• বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ২ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

মানুষ বলেই আমাদের ভাবতে হবে

প্রকাশ:  ১১ অক্টোবর ২০১৮, ২২:১০
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
প্রিন্ট

মানুষের ভাবনায় বৈচিত্র্য থাকতে হয়। বৈচিত্র্য আছে বলেই জীবন গতিশীল থাকে। জীবনের বৈচিত্র্য মানুষকে এগিয়ে দেয়, দেশ আর সভ্যতাকে এগিয়ে নেই। সময় হয়তো এই বৈচিত্রপূর্ণ ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে। সেটা স্বাভাবিক তবে সেটি ইতিবাচক ধারণার উপর হতে হবে। সময়ের মতো প্রযুক্তির প্রভাব থাকে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সব ভাবনা বৈচিত্রে নিজের নিয়ন্ত্রণ ও তাকে প্রয়োগ করার উদার দৃষ্টিভঙ্গি থাকা দরকার। সেটা স্বল্প মেয়াদি যেমন হবে তেমনি দীর্ঘ মেয়াদিও হতে হবে। মানুষের ভাবনা তাকে তার লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাবে কিনা এটি তার বিশ্বাস আর মনের পারস্পরিক বন্ধন কতটা দৃঢ় তার ওপর নির্ভর করে। আবার দর্শনের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক আছে কিনা অথবা একটি অপরটির পরিপূরক কিনা তা বিশ্লেষণ করা দরকার। গ্রিক চিন্তাবিদ পিথাগোরাস ফিলোসফি বা দর্শন বিষয়টি যে মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে তা বাস্তবতার নিরিখে বিবেচনা করেন। পিথাগোরাস নিজেকে জ্ঞানী বা বিদগ্ধ ভাবতেন না, বরং জ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহ ও অনুরাগকে প্রাধান্য দিতেন। কারণ জ্ঞানের প্রতি অনুরাগের সঙ্গে নীতিবিদ্যা, অধিবিদ্যা ও যুক্তিবিদ্যার এক ধরনের অদৃশ্য যোগসূত্র রয়েছে। এর সঙ্গে জ্ঞানতত্ত্ব ও রাজনৈতিক দর্শনের বিষয়টি গভীরভাবে সম্পর্কিত।

রামচন্দ্র গুহ এক নিবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু এবং বিআর আম্বেদকর এ চারজনকে আধুনিক ভারতের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাদের জাতীয়তাবোধ ও রাষ্ট্র চেতনা ভারতবর্ষের স্বাধীনতার মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে বলে তার গবেষণামুখী প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করেছেন।

