• বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

আ.লীগ-বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব

প্রকাশ:  ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:৪৮
ইয়াকুব আলী তুহিন, ফরিদপুর
প্রিন্ট

স্বাধীনতার পর বিগত দিনে প্রতিটি সংসদেই ফরিদপুরে এক বা একাধিক হেভীওয়েট প্রার্থী ছিলেন। এক সময় জেলায় ৫টি সংসদীয় আসন থাকলে ২০০৯ এর নির্বাচনের আগে সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকার আমলে ৫টি আসনকে ৪টি আসন করা হয়। আগামী নির্বাচনে প্রধান দুই দলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনের প্রস্ততি নিচ্ছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশী সকল নেতারাই সপ্তাহে এক থেকে দুইদিন করে এলাকায় সময় দিচ্ছেন, গণসংযোগ করছেন। নিজ নিজ দলের মনোনয়ন পেতে সকলেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

চারটি আসনেই এবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রার্থী দিবে বিএনপি। তবে প্রতিটি আসনেই রয়েছে দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল। প্রতিটি আসনেই মনোনয়ন চাইছেন একাধিক নেতা। সর্বশেষ মনোনয়ন কে পাবেন তার জন্য কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সমর্থক ও কর্মীরা। দলীয় কোন্দল না মিটলে নির্বাচনে তার খেসারত দিতে হবে বলে মনে করেন তারা।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও একই অবস্থা। প্রতিটি আসনেই একাধিক নেতা মনোনয়ন চাইছেন। তবে সকল নেতারই বক্তব্য শেখ হাসিনা যাকে মনোনয়ন দিবেন একমাত্র তিনিই হবেন নৌকার মাঝি।

২০০৮ নির্বাচনে ফরিদপুর সদর আসনে নির্বাচন করেছিলেন জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারী, যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়া আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ। আসন্ন নির্বাচনেও দলটি নির্বাচনে ৪ আসনেই প্রার্থী দিবেন নিশ্চিত করেছেন দলটির জেলা সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, জাকের প্রার্টি ও জেপি’র প্রাথী নির্বাচন করবেন।

ফরিদপুর-১

ফরিদপুরের মধুখালী, বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলার তিনটি পৌরসভা এবং ২৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-১ নির্বাচনী আসন আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসাবে পরিচিত। এ আসনে আওয়ামী লীগের কোন্দল ও গ্রুপিং প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে তৃণমূলে সৃষ্টি হয়েছে গ্রুপিং। এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী একাধিক প্রভাবশালী নেতা মাঠে রয়েছেন।

অন্যদিকে বিএনপি চাইছে প্রতিপক্ষের গৃহবিবাদকে কাজে লাগিয়ে আসনটি দখলে আনতে। তবে সাধারণ ভোটাররা বলছেন, আগামী নির্বাচনে ফরিদপুর-১ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন ফ্যাক্টর হবে। নির্বাচনের জয়-পরাজয় নির্ভর করবে প্রার্থী মনোনয়নের ওপর। জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য মতে, বর্তমানে তিন উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত ফরিদপুর-১ আসনের ভোটার ৪ লাখ ১২ হাজার ৮৬৭ জন। এরমধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৬ হাজার ৪ জন এবং পুরুষ ২ লাখ ৬ হাজার ৮৬৩ জন।

২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: আব্দুর রহমান। ২০০৮ সালেও তিনিই নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের কাজী সিরাজুল ইসলাম। তবে ২০০৪ সালে কাজী সিরাজুল ইসলাম বিএনপিতে যোগ দিলে আসনটি শূন্য হয়। সেবার উপনির্বাচনে জয়ী হন বিএনপির শাহ মো: আবু জাফর। ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির খন্দকার নাসিরুল ইসলাম এবং ’৯১ ও ’৯৬ সালে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের পোড় খাওয়া নেতা আব্দুর রউফ মাস্টার। এর আগে ’৮৮ সালে জাতীয় পার্টি থেকে, ৮৬’র নির্বাচনে সর্বদলীয় জোট থেকে ও ’৭৯ সালে আওয়ামী লীগ থেকে এ আসনে সংসদ সদস্য হন শাহ মো: আবু জাফর।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে তৎপর রয়েছেন নবীন-প্রবীণ কয়েকজন নেতা। বর্তমান এমপি আব্দুর রহমান ও সাবেক এমপি কাজী সিরাজ ছাড়াও নতুনদের মধ্যে প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আরিফুর রহমান দোলন। এ ছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মো: সিরাজুল ইসলাম, বোয়ালমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান এম এম মোশাররফ হোসেন, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মো: লিয়াকত হোসেন সিকদার, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক খান মইনুল ইসলাম মোস্তাক ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি লায়ন মো: সাখাওয়াত হোসেনের নাম শোনা যায়।

