• রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫
  • ||

কোটা সংস্কার আন্দোলনে ‘বাশি’ তত্ত্ব!

প্রকাশ:  ০৮ জুলাই ২০১৮, ২৩:১৪
কামাল আহমেদ
প্রিন্ট

যে তরুণেরা কোটা সংস্কারের আন্দোলন করছেন, তাঁদের বাম ঘরানার শিবির, সংক্ষেপে ‘বাশি’ বলে অভিহিত করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রের দুটি পায়ের ভাঙা হাড়ের এক্স-রের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে গেছে। তাঁর দুটি পা-ই ভেঙে দিয়েছে ছাত্রলীগের পদধারী হাতুড়িবিদ্যায় পারদর্শী দুর্বৃত্তরা। পঙ্গুত্বের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ছাত্র তরিকুল ইসলামকে উপাচার্য হাসপাতালে দেখতে যাননি। তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যাঁদের বাশি বলে উপহাস করেছেন, তরিকুল তাঁদেরই একজন। তরিকুলের দুই ভাঙা পায়ের এক্স-রেটিকে বাংলাদেশের মানচিত্রের ওপর বসালে যে ছবি তৈরি হয়, ফেসবুকে তার ছড়াছড়ি। সম্ভাবনাময় তরুণের ভাঙা পায়ের ছবি বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি হোক, তা কারওরই প্রত্যাশা হতে পারে না। অথচ আন্দোলনকারী তরুণদের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসকদের আচরণ কি আমাদের সেদিকেই ঠেলে দিচ্ছে না?

আমরা জানি, কোটা সংস্কারের দাবিতে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ সরকার আন্দোলনে বিএনপি-জামায়াতের ইন্ধন বা উসকানির কথা বলেছে। ক্ষমতাসীন দলের কেউ কেউ আন্দোলনের সংগঠকদের দু-একজনকে ছাত্রশিবিরের কর্মী হিসেবেও দাবি করেছেন। কিন্তু তাঁদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান। অনুমানভিত্তিক হলেও তিনি আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক দর্শনের একটি তত্ত্বায়ন করেছেন। তাঁর এই অনন্য কৃতিত্ব জাতি নিশ্চয়ই চিরদিনের জন্য স্মরণে রাখবে।

উপাচার্য আবদুস সোবহান আরও বলেছেন, তাঁরা জানতে পেরেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের কতিপয় সহকর্মী আড়ালে থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করছেন, উসকানি দিচ্ছেন। কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাতে ৪ জুলাই ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফরিদ খান গত মঙ্গলবার শহীদ জোহা চত্বরে নগ্ন পায়ে নীরবতা পালন করতে চাইলে তাঁর প্রশাসনের প্রক্টর তাঁকে নিষেধ করেছিলেন। অর্থনীতি বিভাগের অন্যান্য সহকর্মীরও অনেকে তাঁকে ওই প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। আশার কথা, অন্য কিছু শিক্ষক তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, ছাত্রছাত্রীরাও এগিয়ে এসেছিলেন। ফরিদ খান ফেসবুকে সেদিনের কয়েকটি খণ্ডচিত্র তুলে ধরে সেদিন লেখেন, ‘গতকাল থেকে শিক্ষক সহকর্মী, ভাইবোন, শ্বশুর, বন্ধু, ছাত্র, শুভাকাঙ্ক্ষী সবাই একই কনক্লুশন টেনেছে—সময় ভালো না, সাবধানে থাকবেন। আমার মনে হয়, একটি সুস্থ, সুন্দর সভ্য জাতি হিসেবে বিকশিত হতে গেলে আমাদের এই ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।’

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে পুলিশের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে ছাত্রদের রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিলেন শহীদ ড. শামসুজ্জোহা। শহীদ অধ্যাপক জোহা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই সমাহিত আছেন। উপাচার্য অধ্যাপক সোবহানের কথাগুলো ওই কবর পর্যন্ত পৌঁছেছে কি না, জানি না। কিন্তু এটুকু বুঝতে কষ্ট হয় না যে তিনি যেখানেই আছেন, সেখানেই দুঃখ-কষ্ট-রাগে হায় হায় করে উঠছেন।

উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক সোবহানের এটি দ্বিতীয় মেয়াদ। এর আগে, আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালে প্রথম দফায় তিনি একবার এই দায়িত্ব পালন করেছেন। এরও আগে, ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে অন্য দুজন অধ্যাপকের সঙ্গে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। রাজনীতিতে তিনি অনেক দিন ধরেই সক্রিয় এবং আওয়ামী লীগের সমর্থক। দলীয় রাজনীতির জন্য হাজত খাটায় দল ক্ষমতায় এসে তাঁকে পুরস্কৃত করেছে বলেই জনমনে একধরনের ধারণা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় লোকদের নিয়োগ প্রশ্নে বিরোধের জের ধরে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা উপাচার্যের দপ্তরে গিয়ে যেসব কথা শুনিয়ে এসেছিলেন, তা পত্রপত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশ পেয়েছে। রাজনীতিতে সক্রিয় শিক্ষকের দলীয় আনুগত্য থাকতেই পারে, কিন্তু উপাচার্যের পদ গ্রহণের পর কি তার কোনো সীমারেখা থাকবে না?

দূর্ভাগ্যের বিষয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানও তাঁর দীর্ঘ নীরবতা ভেঙ্গে রোববার কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের জঙ্গিদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। পুলিশ কিম্বা ছাত্রলীগও যে অভিযোগ কল্পনা করেনি, তেমন একটা ধারণা আমদানি করলেন তিনি। এতে করে উপাচার্য পদে তাঁর অবস্থান নিশ্চয়ই দৃঢ়তা পেল, কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি তাঁর কাঙ্খিত আসনটি হারালেন।

সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের উন্নয়নের রাজনীতিতে শামিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উন্নতিতে যদি কেউ বিস্মিত হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর জন্য আরও বড় বিস্ময়ের নজির তৈরি করেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তরিকুলের ভাঙা পায়ের চিকিৎসা শেষ না করেই তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। অথচ অন্য চিকিৎসকেরা বলেছেন তাঁর পায়ে অস্ত্রোপচার করতে হবে। চিকিৎসকেরা হিপোক্রেটিক ওথ (Hippocratic Oath) হিসেবে পরিচিত যে শপথ নেন, তাতে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন এমন কোনো রোগীকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ আছে কি না, তা তাঁরাই ভালো জানেন। ঢাকায়ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে যাঁরা আহত হয়েছিলেন, তাঁদের প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। আইনের শাসন থাকলে এ ধরনের অমানবিক দায়িত্বহীনতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের যে জেল-জরিমানা গুনতে হতো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

২. কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিতে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে প্রথমে ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে নিগৃহীত হওয়া একজন কলেজছাত্রী তাঁর দুঃসহ যন্ত্রণা ও কষ্টের কথা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেছেন। আন্দোলনকারীদের একজন নেতাকে বেধড়ক পিটুনির হাত থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে যাওয়াই তাঁর জন্য কাল হয়েছিল। তাঁর শরীরের কোনো অংশই তাদের থাবা থেকে মুক্ত ছিল না। তিনি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে ওই সব উন্মত্ত দুর্বৃত্তের কয়েকজন সেই সিএনজিতে উঠে পড়ে তাঁকে আরও লাঞ্ছিত করে এবং থানায় নিয়ে পুলিশের কাছে দেয়। পুলিশও মেয়েটিকে হেনস্তা করেছে বলে তার অভিযোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কলেজপড়ুয়া একটি মেয়েকে এভাবে যৌন হেনস্তা করার ঘটনাতেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব কি শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে থাকে? তা না হলে এ ধরনের চরম নিন্দনীয় নারী নিগ্রহ ও লাঞ্ছনার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কীভাবে নিস্পৃহ থাকতে পারে? ক্ষমতাসীন দলের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য এবং তার ছাত্রসংগঠনের পেশিশক্তির ওপর কর্তাব্যক্তিদের নির্ভরশীলতাকে এর মূল কারণ হিসেবে যাঁরা চিহ্নিত করেন, তাঁরা কি খুব একটা ভুল বলছেন?

