• বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

কেবল নেতৃত্বের নয়, প্রান্তিক জনতার ঐক্য গড়ে উঠুক

প্রকাশ:  ০৬ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১০ | আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১৪
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রিন্ট

জীবনের চিরায়ত সত্য এই যে, জীবন সমুদ্রের স্রোতধারার মতো প্রবহমান। সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনা, ব্যক্তিজীবনের অনেক বেদনাদায়ক করুণ স্মৃতি ঠেলে মন্থর বা দ্রুতগতিতে নয়, একই তালে, একই ছন্দে কঠিন নির্মোহ স্রোতধারায় অনাদিকাল থেকে নিরবচ্ছিন্ন গতিতে জীবন সম্মুখপানে এগিয়ে যায়। ব্যত্যয় ও ব্যতিক্রমহীন জীবন সহস্র দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, আনন্দ-হাসিকে ধারণ করেই এগিয়ে যায়। ওয়ালসো টাওয়ারে আমার অফিস। অফিস থেকে ফেরার পথে আমি বিস্মিত নয়নে ঘরমুখো অগণিত মানুষের অবর্ণনীয় আকুতি নিয়ে ঘরে ফেরার দৃশ্য অবলোকন করি। আর বিদগ্ধ চিত্তে ভাবী, লোকটি আমার কাছে সাধারণ ও গুরুত্বহীন হলেও ঘরে নিশ্চয়ই সে অনন্যসাধারণ একান্ত কাঙ্খিত ব্যক্তি। হয়তো বা কেউ একজন একমাত্র তারই পথ চেয়ে অপলক দৃষ্টিতে জানালার ধারে অথবা দরজার কপাট ধরে পথের দিকে চেয়ে আছে। পিতা-মাতা, ভ্রাতা-ভগ্নি জায়া, সন্তান-সন্ততি যে কেউই এই অপেক্ষার বিশাল সারির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আমি কবি নই, সাহিত্যিক নই, অন্তর্যামী তো নই-ই। তবে প্রবহমান রাজনীতি অবলোকনে রাজনৈতিক নিবন্ধ লিখি। ব্যক্তিগত জীবনের একটি দমকা হাওয়া আমার চিত্তকে এতখানি ছিন্নবিচ্ছিন্ন করেছে যে, সেই ব্যথিত চিত্তের মর্মান্তিক স্মৃতি এখানে আমি উদ্ধৃত করতে চাই না। কারণ, আগেই বলেছি, এটা প্রকৃতির চলমান ধারারই একটি অংশ। সবার জীবনেই আসে, সবাইকে আবার স্বাভাবিক জীবনের গতিধারায় ফিরেও আসতে হয়। হয়তো বার বার এর পুনরাবৃত্তি ঘটে, বার বার তাকে নতুন করে প্রস্তুতি নিয়ে জীবনের প্রবহমান ধারায় চলতে হয়। যে পারে না, সে স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিটকে পড়ে। প্রকৃতি ও জগতের তাতে কিছুই যায় আসে না। ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে ছিটকে পড়া মানুষটির জন্য একটুখানি সহানুভূতি জানানোর সময় প্রকৃতির নেই।

আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ, দুই সপ্তাহের মধ্যেই স্বজন হারানোর বেদনা আমি কাটিয়ে উঠে আবার নিবন্ধ লেখায় আত্মনিয়োগ করার বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে পেরেছি। তবে এ কথা নিশ্চিন্তে বলতে পারি, কাজটি অসম্ভব না হলেও খুবই দুরূহ।