প্রবন্ধটি পড়ে এক তরুণ অঙ্কশাস্ত্রবিদ রামচন্দ্র গুহকে প্রশ্ন করেন, এ তালিকায় রবীন্দ্রনাথ কেন? এর কারণ ছিল রবীন্দ্রনাথের দর্শনচর্চা। তিনি ইউরোপীয় রেনেসাঁ থেকে মুক্তি, সমতা, স্বাধীনতা সংক্রান্ত জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। এর সঙ্গে দেশজ সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে যে জ্ঞান সৃষ্টির উপাদান তৈরি হয়েছিল তা তাকে ভাববাদী জ্ঞানের প্রতি অনুরাগী করে তুলেছিল। যার মধ্যে স্বদেশ প্রেমের মূল্যবোধ ও দর্শন কাজ করেছিল। যা তাকে আধুনিক ভারতের রূপকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি যদিও কবি ছিলেন তবু বিজ্ঞানের জ্ঞানকে জীবনে গ্রহণ করার জন্য আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, জগদীশ চন্দ্র বসু ও আইনস্টাইনের মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগসূত্র গড়ে তুলেছিলেন, যা তাকে বিজ্ঞান দর্শনে প্রভাবিত করেছিল। তিনি তাই বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে দেশ গঠনের যৌক্তিক ধারণা সমাজে তৈরি করেছিলেন। আবার দর্শনগত চিন্তা যখন বিজ্ঞানের জ্ঞান ও ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয় সে ক্ষেত্রে কোনো মতভিন্নতা থাকলেও যৌক্তিকভাবে যা প্রমাণিত হয় তাকে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তোলা দরকার। কেননা সময়ের সঙ্গে দর্শন ও জ্ঞানের ধারণা পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে চির সত্য বলে কিছু নেই। আর দর্শনের অনেক ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, গ্যালিলিওর আবিষ্কার প্লেটো ও এরিস্টটলের জ্যোতির্বিজ্ঞান মডেলের বিপরীত ধারণার ওপর গড়ে উঠেছিল। কেননা গ্যালিলিও যদি পুরনো মতবাদকে ভিত্তি করে তার বৈজ্ঞানিক দর্শন অব্যাহত রাখতেন তাহলে জ্ঞান আহরণ থেকে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হতো না। আর বর্তমানের আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার দর্শন জ্ঞান অর্জনের মূল শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি পৃথিবীতে পরিচিত হয়েছেন একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হিসেবে। তার চিত্রকর্ম দ্য লাস্ট সাপার, মোনালিসা, লেডি উইদ অ্যান এরমাইন আজ পৃথিবীর বিস্ময়। কিন্তু একজন চিত্রশিল্পী যখন বিজ্ঞানী হয়ে যান তখন দর্শনগত বিষয়টি মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। ছবি আঁকতে আঁকতে তিনি লক্ষ্য করেন, তার জল রংগুলো আর্ট কাগজের নিচে চুয়ে চুয়ে পড়ছে। তখন তার চিন্তা ছবি আঁকার দর্শন থেকে অনুসন্ধানী দর্শনে প্রভাবিত হয়েছে। ফলে চিত্রশিল্পের জ্ঞান থেকে আহরিত অভিজ্ঞতা তাকে বিজ্ঞানের জ্ঞান গ্রহণের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের পথে অগ্রসর করেছে। এ সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রাইবোলজি নামে নতুন একটি ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছেন। এ নতুন প্রযুক্তির দর্শনকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, রাশিয়ার মতো উন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের এনার্জি সেভ করার মাধ্যমে প্রচুর অর্থ সাশ্রয় করছে। আমাদের দেশও দর্শনকে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে। ১৯৬২ সালে জন এফ কেনেডি তার বিখ্যাত ‘মুন স্পিচ’-এর মাধ্যমে চন্দ্রাভিযানের ভাবনাকে প্রযুক্তির উন্নয়ন ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। ভাবনার সঙ্গে পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছিল।

তবে এক্ষেত্রে সমালোচকরা প্রচুর অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিকে প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ মানবতাবাদী সংগঠনগুলো অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোর দারিদ্র্য বিমোচনের চেয়ে চন্দ্রাভিযানের বিষয়টিকে মুখ্য অনুসর্গ হিসেবে বিবেচনায় আনতে চাননি। আবার প্রযুক্তিগত জটিলতা ও গবেষণার মাধ্যমে এর বাস্তবায়ন খুব সহজ বিষয় ছিল না। কিন্তু এসব প্রতিবন্ধক সত্ত্বেও কেনেডি তার উন্নয়ন ভাবনাকে মানুষের মনোবল গড়ে তোলার ভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছেন। এর প্রধান কারণ হলো, ভাবনা যখন অর্জনে রূপান্তর হয়, তখন মানুষের মধ্যে মনোবল গড়ে ওঠার মাধ্যমে দেশপ্রেম জাগ্রত হয়। কেনেডির এ সৃষ্টিশীল ভাবনা বাস্তবে রূপায়িত হয় ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই চন্দ্রাভিযানের মাধ্যমে। নীল আমস্ট্রং চাঁদের মাটিতে পা রেখে বলেন, এ বিজয় হলো মানবজাতির কল্যাণের জন্য এক মাইলফলক। এখানে একটি বিষয় প্রাসঙ্গিকভাবে আসতে পারে। সেটি হলো, চন্দ্রবিজয়কে কেন মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা হলো। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত থাকতে পারে। তবে মানুষ যে অজেয়কে জয় করতে পারে, মানুষ যে তার ভাবনাকে বাস্তবে রূপান্তর করতে পারে, মানুষ যে প্রযুক্তিকে যেকোনো অর্জনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার ক্ষমতা রাখে, এ চন্দ্রবিজয়কে সেই অর্থে মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়া চন্দ্রাভিযানের মাধ্যমে অজানা রহস্য উন্মোচন ও মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়। ফলে প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উন্নয়নের বিষয়টি যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এক ধরনের যোগসূত্র তৈরি করে, তা বলা যায়। মনস্তত্ত্ববিদদের গবেষণায় উঠে এসেছে, মানুষের ভাবনা কখনো স্থির নয়।

