• বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫
  • ||
শিরোনাম

কোন পথে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা?

প্রকাশ:  ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৭:২১ | আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৭:২৬
আবুল কাসেম ফজলুল হক
প্রিন্ট

দেশের শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষিত লোকদের মধ্যে অনেক অভিযোগ আছে। কিন্তু সেসব অভিযোগের প্রতি সরকারের মনোযোগ দেখা যায় না। শিক্ষামন্ত্রী ও সরকারি বুদ্ধিজীবীরা প্রচলিত ব্যবস্থাকে রক্ষা করার জন্য নানা বক্তব্য প্রচার করে চলছেন।

সর্বস্তরে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার ফল খুব ভালো করছে। এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রিও অনেকেই লাভ করছেন। এমনটা আগে ভাবা যেত না। অভিযোগ আছে, শিক্ষার মান একেবারে পড়ে গেছে। সরকারি বুদ্ধিজীবীরা এবং সরকার এ কথা স্বীকার করছে না। তার পরও শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে সরকারি মহলেও নানা আলোচনা আছে।

ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষিত সমাজ কথিত সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন চাইছে। এ পদ্ধতিকে সংশ্লিষ্ট প্রায় সবাই অত্যন্ত ক্ষতিকর মনে করছেন। তার পরও সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে এ পদ্ধতিকে রক্ষা করে চলছে।

পঞ্চম শ্রেণি ও অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষার প্রতিও প্রথম থেকেই বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের এবং শিক্ষক ও অভিভাবকদের সমর্থন নেই। নানাভাবে এ পরীক্ষা দুটি বিলুপ্ত করার জন্য দাবি উত্থাপিত হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু সরকার এগুলো রক্ষা করে চলছে। পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কোচিং সেন্টার, গাইড বুক প্রভৃতি ব্যবসায় স্বর্ণযুগ দেখা দিয়েছে। শিক্ষার অর্থ দাঁড়িয়েছে পরীক্ষার প্রস্তুতি।

ব্রিটিশ সরকারকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশে ব্রিটিশ কাউন্সিলের দ্বারা ইংরেজি মাধ্যমে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তক অবলম্বন করে এ-লেভেল এবং ও-লেভেল চালানোর সুযোগ দিচ্ছে। সেই সঙ্গে আবার ইংলিশ ভার্সন চালু করেছে। জাতি গঠন ও রাষ্ট্র গঠনের প্রতি সরকারের কোনো দৃষ্টিই নেই। উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে যে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, তাও পরীক্ষানির্ভর—শিক্ষা তাতে গৌণ ব্যাপার।

শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা ভাষা ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা নানা রকম বঞ্চনার শিকার। প্রাথমিক শিক্ষা বহু ধারা-উপধারায় বিভক্ত। শিক্ষা সমাপনের পর শিক্ষার্থীরা বেকারত্বের সমস্যায় ভোগে এবং তাতে জীবনীশক্তির অপচয় হয়। এসব নিয়েও নানা দাবি উত্থাপিত হয়। সরকারের এসব নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নীরব।

শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য নানা রকম সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। কিন্তু সেগুলো নিয়ে সরকার কিংবা কোনো রাজনৈতিক দল কোনো মত প্রকাশ করে না। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য কোনো আন্দোলন নেই দেশে। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে ও জনস্বার্থে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য কোনো আন্দোলন না থাকলে যেকোনো রাষ্ট্রেই শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা গণবিরোধী রূপ লাভ করে। বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার রূপ ও প্রকৃতি তাই হয়েছে।

বাংলাদেশের জনগণ জাগ্রত নয়, ঘুমন্ত। কায়েমি স্বার্থবাদীদের সাজানো হুজুগে জনগণ সাড়া দিত। এখন দেখা যাচ্ছে, হুজুগে সাড়া দিতেও জনগণ নিস্পৃহ। শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক ও শিক্ষিত সমাজ মনে হয় নিতান্ত মনমরা অবস্থায় আছে। নগ্ন ব্যক্তিগত স্বার্থের ব্যাপার ছাড়া আর কোনো ব্যাপারেই কেউ নড়াচড়া করতে চায় না।

