• বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

মৌলভীবাজার জেলা ৪ আসনের চালচিত্র

আওয়ামী লীগের দৌড়ঝাঁপ, অন্তরালে বিএনপি

প্রকাশ:  ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:২৩ | আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:৫৮
এম. এ. কাইয়ুম, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রিন্ট

একটি কুঁড়ি দুটি পাতার রাজ্য মৌলভীবাজারে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আগ্রহের কমতি নেই তৃনমূলে। জেলার মোট চারটি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকায় চায়ের টেবিল থেকে রাজনৈতিক টেবিল অবধি সর্ব মহলে সুভা পাচ্ছে একাদশ সংসদের ক্ষমতাসীন দল আ.লীগ, বিএনপির এবং জোট-মহজোট ও শরীক দলের প্রার্থীদের অবস্থান সম্পর্কে । চলছে ব্যক্তি বুঝে আলোচনা-সমালোচনা। সাথে স্থানীয় ভোটারা হিসেব কষছেন গেল ৫ বছরের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে।

বর্তমানে জেলার মোট চারটি সংসদীয় আসন ক্ষমতাসীনদল আ.লীগের দখলে। চারটি আসনে আ.লীগের নির্বাচনের বড় নিয়ামক হয়ে ওঠে চা শ্রমিকদের ভোট । এবার আ.লীগের দখলে হানা দিতে বিএনপি ইচ্ছা পোষন করলেও পরিবেশ পরিস্থিতিতে আর চা শ্রমীকদের একাট্টার কারণে ঘোলাটে অবস্থানে থাকতে হতে পারে প্রার্থীরা। চারটি সংসদীয় আসনের প্রকাশ্যে আ.লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা দৌড়ঝাঁপ করলেও বিএনপির প্রার্থীদের অবস্থান অন্তরালে। বিএনপির অভ্যন্তরীন কোন্দলের কারণে নিজের অবস্থান এখনো পাকাপুক্ত করতে পারেনি স্থানীয় বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। বিএনপির অভ্যন্তরীন কোন্দলের কারণে গেল ইউপি নির্বাচনে জেলার ৬৭ ইউনিয়নের মধ্যে ৬৬টিতে নির্বাচন হয় আর মাত্র ৯টি ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করে।

ইতিমধ্যে মৌলভীবাজার জেলার চারটি আসনের বিপরীতে সরকারি-বেসরকারি বেশ কয়েকটি সংস্থার প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ন তথ্য কেন্দ্রে জমা পড়েছে। ক্ষমতাসীন দল আ.লীগের পাশাপাশি বিএনপি, জাতীয় পার্টি (এরশাদ ও কাজী জাফর) এবং জামায়ত সমর্থিত প্রার্থীদের সর্বশেষ তথ্য আ.লীগের সভানেত্রীর কার্যালয়ে লিখিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এতে মৌলভীবাজার চার আসনের বিপরীতে ক্ষমতাসীন দলের যেমন জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে, সাথে জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়ার ব্যক্তিদেরও নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এদিকে নির্বাচনে মৌলভীবাজার জেলার চারটি আসনের বিপরীতে জয়লাভ করতে চায় বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তবে এ যাত্রায় বিএনপির এ স্বপ্নে আ.লীগের একাট্টার কারণে বেগ পেতে হবে। জেলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে (মৌলভীবাজার-১ (জুড়ী-বড়লেখা), মৌলভীবাজার-৩ (জেলা সদর-রাজনগর) ও মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) সরাসরী আ.লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী দেওয়া হবে এবং শতভাগ সফলতার আসবে বলে জরিপে উঠে এসছে। আর মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনটি জোটের সাথে ভাগ বাটোয়ার করাতে আ.লীগ পক্ষ থেকে প্রার্থী দেওয়ার সম্ভবনা কম। অনুসন্ধানে মৌলভীবাজার চারটি আসনের আ.লীগ, বিএনপি ও শরীক দলের অবস্থান উঠেছে পূর্বপশ্চিমের চোখে-

মৌলভীবাজার-১ (জুড়ী-বড়লেখা)

