• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

বঙ্গবন্ধু তনয়ার হাতে আলোকবর্তিকা

প্রকাশ:  ০৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৫:৫৩
বাহালুল মজনুন চুন্নূ
প্রিন্ট

এই পৃথিবীর ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস। যুগ যুগ ধরে শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে শোষিতরা লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। এই সংগ্রামে আছে রক্তপাত, আছে আত্মত্যাগের সমুজ্জ্বল মহিমা। ফরাসি দার্শনিক জ্যা জ্যাক রুশো তাঁর ‘সোশাল কন্ট্রাক্ট’ (সামাজিক চুক্তি) বইতে বলেছিলেন, মানুষের জš§ হয় মুক্ত হয়ে, কিন্তু জন্মের পরই দেখে তার চারদিকে বাধার শেকল। এই শেকলই হচ্ছে শোষণের অন্যতম হাতিয়ার। সেই শোষণ-নিপীড়নের হাত থেকে মানবমুক্তির জন্য, সামাজিক অসাম্য দূর করার জন্য যুগে যুগে দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিকরা নানা পথ বাতলে দিয়েছেন। সেইন্ট সাইমন, চার্লস ফুঁরিয়ে,ওয়েন প্রমুখ যেখানে সামাজিক অসাম্য ও শোষণকে দূর করতে চেয়েছিলেন সমাজ সংস্কারের মাধ্যেমে, সেখানে কার্ল মার্কস, প্রুধুন, বুকিনিন, ব্লাঙ্কুই প্রমুখদের কেউ কেউ নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যেমে আবার কেউ কেউ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যেমে তা করতে চেয়েছেন। তাঁদের মতাদর্শ অনুসরণ করে দেশে দেশে সংঘটিত হয়েছে নানান বিপ্লব, নানান লড়াই-সংগ্রাম। কার্ল মার্কস, লেনিন, মাওসেতুং, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারা প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য রক্তপাতের অনিবার্যতাকে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁদের কাছে বিপ্লব ও রক্তপাত যেন একই সূত্রে গাঁথা। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি হেঁটেছেন রক্তপাতহীন বিপ্লবের পথে। একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি ডাক দিয়েছিলেন দ্বিতীয় বিপ্লবের। এই বিপ্লব ছিল নব্য প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের সামগ্রিক উন্নয়নের বিপ্লব, বিশেষ করে অর্থনৈতিক মুক্তির বিপ্লব। শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সেই বিপ্লব ছিল এক অনন্য পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও শোষিতের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন পিতার মতোই। তাই তো তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ভাষণে যখন বলেন,‘বঙ্গবন্ধু ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করতে চাই’ তখন এই বাংলায় অন্ধকারের গহীন অমানিশায় আটকে পড়া গরীব মেহনতি মানুষরা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখা শুরু করে।

সপ্তম শতকে গৌড়ের প্রথম সার্বভৌম নরপতি শশাঙ্কের মৃত্যুর পর শতবর্ষব্যাপি অনৈক্য, আত্মকলহ, অনিয়ম, দুর্বলের ওপর সবলের নির্যাতন-নিপীড়নসহ নানা অরাজক পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল। সেই অরাজক পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘মাৎসন্যায়’। ঠিক সেই মাৎসন্যায় পরিস্থিতিই বিরাজ করছিল পঁচাত্তরের পরের একুশটি বছর। আমেরিকার খ্যাতিমান নৃবিজ্ঞানী লুইস হেনরি মর্গানের ‘এনসিয়েন্ট সোসাইটি’ (প্রাচীন সমাজ) বইতে মানুষ বন্যদশা থেকে বর্বরদশায় উত্তীর্ণ হলে যে পরিস্থিতির দৃশ্যপট উল্লেখ করা হয়েছিল, তার থেকেও ভয়ংকর দৃশ্যপট প্রতিটি ক্ষণে মঞ্চস্থ হয়েছিল। চারদিকে শুধু হত্যা, লুটপাট-রাহাজানি, দুর্নীতির মহোৎসব। পুরো দেশকে ঘিরে ধরেছিল দুর্ভেদ্য নিশিথিনী। সেই নিশিথিনী থেকে বাংলার মানুষকে মুক্তি দিতে আলোকবর্তিকা হাতে হাজির হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা।

