• বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

হাওরাঞ্চলের শিক্ষাসংকট কি থাকবেই?

প্রকাশ:  ০২ অক্টোবর ২০১৮, ২০:৪৭
হাসান হামিদ
প্রিন্ট

আমার জন্ম সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের আবিদনগর নামের নিভৃত এক গ্রামে। হাওরের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয় সেখানকার মানুষদের। ছোটবেলা সেই গ্রামের স্কুলেই আমার পাঠ নেয়া শুরু হয়েছিল অন্য সবার সাথে। আমরা সেখানে হেমন্ত আর বর্ষা বলে পুরো বছরকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলি যাতায়াতের পথসুবিধার বিলিবন্টনে।

হেমন্ত মানে শুকনোর সিজনে যদিও এ অঞ্চলের ছেলেমেয়েগুলো গৃহস্থালি কাজের বাদেও স্কুলে যেতে পারে, কিন্তু বর্ষায় বিদ্যালয়ে যাওয়ার একমাত্র পথটি পানিতে ডুবে যায়। তাই সাঁকো দিয়ে, না হয় নৌকা দিয়ে পার হতে হয় তাদের। পার হওয়ার সময় সাকোঁ নড়ে ওঠে। ছোট ছোট হাত-পা কেঁপে ওঠে, তখন ভয় করে; আমার এখন মনে হয় আসলে সেখানে কেঁপে ওঠে এদেশের একটা অংশ। আর এভাবেই ভয় নিয়ে, শিক্ষা উপকরণের অপ্রতুলতা নিয়ে, ঠিকমতো বই-খাতা না পেয়ে বড় হতে হয় তাদের। শিশু অধিকারের যাবতীয় সনদ এখানে মাথা নিচু করে থাকে। ভাবতে পারি না।

আমার মনে আছে, চির অবহেলিত হাওরাঞ্চলে শিক্ষার হার বাড়ানো ও দরিদ্র পরিবারের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনার জন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি করে আবাসিক প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেটা ২০১৬ সালে। এ ঘোষণার প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার পথে, কিন্তু আলোর মুখ দেখছে না এই প্রকল্পটি। না, এই কাজ করলে এখানকার শিক্ষায়, শিক্ষার ব্যবস্থাপনায় এমন কোনো পরিবর্তন হবে না; এ তো জানা কথা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর আমরা মনে করেছিলাম, তিনি এ নিয়ে ভাবছেন। আরও কিছু হবে, আমরা আশা করেছিলাম। কিন্তু না, কিছু হয়নি।

এবার একটু পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেব। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ‘বিদ্যালয় সম্পর্কিত তথ্য’ থেকে জানা যায়, জেলায় ১৪৬৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। কিন্তু ভয়াবহ ব্যাপার হলো, ১৬৬টি গ্রামে এখনো কোনো বিদ্যালয়ই নেই। হয়তো এ গ্রামের শিশুরা পাশের গ্রামে পড়তে যায়, অথবা অনেকেই হয়তো যায় না। পত্রিকার খবরে পড়েছি, ঝড়-তুফানে ভেঙে পড়ায় এবং চরম ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় জেলার ৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা খোলা আকাশের নিচে পড়ছে। এখানকার ১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন পরিত্যক্ত। আর ১২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। মৃত্যুকে হাতে নিয়ে শিশুরা পড়তে যায় মধ্যবয়সি এদেশে, ভাবলে ভালো লাগে না। আমাদের ফাইভ জি ইন্টারনেট স্পিড দিয়ে কি হবে, এদের পড়ার জায়গা যদি না থাকে? হাওরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। এখানে বর্ষায় একমাত্র ভরসা নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো, না হয় কাঠের ছোট নৌকা। আবার নৌকা কেনার সামর্থ নেই অনেকেরই। তাই সড়ক পথের ব্যবস্থা না থাকার কারনেই বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী।

অবশ্য অনেক গ্রামে স্থানীয়দের উদ্যোগে নির্মিত হয় বাঁশের সাঁকো। আর সড়ক পথের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল না থাকার ফলে অনেক শিক্ষার্থীরাই বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। আবার একই কারণে শিক্ষকগণ সময়মতো উপস্থিত হতে পারেন না। জেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোতে শিক্ষার প্রসারে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যকর কোনো কিছুই এখানে কেউ করছেন না। অবশ্য পত্রিকায় পড়েছি, ভিন্ন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের এই জলাভূমি অঞ্চলের জন্য স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও প্রাথমিক বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা নানা পরামর্শ-পরিকল্পনার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু যুগ যুগ ধরে সেই গুরুত্বপূর্ণ দাবি অপূর্ণই রয়ে যাচ্ছে।

অনেকগুলো সমস্যা এক দিনেই হয়তো সমাধান হবে না। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে যেসব ঘোষণা দেয়া হয়, যেসব প্রতিশ্রুতির কথা আমাদের কানে আসে; তার কিঞ্চিত কি বাস্তবতার সমান্তরালে আসে? সংশ্লিষ্টরা বলবেন, হচ্ছে; বাস্তবে কতোটা হচ্ছে, তা গ্রামে যখন যাই মাঝামাঝে টের পাইতো!

লেখক- কবি ও গবেষক

হাসান হামিদ