• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

জীবন একটা অসমাপ্ত উপসংহার

প্রকাশ:  ০৬ নভেম্বর ২০১৮, ১৬:৪৩
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
প্রিন্ট

ফ্ল্যাশ ফিকশন গল্পগুলো কয়েকটি অক্ষরের হয়| কিন্তু গল্পের ভিতরতার অর্থ এতো গভীর হয় যা মনকে প্রভাবিত করে | আর্নেস্ট হেমিং ছয় অক্ষরের একটি গল্প লিখেছিলেন| কেউ কেউ বলেন এটি তাঁর লেখা নয়| তর্ক বিতর্ক যাই থাকুক এ ধরণের বিস্ময়কর ছোট গল্প তো সৃষ্টি হয়েছে বলেই তো মানুষের চিন্তার জগতটা বিভিন্নভাবে কাজ করেছে| গল্পটা এমন | অর্থটা দাঁড়ায় এমন এক জোড়া জুতা একটি শিশুর জন্য কেনা হয়েছিল| মমতাময়ী মা তার গর্ভে যে সন্তানকে বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়ে ধারণ করেছিল| স্বপ্ন আর বাস্তবতার রং মিশিয়ে জীবনের সামনের বিচিত্র ধারণাকে জাগ্রত করেছিল| তা নিমিষেই নিঃশেষ হয়ে গেছে| শিশুটির নরম পায়ে জুতো জোড়া আর পড়া হয়নি| কারণ গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসে পৃথিবীর মুখ দেখতে পারেনি সেই শিশুটি| মায়ের আশা আর ভালোবাসা কান্না হয়ে নির্ঝরের স্বপ্নের মতো ভেঙে গেছে| হয়তো এটাই জীবনের দর্শন| তবে গল্পের মধ্যে যখন দর্শন থাকে তখন তা জীবনবোধের আবরণ থেকে টেনে ভিতরের কঠিন সত্যকে বের করে আনে|

দুই দার্শনিক বন্ধু ছিল। তাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব থাকলেও একটা বিষয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ ছিল। একজন মানুষকে খুব অবিশ্বাস করত। সে বলত, মানুষ বিশ্বাসঘাতক একটি প্রাণী। আরেকজন বিষয়টাকে উল্টো করে ভাবত। সে মানুষকে খুব বিশ্বাস করত। তার দর্শনে বিশ্বাসঘাতক বলে কোনো শব্দ ছিল না। একদিন একটি লোক এসে জানাল, অর্থের অভাবে সে তার কন্যার বিয়ে দিতে পারবে কিনা এ বিষয়ে তার মধ্যে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। জামাই পক্ষ মোটা অংকের যৌতুক দাবি করেছে। কিন্তু এর মধ্যে বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। যৌতুকের কারণে তার কন্যার বিয়ে ভেঙে গেলে তার সম্মান বিনষ্ট হবে আর কন্যাটির আর