• বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

‘যেখানে মায়ের প্রতি সন্তানের আবেগের কোনো মূল্য নেই’

প্রকাশ:  ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৬:৪৮ | আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৬:৫৭
রফিক শিকদার
প্রিন্ট

চলতি বছরের জুলাই মাসের মেডিক্যাল রিপোর্ট অনুযায়ী আমার মায়ের দুটো কিডনীর একটিতে (বাম কিডনী) পাথর আবিস্কৃত হয়। ফলশ্রুতিতে মূত্রনালী ব্লক হয়ে বাম কিডনী অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়। দ্রুত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ইউরোলজী বিভাগের প্রফেসর হাবীবুর রহমান দুলাল স্যারের তত্বাবধানে ভর্তি করি। মা’কে হাসপাতালে ভর্তির প্রথম দিন থেকেই বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়। ক্যাথেটারের মাধ্যমে বাম কিডনীতে জমা হওয়া পুজগুলোকে অপসারণের মাধ্যমে মা’র শারীরিক অবস্থাকে স্বাভাবিক পর্যায়ে আনা হয়।

এরপর বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারি আমার মায়ের ডানপাশের কিডনী পুরোপুরি ভাল আছে, তবে বাম পাশের কিডনীটা ২০% ফাংশনাল। ফলে চলতি মাসের ৫ তারিখে প্রফেসর হাবীবুর রহমান দুলাল স্যার অপারেশনের মাধ্যমে মায়ের বাম কিডনী অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন। হাসপাতালের দশম তলার থিয়েটারে দীর্ঘ সময় ধরে অপারেশন চলতে থাকে আমার মায়ের। যথারীতি অপারেশন শেষও হয়। কিন্তু অপারেশন শেষে মাকে পোস্ট অপারেটিভ-এ রাখার পর জানতে পারি তাঁর ইউরিন production সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে।

রাত ৮টার দিকে কর্তব্যরত ডাক্তার আমাকে বলেন যে, আপনার মায়ের এক্যুট রেনাল ফেইলুর। অর্থাৎ অপারেশনের পর থেকে ডানপাশের সুস্থ কিডনীটি কাজ করছে না, দ্রুত উনাকে আইসিইউতে নেয়ার ব্যবস্থা করেন। সঙ্গে এটাও বলেন- আমাদের হাসপাতালে আইসিইউ খালি নেই, কোনো প্রাইভেট হাসপাতালের আইসিইউতে নেয়ার ব্যবস্থা করুন।

এরপর রাতেই ইনসাফ বারাকাহ কিডনী এন্ড জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ-তে মাকে ভর্তি করি। যেহেতু অপারেশনের পর থেকে মায়ের ডান দিকের সুস্থ কিডনী একদমই ইউরিন উৎপন্ন করতে পারছে না, সেহেতু দুদিন পর উক্ত হাসপাতালের প্রফেসর ফখরুল ইসলাম স্যার কিডনীর অবস্থা পর্যালোচনার জন্য ল্যাব এইড হাসপাতাল হতে সিটিস্ক্যান করতে বলেন। সিটিস্ক্যান করার পর ল্যাবএইড হাসপাতালের রিপোর্ট মারফত জানতে পারি মায়ের পেটে কোনো কিডনীর অস্তিত্ব নেই!!!

বিষয়টি জানার পর ইনসাফ বারাকাহ কিডনী এন্ড জেনারেল হাসপাতালের কিডনী বিশেষজ্ঞ, প্রফেসর ফখরুল ইসলাম স্যার প্রফেসর হাবিবুর রহমান দুলাল স্যারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং মাকে পূনরায় পিজি হাসপাতালে ভর্তির জন্য পরামর্শ দেন। এমতাবস্থায় পথহারা পথিক, কুলহারা নাবিকের মতো টালমাটাল হয়ে উপায় খুঁজতে থাকি। পরেরদিন সকালে মাকে নিয়ে পিজি হাসপাতালের প্রফেসর হাবিবুর রহমান দুলাল স্যারের কাছে যাই। উনি মাকে তাঁর অধিনে ভর্তি করে নেন। আমি উনার কাছে ল্যাবএইড হাসপাতালের সিটিস্ক্যান রিপোর্ট দাখিল করে মায়ের পেটের ডান পাশের সুস্থ কিডনী না থাকার কারণ জানতে চাই।

তিনি আমাকে অন্য হাসপাতালের ডাক্তারের কথায় বা সিটিস্ক্যান রিপোর্টে বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দেন এবং মা ভাল হয়ে যাবে বলে আশ্বস্ত করেন। অতঃপর প্রতি মুহূর্তে মায়ের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। নিয়ন্ত্রনহীন গতিতে ক্রিয়েটিনিন বেড়ে যায়। অপারেশনের আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত যে মায়ের ক্রিয়েটিনিন ছিল পয়েন্ট ৬১, অপারেশনের তিনদিন পর সেই ক্রিয়েটিনিন এসে দাঁড়ায় ৬ পয়েন্টের কাছাকাছি। মায়ের শরীরে পানি জমে অস্বাভাবিক মাত্রায় ফুলে যায়। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দুলতে থাকে আমার অভাগা মায়ের জীবন প্রদীপ। শুরু হয় ডায়ালাইসিস। অবস্থা বেগতিক দেখে চিত্রনায়ক নিরব-এর পরামর্শে মাকে নিয়ে বিআরবি হাসপাতালের নেফ্রলজি বিভাগের প্রধান- প্রফেসর এম, এ সামাদ স্যারের দ্বারস্থ হই।

অত্যন্ত বিনয়ী স্বভাবের ডাক্তার মহোদয় সমস্ত মেডিকেল রিপোর্ট পর্যোলোচনার পর পুনরায় আল্ট্রাস্নোগ্রাম করে মায়ের পেটে কোনো কিডনীর অস্তিত্ব না থাকার বিষয়টি ব্যথিত কণ্ঠে জানিয়ে দেন।

বর্তমানে ডায়ালাইসিস এর মাধ্যমে দুঃসহ যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের বেডে মৃত্যুর প্রহর গুনছে আমার মা!!!

লেখক : চলচ্চিত্র পরিচালক

(লেখকের ফেসবুক স্ট্যাটাস)

-একে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়,রফিক শিকদার