জন্মের পর থেকেই শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়ার বাইগার নদীর সৌন্দর্য, কাশবন, সবুজ বৃক্ষরাজির সৌন্দর্য যেমন দেখেছেন, তেমনি দেখেছেন দারিদ্রপীড়িত জনগোষ্ঠীর বিবর্ণ চেহারা, শুনেছেন তাদের নিদারুণ ক্রন্দন। দেখেছেন পশ্চিম পাকিস্তানিদের অমানবিক শোষণের বিরুদ্ধে পিতার দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ। তাই তো তিনি দেশ ও মানুষকে ভালোবেসে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য, শৃঙ্খল মুক্তির জন্য নিরলস সংগ্রামে অবিচল পথ হেঁটে চলেছেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দীর্ঘ পনেরো বছর বাংলার জনগণকে সাথে নিয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তানি ভাবাদর্শে বিশ্বাসী পুঁজিপতিতের স্বার্থ রক্ষাকারী বিএনপির দু:শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে ছিয়ানব্বই সালে বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ধ্বংস্তুপের কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লড়াই শুরু করেন তিনি। প্রতি পদেই আসতে থাকে দেশি-বিদেশি নানান বাধা, নানান ষড়যন্ত্র। কিন্তু যাঁর দেহে বইছে জাতির পিতার রক্ত, সে তো ভেঙে পড়ার নয়, থেমে যাওয়ার নয়। তিনি প্রবল বিক্রমে সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করেছেন। তাঁর সেই পাঁচ বছরের শাসনামলে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় নিয়েছিলেন কার্যকরী দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচিসহ নানান যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে। মাঝপথে সেই কাজ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে পাকিস্তানপন্থি বিএনপি-জামায়াত জোটের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কারণে। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আবারও দেশ সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

দেশে আজ উন্নয়নের জোয়ার বইছে। এই জোয়ারকে ‘তৃতীয় বিপ্লব’ বলা যায় যে বিপ্লবে আপামর জনসাধারণ পাচ্ছে আর্থ-সামাজিক মুক্তি। প্রতিটি সেক্টরেই উন্নয়নের ছোঁয়া। হতদরিদ্র মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হয়ে একের পর এক জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন তিনি। এমডিজির আটটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশ অসামান্য সফলতা দেখিয়েছে। দারিদ্র্যের হার দেশে মাত্র ২৪.৮ (চব্বিশ দশমিক আট শতাংশ)। সেটা অচিরেই নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনে তাঁর সরকার বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে। দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দারিদ্র বিমোচন, স্বাস্থ্যে ও শিক্ষার উন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ডিজিটালাইজেশনসহ নানামুখি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করেছেন। ইতোমধ্যে দেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। স্বপ্ন দেখছে উন্নত বিশ্বের দেশের কাতারে যাওয়ার। এই সবই সম্ভব হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও দক্ষ নেতৃত্বগুণে। তাকে তাই বলা হয় ‘উন্নয়নের জননী’। বলা হয় ‘দেশরত্ন’।

তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ফিরিয়ে আনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে চেয়েছিল ষড়যন্ত্রকারী বিএনপি-জামায়েত এবং তাদের দোসররা। ষোড়শ শতকে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি তাঁর ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে বলেছেন,‘মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই খারাপ।’এই কথাটি এ যুগে বিএনপি-জামায়েতের ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে সঠিক। তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেছিল। তারা বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্বকে অস্বীকার করে জনমন থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নষ্ট করে দেশকে বানাতে চেয়েছিল পাকিস্তানের তাঁবেদার রাষ্ট্র। তাই এরা ক্ষমাহীন খারাপ মানুষ। এই ক্ষমাহীন খারাপ মানুষগুলোর চক্রান্ত বাস্তবায়ন হতে দেননি বঙ্গবন্ধু কন্যা। মানবতাবিরোধী ভয়ংকর সব যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করে দেশকে কেবল কলঙ্কমুক্তই করেননি, দেশে ফিরিয়ে এনেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানেই শোষণমুক্ত এক আদর্শিক সমাজ। আর সেই পথেই সফলভাবে এগিয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর হৃদয়ে যেন বাজে জাতীয় কবি নজরুলের সেই বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। মহা বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বণিবে না/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমি রণিবে না। তাই তো সকল বাধাকে তিনি অতিক্রম করে বাংলাদেশকে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের দিকে ক্রমশ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি তাঁর লেখা বই ‘ওরা টোকাই কেন’ (১৯৮৯) তে লিখেছিলেন,‘কত তাজা প্রাণ রাজপথে বুকের রক্ত দিয়ে লিখে যাচ্ছে-এই সমাজ বদলে দাও, আমরাও মানুষ, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই, ক্ষুধা দারিদ্র্যে থেকে মুক্তি চাই।’ এই একটি লাইন বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় তিনি নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পান, তাদের কথা ভাবেন। আর তাই তাদের কল্যাণে উৎসর্গ করেন নিজের সমগ্র জীবন।

তিনি যে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর তা আমরা ঐ বইয়ে বারবার খুঁজে পাই। তিনি ঐ বইতে লিখেছেন,‘আমরা সেই সমাজব্যবস্থা চাই যেখানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকবে। যেখানে প্রতিটি শিশু হবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ। তার জন্ম থেকে স্বাবলম্বী হওয়া পর্র্যন্ত সব দায়দায়িত্ব নেবে সরকার। কোনো শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর নির্যাতন নয়, শ্রেণিভেদ বৈষম্য নয়।’ তিনি শ্রেণিভেদ, বৈষম্য দূর করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার পথও বাতলে দিয়েছেন তাঁর লেখা বই ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ:কিছু চিন্তাভাবনা’ (১৯৯৫) তে। তিনি সেই বইটিতে শোষণের প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দেখিয়েছেন সমাধানের পথ। সেই পথেই দেশ পরিচালনা করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এখনও তিনি শোষণের বিরুদ্ধে নিরলস লড়াই করে যাচ্ছেন। তিনি শুধু এদেশের মানুষকে শোষণমুক্ত করতেই ভূমিকা রাখছেন না, তিনি বৈশ্বিক শোষণের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়িয়েছেন। ছড়িয়ে দিচ্ছেন সবর্ত্র শান্তির বাণী।

সামাজ্র্যবাদীদের ছড়ি ঘোরানো বন্ধ করতে তিনি বদ্ধপরিকর। সামাজ্র্যবাদী শক্তিগুলো তাকে নানামুখি চাপ দিলেও তিনি তাদের কাছে মাথা নত করেননি। এই কারণেই আজ দেশ শোষণমুক্ত সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে পারছে। বঙ্গবন্ধু তনয়া যেভাবে এই দেশে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই করছেন তাতে মুগ্ধ দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসেন ম্যান্ডেলা। তিনি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্যে করে বলেছিলেন, ‘তাঁর নেতৃত্বের অসাধারণ গুণ হলো নিপীড়িত, বঞ্চিত, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। শেখ হাসিনার মানুষের প্রতি ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে।’ শেখ হাসিনার সাফল্য সর্র্ম্পকে বলতে গিয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘বিপুল জনপ্রিয় নেত্রী হলেও তিনি আসলে সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র্র মানুষের কণ্ঠস্বর।’ সেই কণ্ঠস্বরের কল্যাণেই দেশ আজ দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত হচ্ছে, শোষণ-বঞ্চনাহীন সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে পেরেছে। শেখ হাসিনার বয়স এখন বাহাত্তর। এই দেশকে আরো সুন্দর, আরো উন্নতির সোপানে নিয়ে যাবেন তার দীর্ঘজীবন কামনা করি। নেত্রী দীর্ঘজীবী হোন।

লেখক: সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

বাহালুল মজনুন চুন্নু
apps