• বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

ফের জয় চায় আ.লীগ, উদ্ধার চেষ্টায় বিএনপি

প্রকাশ:  ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:৫৬
রেজাউল করিম লিটন, চুয়াডাঙ্গা
প্রিন্ট

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চুয়াডাঙ্গায় আগাম নির্বাচনী হাওয়া ক্রমেই জমে উঠতে শুরু করেছে। গ্রাম-গঞ্জ, বাজারে, চায়ের দোকানগুলোতে নির্বাচনী গল্প-গুজবে মাতছেন ভোটাররা। এছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বেশ তৎপর। অনেকটা আগেভাগেই নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন তারা।

অন্যদিকে বিএনপি জেলা শহর থেকে শুরু করে তৃণমূলে কোন্দল উপদলের কারণে তেমন সুবিধা করতে পারছেন না। অনেকে আবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও হামলা মামলার কারণে আগাম প্রচারণায় নামছেন না।

চুয়াডাঙ্গা-১

চুয়াডাঙ্গা সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন। এই আসনে মোট ইউনিয়ন রয়েছে ২০টি। পৌরসভা রয়েছে ২টি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৯৩ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মত নির্বাচিত হন মহাজোট প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী চারদলীয় জোট প্রার্থী অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮৮৯ ভোট।

এ আসনটিতে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশিদের তালিকায় আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের প্রার্থী আছেন ৭ জন। এরমধ্যে- চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুল হক বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় যুব লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান শামসুল আবেদীন খোকন, জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক প্রফেসর ডা. মাহবুব হোসেন মেহেদী। তবে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে এখনও হুইপ ছেলুনের বিকল্প তৈরী হয়নি বলে মনে করেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা।

বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় আছেন ৫ জন। এরা হলেন- কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, জেলা বিএনপির আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সাবেক যুগ্ম সচিব ড. মো. আব্দুস সবুর, বাংলাদেশ উয়ুথ ফোরামের উপদেষ্টা বিডিআর বিদ্রোহে বেঁচে যাওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেঃ কর্ণেল (অবঃ) সৈয়দ কামরুজ্জামান, জেলা বিএনপি নেতা শরিফুজ্জামান শরিফ। এ আসনে কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু কিংবা জেলা বিএনপির আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অহিদুল ইসলাম বিশ্বাসই পারফেক্ট বলে মনে করছেন রাজীনতিক বিশ্লেষকরা।

চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার এর সাথে সাবেক যুব লীগের আহবায়ক ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের অবনতির কারণে সক্রিয় জিপুর গ্রুপ। তারা এতটাই প্রভাব বিস্তার করছে যে, বিগত পৌর নির্বাচনে নৌকা প্রার্থী হুইপ সেলুন জোয়ার্দ্দারের সহোদর রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপুর নিকট বিপুল ভোটে পরাজিত হন। সেই থেকে চুয়াডাঙ্গাতে আওয়ামী লীগের বিরোধ তুঙ্গে। বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে একদিকে নেতৃত্ব দিচ্ছে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন ও অপর দিকে নেতৃত্ব দিচ্ছে চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র যুবলীগের সাবেক আহবায়ক ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু। চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের হুইপ সোলাইমান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন। দীর্ঘ তিনযুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি আওয়ামী লীগকে এক সুতোয় গেঁথে রাখলেও বর্তমান সময়ে এসে সেই পরিস্থিতিতে অনেকটা ভাটা পড়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা আওয়ামী লীগের কোন্দল মেটাতে না পারলে দীর্ঘদিন বিএনপির দখলে থাকা আসনটি পুনরায় তাদের ঘরে চলে যাবে। ওদিকে ভিন্ন চিত্র বিএনপির ক্ষেত্রে। অনেকটা হ-য-ব-র-ল ভাবে চলছে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম। নিজেদের মধ্যে কোন্দল উপদল ও গ্রুপিং-এর কারণে বিপর্যস্ত তারা। দলের কোন্দল মেটানোই তাদের জন্য অনেকটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিগত ৮ বছরে বিএনপির সাংগঠনিক কোনো কার্যক্রম ঠিকমতো পরিচালিত না হওয়ারও অভিযোগ সাধারণ নেতাকর্মীদের। আর এ নিয়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের ক্ষোভেরও অন্ত নেই।

৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরই চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির রাজনীতি চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় নেতাদের কয়েক দফা উদ্যোগের পরও ৮ বছরে এর থেকে উত্তরণ ঘটেনি বৃহৎ এই দলটির। এর পাশাপাশি সরকারি দলের হামলা মামলা তো আছেই। আর এ কারণে ইচ্ছে থাকা সত্তেও এক সময়ের বিএনপির দুর্গ খ্যাত চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থীর মাঠ পর্যায়ে তেমন নির্বাচনী তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তবে তাদের পক্ষে নির্বাচনী ব্যানার-ফেস্টুন নির্বাচনী এলাকায় শোভা পাচ্ছে। এছাড়া চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে জোট-মহাজোটের অন্যান্য শরীকদের কোন প্রার্থীর তেমন কার্যক্রম চোখে পড়েনি।

চুয়াডাঙ্গা-২

চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের ক্ষেত্রে উত্তাপ একটু বেশিই মনে হচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা একটু বেশিই নড়াচড়া করছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রতিনিয়ত ছুটছেন।প্রার্থীদের ছুটাছুটির পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকার প্রতিটি গ্রামে গ্রামে শোভা পাচ্ছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যাপার ফেস্টুন। এক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। যে কোনো গ্রামে ঢুকলেই একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর ব্যানার, ফেস্টুন চোখে পড়ছে।