ফরিদপুর-১ আসনে বিএনপির দুটি গ্রুপ রয়েছে। একটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ মো. আবু জাফর। অপর গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপি নেতা সাবেক এমপি খন্দকার নাসিরুল ইসলাম। ফরিদপুর-১ আসনে চারবার জয়ী হয়েছেন শাহ মো: আবু জাফর। আগামী নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন তিনি। জয়লাভের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদী। তৃণমূলের রাজনীতিবিদ হিসেবে এলাকায় তার ব্যাপক পরিচিতি ও সমর্থন রয়েছে। এবং ওলামাদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা কমিটির সভাপতি ডা: মো: শরিফুল ইসলাম মনোনয়ন চাইছেন।

এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাঃ হাবিবুর রহমানের নাম প্রকাশ করেছে দলের নির্ভরযোগ্য সুত্র। জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় সদস্য ও শ্রমিক পার্টির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো: কামরুজ্জামান মৃধা, কেন্দ্রীয় নেতা আখতার আলী খান।

ফরিদপুর-২

ফরিদপুর-২ সংসদীয় আসন নগরকান্দা ও সালথা উপজেলা এবং সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা ব্যস্ত রয়েছেন গণসংযোগে।

ফরিদপুরের চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে এ আসনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ আসনটিতে সংসদ সদস্য ছিলেন বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমান এবং বর্তমান সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর মত জাতীয় নেতৃত্ব।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের দেয়া তথ্য মতে, এ আসনে বর্তমানে ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ৯৩ হাজার ১৩৮ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬৬৫ জন এবং নারী ১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৭৩ জন।

২০১৪ সালে দশম জাতীয় নির্বাচনে এ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। ২০০৮ সালের নবম সংসদেও এবং তার আগে ৯১ সালের নির্বাচনেও এ আসনে সংসদ সদস্য হন তিনি। অপর দিকে ২০০১ সালে অস্টম, ৯৬ এর ষষ্ঠ নির্বাচনে, ’ ৭৯-এর দ্বিতীয় ও ৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদে এ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির সাবেক মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমান। ১৯৯৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এমপি হন বিএনপির আবুল হোসেন। এ ছাড়া এরশাদ আমলে ৮৮-এর নির্বাচনে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জুয়েল এবং ৮৬-এর নির্বাচনে খায়রুজ্জামান বতু এ আসনে এমপি হন।

সংসদ সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী জাতীয় সংসদের উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এ আসনে। তার নাম আওয়ামী লীগের মানোনয়ন লিস্টের সবার উপরে। কিন্তু শারীরিক ভাবে অসুস্থ থাকায় তিনি আর নির্বাচনে অংশ নিবেন না বলে একাধিক নেতা জানিয়েছেন। এই খবরে দলের মনোনয়ন পেতে একাধিক নেতা চেষ্টা তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে সংসদ উপনেতার ছেলে নগরকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলু, মেজর (অব:) আতমা হালিম ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের পরিচালক এ্যাড. জামাল হোসেন মিয়া, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এয়ার কমডোর (অব:) কাজী দেলোয়ার হোসেন, জেলা কৃষকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাংবাদিক লায়েকুজ্জামান ও সাবেক এমপি বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুজ্জামান চৌধুরী জুয়েল।

বিএনপি থেকে মনোনয়ন দৌড়ে সবার আগে রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ রিংকু। তিনি বিএনপির সাবেক মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমানের একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে এলাকায় জনপ্রিয়। নিয়মিতভাবে এলাকায় তৎপরতা চালাচ্ছেন। নগরকান্দা ও সালথা উপজেলা বিএনপিতেও তার অবস্থান শক্তিশালী। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সাজেদা চৌধুরীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তিনি বিপুল ভোট পেয়ে নজর কারেন। এছাড়াও এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক সহিদুল ইসলাম বাবুল ও নগরকান্দা বিএনপির সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ।

বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব নিয়ে এখনো গ্রুপিং বিদ্যমান। দলের প্রতি সাধারণ মানুষের বাইরেও সরকারি দলের নিজস্ব কোন্দল আগামী নির্বাচনে বিরাট প্রভাব রাখবে। এ ছাড়া এ আসনে অন্যদের মধ্যে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুব সংহতির সহ-সভাপতি আলমগীর হোসেন, জাতীয় পার্টি (জেপি) কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও ফরিদপুর জেলা কমিটির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বকুল এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের অ্যাডভোকেট খান মো: সরোয়ারের নাম শোনা যায়।

ফরিদপুর-৩

ফরিদপুর জেলার সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-৩ আসন। এ আসনে মর্যাদার লড়াই হিসাবে দেখছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা।

ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করতে সম্প্রতি পৌর এলাকার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি বৃহত্তর ফরিদপুরের জেলাগুলো নিয়ে পদ্মা নামে বিভাগ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এই বিভাগের সদর দফতর হবে ফরিদপুর সদরে। এ জন্য এ আসনের গুরুত্ব বেড়েছে। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের দেয়া তথ্য মতে, এ আসনে ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৪২ হাজার ২৬০ জন। এর মধ্যে নারী এক লাখ ৭০ হাজার ৯৫৫ এবং পুরুষ এক লাখ ৭১ হাজার ৩০৫ জন।

বিগত ২০১৪ সালের দশম নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তার আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে প্রথমবারের মতো জয়ী হন আওয়ামী লীগের খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ভোট পান এক লাখ ২২ হাজার ৪৭টি। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে কামাল ইবনে ইউসুফ ভোট পান ৭৬ হাজার ৪৭৮টি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে ধানের শীষের কোনো প্রার্থী ছিল না। এভাবে বিএনপির এ ‘দুর্গ’ নৌকার দখলে যায়।

স্বাধীনতার পর ’৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে এমপি হন আওয়ামী লীগের ইমামউদ্দিন আহমেদ। এরপর ’৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনসহ ’৯১ সালে পঞ্চম, ’৯৬ সালে ষষ্ঠ ও সপ্তম এবং ২০০১ সালের অষ্টম নির্বাচনে জয়ী হন বিএনপির চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ। মাঝখানে এরশাদ আমলে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মহব্বত জান চৌধুরী এবং চতুর্থ সংসদে জাতীয় পার্টির কামরান চৌধুরী এমপি হন।

এ আসনে গত দু’বারের এমপি হয়ে বর্তমান সরকারের এলজিআরডি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। আগামীতেও তিনিই এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী। এ আসনে আওয়ামী লীগে একক প্রার্থী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ওয়ার্ড থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে সভা-সমাবেশ করে দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করে তোলা হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে দলের একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন নিশ্চিত খোন্দকার মোশাররফ হোসেনের।

অন্যদিকে, এবার এ আসনটিকে পুনরুদ্ধার করার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন একই আসন থেকে পাঁচবারের নির্বাচিত এমপি, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ। এলাকায় ভোটার ও কর্মীসমর্থকদের সাথে নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছেন তিনি।

তবে এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন লাভের প্রত্যাশায় কাজ করছেন যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুবুল হাসান পিংকু ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক সৈয়দ জুলফিকার হোসেন জুয়েল । এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গণসংযোগ করছেন। বিএনপি শরিক জামায়াতের ফরিদপুর জেলা আমির অধ্যাপক আব্দুত তাওয়াব এ আসনে ভোটারদের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি জানান, দলের সিদ্ধান্তেই তিনি প্রচারণা চালাচ্ছেন। তার নির্বাচনের বিষয়টি দলের এবং ২০ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। ফরিদপুর সদরের এ আসনটিতে বিএনপির জয় পরাজয়ে জামায়াতের ভোট বিরাট ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন অনেকেই। অন্যান্যের মধ্যে জাতীয় পার্টি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ইয়াহিয়া খান ও হাসিনা ইমরান এবং কমিউনিস্ট পার্টি জেলা শাখার সভাপতি রফিকুজ্জামান লায়েক এর নাম শোনা যায়।

