• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

মানুষ কি তবে বদলেই চলেছে ?

প্রকাশ:  ২৭ অক্টোবর ২০১৮, ২২:৫৫
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
প্রিন্ট

সময়ের পরিবর্তন মানুষের ধারণাকে বদলে দিতে পারছে কিনা সেটি ভেবে দেখার সময় এসেছে | কারণ সময়ের সাথে সভ্যতা ও প্রযুক্তি এগিয়ে যায় | তবে যে কোন সৃষ্টির ক্ষেত্রে পুরোনো ধারণা ভিত্তি হিসেবে কাজ করে | প্রযুক্তির উৎকর্ষের ক্ষেত্রে যেমন নতুন উদ্ভাবনী শক্তির প্রয়োজন, তেমনি পুরনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মৌলিক বিষয়টি প্রয়োগ করা দরকার। একসময় প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ধাতুর ব্যবহার প্রয়োজন ছিল, যা কালক্রমে পরিবর্তিত হয়েছে। এর প্রধান কারণ, অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ধাতু ব্যবহার করে বর্তমানে প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন করা সম্ভব হচ্ছে না। মহাকাশে তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট একটি প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে কাজ করে। তবে এই স্যাটেলাইটের কিছু যন্ত্রাংশ রয়েছে যাদের তাপীয় গুণাঙ্কের একটি নির্দিষ্ট মান বজায় রাখতে হয়, যা প্রচলিত ধাতুগুলো ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ফলে বিকল্প ম্যাটেরিয়াল হিসেবে আজকাল কম্পোজিট ব্যবহার করা হচ্ছে। একটি উড়োজাহাজের ওজন বেশি হলে এর জ্বালানি খরচ বেড়ে যায়। আবার এটি তৈরির ক্ষেত্রে জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। কাজেই বিকল্প হালকা ওজনের ম্যাটেরিয়াল ব্যবহারের মাধ্যমে এ সমস্যাগুলো সমাধানের প্রচেষ্টা চলছে। এখানে পুরনো ধ্যান-ধারণা থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন নতুন ধ্যান-ধারণার মৌলিক কাঠামো গড়ে উঠছে, যা সভ্যতার বিকাশে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

একসময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহন রায় সমাজে বাল্যবিবাহ প্রথা রোধ করার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সামাজিক আন্দোলনের পরোক্ষ প্রভাব সমাজের মধ্যে বিদ্যমান থাকলেও এর প্রত্যক্ষ প্রভাবকে এখনও পর্যন্ত উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তবে আশার কথা হচ্ছে, শিক্ষার উৎকর্ষের মাধ্যমে একজন নারীর মধ্যে যে অগ্রসরমান চিন্তাধারার বিকাশ ঘটছে তা তাকে নিজের মতো করে ভাবতে শেখাচ্ছে। এর ইতিবাচক প্রভাব সমাজের পুরনো গতিপথকে পরিবর্তন করে নতুন গতিধারা সৃষ্টিতে সাহায্য করছে। ফলে নারীরা বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে তাদের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ বলয় গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, তা হল আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম তাদের কর্মসংস্থানের পরিধি বাড়াতে নিজেদের মেধাশক্তি প্রয়োগ করছে। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়েছে। এখন আউসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে চলে এসেছে। এ তথ্যটি জানিয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও পাঠদান বিভাগ। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইন্সটিটিউটের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, অনলাইনে কাজের ক্ষেত্রে ভারত ২৪ শতাংশ অধিকার করেছে। এরপর বাংলাদেশ ১৬ শতাংশ ও যুক্তরাষ্ট্র ১২ শতাংশ অধিকার করেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশকেই পেছনে ফেলতে সক্ষম হয়নি, বরং পাকিস্তান, ফিলিপাইন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, রাশিয়া, ইতালি ও স্পেন বাংলাদেশের পেছনে অবস্থান করছে, যা প্রকৃত অর্থেই গৌরবের বিষয়। এ ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের কারণ হচ্ছে, মানুষের মধ্যে তার নিজের কর্মসংস্থান গড়ে তোলার মতো সৃষ্টিশীল চিন্তাধারা তৈরি হয়েছে। এটি প্রযুক্তির পরিবর্তন ও পেশা পরিবর্তনের মৌলিক ধারণার মধ্যে যোগসূত্র এবং পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করছে। সামগ্রিক বিবেচনায় পুরনো ও নতুন ধ্যান-ধারণার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও কোথায় যেন একটা পারস্পরিক অদৃশ্য সম্পর্ক রয়েছে।