কারণ ভাবনা থেকে ভাবনার সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে যেটি কাজ করে তা হলো, যখন কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র উন্নয়নের ভাবনার সূত্রপাত ঘটে, তখন এর সঙ্গে অন্য বিষয়গুলোর যোগসূত্রের কারণে ভাবনা কোনো এক জায়গায় আবদ্ধ থাকতে পারে না। যেমন মানুষের ভাবনা যখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষের ভাবনাকে প্রভাবিত করে, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞান ছাড়াও অন্যান্য বিষয় ভাবনার অনুসর্গ হিসেবে কাজ করে। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন নির্ভর করে তার শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। আবার শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তির একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যদিও প্রযুক্তি ছাড়াও শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যান্য বিষয়ের অবদান অস্বীকার করা সম্ভব নয়। বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর কলা-সব ক্ষেত্রেই একটি যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে বহুমাত্রিক শিক্ষাকে প্রভাবিত করেছে। সময়ের প্রয়োজনে একজন প্রযুক্তিবিদকে মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান আর অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারণা নিতে হচ্ছে। আবার একজন অর্থনীতিবিদকে প্রযুক্তিবিদ্যা, বিজ্ঞান, দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে, শিক্ষা বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট গ-ির মধ্যে আবদ্ধ নেই, বরং তা বহুমাত্রিক ও সর্বজনীন রূপ লাভ করেছে। বহুমাত্রিক শিক্ষা হল প্রথাগত শিক্ষার বাইরেও শিক্ষার অন্যান্য শাখা বা ক্ষেত্র সম্পর্কে ধারণা বা জ্ঞান অর্জন করা। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষা অর্জনকারী ব্যক্তিদের জ্ঞানের আদান-প্রদানের মাধ্যমে কোনো লক্ষ্য অর্জন করাও বহুমাত্রিক শিক্ষার অংশ। এ ক্ষেত্রে স্বশিক্ষার বিষয়টিও সরাসরিভাবে যুক্ত। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর প্রথাগত শিক্ষা মূলত আইন বিষয়ে হলেও এ জ্ঞানের মধ্যেই তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি।

তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক শিক্ষায় নিজের যোগসূত্র গড়ে তুলেছিলেন। গান্ধীজি ছিলেন বহুমুখী লেখক ও সম্পাদক। যদিও এগুলো তার প্রথাগত শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিল না। এক অর্থে তাকে দার্শনিকও বলা যায়। কারণ তিনি সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, যার ওপর ভিত্তি করে অহিংস দর্শন গড়ে উঠেছিল। একজন তাঁতীর মতো তিনি নিজ হাতে কাপড় বুনতেন। এর অর্থ হচ্ছে তাঁত শিক্ষাতেও তিনি দীক্ষিত হয়েছিলেন। এখানে মনে হতে পারে তার মতো একজন মানুষের তাঁতের কাপড় বোনার যথার্থতা আছে কিনা। কিন্তু এখানেও একটি বিষয় কাজ করেছিল যা হল, এর মাধ্যমে তিনি ভারতের গ্রামীণ শিল্প পুনরুজ্জীবনের প্রয়াস চালিয়েছিলেন। এ ছাড়া শিল্পায়ন ছাড়া যে রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি সম্ভব নয়, তার এই কাজের মাধ্যমে তিনি এ বার্তাটি ভারতবর্ষের মানুষের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মূলত আজকের দিনে শিক্ষার বহুমাত্রিকতার প্রয়োজনীয়তা এখানেই। কারণ মানুষ কখনও একটি স্থিরবিন্দুতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিন্দু থেকে বৃত্ত ও বৃত্ত থেকে মহাবিশ্ব এই দর্শন যদি শিক্ষায় প্রবর্তন করা না যায়, তবে শিক্ষার লক্ষ্য অর্জিত হয় না। শিক্ষার বহুমাত্রিকতা ও তাকে গ্রহণ করার প্রবণতা যদি সৃষ্টি করা না যায়, তাহলে মানুষের মধ্যে উদারতা, উন্নত চিন্তা, সর্বজনীনতা, মানবিক মূল্যবোধ, সৃষ্টিশীলতা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এর অর্থ এই নয় যে, একজন মানুষকে শিক্ষার সব ক্ষেত্রেই অবদান রাখতে হবে বরং সে যে শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে প্রথমত তাকে সেই শিক্ষার ধারাকে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগের মতো জ্ঞান অর্জন করতে হবে। আর এর মাধ্যমে বাস্তব ক্ষেত্রে শিক্ষাকে প্রয়োগ করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমাদৃত করার কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এর বিস্তারে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’ এখানে বিস্তার অর্থ সম্প্রসারণ। এ বিষয়টিকে দু’ভাবে চিন্তা করা যেতে পারে।

