• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

“আমি আপনাকে কোনদিনও ভুলব না স্যার”

রিয়াজ উদ্দিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাৎক্ষনিক পদক্ষেপ নিলেন সুনামগঞ্জের ডিসি

প্রকাশ:  ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ১৯:৪৬
আল-হেলাল, সুনামগঞ্জ
প্রিন্ট

ভর্তি ফি জোগাড় করতে যখন হিমশিম খাচ্ছিলাম তখন ভেবে ছিলাম এই বুঝি আমার জীবনের সব স্বপ্ন শেষ, এই বুঝি জীবনের আলো নিভে গেল। আমার আর পড়া লেখা করে বাবা,মায়ের স্বপ্ন পূরণ করা হবে না। আমি যখন ছোট তখন বাবা মা আমাকে আদর করে ডাকতেন রিয়াজ উদ্দিন। বড় হয়ে জেলা প্রশাসক হয়ে দেশের মানুষের সেবা করবো। আর সেই স্বপ্ন সত্যি করতে আমার বাবা একজন দিনমজুর কৃষক হয়েও আমাদের তিন ভাই বোনকে লেখা পড়া করাচ্ছেন।

আমাদের ভাই বোনের মধ্যে আমি সবার বড়। পাঁচ জনকে নিয়ে সাজানো আমাদের সংসার। কিন্তু আমার বাবার এখন বয়স হয়েছে। আগের মত জমিতে ধান ফলাতে পারেন না। আমি যখন সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচ.এসসি পাশ করে বাসায় গিয়ে আনন্দের সাথে বাবাকে বললাম তখন বাবা বললেন রিয়াজ উদ্দিন তুই আমার স্বপ্ন সত্যি করবে। তোকে যে জেলা প্রশাসক হতেই হবে। তার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলাম আল্লাহর রহমতে সুযোগ পেয়ে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিন্তু ভর্তি হতে পনেরো হাজার টাকার প্রয়োজন যা আমার বাবার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। বাবাকে যখন পনের হাজার টাকা লাগবে বললাম তখন বাবা কেঁদে ফেললেন আর বললেন এত টাকা আমি এখন কোথায় থেকে জোগাড় করব। অনেকে কাছে গেলেন কিন্তু কেউ বাবাকে সাহায্য করল না। তখন বাবা আমাকে বললেন তোকে মনে হয় আর আমি পড়া লেখা করাতে পারবনা।

তখন আমি বাবাকে বললাম বাবা চিন্তু করো না আল্লাহ তায়লা ঠিক একটা ব্যবস্থা করবেন। যখন রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেল তখন আমি বসে আছি আর চিন্তা করছি এই বুঝি আমার জীবনের সব স্বপ্ন শেষ। হঠাৎ মাথায় এলো অনেক সময় পত্রিকাতে দেখি যে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীদের সাহায্য করে। তার পরের দিন সকাল ১০টার দিকে না খেয়ে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। যখন সুনামগঞ্জ ডিসি স্যারের সাথে এসে দেখা করে বললাম স্যার ১৫ হাজার টাকার জন্য আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারছি না। তখন স্যার আমাকে একটা কথা আগে জিজ্ঞেস করলেন যে বাবা তুমি কি খাওয়া দাওয়া করছো। আমি চুপ হয়ে দাড়িঁয়ে আছি তখন স্যার বললেন বুঝতে পেরেছি তুমি আগে চেয়ারে বসো। অফিস স্টাফ দিয়ে আমার জন্য খাবার আনালেন। তারপর বললেন তুমি চিন্তা করনা যত টাকা লাগে ভর্তি হতে জেলা প্রশাসন থেকে আমি দেবো। তুমি নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও। তারপর আজকে স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বললেন দেখা করার জন্য আমি স্যারের সাথে দেখা করতেই এখানে (ওয়েটিং রুমে) বসে আছি। এইভাবে ভিজে ভিজে চোখে কথাগুলো বলছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া রিয়াজ উদ্দিন।

সে তাহিরপুর উপজেলার কামার কান্দি গ্রামের দিনমজুর কৃষক জয়নাল আবেদীন ও ফুলতারা বেগমের বড় ছেলে। মঙ্গলবার বিকালে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য নগদ ১৫ হাজার টাকা রিয়াজ উদ্দিনের হাতে তুলে দেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ। এসময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার শাখার উপ-পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ সফিউল আলম, সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান, আখতার জাহান সাথী, আব্দুল্লাহ আল মামুন, আকলিমা আকতার প্রমুখ। পরে রিয়াজ উদ্দিনের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার পর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, প্রত্যেক বাবা মায়ের স্বপ্ন থাকে যে তার ছেলে মেয়ে বড় হয়ে ডাক্তার হবে, জেলা প্রশাসক হবে। ঠিক তেমন স্বপ্ন দেখছেন রিয়াজ উদ্দিনের বাবা। আর সেই স্বপ্ন যাতে সত্যি হয় আমরা আজকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য তার হাতে নগদ ১৫ হাজার টাকা তুলে দিয়েছি। তার যদি আরো সহযোগিতা লাগে আমরা জেলা প্রশাসন তা করব। তিনি আরো বলেন, শুধু রিয়াজ উদ্দিন নয় টাকার অভাবে যাদের পড়া লেখা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আপনারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করবেন। তিনি বলেন, শুধু জেলা প্রশাসন নয় আমি অনুরোধ জানাই সমাজে যারা ভিত্তবান মানুষ আছেন আপনারা সকলে রিয়াজ উদ্দিন সহ-আরো যারা আছে তাদের পাশে দাড়াঁন। টাকা পাওয়ার পর রিয়াজ উদ্দিন জেলা প্রশাসকের উদ্দেশ্যে বলেন, সত্যি আজকে আমার জন্য যা করলেন তা আমি কোনদিনও ভুলব না স্যার, যত জীবন বেচেঁ থাকব আমি আপনাকে মনে রাখবো।

/এসএইচ

apps