• বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

সিরাজগঞ্জ জেলার ৬টি আসনের চালচিত্র

আ.লীগ চায় জয়ের ধারাবাহিকতা, পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি

প্রকাশ:  ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:১৩
সোহাগ লুৎফুল কবির, সিরাজগঞ্জ
প্রিন্ট

এক সময় সিরাজগঞ্জে ১টি আসন ব্যতীত ৫টি আসনেই বিএনপির শক্ত অবস্থান ছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় বিএনপি তাদের সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। জেলার মোট ৬টি আসনের মধ্যে সিরাজগঞ্জ-১ নং আসনটি স্বাধীনতার সময় থেকেই আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান। আজ পর্যন্ত এই আসনে অন্য কোন দলের প্রার্থী বিজয়ী হতে পারে নি। বাকি ৫টি আসনই বিএনপির দখলে ছিল। কারণ এক সময় সিরাজগঞ্জসহ উত্তরবঙ্গে বিএনপি জামায়াতের ব্যাপক প্রভাব ছিলো। কিন্তু বর্তমানে বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশব্যাপী ব্যাপক উন্নয়ন ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধতার কারণে উত্তরবঙ্গে আওয়ামী লীগের অবস্থান বেশ শক্ত। আগামী নির্বাচনে জেলার ১নং আসন ব্যতীত আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হলেও সিরাজগঞ্জের ৬টি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীগণ ইতোমধ্যেই নিজেদের প্রার্থীতা জানান দিয়ে প্রচারণায় মাঠে নেমেছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের জন্য দলের হাইকমান্ডের সাথে জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রার্থীরা মনোনয়ন পেতে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন সংশ্লিষ্ট দলের কেন্দ্রীয় ও জেলা উপজেলার নেতাদের সঙ্গে। তারা নেতাদের কাছে তুলে ধরছেন রাজনীতিতে তাদের দীর্ঘদিনের অবদান, জনসমর্থন। আর অধিকতর যোগ্য প্রার্থী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে যোগাযোগ রক্ষার পাশাপাশি সমর্থনও নিচ্ছেন তৃণমূল নেতাদের।

যদিও বিএনপির নেতাকর্মীদের ভেতরে এখনো কোন নির্বাচনী আমেজ বা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। মামলা এবং নিজেদের দলের কোন্দল মোকাবেলায় বেশী সময় ব্যাস্ত থাকতে হচ্ছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির তেমন দৃশ্যমান প্রচারণা না থাকলেও, তাদের হারানো অবস্থান উদ্ধারের লক্ষে গোপনে তৃণমূল নেতা কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে জনগণের সাথে নিজেদের সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকেই নিজেদের বলয়ের প্রার্থীদের ব্যাপারে দলের কর্মী সমর্থক ও সাধারণ মানুষের কাছে নানা ভাবে হাজির করছেন । দলের সাধারণ কর্মীরাও তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন । দলের কর্মসূচিতে অংশ নেয় কিনা, কর্মীদের খোঁজ খবর রাখে কিনা বা সরকারি দলের নেতাদের সাথে গোপনে আঁতাত করে কিনা এসব বিষয়ে নেতাদের চোখে চোখে রাখছে তৃণমূলের কর্মী সমর্থকরা ।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার ৬টি আসনই আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। একাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (এরশাদ), ইসলামী ঐক্য জোট, সিপিবি, বাসদ ৬টি আসনেই নির্বাচন করার লক্ষ্যে প্রচারণা চালাচ্ছে। নিবন্ধন বাতিল হওয়ার কারণে জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণা নেই বললেই চলে। সবগুলো আসনেই আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী থাকলেও দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচনে কাজ করবে, এ লক্ষ্যে তারা স্ব স্ব এলাকায় প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি সবগুলো আসনেই একক প্রার্থী দিতে চায় এব্যাপারে তারা কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অন্তত ৪টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে সিরাজগঞ্জ বাসীর ধারনা। তবে এর মধ্যে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে যে দল দক্ষতার পরিচয় দিবে জয়ের পাল্লা তাদের দিকেই যাবে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর-সিরাজগঞ্জ সদর)

আওয়ামী লীগের দূর্গ হিসেবে পরিচিত এ আসনটি কাজীপুর পৌরসভাসহ উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হলেও নতুন করে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের পর সদরের আরো একটি ইউনিয়ন এ আসনে যোগ হয়েছে। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪৫ হাজার ১৫৩ জন। তবে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ৩নং বহুলী ইউনিয়নটি ওই সংসদীয় আসনে সম্পৃক্ত হলে প্রায় ৩০হাজার ভোটার বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত প্রতিবারই আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী এ আসনে জয়লাভ করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, জাতীয় চার নেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন শহীদ এম মুনসুর আলীর স্মৃতিবিজরিত এবং আওয়ামী লীগের প্রেডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের একক নেতৃত্বে এ আসনে আওয়ামী লীগের রয়েছে সাংগঠনিক অবস্থান খুবই শক্তিশালী।