যাই হোক, বাংলাদেশের দোরগোড়ায় নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে প্রায়শ বক্তব্য-বিবৃতির মধ্য দিয়ে জানান দিচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক ও অনাকাক্সিক্ষত হলেও সত্য, রাজনৈতিক দলগুলো এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আনন্দ-উম্মাাদনা নির্বাচনকে ঘিরে গড়ে ওঠে, সমগ্র দেশে একটি প্রাণোচ্ছল উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, গ্রামের ছোট্ট চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থী এমনকি রাজনৈতিক দলের পক্ষে-বিপক্ষে যে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে, এবার সেখানে প্রচ- ভাটা। যে কোনো আড্ডা, বৈঠকে নির্বাচনের বিষয়টি আসে বটে কিন্তু সরব উত্তেজনা সৃষ্টি হয় না। আমি বিস্ময়াভিভূতই শুধু নই, এর কারণ খোঁজারও চেষ্টা করেছি। হয়তো দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রার্থী মনোনয়ন সমাপ্ত হলে রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম হয়ে উঠবে, সভায়-মিছিলে জোয়ার আসবে। প্রার্থী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আতি-পাতি, উত্তম-মধ্যম এমনকি সমাজে যারা অধম হিসেবে স্বীকৃত, সমাজের সাধারণ মানুষ যাদের এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে তারাও বাণী বর্ষণ করবেন। মঞ্চে আস্ফালন করবেন। যারা অসংখ্য দুর্নীতি মামলার আসামি, জামিনে আছেন, তারাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে উচ্চ কণ্ঠে বাণী বর্ষণ করবেন। খেলাটা হয়তো তখন জমে উঠবে, এতখানি নিষ্প্রাণ ও নিষ্প্রভ থাকবে না। আওয়ামী লীগ বা ১৪ দল প্রায় এককভাবেই নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে। শেখ হাসিনা শাহজালালের মাজার জিয়ারত থেকেই তাঁর দলীয় প্রচারণা শুরু করেছেন। তিনি প্রায় প্রতিটি সভায় বলছেন, আওয়ামী লীগের সুবিধা ও অসুবিধা তার দলে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় অসংখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকেন। তাদের অনেকেই যোগ্য, নির্বাচনে যথাযথ লড়াই করতে সমর্থ।

প্রান্তিক জনতার ধারণা, বিগত দশকে তারা নানাভাবে আর্থিক সামর্থ্য অর্জন করেছেন। লাখের অঙ্কে নয়, কোটি কোটি টাকা আসন্ন নির্বাচনে খরচ করার ক্ষমতা তারা রাখেন। এ ক্ষেত্রে বিএনপি প্রার্থীদের সঙ্গে একটা অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নির্বাচনে অর্থ খরচের প্রশ্নে তারা আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের চেয়ে কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই। শুনেছি, আওয়ামী লীগ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রায় ১০০ প্রার্থীর তালিকা ইতিমধ্যে প্রস্তুত করেছে। ভিন্ন ভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকার কিছু কিছু অংশ প্রকাশ পেলেও আওয়ামী লীগ সুসংগঠিত ও শক্তিশালী প্রক্রিয়ায় সৌভাগ্যবান নিশ্চিত প্রার্থীদের তালিকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হতে দেয়নি। এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে তারা অত্যন্ত শৃঙ্খলার পরিচয় দিয়েছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিতে দলীয় মনোনয়ন বোর্ডে প্রার্থী নির্ধারিত হয় না। সাংগঠনিক লৌকিকতার প্রয়োজনে প্রার্থীর ইন্টারভিউ হয়, প্রার্থীকে ভালোমন্দ নানা প্রশ্নের সম্মুখীনও হতে হয়। তবে এ তিন দলেই মনোনয়ন নির্ধারিত হয় তিন দলের তিন প্রধানের মাধ্যমে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার চেয়ে দলীয় প্রধানের নিজস্ব বিবেচনাই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়। বিএনপি ও জাতীয় পার্টিতে কিছু লবিং কাজ করে বটে। কিন্তু আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার ইচ্ছাটাই সর্বগ্রাসী। কোনো কারণে কোনো ব্যক্তির ওপর নেত্রীর নেতিবাচক ধারণা হলে তা শোধরানোর কোনো রাস্তা এক আল্লাহতায়ালা ছাড়া আর কেউ জানেন না। প্রার্থী মনোনয়নে প্রার্থী যখন পার্লামেন্টারি মনোনয়ন বোর্ড মোকাবিলা করেন, তখন বোর্ডের সম্মুখে প্রার্থীকে যে প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হতে হয়, তাতে এলাকায় তার সত্যিকারের অবস্থানের অনেকটাই বেরিয়ে আসে। কিন্তু মনোনয়ন বোর্ড যখন একান্তভাবেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়, তখন বোর্ডের সদস্যরা মনোনয়ন প্রদানের ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থীর স্বপক্ষে অবস্থান নেওয়া দূরে থাক, নিজের মনে প্রার্থী হওয়ার বিন্দুমাত্র খায়েশ থাকলে অহরহ ‘ইয়া নফসি ইয়া নফসি’ করতে থাকেন। নির্বাচনে আসা না আসার প্রশ্নে বিএনপি এখনো ধূম্রজাল সৃষ্টি করে চলেছে। এটি তাদের স্বভাবগত ধারা। আদৌ তারা সংসদীয় গণতন্ত্রে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে কিনা তা নিশ্চিত নয়। বেগম খালেদা জিয়া হয়তো তার হৃদয়ের নিভৃত কন্দরে একেবারেই সুনিশ্চিত ও প্রত্যয়দৃঢ় যে, রাষ্ট্রপতি ধরনের নির্বাচন হলে তাকে হারানোর কোনো প্রতিপক্ষ এখনকার রাজনৈতিক অঙ্গনে নেই। তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, অজেয়। রাজনীতিতে প্রচন্ড অহমিকা ও একগুঁয়েমির প্রকাশ বেগম খালেদা জিয়ার সহজাত। সম্প্রতি তিনি একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তাকে যত বছরেরই সাজা দেওয়া হোক না কেন, বকশীবাজারে তার জন্য বিশেষভাবে বসানো আদালতে তিনি আর মামলার হাজিরা দেবেন না। কারণ, তিনি নিশ্চিত শেখ হাসিনা তাকে দন্ডিত করবেনই। আর শেখ হাসিনা যতদিন ক্ষমতাসীন, সেই দন্ড তাকে ভোগ করতেই হবে। অতএব সুযোগমতো একটা সাহসী জেদ দেখালে তার রাজনৈতিক লাভ ছাড়া লোকসান কোথায়? ছলেবলে কলেকৌশলে শেখ হাসিনার পতন ঘটাতে পারলে তার হাজার বছরের কারাদ-ও এক পলকের জন্য কার্যকর থাকবে না। একটি কথা প্রাসঙ্গিকভাবে আমি উল্লেখ করতে চাই। ১/১১-এর পর শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে কিছু মামলায় দ- প্রদান করা হয়েছিল। পরে শেখ হাসিনার সব দ- ও মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সেই একই ধরনের মামলায় প্রদত্ত দন্ড ও মামলাগুলো খালেদার জন্য তো হাসিনার মতো মওকুফ করা হয়নি। এমনকি একটি মামলাও প্রত্যাহার করা হয়নি। এটি রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।