একটি হচ্ছে শিক্ষাকে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছানো আরেকটি হচ্ছে সম্প্রসারণশীল শিক্ষা, যা মানুষের মধ্যে বহুমুখী চিন্তাধারা তৈরিতে সক্ষম হবে। বহুমাত্রিক শিক্ষার প্রসারে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘বহুমাত্রিক শিক্ষা কেন্দ্র’ গঠন করা যেতে পারে, যেখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা তাদের নিজেদের ক্ষেত্রের সঙ্গে অন্য শিক্ষা ক্ষেত্রের সম্পৃক্ততার বিষয়ে গবেষণা করবে এবং রাষ্ট্র গঠন ও উন্নয়নে তা প্রয়োগ করবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা পরস্পরের সঙ্গে গ্রুপ ডিসকাশনের মাধ্যমে তাদের মধ্যে বহুমাত্রিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটাতে পারেন, যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার ও কনফারেন্সের মাধ্যমে হয়ে থাকে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মনে করেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক উন্নয়ন একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। কারণ মানবিক প্রগতি ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ জন্য উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে মানবিক প্রগতির বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের চেয়ে মানবিক প্রগতি রাষ্ট্রের সমৃদ্ধিতে অনেক বেশি অবদান রাখতে পারে। জন স্টেসি অ্যাডামসের ইক্যুইটি বা সমতাকরণ প্রণোদনা থিওরি থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এখানে বলা হয়েছে যে শুধু মানুষের চাহিদা পূরণ করার মাধ্যমে তার মধ্যে প্রণোদনা তৈরি করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে এই চাহিদা মৌলিক চাহিদার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হলেও তা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সক্ষম হয় না। আর সেখানেই মানুষে মানুষে চাহিদার বৈষম্য নিরসন করে যখন সমতাভিত্তিক বা ইক্যুইটি ধারণা সৃষ্টি করা যায়, তখন মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ইতিবাচক মনোভাব ও প্রণোদনা তৈরি হয়।

মার্কিন অর্থনীতিবিদ রিচার্ড এইচ থ্যালার অর্থনৈতিক আচরণের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্থনীতি ও মনোবিজ্ঞানের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান ঘোচানোর কৌশল নির্ধারণের কথা বলেছেন। তিনি অর্থনীতিকে অনেক বেশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। এখানে একটি বিষয় ভাবা যেতে পারে, তা হলো কিভাবে অর্থনীতি ও মানবিক আচরণের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। মানুষের আচরণ ও মন কিভাবে পরিবর্তন করে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিণত করা যায়—এ কথা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেমন পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি এখানে দৃষ্টান্ত হিসেবে আনা যেতে পারে। বিদেশি অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে দাতাগোষ্ঠী সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে তাদের অপারগতা প্রকাশ করে। বিষয়টি নিশ্চিতভাবে সে সময় রাষ্ট্রের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান। বিষয়টি সে সময় কেউ কেউ অবাস্তব ধারণা বলে বিশ্লেষণ করলেও তা সাধারণ জনগণের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। এর কারণ হলো, এটি মানুষের মনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে তাদের মধ্যে যেমন দেশপ্রেমের মূল্যবোধ জাগ্রত করেছে, তেমনি ‘আমরা নিজেরাও পারি’ এই বিশ্বাস মানুষের মনোবল বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

এখন পদ্মা সেতু দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। যা মানুষের দ্বিধাগ্রস্ত মনকে পরিবর্তন করে তার মধ্যে ইতিবাচক আচরণগত মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার জনক এফ ডাব্লিউ টেইলর বিজ্ঞানকে উৎপাদন ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে ‘মেন্টাল রেভ্ল্যুশন’ বা মানসিক বিপ্লবের কথা বলেছেন। এর মূল বিষয় হলো, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি ও প্রযুক্তি অনুসরণ না করে উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই বিভিন্ন ধরনের ভাবনা মানুষের মধ্যে থাকতে হবে। কারণ ভিন্নতা আর দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা একটির সাথে অন্যটি মিলিয়ে একটি কথায় বলবে তা হলো মানুষ বলেই আমাদের ভাবতে হবে।

লেখকঃ শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী