• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

গবেষণার সৃষ্টির কাছে আলাদিনের চেরাগ কিছুই নয়

প্রকাশ:  ১৪ অক্টোবর ২০১৮, ২১:৩৭
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
প্রিন্ট

একটি দেশকে বদলে দেবার জন্য গবেষণা যেভাবে ভূমিকা রাখে তা অন্য কিছু পারেনা । গবেষণা একটি নতুন ধারণা থেকে সৃষ্টি হয় । কিন্তু নতুন ধারণার সাথে ভাবনার বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলে যেখানে ভাবনাকে উপেক্ষা করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তা কখনোই বাস্তবায়ন করা যায় না। যেকোনো পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভাবনার বিষয়টি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গবেষণার ক্ষেত্রে ভাবনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। যদি আমরা শিল্পায়নের সঙ্গে ভাবনার বিষয়টিকে যুক্ত করতে চাই তবে এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার বিষয়টি কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটে। আর প্রযুক্তি পরিবর্তন সম্ভব হয় বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার মাধ্যমে। আবার প্রযুক্তি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়নের গতি-প্রকৃতিও পরিবর্তিত হয়।

উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে যে শিল্প ধারণা বিদ্যমান তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাকে আমাদের দেশের আঙ্গিকে কিভাবে রূপান্তর করা যায় সেই বিষয়টিও ভাবতে হবে। আমাদের দেশের মধ্যে বিদ্যমান কাঁচামাল বিবেচনা করে আমাদের শিল্পায়নকে আমাদের মতো করে সাজাতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে এই শিল্প যাতে প্রবেশ করানো যায় সে ধরনের গুণগত মানের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকার ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন খোলার উদ্যোগ নিতে পারে। যাদের মূল উদ্দেশ্য হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরে যে নতুন উদ্ভাবন ও ধারণাগুলো আসে তা শিল্পে রূপ দেওয়া যায় কি না এই বিষয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করা। কিভাবে সেটির ব্যাপারে শিল্পোদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব সেটির দায়িত্বও এই ইনস্টিটিউটকে নিতে হবে। আবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ইনস্টিটিউট যাতে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে কাজ করতে পারে সে ধরনের যোগাযোগের প্রত্যক্ষ মাধ্যম গড়ে তুলতে হবে। নতুন শিল্প ধারণার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষার পারস্পরিক যোগসূত্র তৈরি করে বহুমাত্রিক গবেষণার ধারণা সৃষ্টি করতে হবে। তবে এ ধরনের গবেষণাগুলো যাতে দেশপ্রেমের মানসিকতা থেকে আসে সে ভাবনার জায়গাগুলো গবেষকদের মধ্যে থাকতে হবে। একজন গবেষক যদি এই ফলিত ও মৌলিক গবেষণার ফলাফল জানতে না পারে তবে সে তার শিল্পায়নের ধারণাকে এগিয়ে নিতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্পায়নের গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে সারা দেশে বিশেষ কয়েকটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত প্রহণ করেছেন। এরই মধ্যে এগুলোর কয়েকটির প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, চীন এই বিশেষ ধরনের শিল্পাঞ্চল গঠনের বিষয়টি অনেক আগেই চিন্তা করেছে। এই শিল্পাঞ্চল গঠনের মাধ্যমে সাংহাই শহর থেকে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প ধারণা ও তার বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব হয়েছে। চীনে সমাজতন্ত্র প্রচলিত থাকলেও এই বিশেষ অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রে উদার শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক ধারণাকে গ্রহণ করা হয়েছে।

ফলে খুব দ্রুত সময়ে শিল্পায়নের সমৃদ্ধির মাধ্যমে চীনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা গেছে। এই শিল্পাঞ্চলগুলোতে তারা যেমন অবাধ বাণিজ্যের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, তেমনি দেশের শিল্পায়নকে নিজের মতো করে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এখানে চীন রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি ট্রান্সফারের মতো কৌশলকে তাদের শিল্পনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই টেকনোলজি ট্রান্সফারের মাধ্যমে চীন, আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলো থেকে প্রযুক্তি ধারণাকে তাদের দেশে নিয়ে এসেছে, এরপর সেই প্রযুক্তিজ্ঞানকে তারা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োগ করার কৌশলটি বেছে নিয়েছে। যেমন, এ ক্ষেত্রে চীন কোনো একটি ভালো মডেলের গাড়ি জার্মানি বা আমেরিকা থেকে নিয়ে আসে। পরে তারা গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ গাড়ি থেকে আলাদা করে খুলে নেয়। এর মাধ্যমে তারা গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা অর্জন করে। যখন পুরো বিষয়টি কয়েকবার বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা বুঝে উঠতে সক্ষম হয়, তখন তারা আবার যন্ত্রাংশগুলোকে একত্র করে গাড়িটিকে আগের অবস্থায় নিয়ে আসে। এই কৌশল অবলম্বন করে তারা উন্নত রাষ্ট্রগুলোর প্রযুক্তিকে নিজেদের প্রযুক্তির আদলে রূপান্তর করে। একই সঙ্গে তারা নিজস্ব কাঁচামাল ব্যবহার করে গাড়িটির মূল্য উন্নত রাষ্ট্রগুলোর গাড়ির মূল্যের থেকে অনেক বেশি কম রাখতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশেও তাদের শিল্পাঞ্চলগুলোতে এ ধরনের ধারণা প্রয়োগ করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে নিজস্ব ভাবনার স্বকীয়তা যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ কোনো একটি ধারণাকে পুরোপুরি অনুকরণ না করে অনুসরণ করা যেতে পারে। এখানে অনুসরণ বলতে আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের সংস্কৃতিকে ধারণ করে নতুন ভাবনা বা অন্য কোনো ভাবনার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে নিজেদের শিল্পক্ষেত্রে সমৃদ্ধ করা। এছাড়া শিল্পাঞ্চলগুলোর সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যুক্ত করে এই অঞ্চলগুলোতে একটি করে নতুন শিল্প ধারণার বিশেষায়িত গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে। এর মাধ্যমে যেমন বিদ্যমান শিল্পগুলোর গুণগত মান বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে, তেমনি নতুন নতুন শিল্প ধারণা সৃষ্টি করে তা বাস্তবে প্রয়োগ করা যাবে। কোনো একটি নতুন শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে প্রথমে খুব ছোট আকারে শিল্পটির বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

এর সঙ্গে এই শিল্প কিভাবে আরো বড় আকারে করা যায় এবং এটিকে কিভাবে রপ্তানিযোগ্য শিল্পে পরিণত করা যায় সেই বিষয়গুলো ভাবতে হবে। অনেক শিল্প ধারণা প্রয়োগের সুযোগ থাকলেও এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে তা তেমনভাবে দেখা যাচ্ছে না। যেমন-বায়োফুয়েল, বিভিন্ন ধরনের কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল, সফটওয়্যার, রোবটিকস, বায়োমেডিক্যাল সামগ্রী, সামুদ্রিক শিল্প, এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রির মতো শিল্পায়নের সম্ভাবনা বাংলাদেশে সৃষ্টি করা যায়। এই সম্ভাবনাগুলো সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ এ ধরনের সামগ্রী বিশ্ববাজারে রপ্তানি করার সুযোগ লাভ করবে। এতে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, তেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়নও তরান্বিত হবে। এ ধরনের ভাবনা শুধু শিল্পায়নের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। থ্যালার ও অমর্ত্য সেন মনের উন্নয়নের সঙ্গে মানবিক প্রগতি এবং মানবিক প্রগতির সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রগতির কথা উল্লেখ করেছেন। এখানে মানবিক প্রগতি বলতে ইতিবাচক মানসিকতাকেই বোঝায়। আর এই ইতিবাচক মানসিকতা যখন ইতিবাচক ভাবনাকে প্রভাবিত করবে তখন রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি অক্ষুন্ন রাখা সম্ভব হবে। কাজেই সময়ের প্রয়োজনে ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে ইতিবাচক ভাবনাকে মানবিক সংস্কৃতিতে রূপান্তর করার কৌশল আমাদের গ্রহণ করতে হবে। সময় বদলেছে আর সময়ের সঙ্গে ভাবনার মানবিক সংস্কৃতি থেকে বিভিন্ন ধারার ও ক্ষেত্রের মানুষের গ্রুপভিত্তিক গবেষণার প্রয়াস চলছে। কারণ একজন মানুষের সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞের জ্ঞান থাকা সম্ভব নয়।

বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা যখন একত্র হয়ে গবেষণার কাজ করেন, তখন ভিন্ন ভিন্ন ধারণার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক শনাক্ত করে বড় আবিষ্কার বা উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়। এটি মৌলিক বা ফলিত যেকোনো ধরনের উদ্ভাবন হতে পারে। এই গ্রুপভিত্তিক গবেষণার কাজটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের সমন্বয়ে যেমন হতে পারে, তেমনি আমাদের দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রুপভিত্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে হতে পারে। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানও যুক্ত হতে পারে। অন্যভাবেও এই গ্রুপভিত্তিক গবেষণার কাজটি হতে পারে, তা হলো বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাস্তবসম্মত যোগাযোগ ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। একটি কথা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে, তা হলো ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী। আর বিশ্বজনীন গ্রুপ রিসার্চের ক্ষেত্রে এই কথাটি খুব বেশি যথার্থ ও সঠিক বলে ধরে নেওয়া যায়। যাঁরা গ্রুপরিসার্চে আগ্রহী বা বিশ্বজনীন গ্রুপ রিসার্চের ধারণাকে বাস্তবে প্রয়োগ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তাঁদের স্বল্প মেয়াদে ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো হিসেবে সরকার বিশ্বের অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। তবে এটি যেন ফলপ্রসূ হয়, আর এর ফলাফল যাতে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। আবার এ ধরনের স্বল্পকালীন গবেষণাসম্পৃক্ত ভ্রমণের সময় উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব সুবিধা ও বিভিন্ন শিল্প-কারখানা পরিদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। যাতে করে সেই দেশগুলোর প্রযুক্তির উন্নত ধারণা বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও গবেষণার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। গ্রুপ রিসার্চের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বোঝাপড়া, প্রদ্ধাবোধ ও অন্যের মতামতকে প্রহণ করার মতো মানসিকতা থাকতে হবে। আবার আত্মসমালোচনার জায়গায়টি যাতে তৈরি করা যায় সে বিষয়টিও লক্ষ রাখতে হবে। একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো গ্রুপের বিভিন্ন গবেষকের মধ্যে কোনো একটি গবেষণার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মতামত থাকতে পারে। এটাকে নেতিবাচক দ্ব›েদ্ব পরিণত না করে ইতিবাচক দ্ব›েদ্ব রূপান্তর করার মনোভাব থাকা খুব বেশি দরকার। সমাজের গতিধারার পরিবর্তনের কারণে মানুষের একত্র হয়ে কাজ করার সক্ষমতা দিন দিন কমে আসছে। এর প্রতিফলন আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও দেখা যাচ্ছে। সবার মধ্যে অসম প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজেকে এককভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা থাকলেও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফলাফল অর্জনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। ফলে শিক্ষকদের মধ্যে যেমন কাজ করার ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না, তেমনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক কাজ করার ক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রয়াস ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।