জেলার ২টি উপজেলা জুড়ী ও বড়লেখা নিয়ে গঠিত এ আসনে বর্তমান সাংসদ জাতীয় সংসদের সরকার দলীয় হুইপ শাহাব উদ্দিন আহমদ। বড়লেখা উপজেলার ১০ ইউনিয়ন ও ১ পৌরসভা এবং জুড়ী উপজেলার ৬ ইউনিয়ন নিয়ে মৌলভীবাজার-১ আসন গঠিত। এ আসনে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ছাড়াও আ.লীগের মুখোমুখি হবে জামায়ত। এ আসনে জামায়তের প্রভাব ব্যাপাক। এখানে জামায়তের অবস্থান কতটা ভিত্তিপূর্ন তা সর্বশেষ বড়লেখা উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষন করলে খোলাসা হয়ে যায়। উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে আ.লীগের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম সুন্দরের অনেকটা কাছাকাছি অবস্থান করেন জামায়াত সমর্থীত প্রার্থী এমাদুল ইসলাম (!) আর তৃতীয় স্থান অর্জন করে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল হাফিজ।

অন্যদিকে এ আসনে বিএনপি-জামায়তের তীব্র দাপট থাকা সত্বেও ভোটের সময় চমক দেখায় নৌকা এমন জনশ্রæতি আছে। আর তা সম্ভব হয় ১৯ টি চা বাগানের চা শ্রমিকদের ভোটার আর বিএনপি-জামায়তের কোন্দল ‘ষোল আনাই’ কাজে লাগায় আ.লীগ। আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আ.লীগের একক প্রার্থী থাকায় এবারও সেই রীতির ব্যতয় ঘটবে না বলে ধারনা স্থানীয়দের। মৌলভীবাজার-১ আসনের বর্তমান সাংসদ সরকারদলীয় হুইপ শাহাব উদ্দিন আহমদ সম্প্রতি নৌকার কাÐারি হিসেবে মেনোনয় চূড়ান্ত করেছে দলটি হাইকামান্ড।

এ আসনের আ’লীগের দুর্গে প্রথম আঘাত আনে জাতীয় পার্টি (এরশাদ)। ৯১’র নির্বাচনের জাপা প্রার্থী অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী বিজয়ী হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী শাহাব উদ্দিন হারানো আসন পুনরুদ্ধার করেন। কিন্তু ধরে রাখতে পারেননি পরবর্তী নির্বাচনে। এড. এবাদুর রহমান চৌধুরী জাতীয়পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগদান করে ২০০১ সালের জোটবদ্ধ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি-জামায়ত জোট সরকারের প্রতিমন্ত্রী হন।

আবার ২০০৮ সালের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শাহাব উদ্দিন আহমদ পুনরায় নির্বাচিত হন এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে জাতীয়পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী আহমদ রিয়াজকে পরাজিত করে তিনি তৃতীয়বারের মত সাংসদ নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি হুইপের দায়িত্ব পালন করছেন।

এ আসনে নির্বাচনে অংশ নিতে চান মোট ৫ জন প্রার্থী। এর মধ্যে আ.লীগের ১ জন আর বিএনপির প্রার্থী ২ জন, জাতীয় পার্টি থেকে ১ জন এবং জামায়ত সমর্থিত প্রার্থী ১ জন । এদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাসীন দল আ’লীগের একক প্রার্থী হিসেবে আছেন বর্তমান সাংসদ ও জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি, বড়লেখা উপজেলা আ.লীগের সভাপতি এবং জাতীয় সংসদের হুইপ শাহাব উদ্দিন। এ আসনে শাহাব উদ্দিন ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থী হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে লড়বেন। এমনটাই সংস্থার রিপোর্টে উঠে এসেছে। জনপ্রিয়তার দিক দিয়েই হুইপ শাহাব উদ্দিন এমপি মৌলভীবাজার-০১ আসনে আছেন শীর্ষে । তবে সেটা সম্ভব হয়েছে এ আসনে আ.লীগের শক্ত আর কোন প্রার্থী না থাকায়।