হেবিওয়েট আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মাদ নাসিমের বিকল্প কোন সম্ভাব্য প্রার্থী এ আসনে নেই। ১৯৯১ সাল থেকে এ আসনে মোহাম্মদ নাসিম বেশ কয়েকবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন ও জেলার সদরসহ দুইটি আসনে মোহাম্মদ নাসিম এমপি নির্বাচিত হন এবং পরে তিনি কাজিপুরের আসন ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে এ আসন থেকে তার বড় ভাই প্রয়াত ডঃ মোহাম্মদ সেলিম এমপি নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মঈনউদ্দিন ফখরুদ্দিন সরকারের দায়ের করা দুর্নীতির মামলার কারণে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও তার ছেলে প্রকৌশলী তানভীর শাকিল জয় এ আসন থেকে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হন। তিনিও নদী ভাঙ্গা কাজিপুরবাসীর ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করেছেন। এবারও নির্বাচনে মোহাম্মদ নাসিম এ আসনের একক প্রার্থী হলেও যদি তিনি কোনো কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, তবে সে ক্ষেত্রে তার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার তানভীর শাকিল জয় হবেন এই আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মোহাম্মদ নাসিম বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় এমপি নির্বাচিত হন এবং তিনি বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। আপোষহীন স্বাস্থ্য মন্ত্রী দায়িত্ব পালনেও তিনি ব্যাপক সুনাম অর্জন করছেন। সেই সাথে তার নির্বাচনী এলাকা কাজিপুরকে নতুনভাবে সজ্জিত করছেন। রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ ও মাদরাসা নির্মাণসহ এ এলাকায় অসংখ্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছেন। এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুত পৌঁছানোসহ আইসিটি খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। সীমান্ত বাজারে ইন্সটিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি স্থাপন করেছেন। মেঘাইয়ে পর্যটন কেন্দ্র, সোনামুখিতে ষ্টেডিয়াম, বেড়িপোটলে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, রতনকান্দিতে নার্সিং ইন্সটিটিউটসহ অনেক নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। তার নির্বাচনী এলাকার বাগবাটিতে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল স্থাপন করেছেন। যমুনা নদীর ভাঙন থেকে কাজিপুরকে রক্ষায় মেঘাই থেকে ঢেকুরিয়া পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার যমুনা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ এবং সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকা থেকে কাজিপুরের খুদবান্দি পর্যন্ত যমুনা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ ও নদী খনন কাজের জন্য সাড়ে চারশ’ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। কয়েক বছরে সিরাজগঞ্জ-কাজিপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু সংখ্যক ব্রিজ নির্মাণ করেছেন তিনি। এছাড়া মোহাম্মদ নাসিম কাজিপুরবাসীর খোঁজ-খবর নেয়াসহ সকল উন্নয়নমূলক কাজের তদারকী, দলীয় সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করায় তার জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড ও জনগণকে আপন মনে ভালবাসার কারণে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে মোহাম্মদ নাসিমের বিজয় সুনিশ্চিত বলে মনে করছেন তার নির্বাচনী এলাকার জন সাধারণ।

এ আসনে ভোটের রাজনীতিতে বিএনপিরও জনমত এখনও গড়ে তুলতে না পারলেও সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন পাওয়ার জন্য দলের হাইকমান্ডে লবিং গ্রুপিং চালিয়ে যাচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে। এ আসন থেকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজা দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এলাকায় গণসংযোগ, মতবিনিময়সহ কেন্দ্রে জোর লবিং চালিয়ে নিজের প্রার্থীতার বিষয়ে জানান দিচ্ছেন। আগামী সংসদ নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন পেলে আওয়ামী লীগ বিএনপির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বতাপূর্ণ নির্বাচন হবে বলে তিনি আশাবাদী।

জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি নাজমুল হাসান তালুকদার রানাও এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী। বিগত দিনে হামলা-মামলা, নির্যাতনের শিকার হয়েও দলের দুর্দিনে নেতাকর্মীদের পাশে থেকে সব সময় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কাজিপুরে তার জন্মস্থান হওয়ায় তিনি ইতিমধ্যে মনোনয়নের জন্য দলের হাইকমান্ডে জোর লবিংয়ের পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত থেকে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময় দলের ক্রান্তিকালে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি। হামলা মামলা নির্যাতনের শিকার হয়ে একাধিকবার কারাবরণ করেও দলের নেতাকর্মীদের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছি। এজন্য আগামী নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন দিলে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বীতা গড়ে তুলতে পারবেন বলে তিনি মনে করেন।

এছাড়া কন্ঠশিল্পী কনক চাঁপাও বিএনপি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা নির্বাচণী এলাকায় বিভিন্ন স্থানে প্রার্থী হিসেবে জানান দিচ্ছেন। কনক চাঁপা ঢাকায় অবস্থান করছেন দীর্ঘদিন ধরে। এছাড়াও এ আসনটি থেকে জাসদ (ইনু) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ও জেলা জাসদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই তালুকদার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন সম্বাব্য প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে এলাকায়।

সিরাজগঞ্জ-২ (সদর ও কামারখন্দ)

এখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয় সিরাজগঞ্জ জেলার রাজনীতি। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশব্যাপী ব্যাপক উন্নয়ন ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধতার কারণে সিরাজগঞ্জ সদর আসনে আওয়ামী লীগের অবস্থান এবার বেশ শক্ত। সিরাজগঞ্জ সদরের ৬টি ও কামারখন্দ উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে সিরাজগঞ্জ-২ আসন গঠিত।

বর্তমানে এই আসনের এমপি পদে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডাঃ হাবিবে মিল্লাত মুন্না। তার পরও বিএনপি এ অঞ্চলকে নিজেদের শক্ত 'ঘাঁটি' হিসেবে দাবি করে। ভোট সুষ্ঠু হলে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীই একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হবেন বলেও বিশ্বাস বিএনপির সমর্থক ও নেতাকর্মীদের।

যদিও তাদের এমন দাবির সঙ্গে একমত নন প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয় এমপি হাবিবে মিল্লাত মুন্না। বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তার বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলমান উন্নয়নের সামনে উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ জেলায় বিএনপির যে তথাকথিত আধিপত্য তা ভেসে যাবে। এরই মধ্যে দলটির অনেক নেতাকর্মী ধানের শীষ ছেড়ে নৌকার হাল ধরেছেন দাবি করে মুন্না আরও বলেন, আগামী নির্বাচনেও নৌকা প্রতীকের সামনে বিএনপির প্রার্থীদের ভরাডুবি ঘটবে। বর্তমানে বিনা ভোটে এমপি মিল্লাত মুন্নাই যোগ্য প্রার্থী বলে মনে করেন তার অনুসারীরা। সততা, নিষ্ঠা এবং জেলার নানা উন্নয়ন কাজে বিশেষ নজর রাখায় ক্লিন ইমেজের মিল্লাত মুন্না জয়ের ধারা বজায় রাখতে পারবেন বলে বিশ্বাস তার পক্ষাবলম্বনকারীদের।

কিন্তু স্থানীয় ভোটারদের মতে, বিএনপি থেকে আগামী নির্বাচনে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রার্থী হলে আওয়ামী লীগের দাপুটে কোন প্রার্থী না হলে আসনটি হাতছাড়াও হতে পারে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা কর্মীদের একটি অংশের দাবি, বিএনপি থেকে টুকু মাঠে নামলে তাকে ঠেকাতে এ আসনে দলের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের বিকল্প নেই। এর আগে ১৯৯৬ সালে এমপি হিসেবে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ নাসিম।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে অনেকে ডঃ জান্নাত আরা তালুকদার হেনরীর কথাও বলছেন। তবে প্রার্থী যাকেই করা হোক না কেন, ক্ষমতাসীন দলে বিরাজমান দ্বন্দ্ব-কোন্দল মিটিয়ে না নিলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে চড়া মূল্য দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন খোদ দলের নেতারাই। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোন্দলের কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জান্নাত আর তালুকদার হেনরীকে ২১২১ ভোটে হারিয়ে এমপি হন টুকুর স্ত্রী জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি রুমানা মাহমুদ। ২০০১ সালে বিএনপি থেকে ইকবাল মাহমুদ টুকু নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আইনি জটিলতায় প্রার্থী হতে না পারায় তার স্ত্রী রুমানা মাহমুদ নির্বাচনে অংশ নেন।

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ননদের স্বামী ডাঃ হাবিবে মিল্লাত মুন্না আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থিতার জন্যও এরই মধ্যে অনানুষ্ঠানিক ভাবে তিনি প্রচার শুরু করেছেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ হাবিবে মিল্লাত মুন্না স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০১১ সালে সিরাজগঞ্জ সফরে এসে জেলার উন্নয়ন সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর আলোচনায় উঠে আসেন মুন্না। এর পর উন্নয়ন কাজের তদারকির পাশাপাশি জেলার রাজনীতির হাল ধরেন তিনি। সাংসদ নির্বাচিত হয়ে তার কর্মতৎপরতা আরও বৃদ্ধি পায়। তবে জেলার রাজনীতিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে গিয়ে তার অনুসারীদের সঙ্গে মোহাম্মদ নাসিমের অনুসারীরা প্রকাশ্য কোন্দলে জড়িয়ে পড়েন। তাই আগামী নির্বাচনে ডাঃ মুন্না মনোনয়ন পেলেও দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী তার পক্ষে মাঠে নামবেন কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যদিও হাবিবে মিল্লাত মুন্না বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগে কোনো কোন্দল নেই, তবে আছে প্রতিযোগিতা আর বড় দলে এটাই স্বাভাবিক। তবে নৌকার জয় ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সবাই একাট্টা। স্বাধীনতার পর ৪৭ বছরে যে উন্নয়ন হয়নি, শেখ হাসিনার আমলে তার চেয়েও অনেক বেশি হয়েছে। তাই আগামীতেও নৌকার জয় সুনিশ্চিত।

এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হেভীওয়েট প্রার্থী সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি জেলা বিএনপির রাজনীতি একক হাতে নিয়ন্ত্রিত করেন। দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থাকায় তাদের কাছে তিনি প্রাণশক্তি। বিএনপি থেকে টুকুর মনোনয়ন নিশ্চিত বলেই প্রচার চালাচ্ছেন তার অনুসারীরা। নিজেদের শক্ত ঘাঁটি বলে দাবি করলেও বর্তমান সরকার আমলে মাঠে নামতে না পারায় এ আসনের রাজনীতিতে বিএনপি অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নেতৃত্বে দলের বড় একটি অংশ ঘরোয়া ভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। মামলা ও গ্রেফতার আতঙ্কে অধিকাংশ নেতাকর্মীই এলাকাছাড়া। ২০০৮সালে মামলা জটিলতার কারণে তিনি নির্বাচন করতে না পারায় ধানের শীষের হয়ে তার সহধর্মীনী তৎকালীন জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি রুমানা মাহমুদ নির্বাচন করে এমপি নির্বাচিত হন।

দলের সিনিয়র নেতারা মনে করেন, আইনী জটিলতার কারণে আগামী নির্বাচনে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রার্থী হতে না পারলে এ আসনে তার সহধর্মীনী জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি রুমানা মাহমুদ আবারও নির্বাচন করতে পারেন। রুমানা মাহমুদ ইতিমধ্যে দলের কেন্দ্রীয় সকল কর্মসূচিসহ সভা, সমাবেশের মাধ্যমে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। দলের দুঃসময়ে সাধারণ নেতাকর্মীরা তাকে পাশে পেয়ে দারুন ভাবে উজ্জীবিত। তাছাড়া এ নেত্রীর রয়েছে ক্লিন ইমেজ। অনেক নেতাকর্মী মনে করেন আইনী জটিলতায় ইকবাল হাসান মাহমুদ টুক নির্বাচন করতে না পারলে একমাত্র রুমানা মাহমুদকে দিয়েই এ আসনটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। সিরাজগঞ্জ-২(সদর-কামারখন্দ) আসনে বিএনপির অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেন- বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, তারেক পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের সাবেক নিরাপত্তা সমন্বয়ক মেজর মোঃ হানিফ (অবঃ)। বর্তমান সরকারের শাসনামলে আন্দোলন- সংগ্রাম করতে গিয়ে একাধিক বার কারাবরণ কারী নেতা মেজর মোঃ হানিফ (অবঃ) ২০১০ সালে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে হেরে যান। আগামী নির্বাচনে তিনি এ আসন থেকে মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হাই কমান্ডে জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে, জাতীয় পার্টিসহ ছোট ছোট দলগুলোও বসে নেই। এসব দলের নেতাকর্মীরাও নিজ নিজ দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে গণসংযোগ শুরু করেছেন। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আমিনুল ইসলাম ঝন্টু, কামারখন্দ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড শহীদুলাহ সবুজ। জাসদের কেন্দ্রীয় সদস্য ও জেলার সহ-সভাপতি আবু বকর ভূইয়া, বাসদের জেলা সমন্বয়ক নব কুমার কর্মকার নিজ নিজ দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। এ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন কেন্দ্রীয় যুব সংহতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ঝন্টুকে মহাজোট থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়। অপরদিকে আওয়ামী লীগ থেকে জান্নাত আরা তালুকদার হেনরী নৌকা প্রতীকে নিয়ে নির্বাচন করেন। এবারও জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আমিনুল ইসলাম ঝন্টু গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। এ আসনের ভোটারদের মধ্যে হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের বিরাট জনসমর্থন রয়েছে। তবে সাংগঠনিক শক্তি ও হেভীওয়েট প্রার্থী না থাকায় এ জনপ্রিয়তা কাজে লাগাতে পারছে না দলটি। তবে, তিনি এবারও মনোনয়ন প্রত্যাশী এবং বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে জেলার গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে বলে সাধারণ ভোটার ও সচেতন মহল মনে করছেন।

সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ-সলঙ্গা)

মৎস্য ও শস্য ভাণ্ডার নামে খ্যাত রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলা মিলে এ আসনটি গঠিত। এ আসনের মোট ৩ লাখ ৬২ হাজার ৩১ জন ভোটারের মধ্যে রায়গঞ্জেরই আড়াই লাখের বেশি। এখানে বিএনপির শক্তিশালী অবস্থানের কারণে আগামী সংসদ নির্বাচনে শুধু রায়গঞ্জের ভোটাররাই যথেষ্ট বলেও মনে করেন রায়গঞ্জবাসী। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরগরম সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ-সলঙ্গা) আসন।

সর্বশেষ পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে টানা টানা তিনবার বিএনপি ও দু’বার আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত টানা তিনবার সংসদ সদস্য ছিলেন প্রবীণ বিএনপি নেতা আব্দুল মান্নান তালুকদার। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রয়াত ইসহাক হোসেন তালুকদারের কাছে বিপুল ভোটে হেরে যান তিনি। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে টানা দু’বার এমপি নির্বাচিত হন গাজী ইসহাক হোসেন তালুকদার। মেয়াদের দুই বছরের মাথায় গত বছরের ৬ অক্টোবর তার মৃত্যুর পর উপ-নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন তাড়াশ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ম ম আমজাদ হোসেন মিলন। দু’দলেই মনোনয়ন প্রত্যাশীদের প্রায় সবাই রায়গঞ্জের বাসিন্দা। শুধু বর্তমান এমপি আমজাদ হোসেন তাড়াশ উপজেলার বাসিন্দা। যার মাধ্যমে প্রথমবার নিজস্ব কোনো এমপি পেয়েছিলেন তাড়াশবাসী, তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। তাই আগামী নির্বাচনে রায়গঞ্জ থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির যে প্রার্থীই মনোনয়ন পাবেন, তিনিই সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের ‘ভাগ্য নির্ধারক’ হবেন বলে মনে করেন এলাকাবাসি।

এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য গাজী ম ম আমজাদ হোসেন মিলন, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শিল্পপতি লুৎফর রহমান দিলু, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন সুইট, সাবেক সংসদ সদস্য ইসাহাক তালুকদারের ছেলে অ্যাডভোকেট ইমরুল হোসেন ইমন তালুকদার।

অপরদিকে, ১৮ দলীয় জোটের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন- সাবেক এমপি আব্দুল মান্নান তালুকদার, বিএনপির মনোনয়ন চাইতে পারেন রায়গঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি আইনুল হক, কেন্দ্রীয় গ্রাম সরকার বিষয়ক সহ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম শিশির সহ আরো কয়েকজন।

সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া)

উল্লাপাড়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত সিরাজগঞ্জ-৪ আসন। হালনাগাদ এ আসনে ভোটার প্রায় ৩ লাখ ৯৪ হাজার। বিগত দশটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ৪ বার বিএনপি প্রার্থী ২ বার, জাসদ প্রার্থী ২ বার এবং জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ১ বার করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টার্গেট আসনটি ধরে রাখা, আর বিএনপি চায় পুনরুদ্ধার। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মাঠে থাকলেও, বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের প্রচার প্রচারণা বিশেষ দিন গুলোতে পোষ্টার আর বিলবোর্ডে মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

উল্লাপাড়ায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের সাংগঠনিক ভীত মজবুত। আওয়ামী লীগ পরপর দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকায় বিএনপি-জামায়াতের সাংগঠনিক ভীত অনেকটাই নরবরে হয়ে পড়েছে। ২০১৪ সালে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের ছেলে তানভীর ইমাম। ২০১২ সালের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে পুরো ২০১৪ সাল পর্যন্ত উল্লাপাড়ায় জামায়াত-বিএনপি ব্যাপক সন্ত্রাস ও তান্ডব চালায়। ২০১৪ সালের পর সংসদ সদস্য তানভীর ইমাম দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে জামায়াত-বিএনপির ওই তান্ডব শক্ত হাতে দমন করেছেন। তিনি জামায়াত-বিএনপির জ্বালাও পোড়াও ও সন্ত্রাসের রাজনীতির বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখায় বিগত সাড়ে চার বছরে এই জনপদে বিএনপি-জামায়াত আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তানভীর ইমাম এবারও দলের মনোনয়ন চাইবেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তাকে দলীয় মনোনয়ন দিলে, উল্লাপাড়ার সর্বস্তরের দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে এ আসনে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করে উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখবো।

এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী উল্লাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক ও সাবেক এমপি শফিকুল ইসলাম শফি ২০০৮ সালে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ২০১৪ সালে দলের মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হন। ২০১৪ সালে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে শফিকুল ইসলাম অনেকটাই দলের মধ্যে কোনঠাসা হয়ে পড়েন। মনোনয়ন বঞ্চিত হবার পর তার অনুসারীদের নিয়ে স্থানীয় শহীদ মিনারে অনশন করার ঘটনাটি দলের অনেক নেতাকর্মীই ভালো চোখে দেখেননি। এবার দলীয় মনোনয়নের প্রত্যাশায় তার সমর্থকদের নিয়ে মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। তার সময়ের বিভিন্ন উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে পোষ্টার ও লিফলেট বিলি করে আকৃষ্ট করছেন ভোটারদের। তার অনুসারীরা মনে করছেন, এবার এই আসনে শফিকুলই দলের মনোনয়ন পাবেন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ মির্জার মেয়ে সেলিনা মির্জা মুক্তি। তিনি বলেন, মাঠে তার অবস্থা অত্যন্ত ভালো। বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। প্রয়াত পিতা আব্দুল লতিফ মির্জার গ্রহণ যোগ্যতা ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এই আসনে আমাকে মনোনয়ন দিলে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে সহজেই নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারবো।