কিন্তু গ্রুপভিত্তিক গবেষণার সংস্কৃতি ও ধারণা যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে তৈরি করা যায়, তবে শিক্ষকদের মধ্যে পদ-পদবির জন্য দলাদলি থাকবে না। বরং বুদ্ধিভিত্তিক সমন্বিত গবেষণা প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে যেমন সম্প্রীতি তৈরি করতে পারবেন, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণার মাধ্যমে দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবেন। আর শিক্ষার্থীরাও গবেষণার প্রতি আকৃষ্ট হবে। এ জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ সোসাইটি গড়ে তোলা দরকার। আর এ বিষয়ে সরকার ও ইউজিসি পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এ ধরনের রিসার্চ সোসাইটি আইনের মাধ্যমে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে তুলতে পারলে বহুমাত্রিক গবেষণার ধারণা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। এই সোসাইটির মাধ্যমে গবেষণার ক্ষেত্রে প্রতিবছরের অর্জনগুলো যাচাই করে দেখতে হবে ও একটি দায়বদ্ধতার জায়গা তৈরি করতে হবে। আবার রিসার্চ সোসাইটির মাধ্যমে যে গবেষণাগুলো পরিচালিত হবে তার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের রিসার্চ সোসাইটির মাধ্যমে ফলিত গবেষণার চেয়ে মৌলিক গবেষণাকে প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ ফলিত গবেষণা বাংলাদেশে যে পরিমাণ হচ্ছে মৌলিক গবেষণা সে ক্ষেত্রে নেই বললেই চলে। কিন্তু মৌলিক গবেষণা ছাড়া একটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটাতে পারে না। গ্রুপভিত্তিক কয়েকটি গবেষণার দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। যেমন—রোবটিকস নিয়ে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যখন মৌলিক ও ফলিত গবেষণা করবে, তখন বহুমাত্রিক গবেষণার ধারণা একক গবেষণার ধারণা থেকে বেশি ফলপ্রসূ হবে। এর কারণ হলো রোবটের ব্যবহার অনুসারে এর মূল স্ট্রাকচার বা বডি ডিজাইন করবেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রিধারী গবেষকরা। এ ক্ষেত্রে রোবট তৈরির ম্যাটেরিয়াল যাচাই ও বাছাই, রোবটের যে বিভিন্ন মোশন আছে সেগুলোর ফলে ম্যাটেরিয়ালের কী পরিমাণ ক্ষয় হচ্ছে, এ বিষয়গুলো মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গবেষকরা তাঁদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন। রোবটের বিভিন্ন জটিল মোশন চালু রাখার জন্য যে জটিল ইলেকট্রিক্যাল সার্কিটের প্রয়োজন হবে, এর ডিজাইনও তৈরি করবেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রিধারী গবেষকরা। আর এটিকে বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে ও সেন্সর ব্যবহার করে ইন্টারফেসিংয়ের কাজ করবেন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষকরা। আবার এখানে কন্ট্রোল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও প্রডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সংশ্লিষ্ট গবেষকদেরও যুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে। যদি এই রোবটটি বাণিজ্যিকীকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তবে সে ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ, সমাজতত্ত¡বিদ ও মনস্তত্ত¡বিদদের গবেষণালব্ধ দৃষ্টিভঙ্গিকেও বিবেচনায় আনতে হবে। আর এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন ও আধুনিক চিন্তাধারা যুক্ত হতে পারে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান হলো গৌণ, নতুন শিক্ষা উদ্ভাবন হলো মুখ্য।’ আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার নতুন উদ্ভাবনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে গ্রুপভিত্তিক গবেষণাকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মাধ্যমে গবেষণাভিত্তিক যে প্রকল্পগুলো পরিচালিত হচ্ছে, তার মাধ্যমে নতুন ধারণা ও সৃষ্টি গ্রুপভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমেই সম্ভব হচ্ছে। আমাদের দেশেও নাসার মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে গবেষণাকে বাস্তব অর্থে শিল্পমুখী করে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা যেতে পারে। বিল গেটস, স্টিভ জবসের যে আধুনিক সফটওয়্যার কম্পানিগুলো রয়েছে, তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় ও তাঁদের ইন্ডাস্ট্রির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে গবেষণাকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের গবেষণার সুবিধা হলো, এতে পিএইচডি, পোস্ট-ডক্টরাল ও মাস্টার্স লেভেলের পূর্ণকালীন শিক্ষার্থী রিসার্চ ফেলো হিসেবে পাওয়া যায়। এতে করে এই রিসার্চে সার্বক্ষণিকভাবে সম্পৃক্ত থেকে একজন শিক্ষার্থী আর্থিক স্বাধীনতা লাভ করে। ফলে আর্থিক স্বাধীনতার কারণে সেই শিক্ষার্থী নিবিড়ভাবে গবেষণাকার্য চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত এ ধরনের গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায়নি। ফলে একজন শিক্ষার্থী সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজে যুক্ত থাকায় তার পক্ষে গবেষণায় গভীরভাবে সম্পৃক্ত থাকা সম্ভব হয় না। এ কারণে মৌলিক গবেষণার যে উৎকর্ষ সাধন হওয়ার কথা ছিল, তা সেভাবে হতে পারেনি। গবেষণা শুধু ফলিত গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। কাজেই গবেষণা ও উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তিকে সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। সবকিছু বিবেচনা করে আমরা একটি কোথায় দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি তা হলো গবেষণার সৃষ্টির কাছে আলাদিনের চেরাগ কিছুই নয়।

লেখকঃ শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
apps