অন্যদিকে সাবেক প্রতিমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী ছাড়াও বিএনপি থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন, ঢাকাস্থ জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও জুড়ী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমদ মিঠু। জামায়াত নেতা ও ব্যবসায়ী মাওলানা আমিনুল ইসলাম। আর জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন চাইবেন বড়লেখা উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া)

বিগত ১৮ বছর ধরে জাতীয় রাজনীতিতে উপেক্ষিত জেলার একটি মাত্র আসন মৌলভীবাজার-২। জেলার মধ্যবর্তী উপজেলা কুলাউড়া নিয়ে গঠিত এ আসনটিতে ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনটি সংসদ নির্বাচনে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেননি কিংবা মনোনয়ন পননি। আর দীর্ঘ ১৮ বছর যাবৎ এই আসনে বিএনপি-আওয়ামীলীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত কোন প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি। বিশাল চা-শ্রমিক ভোট ব্যাংক খ্যাত এই আসনটিতে প্রতীক নয়, ব্যক্তি ভাবমূর্তিই প্রাধান্য পেয়ে আসছে।

কুলাউড়া উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-২ আসন। এ আসনে রয়েছে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক ভোটার। এর মধ্যে ৫০ হাজারের বেশী ভোট চা-শ্রমিকদের। আগামী একাদশ নির্বাচনে রীতিমত বিপ্লব ঘটবে এ আসনে। গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত রিপোর্ট এবং সরেজমিন ঘুরে এমন তথ্যই পাওয়া গেলো।

একাদশ নির্বাচনে এ আসন থেকে একাধিক প্রার্থীরা অংশ নিতে চাইলে প্রকৃত পক্ষে মাঠে থাকবেন ক্ষমতাসীন দলের হেভিওয়েট চারজন, বিএনপির আছেন ২ জন, জাতীয় পার্টি (এরশাদের ১, কাজী জাফর ১) ২ জন এবং জামায়ত সমর্থিত প্রার্থী আছেন একজন।

এই আসনকে ঘিরে মৌলভীবাজার জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা। কারণ এখানে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি অথবা জাতীয় পার্টি তিন প্রধান দলেরই জনপ্রিয় নেতারা রয়েছেন ¯্রােতের বাইরে। যদিও বিগত প্রায় দেড় যুগ (১৮ বছর) যাবৎ এই আসনে বিএনপি-আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত কোন প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি। কোন দলেরই একক আধিপত্য না থাকলেও নব্বই পরবর্তী ছয়টি সংসদ নির্বাচনে দুই বার লাঙ্গল, দুইবার স্বতন্ত্র একবার করে নৌকা ও ধানের শীষ জয়লাভ করে। ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনটি সংসদ নির্বাচনে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেননি কিংবা মনোনয়ন পননি। ২০০১ সালে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এম শাহীন, ২০০৮ সালে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী নওয়াব আলী আব্বাস খান এবং ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আব্দুল মতিন এমপি নির্বাচিত হন। অর্থাৎ দুইজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও একজন জাতীয় পার্টির প্রার্থী জয়লাভ করলেও আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির কোনো প্রার্থী এ তিনটি নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেননি। শুধু তা-ই নয়; এর কারণ হিসেবে ভোটাররা অবশ্য দুই দলের প্রার্থী মনোনয়নকে দায়ী করেছেন।

বিশাল চা-শ্রমিক ভোট ব্যাংক খ্যাত এই আসনটিতে আওয়ামী লীগ সব সময় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। তবে বিগত অনেক জাতীয় নির্বাচনে ব্যাক্তি ইমেজ দিয়ে সেই ভোট ব্যাংকে ফাটল ধরিয়েছেন অনেকেই। এখানকার ভোটের ইতিহাস বলছে, এ আসনে প্রতীক নয়, ব্যক্তি ভাবমূর্তিই প্রাধান্য পেয়ে আসছে। নৌকা কিংবা ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী যেমন জামানত হারিয়েছেন, হারিকেন প্রতীক নিয়ে মুসলিম লীগের প্রার্থীর বিজয়ী (১৯৮৬ সালে) হওয়ার মতো ঘটনাও আছে মৌলভীবাজার-২ আসনে। তাই ক্ষমতাসীন দল আ.লীগ কিংবা বিএনপির দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ত্রæটি করলেই অনায়াসে হাতছাড়া হবে এ আসন এমনটাই মনে করেন স্থানীয়রা। বর্তমান এমপি আব্দুল মতিনের ব্যক্তি প্রভাব মাঠে না পড়ার কারণে আসন্ন একাদশ নির্বাচনে আওয়ামীলীগে মনোনয়ন তালিকায় তাঁকে নিয়ে হিসেব কষছে না কেউ।