২. সাম্প্রতিক সময়ের একটি সত্য ঘটনা মানুষের মনোস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের বিষয়টিকে প্রভাবিত করেছে, যা প্রণোদনার ক্ষেত্রে বিহ্যাভিওর মোডিফিকেশন থিওরির সঙ্গে সম্পর্কিত। যে থিওরিতে বলা হয়েছে, মানুষের ইতিবাচক ধারণাকে যখন স্বীকৃতি প্রদান করা হয় তখন পরবর্তীকালে সে একই ধরনের ইতিবাচক কাজ করে থাকে। আবার যখন মানুষের নেতিবাচক ধারণা তার কাজের ধারাকে নিরুৎসাহিত করে, তখন সে এ ধরনের নেতিবাচক কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখে ও ইতিবাচক হওয়ার চেষ্টা করে। ফলে ইতিবাচক ও নেতিবাচক ধারণার ফলাফলের ওপর একজন মানুষের পরিবর্তনের বিষয়টি তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার ওপর প্রভাব ফেলে। অতিসম্প্রতি একব্যক্তি দুদকের চেয়ারম্যানের কাছে ‘বাবা তুমি ঘুষ খাও’ শিরোনামে চিঠি লিখে তার জীবনের বাস্তব একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। এই পত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন তার বারো বছরের মেয়ে তনিমার একটি প্রশ্নের কথা। পাশাপাশি মেয়ের সঙ্গে তার জীবনের অনেক স্মরণীয় ঘটনার অবতারণা করেছেন, যা মনকে আলোড়িত করে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেছেন, একদিন অফিস থেকে বাসায় ফিরে এলে তার আদরের মেয়েটি তাকে প্রশ্ন করে, ‘বাবা তুমি কি ঘুষ খাও?’ মেয়ের এমন প্রশ্ন শুনে তিনি বিস্মিত হয়ে পড়েন। তার মনে হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী বলবেন। প্রশ্নটা তার কাছে সহজ মনে হলেও উত্তরটা ছিল অনেক কঠিন। উত্তরে তিনি বললেন, ‘ঘুষ কি কখনও খাওয়া যায়? এটা তো কোনো খাবার জিনিস নয়।’ কিন্তু মেয়েটি আরও পরিষ্কার করে বলল, ‘তুমি ঘুষ খাও নাকি সেটা জানতে চেয়েছি।’ এর সরাসরি উত্তর চাইল সে। এবার একটা কঠিন ও নির্মম প্রশ্ন করল, ‘বাবা তোমার বেতন কত?’ আর বলতে লাগল- ‘এই যে, তুমি গাড়ি কিনেছ, ফ্ল্যাট কিনেছ- এত টাকা কোথায় পেলে, বাবা? মায়ের এত গহনা কোথায় পেলে? লোকজন বাসায় মিষ্টি আনে, ফলমূল আনে, কিসব প্যাকেট আনে, কেন এসব আনে? বলো না বাবা, তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো দুদক না। সত্য কথা বলো বাবা। আমি কিছু চাই না, শুধু সত্যটা জানতে চাই। বলো না বাবা, আমি ঘুষখোরের মেয়ে কিনা।’ বাবা ঘুষ খাওয়ার কথা অস্বীকার করলেন। কিন্তু মেয়েটি তা মন থেকে মেনে নিতে পারল না। পরদিন অফিস থেকে ঘরে ফিরে বাবা দেখলেন পোস্টারে লেখা আছে, ‘ঘুষ খাওয়া চলবে না, কোনোমতে ঘুষ না, ঘুষখোরের কন্যা আমি না।’ এরপর থেকে বাবার সঙ্গে মেয়ের সম্পর্কের দূরত্ব বাড়তে থাকে। বাবার দামি গাড়ি সে ব্যবহার করল না। রিকশায় করে সে স্কুলে গেল। কারণ তার মনে হয়েছে এই গাড়ি ঘুষের টাকায় কেনা। পরদিন আবারও দরজায় পোস্টার দেখা গেল। সেখানে কচি হাতের কালো অক্ষরে লেখা ছিল, ‘সাবধান সাবধান ঘরে ঘরে দুদক। ঘুষখোরের কালো হাত ভেঙে দাও। সত্যের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়।’ এমন আরও অনেক কথা। বাবার গায়ে সে তীব্র একটা ঘুষের গন্ধ পেল। বাবা ভাবছেন আর ভাবছেন। তার মনোজগতে নানা ধরনের চিন্তাধারা তার কপালে অশনি সংকেতের ভাঁজ টেনে দিল। নিজেকে তার চোর বলে মনে হল। বদলে গেল বাবার জীবনধারা। সূত্রপাত হল সততার পথে নতুন জীবনে যাত্রা। এরপর বাবা চিঠির শেষাংশে লিখেছেন, ‘মেয়েটার হাত ধরে বিকালে হাঁটি। মনে মনে ভাবি আমি এখন ভালো আছি। হেরে গেছি নাকি জিতে গেছি তা বুঝি না। তবে মেয়ে আমার জীবনের নতুন মাত্রার সন্ধান দিয়েছে তা বুঝি।’