খালেদা জিয়া আজ কারাভোগ করছেন। বৃহস্পতিবার অপরাহ্নে তার জামিন নাকচ হয়। তিনি হয়তো শুক্র ও শনিবার দুই দিনে কী প্রতিক্রিয়া হয়, তা পর্যবেক্ষণ করে রবিবারের কোর্ট কর্তৃক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাতেন। কিন্তু তিনি যা অবলোকন করেছেন তা তার কল্পনারও অতীত। বিক্ষোভ, মিছিল, সভা, প্রতিবাদ কোনোটা তো হয়ইনি, এমনকি সংবাদমাধ্যম থেকে জোরালো সমর্থন বেগম খালেদা জিয়া পাননি। হাসিনা বগল দাবিয়ে ভাবলেন, এ তো বেশ মজা! খালেদাকে অন্তরিন রাখলে দেশ স্বাভাবিকভাবে চলে, প্রতিবাদ বিক্ষোভ মিছিল দূরে থাক, স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বোঝাই যায় না যে, খালেদা জিয়াকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার দূরে থাক, অলৌকিক কিছু না হলে সরকার যতদিন ইচ্ছা ততদিন তাকে কারান্তরিন রাখতে পারে।

শেখ হাসিনা কিছু কিছু বিষয়ে খুবই কৌশলী। খালেদা জিয়ার প্রতি তার ব্যক্তিগত সহানুভূতি প্রদর্শনের সহমর্মিতা জাহির করে তার সঙ্গে ব্যক্তিগত গৃহপরিচারিকা দিয়েছেন। অবশ্য এফিডেভিট করে ওই পরিচারিকার সম্মতি গ্রহণ করতে ভুল করেননি। এদিকে খালেদা জিয়ার রথী-মহারথীরা ভিতু কাপুরুষের মতো ‘চাচা আপন জান বাঁচা’ নীতি অনুসরণ করে লোক দেখানো একটি স্বাক্ষর গ্রহণ কর্মসূচি ছাড়া কিছুই করেননি। এখানে উল্লেখ্য, ধনী-দরিদ্র কেউ প্রতি ঘণ্টায় খাদ্য গ্রহণ করে না। তবে বিএনপি নেতারা নির্লজ্জের মতো দুই ঘণ্টার প্রতীকী অনশন কেন করলেন, এটি কারও বোধগম্য নয়। বোধ করি এদের কোনো চক্ষুলজ্জার বালাই নেই।

