার ৯’শ ১৫ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৪২ হাজার ৯’শ ৫৮জন।

বাগেরহাট ৩ (রামপাল-মোংলা)

বাগেরহাট-৩ আসনটি রামপাল ও মোংলা উপজেলা নিয়ে গঠিত। এতে মোট দুই লাখ ২৭ হাজার ৬৪৬ জন ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ১৪ হাজার ৪০৬ এবং নারী এক লাখ ১৩ হাজার ২৪০ জন। রামপাল মোংলা অঞ্চলের মানুষের প্রধান পেশা কৃষিকাজ। তবে লবণাক্ত এই অঞ্চলের মানুষ চিংড়ি চাষে বেশি আগ্রহী। বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর এই মোংলাতেই। নির্বাচনী হিসাবে বিগত দিনে দেখা যায় এই উপজেলায় ভোটের ফলাফল নির্ভর করে তরুণ ভোটারদের হাতে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হতে পারেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আবদুল খালেকের সহধর্মিনী বর্তমান সংসদ সদস্য হাবিবুন্নাহার তালুকদার রয়েছে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান। তবে এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীও কম নয়। আসনে আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন খুলনা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক শেখ মো. আবু হানিফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র নেতা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক ব্যারিস্টার শেখ ওবায়দুর রহমান ওবায়েদ, চিত্রনায়ক শাকিল খান।

বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র নেতা সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বাগেরহাট জেলা বিএনপির সহ সভাপতি ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী রেজা বাবু, জেলা বিএনপির অপর সহ-সভাপতি সরদার মো. অজিয়ার রহমান, ছাড়াও জামায়াত নেতা শেখ আবদুল ওয়াদুদ।

মোংলা-ঘষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেল খনন, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, খুলনা-মোংলা রেললাইন, খানজাহান বিমানবন্দর নির্মাণ, রামপালে কয়লাভিত্তিক আধুনিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অসংখ্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সবকিছুই আওয়ামী লীগ সরকারে আমলেই শুরু হয়েছে। তাই এই আসনে আওয়ামী লীগের আধিপত্য বেশি।

বাগেরহাট ৪ (মোড়েলড়ঞ্জ- শরণখোলা)

বাগেরহাট জেলার মোড়েলগজ্ঞ ও শরনখোলা উপজেলা নিয়ে বাগেরহাট -৪ আসন গঠিত। ভৌগলিক সীমারেখায় এ আসনের অন্তর্ভুক্ত ১টি পৌরসভাসহ ২০টি ইউনিয়ন। সুন্দরবন সংলগ্ন বলেশ্বর ও প্রমত্তা কচানদী বিধৌত এ জনপদের অধিকাংশ মানুষ ব্যবসা বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ইতিপূর্বে এ জনপদের মানুষ রাজনৈতিক ভাবেও রাষ্ট্রীয় অনেক গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় দক্ষিণের এ জনপদে বিরাজ করছে নির্বাচনী আমেজ। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশ বরেণ্য বেশ কজন রাজনৈতিক ব্যাক্তির পদচারনায় মুখরিত এই আসন । তাই জেলার অন্য তিনটি আসনের থেকে এখানকার দলীয় নেতাকর্মীরা অনেকটা আগেভাগেই রাজনৈতিক মাঠ নিজেদের অনুকুলে রাখতে নানা আয়োজনে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ অবস্থার মধ্যেও দলগুলির নেতাদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ এখনও প্রশমন হয়নি।

আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে শেখ আব্দুল আজীজ ১৯৭৩ সালে বাগেরহাট -৪ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার তথ্য, টেলিকমিউনিকেশন, যোগাযোগ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তারই উত্তরসূরি হিসেবে ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে আব্দুল লতিফ খান এমপি এবং ১৯৯৬ সালে ডা. মোজাম্মেল হোসেন সমাজ কল্যাণ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০৮ সাল এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালেও এ আসন থেকে ডা. মোজাম্মেল হোসেন এমপি নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সদ্য কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এ জনপদের আরেক নেতা এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ ।এখনও এঅঞ্চলের বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা এ্যাডভোকেট আমিরুল আলম মিলন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্দাথ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম।

বর্তমান সময়ের আলোচিত আওয়ামী লীগের এই তিন নেতাই বাগেরহাট -৪ আসন থেকে এবার মনোনয়ন যুদ্ধে মাঠে নেমেছেন। এছাড়া এ আসনে অপর মনোনয়ন প্রত্যাশির মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ সম্পাদক মো: জামিল হোসাইন, মোড়েলগজ্ঞ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট প্রবীর রঞ্চন হালদার, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ সম্পাদক মিজানুর রহমান জনি প্রমুখ। বাগেরহাট-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশিদের মধ্যে রয়েছেন বাগেরহাট জেলা বিএনপির সহ সভাপতি কাজী খায়রুজ্জামান শিপন, বাগেরহাট জেলা বিএনপির উপদেষ্টা কাজী মনিরুজ্জামান মনির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্দাথ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম এবং মোড়েলগজ্ঞ চালতাবুনিয়া গ্রামের সন্তান বাগেরহাট জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র মো. মনিরুল হক প্রমুখ।