এই বাস্তবতার মধ্যে সরকার নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির, অর্থাৎ মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নতির জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এক বিরাট কর্মযজ্ঞ আরম্ভ করেছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের মাদরাসা শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষাও এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত আছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে যেভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সংস্কারের জন্য বিরাট অঙ্কের টাকা নিয়ে কাজ আরম্ভ করা হয়েছে, তাকে প্রচারমাধ্যম সরকারপক্ষের নির্বাচনী কাজ বলে উল্লেখ করেছে। নির্বাচনী কার্যক্রম হলেও এর ভালো-মন্দ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার কৌতূহলী হওয়া উচিত। এই সংস্কার কার্যক্রম যদি এক খারাপ থেকে আরেক খারাপের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে তা জাতির জন্য মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং সরকার জাতি গঠন ও রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে একটুও মনোযোগী নয়। রাজনীতির মর্মে নগ্ন ক্ষমতার লড়াই ছাড়া আর কিছু নেই। এখন জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। নির্বাচনকে এখন বলা হয় ভোটের উৎসব। কেউ কেউ বলেন, জাতীয় সংসদের নির্বাচন জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় উৎসব। আসন্ন ভোটের উৎসব কি ভালোভাবে সম্পন্ন হবে?

অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, কালো টাকামুক্ত, পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক—এটা চাই। এবারই সেটা হবে—এমনটা আশা করতে পারি না। এর জন্য প্রস্তুতি দরকার। উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল গঠন আগে দরকার। উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল ছাড়া রাজনীতির উন্নতি হবে না। গণতন্ত্রবিরোধী, পরিবারতান্ত্রিক, নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ববাদী, একনায়কত্ববাদী দল দিয়ে গণতন্ত্র আশা করার মধ্যে কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিচয় নেই।

আওয়ামী লীগ এখন ইসলামের দিকে বিশেষ মনোযোগী হয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চের কার্যক্রমের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ব্লগার্স অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্টস ফোরামের দশ-বারোজন জঙ্গিবাদীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। হেফাজতে ইসলাম, তাবলিগ জামায়াত ইত্যাদির ভেতরেও রাজনীতি ঢুকে গেছে। এগুলোর ওপর বিএনপির একচেটিয়া কর্তৃত্ব আর নেই। আওয়ামী লীগ ধর্মীয় শক্তিকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসার জন্য তৎপর হয়েছে। কেউ কেউ অনেক দিন ধরে বলে আসছেন, দেশে রাজনৈতিক দল দুটি—এক. আওয়ামী লীগ, দুই. জামায়াতে ইসলামী। সরকার জামায়াতের প্রতি, বিএনপির প্রতিও যে কঠোর নীতি অবলম্বন করেছে, তাতে জামায়াত কি শেষ হয়ে যাওয়ার পথে নয়? গত প্রায় বারো বছর ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে বিএনপি কি শক্তিশালী হয়েছে? ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির কথিত সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তাতে বছর দুই সময়ের মধ্যে অন্তত দেড় হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছে। এখন রাজনীতির কি উন্নতি হয়েছে? সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সমস্যাটিকে নিতান্ত ভালোবাসা রূপে দেখে সমাধান করে দেখা যায়? সমস্যার সমাধান কি শুধু নির্বাচন কমিশন, ওসি, ডিসি প্রমুখের ওপর নির্ভর করে? রাজনীতির উন্নতি না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। খবরে প্রকাশ, দুই হাজার মাদরাসার উন্নয়নের জন্য ছয় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে সরকার কাজ আরম্ভ করেছে। টাকার অঙ্কটা অবশ্যই বিরাট। এতে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, ইউনেসকো, ইউনিসেফ আছে। মাদরাসা নিয়ে সরকারের সমস্যা কিছুটা বুঝতে পারি কিন্তু মাদরাসার অভ্যন্তরীণ সমস্যাবলি সম্পর্কে আমার জ্ঞান অতি অল্প। সে জন্য মাদরাসার মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার উন্নতি সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না। সংশ্লিষ্ট মহলকে বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হবে, যাতে সংস্কারের গতি এক খারাপ থেকে অন্য খারাপের দিকে না যায়। আলিয়া মাদরাসা আছে, কওমি মাদরাসা আছে। সরকার এই সেদিন কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে এমএ ডিগ্রির সমান বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় কাজে এই ডিগ্রি মূল্য পাবে। এরা কি বিসিএস পরীক্ষা দিতে পারবে না?