আমরা কি সবাই এভাবে বদলে যেতে পারি না? বদলাতেই হবে। তা না হলে দুর্নীতির ভয়াল গ্রাসে যেমন ভাঙবে মন, তেমনি ভাঙবে দেশ।

৩. যারা আমার সমালোচনা করে তাদের আমি প্রশংসা করি। কারণ তাদের সত্য-মিথ্যা সমালোচনাগুলো বিশ্লেষণ করে আমি নিজেকে পরবর্তী সমালোচনার জন্য প্রস্তুত রাখি। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হল, আমি একজন অতি নগণ্য মানুষ হলেও তাদের দ্বারা সমালোচিত হতে পারছি। ফলে তারা অন্যদের কাছে আমার প্রচারণা করছে, হোক সেটা ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক। এটাও এক ধরনের অর্জন। কারণ সবাই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারে না। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, আমি যতই তাদের জন্য ভালো কাজ করি না কেন, তারা তাতে খুঁত ধরবে। ফলে এটা আমাকে নিখুঁত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করছে। সমালোচনাকারীরা সবসময় আমার অগোচরে সমালোচনা করে। কাজেই আমি ধরে নেই তারা আমার অগোচরেই এই মহৎ কাজটি করবে। এটা আমার জন্য একটা মজার অভিজ্ঞতা, কারণ তাদের সমালোচনা আমার কানে এনে পৌঁছে দেয় তাদেরই কেউ কেউ। ফলে মানুষকে চেনা ও বিশ্লেষণ করা আমার জন্য সহজ হয়।

সমালোচনাকারীরা একটা গণ্ডির মধ্যে থাকে; কিন্তু সার্বজনীনতা তারা দেখতে পায় না। ফলে তাদের সমালোচনা একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই কাজ করে, যা বিশ্বজনীন সীমা অতিক্রম করার শক্তি রাখে না। আবার অনেক সময় সমালোচনাকারীরা নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে সমালোচনা জন্যই সমালোচনা করে থাকে, যা বোঝা খুব সহজ। আবার হতাশাগ্রস্ত মানুষরাও সমালোচনা করতে পারে। এটা তাদের একটা অসুখ। এটাকে বলে ফিক্সিং। অর্থাৎ যা কিছু ভালো-মন্দ ঘটুক না কেন, তাতে ওই মানুষটার কোনো সম্পর্ক আছে কী নেই সেটা মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হচ্ছে সব ব্যাপারেই তার ওপর দোষারোপ করা। এটাও এক ধরনের মজার অভিজ্ঞতা। অন্য আরেকটি বিষয় এখানে কাজ করতে পারে সেটা হল কন্ট্রাস্টিং পার্সেপশন। অর্থাৎ তাদের পুরনো ধারণাই ঠিক আর নতুন সব ধরনের ধারণাই ভুল। ফলে মানুষের নতুন চিন্তাভাবনাকে তারা গ্রহণ করতে পারে না বলে এক ধরনের হীনমন্যতা থেকে সমালোচনা করে।

