• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

ডাক্তারের ভিজিট সরকারিভাবে বেঁধে দিয়ে লাভ নেই

প্রকাশ:  ১২ জুলাই ২০১৮, ১৮:১৩
ডা. কায়সার আনাম
প্রিন্ট

ডাক্তারের ভিজিট সরকারিভাবে বেঁধে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। আমার মনে হয় এতে করে মূল সমস্যার সমাধান হবে না। কেননা তখন কিছু প্রশ্নবোধক বিবেকসম্পন্ন ডাক্তার এই ঘাটতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য রোগি দেখার সংখ্যা বাড়িয়ে দিবে। গড়ে প্রতি রোগী সময় পাবে ত্রিশ সেকেন্ড।

সেটা মনিটর করবেন কিভাবে? জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে আরো ক্ষুণ্ণ হবে। আর ভিজিটটাই সব না। ভিজিটের সামান্য টাকার বাইরেও রোগীর কাছ থেকে বিভিন্ন পন্থায় অনেক টাকা বের করে নিবে মুনাফালোভীরা। তার থেকে বরং একজন ডাক্তার দিনে সর্বোচ্চ কতজন রোগী দেখতে পারবে সেই বিষয়ক একটা নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে। এটা বাস্তবসম্মত। কারণ অলরেডি বেসরকারি কিছু হাসপাতালে কোয়ালিটি কন্ট্রোলের এই সিস্টেম আছে। কেউ চাইলেই সেখানে এক বেলায় একশো রোগি দেখতে পারবে না। কিংবা রাত দুইটা পর্যন্ত ঘুম ঘুম চোখে চেম্বার করতে পারবে না।

আমি যদি আমার ডাক্তারের পূর্ণ মনোযোগ, মানবিক ব্যবহার এবং সঠিক সিদ্ধান্ত পাই তাহলে দ্বিগুণ ভিজিট দিতেও রাজি আছি। ভিজিট কম দিয়ে দায়সারা সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার লাভটা কী? ডাক্তারের চেম্বারে কি আমি ডেইলি যাই? এখানে পাঁচশো/হাজার টাকা বাঁচিয়ে বড়লোক হয়ে যাবনা। সঠিক সিদ্ধান্ত ও কাউন্সেলিং এর দাম এর থেকে অনেক বেশি।

ভাল নলেজের ডাক্তার কিন্তু অনেক বেশি রোগি দেখার ফ্যালাসি বলি। একজন যুগ্ম সচিব গেছেন একজন নিউরোলজিস্টের কাছে। সচিব সাহেব দরজা দিয়ে ঢুকতেই ডাক্তার তার মুভমেন্ট দেখে রোগ বুঝে ফেললেন।

অ্যাসিস্ট্যান্টকে বললেন- লেখ GBS, অমুক অমুক টেস্ট দাও, ভর্তি লিখে দাও, তমুক তমুক ওষুধ দাও।

এর বেশি কথা আর বললেন না। সচিব সাহেব ভালো করে চেয়ারে বসতেও পারলেন না। বুঝতেই পারলেন না কী থেকে কী হল।

ব্যাপারটা ভালোমত বুঝতে তিনি সিঙাপুর চলে গেলেন। সেখানে সপ্তাহখানেক ভর্তি থেকে অনেক জটিল টেস্ট করে, বার লাখ টাকা খরচ করে জানতে পারলেন তার GBS-ই হয়েছে।

তিনি আর সেখানে চিকিৎসা শুরু করে খরচ বাড়ালেন না। চিকিৎসা শুরুর আগেই তো টাকা শেষ!

দেশে ফিরে আবার সেই ডাক্তারের কাছে গিয়ে বললেন - আপনি ভাল ডাক্তার বুঝলাম। কিন্তু যদি আমাকে একটু ভাল করে বুঝিয়ে বলতেন তাহলে আমার এতো টাকা নষ্ট হতো না।

এই ডাক্তারকে এক হাজার টাকা ভিজিট না দিয়ে দশ হাজার টাকা দিলেও ক্ষতি ছিল না যদি দশ মিনিট ভাল করে কাউন্সেলিং করত। তাই ভিজিটকে টার্গেট করে রোগীর লাভ হবে না। কোয়ালিটি টার্গেট করতে হবে।

রোগীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার আরেকটা উপকার আছে। কিছু কিছু সময় দেখি যারা মুনাফালোভী তারা নিজেদের পসার বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন মেকানিজমের আশ্রয় নেয়। ভাল নলেজ/দক্ষতা ছাড়াই তাদের অনেক রোগি হয়। সেখানে বেশি ভিড় দেখে মানুষ মনে করে এরাই ভাল। তখন তাদের কাছেই যায়। গণ-ডাক্তারের কাছে গিয়ে গণ-চিকিৎসাই পায়। ওদিকে নলেজসম্পন্ন সৎ ডাক্তাররা এসব মেকানিজম করেনা বলে রোগী তাদের খোঁজ পায়না বা তাদের রোগির কম সংখ্যা দেখে ইমপ্রেসড হয়না।

এই দুষ্ট মনোপলিগুলোও ভাঙা যাবে। চিকিৎসার কোয়ালিটি নিয়ন্ত্রণ হবে। এবং ভিজিটের বাইরেও আখেরে রোগীর চিকিৎসাব্যয়ও কমবে।

লেখক: মেডিকেল অফিসার, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্স অ্যান্ড হসপিটাল।

ডাক্তারের ভিজিট
apps