এদিকে ড. কামাল হোসেন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী-আ স ম আবদুর রবকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট তৈরি করেছেন। মনের লিপ্সা ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের মতো একটা ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন। দুই নেতার মধ্যে ড. কামাল হোসেন রাজনীতিতে সাইবেরিয়ান পাখি। ওই জোটের পক্ষ থেকে পাঁচ দফার একটি আলটিমেটাম দেওয়া হলো। নীরবে, নিঃশব্দে সেই আলটিমেটামের তারিখ শেষ হয়ে গেল। মজার বিষয়টি হলো, তিনি যথারীতি বিদেশে আছেন এবং ৫ অক্টোবর দেশে ফিরবেন বলে গুজব আছে। ড. কামাল হোসেন বিদ্বান কিন্তু এত রাজনীতি করেও তিনি রাজনীতিবিদ হতে পারেননি। আমার স্পষ্ট মনে আছে, তারই গণফোরামের একটি দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে আমি আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। গণফোরামের মহাসচিব জনাব মোস্তফা মহসীন মন্টু প্রাক্তন ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নেতা। আমি তাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করি, তার প্রতি আমার আস্থা অপরিসীম। তারই বিশেষ অনুরোধে গণফোরামের একটি দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলাম। বক্তৃতা করেছি এবং অনেকের বক্তৃতা শ্রবণ করেছি। আমি প্রায় চার ঘণ্টা উপস্থিত থেকে গণফোরাম সভাপতি জনাব কামাল হোসেনের উপস্থিতি অবলোকন করতে পারিনি। জনাব মোস্তফা মহসীন মন্টু যখন অতিথিদের বিদায় দেন, তখন মনে হচ্ছিল তিনি জিন্দা লাশ। তিনি এতটাই বিব্রত হয়েছিলেন যে, অতিথিদের সঙ্গে শুধু করমর্দন ছাড়া কোনো কথাই বলতে পারেননি।

আগেই বলেছি, বাংলাদেশে ইতিমধ্যে নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তফ্রন্ট নামে একটি মোর্চা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে অনেক বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো সংগঠন তো রয়েছেই এমনকি অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, সারা বাংলাদেশের কোনো আসন থেকেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে যিনি জামানত রক্ষা করতে পারবেন না। জোট গঠন প্রক্রিয়ায় যাদের অবদান অনেক বেশি, রাজনৈতিক চিন্তাধারায় তাদের নিজেদের মধ্যে ব্যবধানের তেমনি কোনো সীমানা নেই। এ ক্ষেত্রে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একটি উক্তি উল্লেখযোগ্য জিরো প্ল­াস জিরো প্ল­াস জিরো ইজ ইক্যুয়াল টু জিরো।