কখনো বিয়ে হবে না বলে লোকটি খুব কান্নাকাটি করতে লাগল। যে দার্শনিক বন্ধুটি মানুষকে বিশ্বাস করত, সে অর্থ সাহায্য দিয়ে লোকটিকে আশস্ত করল যে, তার কন্যার বিয়ের কোনো সমস্যা হবে না। লোকটি অর্থ নিয়ে যাওয়ার সময় দুই বন্ধুকে বিয়েতে নিমন্ত্রণ জানিয়ে গেল। অন্য যে বন্ধুটি মানুষকে অবিশ্বাস করত, সে বিষয়টিকে ভালোভাবে নিল না। বরং লোকটি ফিরে যাওয়ার সময় তাকে ধোঁকাবাজ ও মিথ্যেবাদী বলে গালমন্দ করল। যাই হোক, বিয়ের দিন চলে এলো। দুই বন্ধু সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। কিন্তু হঠাত্ করে বিয়েবাড়ির পরিবেশটা কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেল। যে লোকটা মেয়ের বিয়ের জন্য অর্থ সাহায্য নিতে এসেছিল, সে গ্রামের কয়েক যুবককে ডেকে বলল, ঐ দার্শনিকের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়েটা দিয়ে দাও। ও খুব ভালো মানুষ। আমাকে সাহায্য করেছিল। জোর করে যুবকরা ওই দার্শনিকের সঙ্গে লোকটির মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিল। যে বন্ধুটি মানুষকে বিশ্বাস করত, এ ঘটনার পর তার মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে গেল। আর যে বন্ধুটি মানুষকে অবিশ্বাস করত, তার এ ঘটনার পর মানুষের প্রতি বিশ্বাস তৈরি হলো। কারণ সে জানতে পেরেছিল যে, বিয়ের শেষ সময়ে বরপক্ষ আরো যৌতুক দাবি করেছিল। কিন্তু লোকটার ওই পরিমাণ অর্থ ছিল না। ফলে বরপক্ষ বিয়েতে আসবে না বলে জানিয়ে দিয়েছিল। মেয়েটা তার বিয়ে হচ্ছে না জেনে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। তাই মেয়ের জীবন বাঁচাতে লোকটি তার দার্শনিক বন্ধুর সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তার মানুষের প্রতি অবিশ্বাস থেকে বিশ্বাস তৈরি হলো। আর লোকটি তার সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়নি এই ভেবে যে, লোকটা ফিরে আসার সময় সে তাকে গালমন্দ করেছিল। আর বদরাগী মানুষের কাছে কেউ নিজের মেয়ে বিয়ে দিতে চায় না। সময় ও পরিস্থিতির কারণে আজ দুই বন্ধুর দর্শনগত চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটেছে।