অনেক সময় সমালোচনাকারীরা শীতনিদ্রা নীতি অবলম্বন করে মুখে কুলুপ এঁটে রেখে ছক এঁকে সমালোচনা করতে চায়। এরা নিজেদের অতি বুদ্ধিমান প্রাণী ভাবে। আবার একজন নিজেকে অন্তরালে রেখে অন্যকে প্রভাবিত করে সমালোচনা পছন্দ করে। এরাও নিজেদের অতিমাত্রায় বুদ্ধিমান ভাবে। তবে যারা তাদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়, তাদের ব্যক্তিত্বের বিনাশ ঘটে। একটা পুরনো ধারণা আছে- সমালোচনা করে অথবা নিন্দা করে একজন মানুষের মনোবল ভেঙে দেয়া যায়। আধুনিক ধারণা বলছে ঠিক তার উল্টো অর্থাৎ যার সমালোচনা আপনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে করছেন তার মনোবল না ভেঙে বরং অনেক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আজকের সমাজে সমালোচনাটা প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। ফলে সমালোচকদের মন ভেঙে যাচ্ছে আর সমালোচিত ব্যক্তির এটাকে ইতিবাচক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে সমালোচকরা তাকে অখ্যাত থেকে বিখ্যাত বানিয়ে ছাড়ছে। যখন তাদের এ বিষয়ে বোধশক্তি জাগ্রত হয় তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। তারা অনেক পেছনে পড়ে যায়। সবকিছু মিলিয়ে ভাবুন তো আপনি সমালোচক ও নিন্দুক হিসেবে কত মানুষের নিভৃতে উপকার করছেন। জয়তু নিন্দুকরা। আপনাদের জন্য শুভ কামনা।

বৈচিত্র্য ও রূপান্তরের মাধ্যমে মানুষের জীবন গড়ে ওঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই রূপান্তরের বিষয়টি পরিবর্তনশীল হতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জীবনের রূপান্তর ঘটলেও পরিবর্তনশীলতার বিষয়টি সেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে না। কারণ মানুষের জীবনের কিছু মৌলিক বিষয় রয়েছে, যার প্রয়োগের চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটলেও মূল উপাদানের পরিবর্তন ঘটানো উচিত নয়। যেমন- একজন নারী কন্যা হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। এরপর জায়া হিসেবে তার পদযাত্রা শুরু হয়। পরে তার জননী হিসেবে রূপান্তর ঘটে। এখানে পরিবর্তনশীলতার বিষয়টি অপরিহার্য। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে একজন নারীর ভূমিকাও পরিবর্তিত হয়। এখানে ভূমিকাকে দায়িত্বশীলতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। জননী হিসেবে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে তা হলো, সন্তানকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলা। সুশিক্ষার সঙ্গে স্বশিক্ষা ও সংস্কৃতির বিষয়টি নিবিড়ভাবে জড়িত। আবার মানবিক মূল্যবোধ, সততা, নৈতিকতা, উদারতা ও সার্বজনীনতার বিষয়গুলো কোনোভাবে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। কিন্তু সাম্প্রতিককালে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোর ব্যত্যয় ঘটছে। যেমন বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানাগুলোতে মা যখন তার সন্তানকে জঙ্গিবাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, তখন এ ধরনের মনস্তাত্তি্বক পরিবর্তন কোনোভাবেই কাম্য নয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে নারীদের জঙ্গিবাদীদের প্রয়োজনে আত্মঘাতী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এ পরিবর্তন প্রত্যক্ষভাবে সমাজের মূল ভিত্তিকে আঘাত করছে। ফলে শক্ত শিকড়ের ওপর যেখানে নারী সমাজের দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল, তা থেকে এক ধরনের বিচ্যুত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টিকে যদি সতীদাহ প্রথা বা সহমরণের সঙ্গে তুলনা করা হয়; তবে এ ক্ষেত্রে সহজ-সরল একটি সমীকরণের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে এখানে যে বিষয়টি পরোক্ষভাবে কাজ করেছিল তা হলো, এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রীকে বঞ্চিত করা। সাম্প্রতিককালে মমতাময়ী মায়ের নিষ্পাপ সন্তানকে জঙ্গিবাদে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা ও আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতাও আমরা দেখেছি। যদিও সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবী অগ্রসর হয়েছে, মানুষের জীবনধারার পরিবর্তন ঘটেছে; কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা পুরোপুরি পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে স্বামীর রক্ষণশীল আচরণ, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে অনেকে বাধ্য হয়েই নারী আত্মঘাতী জঙ্গি হামলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