সপ্তাহ দুই আগে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে যে সরকার মাধ্যমিক পর্যায়ের, অর্থাৎ নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার উন্নয়নের জন্য এক লাখ আটত্রিশ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই কাজ আরম্ভ করছে। ডলারের তুলনায় টাকার দাম অনেক কম। টাকার ক্রয়ক্ষমতাও কম। তবু মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নতির জন্য গৃহীত প্রকল্পের টাকার পরিমাণ অত্যন্ত বড়। এতে মাদরাসা, কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত আছে। এই টাকার জন্য অবশ্যই ভোটের রাজনীতিতে সরকারের ও সরকারি দলের প্রতি জনসমর্থন বাড়বে। তবে প্রকল্পের উদ্দেশ্য তো ভোট নয়; উদ্দেশ্য মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার উন্নতি। প্রকল্পের নাম ‘মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’। টাকার সদ্ব্যবহার কিভাবে হয় তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেখবে।

আমার বক্তব্য শুধু এইটুকুই যে টাকা খরচ হয়ে গেল, অথচ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার উন্নতির কাজ কিছুই হলো না—এমন যেন না হয়। বিশ্বব্যাংক, ইউনেসকো, ইউনিসেফ ইত্যাদির সংযোগে বড় বড় প্রকল্পের কাজে দেখা যায়, বাইরের নানা কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয়; সেগুলো বাংলাদেশের জন্য কল্যাণকর হয় না। কথিত সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি কোন শিক্ষক, কোন অভিভাবক চেয়েছিলেন? পঞ্চম শ্রেণি ও অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা কে চেয়েছিলেন? ইংলিশ ভার্সন কে চেয়েছিলেন? পাঠ্যপুস্তক, পাঠ্যসূচি ও পাঠক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছু আছে, প্রয়োজনীয় অনেক কিছু নেই। তা ছাড়া অনেক বেশি বিষয় পাঠ্যসূচিতে এনে শিক্ষার্থীদের ওপর দুর্বহ বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। শিশু-কিশোরদের কোন পরিকল্পনা অনুযায়ী তৈরি করা হচ্ছে?

পাঠ্যপুস্তকের ও শিক্ষানীতির হেফাজতি ও ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বুদ্ধিজীবীরা তৎপরতা প্রদর্শন করেন; কিন্তু তার ফল হয় না। তাঁরা বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশ-উপযোগী উন্নতমানের সিলেবাস, কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক নিয়ে কোনো চিন্তাই করেন না। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও উন্নতি নিয়েও তাঁদের কোনো চিন্তা নেই। প্রচলিত ব্যবস্থা নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট।

রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসনব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র, জাতি ও জনজীবনের উন্নতির জন্য দরকার নতুন চিন্তা ও কার্যক্রম। তা যত দিন দেখা না দেয়, তত দিন এ রকমই চলতে থাকবে। আমরা প্রগতিশীল নতুন চিন্তা ও তা নিয়ে কাজের নতুন ধারা চাই।

লেখক: শিক্ষাবিদক, প্রাবন্ধিক, ও গবেষক