শেখ হাসিনা যেভাবে দাম্ভিক মানসিকতায় দেশ পরিচালনা করছেন তা এককথায় দুর্বিষহ ও অসহনীয়। এ অবস্থার পরিবর্তনে নিরবচ্ছিন্ন ও অব্যাহত প্রচেষ্টা রাখতেই হবে। সেই আঙ্গিকে সরকারবিরোধী যে কোনো জোট মানুষের একটু আশার সঞ্চার করবে, উদ্দীপনা জাগ্রত করবে, ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মিছিলে মুষ্টিবদ্ধ উত্তোলিত হাতে স্লে­াগান উচ্চারণ করবে এটিই বাংলাদেশের অতীত ঐতিহ্যের প্রবহমান ধারা। কিন্তু জনাব বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনদের ঐক্য প্রক্রিয়ায় কেন কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো না, এটা বুঝতে কষ্ট হয় না। জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য যে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অকুতোভয় সাহস নেতৃত্বের ধারণ করা আবশ্যক এ ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতৃত্বের মাঝে তা পরিলক্ষিত হয় না। আমি আগেই বলেছি, বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত রাজনীতিসচেতন। যেসব আন্দোলনে তারা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন, তা গণসমুদ্রের ফেনিল চূড়ায় ভিসুভিয়াসের মতো জ্বলে উঠেছে, অসম্ভবের বক্ষ বিদীর্ণ করে আন্দোলনকে সফলতা দিয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে জনগণের নিষ্পৃহতা বিজয় ছিনিয়ে আনা তো দূরে থাক, কতটুকু পথ চলতে পারবে সেটিই একটি কঠিন প্রশ্ন। তবু যুক্তি প্রদর্শন করে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আন্দোলনের জন্যই আজ শক্তিশালী জোট গঠন করে অবশ্যই আন্দোলনের পথ পরিক্রমণ শুরু করতে হবে। নইলে দেশের মানুষ চূড়ান্ত বিভ্রান্তির মুখে পড়ে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ও বিশৃঙ্খল আন্দোলনের অভিশপ্ত পথে হাঁটতে গিয়ে একটি গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে না বসে! যারা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক আন্দোলন চান, গণসমুদ্রের ফেনিল চূড়ায় ভিসুভিয়াসের মতো জ্বলে উঠতে চান, তাদের জন্য সময় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে। জনগণের মননশীলতা এখনো ক্ষুরধার, শানিত তরবারির মতো। সেই কোষমুক্ত তরবারিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার যোগ্য নেতৃত্বের আজ বড় অভাব। তাই দলীয় সংকীর্ণতা এবং কে বড় নেতা হবেন চিন্তার এই কূপম-ূকতা থেকে বেরিয়ে এসে নেতৃত্বকে আজ প্রমাণ দেওয়ার সময় এসেছে যে, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’ এ চিরসত্যটিকে বক্ষে ধারণ করে এগিয়ে আসবেন। আন্দোলনের ক্রমাগত ধারায় ’৫৪-এর ঐক্য, ’৬২-এর মৌলিক গণতন্ত্রের পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে দুর্দমনীয় গণআন্দোলন, ’৬৯ সালে প্রচন্ড গণবিস্ফোরণে সমগ্র জাতির দাবানলের মতো জ্বলে ওঠা, ’৭০-এর নির্বাচনে অভ্রান্ত নিরঙ্কুশ এবং ঐতিহাসিক রায় প্রদান, যে রায়টি শুধু বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধই করেনি, বরং নয় মাসের যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনে জাতিকে উদ্বেলিত, উজ্জীবিত, উচ্ছ্বসিত ও ফলপ্রসূভাবে উৎসাহিত করেছিল।

প্রাসঙ্গিকভাবে ছোট্ট একটি ঘটনার প্রতিবাদ আমি এ নিবন্ধে আনতে চাই। ভারতীয় শাসক দল বিজেপির এক নেতা উম্ম ত্ত মাতালের মতো বলেছেন, বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন হলে তারা বাংলাদেশ দখল করে নেবেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের অকৃত্রিম সহযোগিতা আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। কিন্তু এ ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও স্পর্ধিত বক্তব্যের প্রতিবাদ করাও প্রতিটি বাঙালির নৈতিক দায়িত্ব। এ ধরনের অশালীন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে আমি বলতে চাই, এমন অমার্জিত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান থেকে ভারতের শাসক দল তাদের নেতা-কর্মীদের বিরত তো রাখবেই, ভারতের জাগ্রত জনতাও এ ধরনের নেতৃত্বকে অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

স্বাধীনতা বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। এটি কারও অনুকম্পা বা দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়। কারও বিস্মৃত হওয়া উচিত হবে না, স্বাধীনতা বাংলাদেশের আকাশকে নির্মল করেছে, প্রজ্বলিত করেছে, উদ্ভাসিত করেছে এটি যেমন ঠিক, তেমনি এই উপমহাদেশে শান্তির দিগন্ত বিস্তৃতির পথ পরিক্রমণের সূচনাও করেছে। এটি একটি অভ্রান্ত ও বাস্তব সত্য। ’৭১-পূর্ব ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে সংঘর্ষের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলেই এ সত্যটি প্রতিভাত হবে। [সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন]

লেখক : স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা

নূরে আলম সিদ্দিকী