২.

এক গ্রামে একজন খুব কৌতূহলী মানুষ বাস করত। অনেকগুলো প্রশ্ন তার মধ্যে কাজ করছিল। কিন্তু কোনোভাবেই সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর সে খুঁজে পাচ্ছিল না। অবশেষে সেই গ্রামের এক আজব ধরনের দার্শনিকের কাছে সে উপস্থিত হলো। আজব ধরনের এ কারণে বলছি যে, তার দর্শনগত ধারণাগুলো একটু অন্য ধরনের ছিল, যা সচরাচর অন্য দার্শনিকরা সেইভাবে ভাবত না। সে বলত, মাটির কোনো মূল্য নেই যতক্ষণ না সেখানে ফসল ফলানো যায়, যতক্ষণ না একজন মানুষ মাটির ওপর দিয়ে হেঁটে চলে, যতক্ষণ না মাটির নিচ থেকে খনিজ পদার্থ তুলে আনা যায় অথবা মাটিকে খনন করে এর মধ্যে জলধারা তৈরি করা যায়। এক্ষেত্রে সে মাটিকে বলত দেহ আর মাটির মধ্যে যে সৃষ্টিশীলতা তৈরি হতো, তাকে বলত সে আত্মা। কেননা সে বিশ্বাস করত, আত্মা ছাড়া দেহের কোনো মূল্য নেই। একইভাবে সে গাছের শেকড়কে বলত দেহ আর এর ফুল, ফল আর সবুজ রঙের পাতাকে বলত আত্মা। তার যুক্তি ছিল, এমন গাছের পাতা যখন বাতাসের আনন্দে নেচে উঠে তখন প্রাণের স্পদন জেগে ওঠে ধরণীতে। আর পাতা গাছকে বাঁচিয়ে রাখে সূর্যের আলো মেখে। গ্রামের কৌতূহলী লোকটি দার্শনিককে জিজ্ঞেস করল, ‘জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য কি?’ দার্শনিক জবাবে বলল, ‘থেমে যাওয়ার নাম মরণ আর চলার নাম জীবন।’ দার্শনিক আরেকটু ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘মনে করুন বাতাস থেমে গেল আর যদি বাতাস থেমে যায়, মানুষ থেমে যাবে। মানে বাতাসের অভাবে মানুষের মৃত্যু হবে। বাতাস জল তরঙ্গের মতো বয়ে চলেছে বলেই মানুষ বেঁচে আছে আর পৃথিবীর স্বাভাবিক গতি বজায় রয়েছে। যেদিন একজন মানুষ থেমে যাবে বেঁচে থাকলেও তার মৃত্যু হবে আর একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে কিন্তু তার কর্ম ও অবদান তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। একজন লেখকের একটি মূল্যবান বই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। কারণ তার মৃত্যুর পরও সেই বই পড়ে মানুষ উপকৃত হয়। একটি গান একজন মানুষকে মৃত্যুর পরও বাঁচিয়ে রাখে। কারণ সংগীতশিল্পীটি হয়তো মারা গেছেন, কিন্তু তার গান আজো মানুষের আবেগকে তাড়িত করছে।’ লোকটি আরেকটি প্রশ্ন করল, ‘মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য কি?’ দার্শনিক তার রহস্যময় চোখ প্রসারিত করে বলল, ‘মানুষ আর পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। একজন মানুষ যেমন মানুষ হতে পারে তেমনি পশুও হতে পারে, আবার একটি পশু যেমন পশুও হতে পারে তেমনি মানুষও হতে পারে।’ কৌতূহলী লোকটি বেশ অবাক হলো। সে বলল, ‘যদি বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে বলতেন।’ দার্শনিক বললেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার জন্য খন্দকার মোশতাক ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তিনি আসলে মানুষ ছিলেন না— তিনি ছিলেন পশু। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করার জন্য মীরজাফর ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তিনিও মানুষ ছিলেন না— প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন পশু। আর যারা বঙ্গবন্ধু ও নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে রক্ষা করার জন্য প্রাণ দিয়েছিল, তারা ছিল প্রকৃত মানুষ। একটি ক্ষুধার্ত সিংহ যখন নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন সে পশু আর একটি প্রভুভক্ত কুকুর যখন প্রভুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন দেয়, তখন সে পশু নয়— সে একজন প্রকৃত মানুষ।’ কৌতূহলী লোকটি তার সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে খুশিমনে বাড়ি চলে গেল। আর মনে মনে ভাবল, সব প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ করে খোঁজা উচিত নয়।

৩.

ঘটনাটা ১৯৭১ সালের। ৭ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা আর ২৫ মার্চ গণহত্যার পরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। বাংলার দামাল ছেলেরা ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ আর ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে। এক মায়ের দুটি সন্তান ছিল। তাদের বাবা তাদের খুব ছোট রেখে মারা যান। বিধবা মায়ের কাঁধে দুই সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব চলে আসে। যখন তার স্বামী বেঁচে ছিল, সেই সুসময়ে অনেকে তাদের আখের গোছানোর কাজটা করে নিয়েছিল। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর আপনজন আর সুবিধাভোগী কারো খোঁজ পাওয়া গেল না। কেউ কেউ তরুণী মায়ের ভরা যৌবন দেখে তাকে কুপ্রস্তাবও দিল। কিন্তু নিজেকে কীভাবে রক্ষা করতে হয়, জীবন সংগ্রামে লড়ে কীভাবে জয়ী হতে হয়— এ বিষয়টি তিনি খুব ভালোভাবে বুঝতেন। একটা সেলাই মেশিন কিনে তিনি কাজ করা শুরু করলেন। নিজে খেয়ে না খেয়ে ছেলেদের মানুষ করার জন্য প্রাণপণে লড়াই করে যেতে লাগলেন। বড় ছেলেটা যুদ্ধের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র আর ছোট ছেলেটা গ্রামের বখাটে ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করায় তার লেখাপড়া আর বেশিদূর এগোলো না। একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়িতে এসে বড় ছেলেটি তার মাকে বলল, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধে যেতে চাই।’ দুঃখী মায়ের বুক ফেটে কান্না এলেও তিনি তা প্রকাশ করলেন না। হাসিমুখে ছেলেকে বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য পাঠালেন। আর ছোট ছেলেটার আচার-আচরণ মায়ের কাছে ভালো লাগল না। ছোট ছেলেটা ও গ্রামের কিছু লোক মিলে শান্তি কমিটি গঠন করল। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করা, হানাদারদের সাহায্য করা, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া, ধনসম্পদ লুট করা আর মা-বোনের ইজ্জত নেয়া। একদিন মা তার বড় ছেলের সহযোদ্ধাদের কাছে খবর পেলেন, তার সন্তানটি খানসেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হয়েছে। মা কাঁদলেন না। বোবা কান্নাটা বুকে চেপে হাসলেন এই ভেবে যে, তার সন্তান তাকে গৌরবান্বিত করেছে। সে আজ শহীদ জননী। মায়ের ছোট ছেলেটা তার বড় ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদে খুব হাসল আর তার দোসরদের মিষ্টি খাওয়াল। কারণ সে আর মানুষ ছিল না, সে ছিল একটা দানব। মায়ের কাছে ছেলের নানা কুকীর্তির কথা আসতে লাগল। ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের গণহত্যার খবর মায়ের কাছে এলো। মা জানতে পারলেন তার ছোট সন্তান এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। মা মনকে শক্ত করলেন। মা মনকে বিসর্জন দিয়ে মুক্তিগামী মানুষের সঙ্গী হলেন। কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন মনে মনে। তার কাছে বড় ছেলের রাইফেলটি স্মৃতি হিসেবে রেখেছিলেন তিনি। তখনো সেই রাইফেলে তিনটি বুলেট অবশিষ্ট ছিল। ছোট ছেলেটা ঘরে আসতেই মা রাইফেলের তিনটি বুলেট তার বুক বরাবর ছুড়ে মারলেন। রক্ত গড়াল। মা আজ মুক্তির হাসি হাসলেন। কারণ ওই রক্ত ছিল বিশ্বাসঘাতকের রক্ত। মা কান পেতে বাইরে বাংলাদেশের বিজয় মিছিলের শব্দ শুনতে পেলেন। মা ভাবলেন, সব হারিয়ে তিনিও আজ বিজয়ী হয়েছেন। কারণ তিনি রাজাকারের মা নন, একজন মুক্তিযোদ্ধার মা। আর তিনিও যে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যা তিনি আজ জানেন না।

৪.