অপরদিকে রাজনৈতিকভাবে নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াত ইসলামীর মাঠ পর্যায় কোন তৎপরতা না থাকলেও নির্বাচনী প্রস্তুতি রয়েছে দলের নেতাদের। মাঠপর্যায়ে নিজস্ব কৌসলে তারা কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে থাকেন। আগামী নির্বাচনে জামায়াতের প্রাথী তালিকায় এ আসনে অধ্যাপক শহিদুল ইসলামকে রেখেছে তাদের সম্ভব্য প্রার্থী তালিকায়। বিএপির নেত্রীত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরীক হওয়ায় জামায়াত ইসলামী এ আসনে জোটের মনোনয়ন দাবিদার । এছাড়া জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা বাবু সোমনাথ দে বর্তমান আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি ডা. মোজাম্মেল হোসেনের সাথে একজোট হয়ে এলাকার বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদানের মাধ্যমে গণসংযোগের পাশাপাশি পৃথক ভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন করছেন।

বাগেরহাটের ৪ টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বাগেরহাট ৪ আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল প্রকাশ্য চরম আকার ধারন করেছে। পূর্ব বিরোধের জের ধরে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা কৌশলে ডা. মোজাম্মেল হোসেনের বিরোধীতা করে। বিরোধিতার পরও ভোটযুদ্ধে তিনি জয়ী হন। এমপি নির্বাচিত হবার পর থেকেই মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলার শীর্ষ নেতাদের সাথে ডা. মোজাম্মেল হোসেনের দুরত্ব আরও বেড়ে যায়। মোড়েলগজ্ঞ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ্যাডভোকেট আমিরুল আলম মিলনের অনুসারীদের সাথে এমপি গ্রুপের আভ্যন্তরীণ কোন্দল মাঝে মধ্যে প্রকাশ্য রূপ নেয়। পরবর্তিতে যার প্রভাব উপজেলা ও পৌর নির্বাচনে গিয়ে পড়ে। স্থানীয় নেতাদের বিভক্তির ফলে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম পৃথক পৃথক ভাবে পালিত হতে থাকে। কখনও কখনও তা সংঘর্ষের পর্যায়ে পৌছায়। দলের অভ্যন্তরে নেতাদের মধ্যকার বিরোধ এখনো বিদ্যমান রয়েছে। নির্বাচনের আগে এ বিরোধ কতখানি প্রশমিত হয় তা ভাবনার বিষয়।

সম্প্রতি (১ অক্টোবর) দলীয় কোন্দলের জেরে ডা মোজাম্মেল হোসেনের সমর্থনকারী এক ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছাত্রনেতা বদিউজ্জামান সোহাগের ২ জন অনুসারীকে প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করে। ঠিক তারপর দিন ওই খুন হওয়া নেতাদের জানাজায় বর্তমান এমপি ডা. মোজাম্মেল হোসেন উপস্থিত হলে স্থানীয় হাজার হাজার জনতার মাঝে লাঞ্ছনার (জানাজা অনুষ্ঠানে এমপিকে উদ্যেশ্য করে স্থানীয়রা জুতা ছুড়ে মারে) শিকার হন। এতে সহজেই বোঝা যায় বর্তমান এমপি তার জনপ্রিয়তা কতটা হারিয়েছেন। তার ওপর তিনি অনেক বয়স্ক হওয়ায় এই আসনে নতুন মুখ আসাটা অনেকেই প্রত্যাশা করছেন।

বাগেরহাট-৪ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ১ হাজার ৯’শ ৭৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫০ হাজার ৯শ ৬০ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৫১ হাজার ১৩ ভোট।

একনজরে বাগেরহাটের কিছু তথ্য

বাগেরহাট জেলার মোট আয়তন ৫৮৮২.১৮ বর্গ কিলোমিটার (১,৮৩৪.৭৪ বর্গকিঃমিঃ বনাঞ্চলসহ), উপজেলা ০৯ টি, ইউনিয়ন ৭৫ (পঁচাত্তর) টি, গ্রামেরসংখ্যা ১,০৪৭ টি, পৌরসভা ০৩ টি (বাগেরহাট, মোংলাপোর্ট, মোড়েলগঞ্জ), সমুদ্রবন্দর ০১টি (মোংলা সমুদ্রবন্দর) ,ইপিজেড ১টি। নির্বাচনী আসন ৪ টি, মোট ভোটার ১১,১৯,৫৮২ জন, পুরুষ ভোটার ৫,৬২,০৫২ জন , নারী ভোটার ৫,৫৭,৫৩০ জন।

/পি.এস

বাগেরহাট,বিএনপি,আ.লীগ

সর্বাধিক পঠিত