কোটা সংস্কারের আন্দোলন মোকাবিলায় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ এবং পেটোয়া ছাত্রলীগের মধ্যে একধরনের অদ্ভুত সমন্বয় লক্ষ করা যাচ্ছে। এই সমন্বয় যে কাকতালীয় নয়, সেই সন্দেহ আরও প্রকট হয় যখন আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি অথবা নিপীড়ন-নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতেও নাগরিক সমাবেশে পুলিশ মারমুখী হয়ে ওঠে।

আন্দোলনে উসকানি ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আবিষ্কারের যে কৌশল সরকার গ্রহণ করেছে, সেটাও খুব পরিচিত কৌশল। যেকোনো সমালোচনা ও ভিন্নমতকে জামায়াত-শিবিরের ষড়যন্ত্র অভিহিত করার বিষয়টি এখন ক্ষমতাসীনদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে বলে যাদের অভিহিত করা হয়, সেই জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে কিন্তু সরকার গত নয় বছরে কখনোই কান দেয়নি। যেসব দলকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, তারা সমর্থন করলেই কোনো আন্দোলন বা দাবি তার যৌক্তিকতা হারায় না। সুতরাং কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্র অভিহিত করা বিশ্বাসযোগ্য হয় কীভাবে?

ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও মন্ত্রীরা এবং তাঁদের সমর্থকগোষ্ঠী এসব ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব দিয়ে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগকেই বরং খাটো করছে। আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রী ও তরুণ-তরুণীদের ওপর নিষ্ঠুর-নির্মম অত্যাচার-নির্যাতনের বিচার না করে তাঁদের দেশপ্রেমের প্রতি কটাক্ষ করার নীতি ক্ষোভ প্রশমনের বদলে তাকে আরও উসকে দেওয়ার নীতি নিতান্তই হতাশাজনক।

৩. লাঞ্ছিত ছাত্রীটির কথায় ফিরে আসি। মেয়েটির ছবি, নাম এবং পূর্ণ পরিচয় বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়েছে। সংবাদমূল্যের বিচারে এ ধরনের হামলায় বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার মাত্রা তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু মেয়েটির চেহারা ঢেকে দেওয়া বা আবছা করে দেওয়ার প্রযুক্তিগত সুবিধা সত্ত্বেও এসব গণমাধ্যম তা কেন করল না, সেই প্রশ্নও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। যৌন নিগ্রহের শিকার কোনো নারী ও শিশুর ছবি ও পরিচয় গণমাধ্যমে প্রকাশ তাকে যে আরও নিগৃহীত করার শামিল, এই বোধ এখন আর অজানা কিছু নয়। দেশের আইনেও সে রকম বিধান আছে।

মেয়েটি যতটা নিগ্রহের শিকার হয়েছে, তার মাত্রা বিচারে গণমাধ্যম ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে হয়। যাঁরা এ বিষয়ে সচেতন, তাঁরা অবশ্য সতর্ক ছিলেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ তা মানেননি। হয়তো সে কারণেই মেয়েটি পরে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হতে বাধ্য হয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তো যে কেউই এসব ছবি প্রকাশ করতে পারে, সে ক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যম পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি কেন নেবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও এসব নীতিমালা মানতে হয়। কেউ এ ধরনের ছবি প্রকাশ করলে ফেসবুক, টুইটার বা ইনস্টাগ্রামের ব্যবস্থাপকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার ব্যবস্থা আছে, যার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানের ক্ষতি কমানো সম্ভব।

কামাল আহমেদ: সাংবাদিক

সূত্র: প্রথম আলো

-একে

কোটা আন্দোলন