ক্ষমতাসীন দল আ.লীগের বর্তমান সাংসদ বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল মতিন ছাড়াও মনোনয়ন প্রত্যাশী ডাকসুর সাবেক ভিপি ও কেন্দ্রীয় আ’লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, সাবেক জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ কর্মী মরহুম আব্দুল জব্বারের ছেলে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান আসম কামরুল ইসলাম, লন্ডন আ.লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সাংবাদিক কামাল হাসান, সাবেক এ আইজিপি সৈয়দ বজলুল করিম, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক ও সিলেট মহানগন আ’লীগেন সাংঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল । এ আসনে বর্তমান সাংসদ আব্দুল মতিনের জনপ্রিয়তা তীব্রহারে হ্রাস পাওয়া এবং তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ায় আগামী একাদশ নির্বাচনে ব্যাপক হারে আলোচানার অনান্য প্রার্থীরা।

অন্যদিকে বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন দুজন এদের মধ্যে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে পরাজিত করে দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও ঠিকানা গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এম শাহীন । অন্যজন হলেন ২০০৮ সালে বিএনপি জোটের মনোনীত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সহ সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এড. আবেদ রাজা। জাতীয় পার্টি (এরশাদ): জাতীয় পার্টির কেন্দ্রী নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মৌলভীবাজার জেলা কমিটির প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদ এড. মাহবুবুর রহমান শামীম। অ্যাডভোকেট নওয়াব আলী আব্বাস খান একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এ আসন থেকে পৃথক ৩ এমপি নির্বাচিত হন। সর্বশেষ তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি ছেড়ে প্রয়াত কাজী জাফরের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ২০ দলীয় জোটে যান। বর্তমানে ২০ দলীয় জোটে থেকে জোটের প্রার্থী হয়ে আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহী। জামায়ত সমর্থীত প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র হয়ে নির্বাচন করবেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান।

এদিকে বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টে উঠেছে এসেছে বর্তমান সাংসদ আব্দুল মতিনসহ বেশ কয়েকজন আ.লীগে নেতার নাম। এতে একাদশ নিবার্চনে দলীয় মনোনয়ন আব্দুল মতিনকে দেওয়া হলে নিশ্চিত ভরাডুবি হবে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। আব্দুল মতিনের বেলায় জয়ের সম্ভাবনা হিসেবে মাত্র ১০% ধরা হয়েছে। এর বিপরীতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আছেন সুলতান মোহম্মদ মনসুর। দলীয় মনোনয়ন মনসুরকে দেওয়া হলে একাদশ নির্বাচনে ক্ষমতাসীর দল আ.লীগের কোনো প্রকার পরিশ্রম ছাড়াই জয়লাভ করতে পারবে। এছাড়াও জয়ের সম্ভাবনায় আছেন বর্তমান চেয়ারম্যান আসম কামরুল, সাংবাদিক কামাল হাসান।

মৌলভীবাজার-০৩ (মৌলভীবাজার সদর- রাজনগর)

মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-৩ আসন। এ আসনের বর্তমান সাংসদ ক্লিন ইমেজের অধিককারী সৈয়দা সায়রা মহসিন। এখানে আ.লীগের বিপরীতে বিএনপির রয়েছে শক্ত এক প্রার্থী। অন্যদিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আ’লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে রিপোর্টের গুডবুকে উল্লেখ আছে দু’জনের নাম। এরা হলেন বর্তমান সাংসদ সায়রা মহসিন আর অন্যজন হলেন জেলা আ’লীগের সভাপতি নেছার আহমদ। যদিও আ’লীগের খসড়া তালিকায় দলীয় মনোনয়নের জন্য চূড়ান্ত হিসেবে নাম উঠে এসেছে সায়রা মহসিনের।