ফরিদপুর-৪

ফরিদপুরের ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-৪ আসন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় দু’দলে প্রার্থী মনোনয়নে চমক আসতে পারে বলে অনেকের অভিমত। নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে দলের মনোনয়ন পেতে তৎপর রয়েছেন প্রায় ডজন খানেক প্রার্থী।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, এ আসনের মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৩ হাজার ১০৭ জন। এদের মধ্যে নারী ১ লাখ ৮৬ হাজার ২৪২ জন এবং পুরুষ ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৬৫ জন।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের দশম জাতীয় নির্বাচনে এ আসনে এমপি হন স্বতন্ত্র প্রার্থী মজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী। তার আগে ২০০৮ সালে এমপি হন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহর স্ত্রী কাজী নিলুফার জাফরউল্লাহ। এর আগে এরশাদ আমলের দু’টি নির্বাচন ব্যতিত এ আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের দখলে ছিলো। ’৭৩ এর প্রথম জাতীয় নির্বাচনে এ আসনে এমপি হয়েছিলেন অ্যাডভোকেট সামসুদ্দিন মোল্যা। এরপর ’৭৯ সালের ২য় জাতীয় নির্বাচন, ’৯১ এর পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন ও ’৯৬ এর ৭ম জাতীয় নির্বাচনে এ আসনে এমপি হন কাজী মোহাম্মদ আবু ইউসুফ। একসময়ে শুধু ভাঙ্গা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি ফরিদপুর-৫ আসন হিসেবে পরিচিত ছিলো। তবে ২০০৮ সালে চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-৪ আসনের সাথে এ আসনটিকে সংযুক্ত করা হয়।

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে তৎপর রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ। অবশ্য আওয়ামী লীগের এই হেভিওয়েট রাজনীতিবীদের জন্য এখন এ আসনের নির্বাচনী রাজনীতি বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। এরইমধ্যে সদরপুর, চরভদ্রাসন ও ভাঙ্গায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদপদবীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অনেকে সংবাদ সম্মেলন করে তার বিরুদ্ধে বিষোদগারও করেছেন। এসব সত্ত্বেও আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন তিনিই পাবেন বলে তার সমর্থকদের ধারণা।

তবে দশম জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে প্রথমবারের মতো স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মুজিবুর রহমান ওরফে নিক্সন চৌধুরী আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাজী জাফরউল্যাহ’র মতো জাদরেল নেতাকে হারিয়ে চমক দেখান। স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত হলেও তিনি নিজেকে আওয়ামী পরিবারের হিসেবে পরিচিতি দেন। দীর্ঘদিন এমপি হিসেবে তিনি এলাকায় নিজস্ব ইমেজ তৈরি করেছেন। এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট শিল্পপতি খন্দকার মঞ্জুরুল হক।

বিএনপি প্রার্থী হিসেবে জোরদার অবস্থানে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির সভাপতি জহিরুল হক শাহজাদা মিয়া। বিএনপির থেকে আরো মনোনয়ন চাইছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন সেলিম। অপরদিকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে গনসংযোগে নেমেছেন জাসাসের সহসভাপতি চিত্র নায়িকা শায়লা। তিনিও তার সমমনাদের সাথে নিয়ে জোর প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনিও মনোনয়োন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। ভাঙ্গা উপজেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম সাবেক ছাত্রদল নেতা ও জিয়া পরিষদের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জেডএম দেলোয়ার হোসেন এ আসনে বিএনপির আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী। তিনিও দীর্ঘদিন এলাকায় গণসংযোগ ও বিভিন্ন উঠোন বৈঠক করছেন।

ভোটারদের মতে, এ আসনটিতে আওয়ামী লীগের ভোট বেশি। তবে আগামী নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ নেতা কাজী জাফরউল্লাহ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী নিক্সন চৌধুরী দু’জনেই প্রার্থী হচ্ছেন বলে জানা গেছে। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ভোট ভাগ হয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন বিএনপির সমর্থকেরা। অবশ্য আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মতে, শেষ পর্যন্ত এখানে নৌকায় জয়ী হবে।

এছাড়া কমিউনিষ্ট পার্টির প্রার্থী আতাউর রহমান কালু তৎপরতা চালাচ্ছেন। জাকের পার্টি এ আসনে নির্বাচনে অংশ নিলে প্রার্থী হতে পারেন দলটির চেয়ারম্যান পীরজাদা মোস্তফা আমীর ফয়সাল। সম্প্রতি দলের জাতীয় কাউন্সিলে দিল্লীতে বিজেপির কেন্দ্রীয় কমান্ডের সাথে দলের আমির মোস্তফা আমীর ফয়সালের বৈঠকের পর নেতাকর্মীদের মাঝে নির্বাচনমুখী তৎপরতা লক্ষ করা গেছে।

/পি.এস

ফরিদপুর,বিএনপি,আওয়ামী লীগ,কোন্দল,গ্রুপিং