এক সময় উল্লাপাড়ায় বিএনপি- জামায়াতের সাংগঠনিক ভীত ছিল বেশ মজবুত। কিন্তু বিগত দিনে আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি, সন্ত্রাস আর ধ্বংসের রাজনীতির কারণে দুই দলের নেতাকর্মীরা মামলায় জড়িয়ে অনেকেই এলাকা ছাড়া, আবার কেউ কেউ রয়েছেন কারাগারে। যে কারণে গত সাড়ে চার বছরে এই দুই দলের নেতাকর্মীরা ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বলতে গেলে এদের সাংগঠনিক অবস্থা অনেকটাই দূর্বল। উল্লাপাড়ায় প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব আর কোন্দলে নিজেদের আগুনেই পুড়ছে বিএনপি। এ কারণেই উপজেলা কার্যালয়টির ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় তা হাত ছাড়া হয়ে গেছে। এখানে দুই গ্রুপের দুইটি কমিটি। একটি পূর্ণাঙ্গ আরেকটি আহবায়ক কমিটি। পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি সাবেক এমপি এম.আকবর আলী আর আহবায়ক কমিটির আহবায়ক কেন্দ্রীয় তাঁতী দলের উপদেষ্টা কাজী কামাল। এই দুইজনকে ঘিরেই উল্লাপাড়া বিএনপি দুই গ্রুপে বিভক্ত। কাজী কামাল শহর ভিত্তিক কিছু নেতাকর্মীদের নিয়ে আকবর বিরোধী একটি বলয় তৈরি করেছেন। যে কারণে আকবর আলী দীর্ঘদিন ধরে নিজ নির্বাচনী এলাকায় আসছেন না। এম. আকবর আলী ১৯৯১ ও ২০০১ সালে নির্বাচনে বিএনপির টিকিট নিয়ে এ আসনের এমপি নির্বাচিত হন। এম.আকবর আলী মুঠো ফোনে বলেন, দুই টার্ম এমপি থাকাবস্থায় উল্লাপাড়ায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এখন উল্লাপাড়া যে শিক্ষা নগরী হিসেবে খ্যাত হয়ে উঠেছে সেটি আমারই অবদান। দল মনোনয়ন দিলে আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দলের অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী কাজী কামাল দুই দফা দলের মনোনয়ন চেয়েও মনোনয়ন পাননি। এম. আকবর আলী ও কাজী কামাল দুইজনেরই এলাকায় যাতায়াত খুবই কম। সামান্য প্রচার প্রচারণা যা হচ্ছে তাও দুইজনের অনুসারীরাই করছে। কাজী কামাল আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামী নির্বাচনে তিনি দলের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হলে জনগণের এমপি হয়ে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন। তিনি বলেন, উল্লাপাড়ায় কাজী পরিবারের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। উল্লাপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি তাদের দান করা জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। এসময় তিনি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি করেন এবং দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।

এ আসনে দলের মনোনয়ন চাইতে পারে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত এমপি মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. শামসুল আলম। দুইটার্ম তিনি বিএনপির প্রার্থী হয়ে উল্লাপাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে সামান্য ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। বিএনপির মনোনয়নের জন্য পোষ্টার আর বিলবোর্ডে প্রচারণায় আছেন এ্যাড. সিমকী ইমাম খান, যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আব্দুল ওয়াহাব, কেএম শরাফুদ্দিন উদ্দিন মঞ্জু।

কেন্দ্রীয় জামায়াতের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের হেভিওয়েট প্রার্থী। ২০০৮সালের নির্বাচনে বিএনপিকে পিছনে ফেলে রফিকুল ইসলাম দাঁড়িপাল্লা প্রতীক প্রায় ৯৬ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান দখল করেন। এই জনপদের মানুষের কাছে তিনি খান সাহেব হিসেবে পরিচিত। তবে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীক না থাকায় জামায়াত প্রার্থী স্বতন্ত্র নির্বাচনে খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না বলে ধারণা সাধারণ ভোটারদের। বিগত সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে দলের শীর্ষ নেতাদের সাজা ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবির উল্লাপাড়ায় ব্যাপক সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি জ্বালাও পোড়াও তাণ্ডব করে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করে। সেই থেকে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা পুলিশের নজরদারী ও মামলায় জড়িয়ে যায়। ফলে জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি এখানে অনেকটাই নরবরে হয়ে পড়েছে। উল্লাপাড়ায় লোকমুখে ছড়াচ্ছে জামায়াতের রফিকুল ইসলাম খান দলীয় জোটের প্রার্থী হয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য সচিব আজাদ হোসেন বলেন, কোন অবস্থাতেই ধানের শীষ প্রতীক কাউকে লীজ দেয়া হবে না। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত বলে তিনি মনে করেন। এদিকে রফিকুল ইসলাম খান আদালত অবমানননার অভিযোগে তিন মাসের কারাদণ্ড নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন। এ অবস্থায় তিনি নির্বাচন করতে পারবেন কিনা সেটি নিয়েও প্রশ্নও রয়েছে।

এখানে জাতীয় পার্টির অবস্থা বেশ দুর্বল। তার উপর রয়েছে দলে কোন্দল। দলের মনোনয়ন চাইতে পারে হিল্টন প্রামানিক ওএমএ হাশেম রাজু। ইতিমধ্যেই এমএ হাশেম রাজুর বেশ কিছু এলাকায় পোষ্টার বিতরণ শুরু করেছেন।

সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি ও চৌহালী)

তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ বেলকুচি ও যমুনা নদীবেষ্টিত চৌহালী উপজেলা মিলে সিরাজগঞ্জ-৫ আসন গঠিত। এই আসনে আওয়ামী লীগ মরিয়া তাদের আসন ধরে রাখতে এবং বিএনপি ব্যস্ত পুনরুদ্ধারে। নবম ও দশম সংসদ নির্বাচনে এই আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে রয়েছে। এর আগে এই আসন বিএনপির দখলে ছিল।