মৌলভীবাজার-৩ আসনটি মূলত বিএনপির ঘাঁটি বলেই পরিচিত ছিল এক সময়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম. সাইফুর রহমান ছিলেন এখানকার নেতা। এম. সাইফুর রহমান রাজনীতিতে আসেন জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। মোট চারবার তিনি সাংসদ নির্বাচিত হন। জিয়ার মন্ত্রীসভায় প্রথমে বাণিজ্যমন্ত্রী ও পরে অর্থমন্ত্রী হন। পরে ১২ বার বাজেট পেশ করেন। তিনি ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ঢাকা-সিলেট মহা সড়কের খড়িয়ালা নামক স্থানে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। এর আগে ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এম. সাইফুর রহমানকে হারিয়ে বিএনপির কব্জা থেকে মৌলভীবাজার-৩ আসনটি উদ্ধার করেন আওয়ামীলীগ নেতা সৈয়দ মহসীন আলী। ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলী সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে মৌলভীবাজার-৩ আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। পরে উপ-নির্বাচনে তাঁর সহধর্মিণী সৈয়দা সায়রা মহসিনকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দিলে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্ধতায় নির্বাচিত হন।

এ আসেন ক্ষমতাসীন দল আ.লীগের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ৪ জন (প্রকৃত পক্ষে মাঠে থাকবেন ২ জন), বিএনপির ২ জন এবং জাতীয় পার্টির একজন।

আ’লীগের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে আছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসিন আলীর স্ত্রী বর্তমান সাংসদ সৈয়দ সায়রা মহসিন, মৌলভীবাজার জেলা আ.লীগের সভাপতি নেছার আহমদ।

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন সিলেটের উন্নয়নের রুপকার সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের পুত্র, সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি এম. নাসের রহমান। পারিবারিক ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন এম. নাসের রহমান । জাতীয় পার্টি থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন জেলার সভাপতি সৈয়দ শাহাব উদ্দিন আহমদ।

এদিকে জরিপে সৈয়দা সায়রা মহসিনের নাম শীর্ষ রয়েছে। আর বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন নাছের রহমান।

মৌলভীবাজার-৪ ( শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ)

জেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আসন মৌলভীবাজার-৪। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনের বর্তমান জনপ্রয়ি সাংসদ সাবেক চীফ হুইপ ও জেলা আ’লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুস শহীদ। এ আসনের নৌকার এক মাত্র কান্ডারী হিসেবে শক্ত নির্বাচনী কলা কৌশল, মেধা ও বুদ্দিমত্তা দিয়ে সর্বমহলের ভোট বাগে নেওয়ারমতো যোগ্য নেতা হিসেবে তার তুলনা হয় না। এ আসনে অর্ধশতাধিক চা বাগানের চা শ্রমিক ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট ব্যাংক নির্বাচনে ফলাফল নির্ধারনে প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে আর্ভিভূত হন। তাই আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজার-৪ আসনটি। এতে করে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আব্দুস শহীদের বিকল্প আব্দুস শহীদ’ই মনে করেন স্থানীয় ভোটারা।

এলাকায় জনশ্রুতি আছে সাবেক চিফ জাস্টিজের অনুসারী শিক্ষা জীবনের বন্ধু অধ্যাপক রফিকুর রহমান। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের দাবী অধ্যাপক রফিকুর রহমান সাবেক সাবেক চিফ জাস্টিজের অনুসারী হওয়াতে সেসময়ে তিনি আব্দুস শহীদের নির্বাচনী এলাকা কমলগঞ্জে ও শ্রীমঙ্গলে প্রশাসনে একচ্ছত্র দাপট দেখান। সাবেক প্রধান বিচারপতির প্রভাবে স্থানীয় প্রশাসনে সে সময়েও প্রশাসনিকভাবে অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়েন শহীদ। সাবেক চিফ জাস্টিজ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দাপটের সাথে দূর্গাপূজায় শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন মন্ডপে ঘুরে বেড়ান। এরপর অধ্যাপক রফিক আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়ার সুবাদে দলের মধ্যে আধিপত্য ঘটান। জনশ্রæতি আছে অধ্যাপক রফিক ছাড়াও সাবেক চিফ জাস্টিজের অনুসারী হিসেবে খ্যাত- শ্রীমঙ্গল উপজেলা আ’লীগের সাধরাণ সম্পাদক রনবীর কুমার দেব।