অনেক সময় অনেক কিছু আমরা গুলিয়ে ফেলি। প্রকৃত তফাতটা বুঝতে পারি না অথবা বোঝার চেষ্টা করি না। এক ছাত্র তার শিক্ষককে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার বিপ্লব আর ষড়যন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য কি?’ শিক্ষক উত্তরে বললেন, ‘ধরো তোমার পরীক্ষার খাতা আমার কাছে। তোমার পাস-ফেল নির্ভর করছে আমার ওপর। এ সময় আমি একটা অসত্ কাজ করে স্কুলের ক্ষতি করতে চাইলাম। বিষয়টি জেনেও যদি তুমি পরীক্ষায় ভালো করার ভয়ে চুপ করে থাকো, তবে সেটা হবে ষড়যন্ত্র আর যদি তুমি এর প্রতিবাদ করো ও এতে বাধা দাও আর আমাকে খারাপ কাজ থেকে বিরত করতে পারো, তবে সেটা হবে বিপ্লব। ছাত্রটি আবার বলল, ‘স্যার চুপ করাটা ষড়যন্ত্র হবে কেন, আমি তো কারো ক্ষতি করছি না।’ শিক্ষক বললেন, ‘তুমি যদি আমার খারাপ কাজের প্রতিবাদ না করো, তবে স্কুলের ক্ষতি হবে আর স্কুলটা না থাকলে অনেকগুলো পরিবার পথে বসবে আর ছাত্ররা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। তখন দেশের ক্ষতি হবে আর দেশের ক্ষতি হলে পুরো জাতির ক্ষতি হবে। একটা প্রজন্ম আর সভ্যতা ধ্বংস হবে, যা কখনো কোনোভাবেই পূরণ করা যাবে না।’ শিক্ষক আবার বললেন, বিষয়টা অন্যভাবেও ঘটতে পারে। ধরো তুমি পরীক্ষায় খারাপ করলে, এজন্য আমি তোমাকে গালমন্দ করলাম। কিন্তু তুমি এটা ভালোভাবে না নিয়ে আমার বিরুদ্ধে অন্যদের কাছে কুত্সা রটালে। এটা হলো ষড়যন্ত্র, আর তুমি যদি আমার গালমন্দকে আশীর্বাদ মনে করে তোমাকে পরিবর্তন করতে পারতে, তবে সেটা হতো বিপ্লব। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এফডব্লিউ টেলর মনের বিপ্লবের কথা বলেছেন। এ মনের বিপ্লব গোলা-বারুদের বিপ্লব নয়। আলোকিত মানুষ হওয়ার বিপ্লব। ছাত্রটি উত্তর পেয়ে প্রশান্ত চিত্তে বাড়ি ফিরে গেল।

এখানে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো— ১. যে দর্শন দুর্বল ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠে তার পরিবর্তন হতে পারে। তবে প্রকৃত দর্শন কখনো পরিবর্তন হয় না যদি সেটা প্রকৃত নীতির ওপর গড়ে ওঠে। দর্শনগত বিষয়টি অনেকে আপেক্ষিক মনে করলেও প্রকৃত দর্শন আপেক্ষিক নয়। ২. জীবন ও মৃত্যুর বিষয়টি নির্ভর করে মানুষের কর্ম ও অবদানের ওপর। অনেকে জীবিত আছে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হলেও তার নিষ্ক্রিয়তার কারণে সে আগেই মরে আছে আর অনেকে মৃত্যুর পরও বেঁচে আছে। সক্রিয় থেকে জীবনযুদ্ধে লড়ে যাওয়ার নামই জীবন। মানুষের মনুষ্যত্ব না থাকলে তাকে পশুর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। আবার পশুর মধ্যে বিবেক জাগ্রত হলে তাকে আর পশু বলা ঠিক নয়, সেও মানুষ। আমরা প্রকৃত মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি। কেননা মানুষ হওয়া কঠিন কিন্তু পশু হওয়া সহজ। ৩. নাই মামার চেয়ে কানা মামাই ভালো। কুলাঙ্গার সন্তানের চেয়ে নিঃসন্তান থাকা ভালো। আর দেশদ্রোহীর মা হওয়ার চেয়ে দেশপ্রেমিকের মা হওয়া ভালো। দেশদ্রোহী দেশকে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দিতে পারে, কিন্তু প্রকৃত দেশভক্তি দেশকে শক্ত ভিত্তির ওপর গড়ে তোলে। দেশদ্রোহী হওয়া সহজ, কিন্তু দেশপ্রেমিক হওয়া তপস্যার বিষয়, যা অর্জন করা কঠিন। আমরা প্রকৃত দেশপ্রেমিক হওয়ার চেষ্টা করি। ৪. ভালো কিছু করার নাম হলো বিপ্লব আর খারাপ কিছু করার নাম হলো ষড়যন্ত্র।

এতো কিছুর পরও জীবন একটা অসমাপ্ত উপসংহার| যেখানে শেষ সেখান থেকেই শুরু| হয়তো সেই জীবনের অসমাপ্ত গল্পটা কেউ কোনোদিন জানবেনা| খোঁজও করবে না|

লেখকঃ শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
apps