এ আসনে মহাজোট থেকে বর্তমান এমপি আব্দুল মজিদ মণ্ডলের ছেলে মোমিন মন্ডল মনোনয়ন চাইবেন বলে সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন। বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস ও ঢাকার বনানী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মীর মোশাররফ হোসেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী।

১৯৭৫ সালের পর প্রথমবার ’৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস জয়লাভ করেন। ২০০১ সালে বিএনপি প্রার্থী সাবেক বিচারপতি মোজাম্মেল হকের কাছে বিপুল ভোটে লতিফ বিশ্বাস পরাজিত হন। ১/১১ পরবর্তী নির্বাচনে সীমানা নির্ধারণ হলে চৌহালী উপজেলা বেলকুচি উপজেলার সঙ্গে যোগ হয় এবং সেই সঙ্গে বদলে যায় ভোটের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ থেকে আবারও প্রার্থী হন আলহাজ্ব আব্দুল লতিফ বিশ্বাস এবং পরাজিত করেন বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদেরকে। লতিফ বিশ্বাস ২০০৮ সালে জয়লাভের পর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন। মন্ত্রী হয়ে দলীয় যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও নিজের সহধর্মিণীকে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং বিএনপিপন্থি মফিজ উদ্দিন লাল খানকে বেলকুচি পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত করেন। মন্ত্রী হয়ে উন্নয়ন করলেও মন্ত্রীত্বের প্রভাব, দলীয় নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করা, বেপরোয়া আচরণসহ নানা অভিযোগ উঠলে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত হন তিনি।

মনোনয়ন বঞ্চিত হলেও সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বিবেচনায় তাকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, জেলা পরিষদ প্রশাসক ও পরবর্তীকালে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া হয় এবং তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আবারও দলীয় যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে নিজের সহধর্মিণীকে বেলকুচি পৌরসভার মেয়র এবং রাজনীতিতে নবীন নিজ পুত্রকে ইউপি চেয়ারম্যান করায় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিয়োগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে লতিফ বিশ্বাস মনোনয়ন বঞ্চিত হন। মনোনয়ন পান ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদ মণ্ডল। মজিদ মণ্ডল ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করলে তার দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেলকুচিতে গ্যাস সংযোগ, রাস্তা-ঘাট স্কুল-কলেজের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এমন আশা সাধারণ জনগণের মাঝে দানা বেঁধে ওঠে। কিন্তু ব্যবসায়িক ব্যস্ততার কারণে দলীয় কর্মকাণ্ডে তিনি তেমন সময় দিতে পারেন নি। মনোনয়ন প্রাপ্তির ব্যাপারে বর্তমান এমপি পুত্র ও এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক মণ্ডল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আন্দুল মোমিন মণ্ডলের নামও আলোচনায় রয়েছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তার পুত্র মোমিন মণ্ডলকে প্রার্থী করার জন্য তার চেষ্টা-তদবিরের অন্ত নেই। সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান এমপির মনোনয়নকে কেন্দ্র করে নেতা-কর্মীরাও দুভাগে বিভক্ত।

এ দুজন ছাড়াও সাবেক ছাত্রনেতা ঢাকা মহানগরের বনানী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সমাজ সেবক ও ব্যবসায়ী মীর মোশারফ হোসেন মনোনয়ন প্রত্যাশী। এ লক্ষ্যে তিনি নির্বাচনী এলাকায় জনসংযোগ করছেন। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কাজ করছেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। কোন পক্ষের সঙ্গে দ্বন্দ্ব না থাকায় সাধারণ ভোটারদের মাঝে তাকে নিয়ে রয়েছে ব্যাপক উৎসাহ। তরুণ ভোটারদের মাঝেও তার গ্রহণ যোগ্যতা রয়েছে তুঙ্গে।

অপরদিকে, ১৮ দলের পক্ষ থেকে তরুণ নেতা কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীম, জেলা বিএনপির সদস্য রাকিবুল করিম পাপ্পু গণসংযোগ করছেন। বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমীরুল ইসলাম খান আলীমের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। অপেক্ষাকৃত তরুণ এই ছাত্রনেতার ক্লিন ইমেজের কারণে এলাকার জনগণ ও নিজ দলে তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন নিয়মিত। আমীরুল ইসলাম খান আলীম ছাড়াও জেলা বিএনপির সহসভাপতি রকিবুল আলম খান পাপ্পু রয়েছেন আলোচনায়। তিনিও জনসংযোগ করছেন। পোস্টার ব্যানার ছাপিয়েছেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত বিএনপির কাছে আসনটি দাবি করেছিল। কিন্তু বিএনপির প্রভাবশালী প্রার্থী মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের জামায়তের সাবেক আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নির্বাচনী আসন পাবনার সাঁথিয়া থেকে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই জামায়াত বিএনপি প্রার্থীকে এ আসনটি ছেড়ে দেওয়ার কথা উঠে।

সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর)

সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) সংসদীয় আসনটি ঐতিহ্যগতভাবেই ব্যাপক আলোচিত। সম্ভাব্য প্রার্থীগণ স্থানীয় পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিজ্ঞাপন প্রকাশের পাশাপাশি ব্যাপক হারে গণসংযোগও করে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। সেই সাথে তারা নিজ নিজ দলের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের সাথে জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনটি ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী দুই হেভিওয়েট নেতা। এরা হলেন- বর্তমান এমপি শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিবুর রহমান স্বপন এবং বিশিষ্ট শিল্পপতি, কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক এমপি চয়ন ইসলাম। এরা ছাড়াও আওয়ামী লীগ থেকে এ আসনে আরো মনোনয়ন চাইছেন-সিরাজগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতের পিপি, মিল্কভিটার ভাইস চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট শেখ আব্দুল হামিদ লাভলু এবং কেন্দ্রীয় যুবলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড কাউন্সিলের প্রধান উপদেষ্টা, বাংলাদেশ টুরিজম বোর্ডের পরিচালক ডঃ সাজ্জাদ হায়দার লিটন।

আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি হাসিবুর রহমান স্বপন ও সাবেক এমপি চয়ন ইসলামের মধ্যকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব অনেক দিনের এবং সম্প্রতি তাদের কর্মকাণ্ডে এ দ্বন্দ্ব আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চয়ন ইসলামের পিতা বাংলা একাডেমির প্রথম মহাপরিচালক ও রাজশাহী বিশ্বিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ডঃ মযহারুল ইসলাম হেরে যান তৎকালীন বিএনপি প্রার্থী বর্তমান আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি হাসিবুর রহমান স্বপনের কাছে। পরে স্বপন বিএনপি ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের ঐক্যমতের সরকারে যোগ দিয়ে শিল্প উপমন্ত্রী হন। পরে ফ্লোরক্রস মামলায় হেরে গিয়ে পদ হারান তিনি। পরে তিনি উপ-নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হলেও নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী চয়ন ইসলামের কাছে হেয়ে যান। এ দু‘জনের মধ্যে দ্বন্দ্বের শুরু মূলত সেখান থেকেই। ২০০৮ সালের নির্বাচনে চয়ন ইসলাম আওয়ামী লীগের এমপি নির্বাচিত হন, আর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন হাসিবুর রহমান স্বপন। ভিতরে ভিতরে তাদের দ্বন্দ্ব থাকলেও প্রকাশ্যে তারা মিলেমিশে কাজ করেন ৫ বছর। ২০১৪ সালে স্বপন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন। এরপর থেকে চয়ন ইসলামের সাথে তার দূরত্ব আবারো বাড়তে থাকে। চয়ন ইসলাম নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে আলাদাভাবে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা সরকার দলীয় প্রার্থীদের টানাপোড়েনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের হারানো এ আসনটিকে পুনঃরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন। সরকার দলীয় সাবেক ও বর্তমান এমপির দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নিজেদের ঘর গোছাতে মাঠে নেমে পড়েছেন। এরা হলেন- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস, শাহজাদপুর পৌর বিএনপির সভাপতি ও বিশিষ্ট শিল্পপতি কেএম তারিকুল ইসলাম আরিফ, বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক এমপি কামরুদ্দিন এহিয়া খান মজলিশ, সাবেক ছাত্র নেতা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহসভাপতি শফিকুল ইসলাম ছালাম এমবিএ, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সহসভাপতি, ডাকসুর সাবেক সমাজকল্যাণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি, সিরাজগঞ্জ জেলা ও শাহজাদপুর থানা বিএনপির সদস্য গোলাম সরোয়ার, সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অধ্যাপক ডঃ এমএ মতিনের ছেলে বিএনপির সমর্থক ডঃ এমএ মুহিত।

এ ছাড়া আগামী জাতীয় সংসদ নির্বচনকে সামনে রেখে জাসদ, বাসদসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের কম বেশি তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে শাহজাদপুরে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) কোন মজবুত ভীত না থাকায় মাঠে ময়দানে নেতা-কর্মীদের দৃশ্যমান কোন কর্মতৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ফলে শাহজাদপুরে জাতীয় পার্টির অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে।

অপরদিকে, শাহজাদপুরে জামায়াতের দৃশ্যত কোন কার্যক্রম চোখে না দেখা গেলেও তাদের মসজিদ ও মাদ্রাসা ভিত্তিক কার্যক্রম উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে পুরোদমে চলছে। স্থানীয় জামায়াতের একাধিক নেতাকর্মী এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আগের চেয়ে তাদের ভোটার সংখ্যা ও সমর্থক বেড়ে প্রায় ২/৩ গুণ হয়েছে। ফলে শাহজাদপুরে তারা আগের চেয়ে এখন আরো অনেক বেশি শক্তিশালী। নিবন্ধন বাতিলের কারণে তারা দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও জোটগতভাবে যাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে তার পক্ষেই তারা কাজ করবেন। তবে দল সিদ্ধান্ত নিলে সে ক্ষেত্রে তারাও এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী দিতে পারেন বলে আভাস দিয়েছেন।

/পি.এস

সিরাজগঞ্জ,বিএনপি,আ.লীগ