সাম্প্রতিককালের একটি ঘটনায় বিকৃত সামাজিক ও মনোজাগতিক রূপান্তরের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। সামাজিক সম্পর্কের বলয় ও রূপান্তর আত্মিক না হয়ে আর্থিক হওয়ায় এ ধরনের বিরূপ সামাজিক প্রতিক্রিয়া কাজ করছে। বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ঘটনা সমাজতাত্তি্বক ও মনস্তাত্তি্বক ধারণা বর্তমান সময়েও শ্রেণি বিভাজনের ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। পত্রিকার খবরে এসেছে ভেবে দেখার জন্য, যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো, ছেলের জন্মদিনে মেয়ে জোগাড় করে দেওয়ার ব্যবস্থা দিলদার আহমেদই করেছিলেন। এ ছাড়া সাফাতের বাবা তার সন্তানের পকেট খরচ হিসেবে প্রতিদিন দুই লাখ টাকা দিতেন। ফলে অর্থ হয়েছে অনর্থকের মূল আর ব্যক্তিত্ব বিকশিত না হয়ে বিকৃত হয়েছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে অপসংস্কৃতির ধারা প্রবাহিত হয়েছে তার প্রভাব পড়েছে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও শিল্পক্ষেত্রে। অপসংস্কৃতিকে সংস্কৃতি ও সমাজের অংশ মনে করে বনানীর ঘটনায় অপরাধটা কোথায় তা সাফাতের মতো তরুণ প্রজন্ম যেমন বুঝতে পারছে না, তেমনি প্রবীণ হয়েও তার বাবা বিষয়টিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে না। সাফাতের মা প্রকৃত অর্থেই বিষয়টিকে উপলব্ধি করে তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, তার সন্তানের নষ্ট হওয়ার জন্য তার বাবা ও বাবার অর্থ দায়ী। সাফাতের সাবেক স্ত্রী বলেছেন, একজন বাবা চান তার সন্তান তার মতো বেড়ে উঠুক। দিলদারও ছেলেকে তার মতোই বানিয়েছেন। এ ধরনের রূপান্তর সমাজের জন্য কাম্য নয়। নিজের বাবা-মাকে হত্যার মাধ্যমে ঐশীর যে ঘটনা সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল, রূপান্তরের পরিবর্তনশীলতাকে সমর্থন করে না। অবৈধ উপার্জনের ফল যে সুখকর হয় না তা স্পষ্ট। পরিবারের সঙ্গে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা ঐশীর মনোজগতে কাজ করেছিল। ফলে পরিবারকেন্দ্রিক উদার ধারণা থেকে বঞ্চিত হয়ে সে বাইরের অবাস্তব জগতের প্রতি আকর্ষিত হয়েছিল।

এই ঘটনাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে সমীকরণটি যে জায়গায় এসে মেলে সেটি হলো, এখানে প্রকৃত দোষী পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র নাকি বিশ্বায়ন। সাধারণভাবে এখানে সন্তানের চেয়ে বাবা-মাকে দোষী করাই সমীচীন হবে। কেননা রূপান্তরের পরিবর্তনশীলতাকে তারা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখতে ব্যর্থ হয়েছেন। সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রাচুর্য ও আভিজাত্যের নেপথ্যে যে একটি কদর্য চেহারা আছে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই দিকটিকে ইঙ্গিত করে। এ জন্য এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করতে গেলে প্রথমে পরিবার, তারপর সমাজ থেকে মাদককে সমূলে বিদায় জানাতে হবে। বেপরোয়া জীবনযাপনের লাগাম টেনে ধরতে হবে। তা না হলে বনানীর মতো এ রকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে। প্রকৃত আধুনিকতা ম্যাকল্যানগিলো আনটোনিয়োনির আধুনিকতার ধারণা থেকে উপলব্ধি করা যায়। তিনি বলেছেন, 'যারা জীবনকে আধুনিকতার বিশুদ্ধতার সঙ্গে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেনি, তাদের ক্ষেত্রে আধুনিকতাকে ধারণ করা খুব কঠিন। কিন্তু প্রকৃত আধুনিকতা বাস্তবিকই মানুষের সঙ্গে মানুষের মানবিক ও উদারনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তোলে।' আমরা সেই আধুনিক রূপান্তরের পরিবর্তনশীলতার প্রত্যাশা করি; যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আলোকিত করবে।

লেখকঃ শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
apps