এ আসনের মনোনয়ন নিয়ে বিবাদ-বিরোধ রয়েছে দু’দলেই। আওয়ামীলীগের বিবাদ প্রকাশ্য না হলেও বিএনপি’র গৃহবিবাদ অনেকটাই প্রকাশ্যে। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা (বিশেষ করে এমপি আব্দুস শহীদ) মাঠ পর্যায়ে গণসংযোগ সভা সমাবেশে অংশ নিয়ে সরব থাকলেও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ব্যানার ও ফেস্টুনে নিজেদের প্রচারণার সীমাবদ্ধ রেখেছেন।

এই আসনটি হিন্দু, আদিবাসী ও চা শ্রমিক অধ্যুষিত। মোট ভোটারের বিরাট একটি অংশ রয়েছে তাদের দখলে । দেশ স্বাধীনের পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানকার চা শ্রমিকদের ভোটাধিকার দিয়েছিলেন। সে থেকেই চা শ্রমিকরাও বঙ্গবন্ধুর এই প্রতিদান হিসেবে তারা সবসময় নৌকায় ভোট দিয়ে থাকেন। আর এই চা শ্রমিকদের একচেটিয়া ভোটের প্রভাবে এ আসনটিতে সব সময় নৌকারই বিজয় হয়। বলা চলে চা শ্রমিক মানেই নৌকা। মূলত: এই আসনে আওয়ামী লীগের টিকেটে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হওয়া মানেই বিজয় নিশ্চিত। স্বাধীনতা পরবর্তীকালের ফলাফলের ধারাবাহিকতা এটাই প্রমাণ করে। জনশ্রæতি আছে এই আসনের চা শ্রমিক ও নৃতাত্বিক জনগোষ্টির ভোটাররা প্রার্থী দেখে নয়, বরং প্রতীক দেখেই ভোট দেন।

এ আসনে একাধিক চা বাগান থাকার সুবাদে বরাবরই দাপট থাকে ক্ষমতাসীন দল আ.লীগের। বিএনপির শক্ত প্রার্থী থাকার পরও নৌকার কাছে ধরাশায়ী হতে হয়।

১৯৯১ সাল থেকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন পর্যন্ত মৌলভীবাজার-৪ আসনে একাধারে ৫ নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক চিফ হুইপ, মৌলভীবাজার জেলা আ’লীগের সাবেক সভাপতি উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ। তিনি ১৯৯৬ সালে হুইপ, ২০০১ সালে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন দলীয় চিফ হুইপ।

এ আসনে একাধিক প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন চাইলেও জরিপে প্রকৃত পক্ষে ক্ষমতাসীন দল আ’লীগের ১ জন, বিএনপির ১ জন এবং জাতীয় পাটির ১ জন মাঠে থাকবেন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে আছেন বর্তমান সাংসদ ও সাবেক চিফ হুইপ ও জেলা আ’লীগের সভাপতি আব্দুস শহীদ, কেন্দ্রীয় আ.লীগের সদস্য ও কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রফিকুর রহমান, শ্রীমঙ্গল উপজেলা আ’লীগের সাধরাণ সম্পাদক রনবীর কুমার দেব। জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির থেকে একাদশ নির্বাচনে অংশ নিতে চান গত দুটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী থাকা মুজিবুর রহমান (হাজী মুজিব)। জাতীয় পার্টির দলীয় মনোনয়ন চাইবেন কমলগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মো. দুরুদ আলী। তবে এ আসনে আ.লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন বর্তমান সাংসদ আব্দুস শাহীদ আর বিএনপি থেকে মুজিবুর রহমান (হাজী মুজিব)। এনই/

মৌলভীবাজার জেলা