নির্বাচনের পেছনের হিসেব অনুযায়ী আসনটি বেশিরভাগ সময় বিএনপি কিংবা বিএনপি জামায়াত জোটের হাতে থেকেছে। বড় সব নির্বাচনে এই আসনে জামায়াতকে ফ্যাক্টর হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত এই তিনটি দলই তাদের দলীয় প্রার্থীকে জিতিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে গণসংযোগে ব্যস্ত।

জীবননগর ও দামুড়হুদা উপজেলা এবং চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার তিতুদহ, গড়াইটুপি ও বেগমপুর ইউনিয়ন নিয়ে চুয়াডাঙ্গা-২ আসন। এই আসন থেকে অতীতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থী জয়লাভ করার রেকর্ড আছে। ফলে, এই আসন থেকে কোন দলের প্রার্থী নির্বাচিত হবেন তা আগেভাগে বলে দেওয়া খুব সহজ কাজ নয়। বোধহয় এ জন্যই সব দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা আশায় বুধ বেধে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। মনোনয়ন পাওয়ার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা যেভাবে তৎপর তাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এই আসনের ভোটযুদ্ধ হবে দেখার মতো।

এই আসনে আওয়ামী লীগের ৬ জন ও বিএনপির ২ জন প্রার্থী মাঠে তৎপর। আর জামায়াতের প্রার্থীর নাম ঘোষণা হয়ে গেছে আগেই। তিনি হলেন, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী রুহুল আমিন।

পরপর দুইবার আওয়ামী লীগের হাতে থাকা জাতীয় সংসদের ৮০ নম্বর আসনটি আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ নিজের হাতে রাখতে চাচ্ছে। আসনটি একসময় বিএনপির হাতে ছিল। সঙ্গত কারণেই তারাও স্বপ্ন দেখছে আসনটিকে তাদের দখলে নেবার। জামায়াতের দাবি, এই আসনটি আসলে তাদের। একসময় তাদের দলীয় নেতা এই আসনে জয়লাভ করেছেন। আবারও তারা জিতে আসবে বলে স্বপ্ন দেখছে। জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে, চুয়াডাঙ্গা-২ নির্বাচনী এলাকায় ভোটার চার লাখ পাঁচ হাজার ৬৫৩। এর মধ্যে পুরুষ দুই লাখ তিন হাজার ৫৪৩ ও মহিলা দুই লাখ দুই হাজার ১১০।

আওয়ামী লীগ থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হাজী আলী আজগার টগর, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক আমার সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক হাশেম রেজা, দামুড়হুদা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নজরুল মল্লিক, দর্শনা পৌরসভার বর্তমান মেয়র ও দর্শনা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান।

তবে এ আসনে জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আজাদুল ইসলাম, দামুড়হুদা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জেলা পরিষদ প্রশাসক মাহফুজুর রহমান ক্লিন ইমেজ রয়েছে।

৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা-২ নির্বাচনী এলাকায় শক্ত হাতে হাল ধরে রেখেছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি হাজি মোজাম্মেল হক। এমপি নির্বাচিতও হয়েছিলেন তিনবার। গত ৪ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। ফলে, চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে নতুন মুখ ছাড়া বিএনপির কোনো উপায় নেই। আসনটি অতীতে বেশিরভাগ সময় বিএনপির হাতে থাকার কারণে মাত্র দুজন সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে খুশি এলাকার ভোটার ও দলীয় নেতাকর্মিরা। তারা বলছেন, আসনটি বিএনপির।

নানাভাবে দলটিকে দমিয়ে রাখা হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গাও তার বাইরে নয়। এখানেও দলের নেতাকর্মীদের কৌশলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিএনপির যে দুজন সম্ভাব্য প্রার্থী গণসংযোগে আছেন তারা হলেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির উপ-কোষাধ্যক্ষ ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদ হাসান খান বাবু ও জেলা বিএনপির সদস্য মখলেছুর রহমান তরফদার টিপু। এই দু’নেতার মধ্যে দলের সিংহভাগ নেতাকর্মী আছেন মাহমুদ হাসান খান বাবুর পক্ষে।

জামায়াতের প্রয়াত নেতা মাওলানা হাবিবুর রহমান এই আসনে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। ওইসময় তিনি জামায়াতের নেতা হলেও রাজনীতির চেয়ে ধর্মীয় সভা-সমাবেশে তাকে বেশি বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। ধর্মীয় সভায় বক্তব্য দিতে দিতে মানুষের কাছে তিনি সুবক্তা হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। সেই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জামায়াতের প্রার্থী হন এবং জয়লাভ করেন।

এখনকার জামায়াত নেতাদের দাবি, সেই উত্তাপ আজও আছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ জামায়াতের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় আছে। এই আসনে জামায়াত ইতিমধ্যেই তাদের প্রার্থী চুড়ান্ত করেছে। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী রুহুল আমিন এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী। দলীয় প্রার্থী হিসেবে চুড়ান্ত ঘোষণার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ঘুরছেন গ্রামেগঞ্জে, ভোটারদের কাছে কাছে।

/পি.এস

চুয়াডাঙ্গা,বিএনপি,আ.লীগ