• রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫
  • ||

গুণ্ডামি হামলা ও দমনের পরিণতি হয় ভয়াবহ

প্রকাশ:  ০৪ জুলাই ২০১৮, ০০:২৯ | আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৮, ০০:৩৭
পীর হাবিবুর রহমান
প্রিন্ট

ছোট হোক বড় হোক যেখানেই সমস্যা সেখানেই সমাধান দিতে হয় প্রধানমন্ত্রীকে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ভ্যাটের বিরুদ্ধে আন্দোলনে রাজপথ উত্তাল করে দিলে সরকারের কেউ সমাধান দিতে পারেননি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই সমাধান দিয়ে তাদের রাজপথ থেকে পড়ালেখার টেবিলে সন্তুষ্ট করে পাঠাতে হয়েছিল।

বেপরোয়া বাসচালকদের কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল। মানুষ ক্ষুব্ধ। নিরাপদ সড়কের জন্য সোচ্চার নাগরিকরা। সমাধানে কেউ এগিয়ে এলেন না। সরকারে থাকা পরিবহন নেতা ও মালিকপক্ষ অতীতে চালকদের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বাস্তবসম্মত নির্দেশনা দিতে হয়েছে। একটি স্কুলের জন্য প্রবাসীর মুঠোফোনের খুদে বার্তায় প্রধানমন্ত্রীকেই ফেনীতে স্কুল দিতে হয়। বেসরকারি শিক্ষকদের আন্দোলন দিনের পর দিন যখন উত্তাল হয়েছিল তাকেই সমাধান দিতে হয়েছে।

’৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আওয়ামী লীগকে ২১ বছর পর ক্ষমতায় এনেছিলেন। সেবার ঐকমত্যের সরকারে যোগাযোগমন্ত্রী হয়েছিলেন আন্দোলনে পাশে থাকা জাতীয় পার্টির তৎকালীন মহাসচিব আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি কারাবন্দী এরশাদকেই মুক্ত করতে ভূমিকা রাখেননি, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় বসাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। এরশাদের গুড মিনিস্টার মঞ্জু শেখ হাসিনা সরকারেরও সফল মন্ত্রী ছিলেন। এখনো আছেন। ’৯৬ শাসনামলে কাজ করার সুবাদে পরবর্তীতে শেখ হাসিনাকে অ্যারাবিয়ান ব্ল্যাক হর্স বলে মন্তব্য করেছিলেন। অর্থাৎ সরকারপ্রধান হিসেবে তার গতিকে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা আরবীয় কালো ঘোড়ার সঙ্গে উপমা হিসেবে তুলনা করেছিলেন। তিনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইলেকটেড সিএমএলএও বলতেন। সেনাশাসক এরশাদের মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেই এই মন্তব্য করতেন।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও অনেক আগে বলেছিলেন, টিমলিডার হিসেবে শেখ হাসিনার গতির সঙ্গে বাকিরা ছুটতে পারছেন না। প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও অভিজ্ঞ মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও অনেক আড্ডায় বলেছেন, ফাইল ওয়ার্কে শেখ হাসিনার জুড়ি নেই। মন্ত্রিসভার বৈঠকসহ যে কোনো বৈঠকে তিনি হোমওয়ার্ক করে আসেন। প্রতিটি ফাইল তাঁর নখদর্পণে। মন্ত্রিসভা বা একনেকের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী হয়তো কারও সঙ্গে কথা বলছেন, এমন সময় কোনো মন্ত্রী কোনো বক্তব্য রাখলে শেখ হাসিনা সঙ্গে সঙ্গে সেই বিষয় নিয়ে যে মতামত রাখেন তাতে সবাই উপলব্ধি করতে পারেন, এই বিষয়ে তিনি ওয়াকিবহাল।

এমনিতেই প্রচলিত রয়েছে, বয়স প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্পর্শ করতে পারেনি। শারীরিক ফিটনেসের কারণে এখনো তিনি ১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করতে পারেন। দলের নেতা-কর্মীদেরও হাঁড়ির খবর যে রাখেন, প্রতিদিন তাঁর মোবাইলে আসা তিন-চার শ এসএমএসও যে নজর এড়ায় না, তাও দলের বর্ধিত সভায় তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দলের নেতা-কর্মীরাই নন, দেশের রাজনৈতিক মহলও অবহিত হয়েছেন।

গত ১০ বছরে দেখা গেছে, যখন যে সমস্যা বা সংকট তৈরি হয়েছে তার সমাধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই দিতে হয়েছে। মাঝখানে সরকার বিব্রত হয়েছে। পরিস্থিতি অশান্ত হয়েছে। মানুষ উদ্বিগ্ন হয়েছে। মানুষের মনে এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে, সব সমস্যার সমাধান প্রধানমন্ত্রীকেই দিতে হয়, তাহলে এত উজিরে খামোখা আর আমলার কাজটা কী?

সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সংস্কারের দাবিতে মার্চ মাসে ছাত্রদের যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা দাবানলের মতো এপ্রিলে জ্বলে উঠেছিল। ৮ এপ্রিল শাহবাগে পুলিশ আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটা করলে এবং কাঁদুনে গ্যাসের শেল ছুড়লে পরিস্থিতি উত্তপ্তই হয়নি, আন্দোলন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে আন্দোলনের ফাঁক দিয়ে একদল দুর্বৃত্ত নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল। সেই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১১ এপ্রিল কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। তখনো সংসদের ভিতর-বাইরে দুজন মন্ত্রীর বক্তব্য পরিস্থিতিকে অশান্ত করে দিতে চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী গত ২৭ জুন আবারও বলেছেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কোটা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় শনিবার থেকে আন্দোলনকারীরা সংবাদ সম্মেলন করে আবারও কর্মসূচি দিতে গিয়েছিল। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। গণমাধ্যম বলছে, সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা এই ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ছাত্রলীগ হামলা চালায়নি। এখানে আন্দোলনকারীরা দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মারামারি করেছে। গণমাধ্যমে হামলাকারীদের ছবিতে ছাত্রলীগের অনেকের মুখ ভেসেছে। রাজশাহীতেও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা হয়েছে। আন্দোলনকারী নেতাদের পুলিশ গ্রেফতার করে রিমান্ডেও নিয়েছে। সরকারি দলের নেতারা এই আন্দোলনের নেপথ্যে বিএনপি ও ছাত্রশিবিরের ইন্ধনের অভিযোগ এনেছেন। কিন্তু গোটা দেশের মানুষ দেখেছে, সরকারেরও অনেকে বুঝেছেন এপ্রিলে উত্তাল হয়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই আসেনি, আন্দোলন থেমে গিয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছে, প্রধানমন্ত্রীর সেই ঘোষণার পর তার কার্যালয় থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদ বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কী ভূমিকা রেখেছেন? প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করা হয় যদি তাদের কাজ, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নে তারা নিজেরা কি আলোচনা ও নিজেদের সমন্বয় গড়ে তুলেছিলেন? প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা চেয়েছিলেন? কিংবা নিজেরা এ-সংক্রান্ত কোনো প্রজ্ঞাপন, বিবৃতি বা আইন সংশোধনের খসড়া কিছু দাঁড় করিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করেছিলেন? যদি না করে থাকেন, তাহলে তারা কি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেননি?

সব সরকারের আমলেই সমাজের যে কোনো অংশ যে কোনো ইস্যুতে বিক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলনে নামলে বা অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি সেখানে সমর্থন জুগিয়ে থাকে। চায় সরকারের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠুক। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকতেও সার কেলেঙ্কারি থেকে কানসার্ট বা শনিরআখড়ার আন্দোলনকেও বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দিয়েছিল। সরকারবিরোধী যে কোনো আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ দেখলে বিরোধী দল সুযোগ খুঁজবে সেখানে বাতাস দিতে। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব হলো, যে কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভরূপ নেওয়ার আগেই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই হোক বা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেই হোক পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ করা। প্রধানমন্ত্রী বরাবর তা করে এলেও কোথায় যেন ভিতরে একটি গলদ কাজ করে। সময় ক্ষেপণ করে।

সরকারি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে ৫৫ শতাংশ নিয়োগ হয় অগ্রাধিকার কোটায়। বাকি ৪৫ শতাংশ হয় মেধা কোটায়। বিদ্যমান কোটা সংস্কারের পাঁচ দফা দাবিতে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। মার্চে পুলিশ কার্জন হলে, এপ্রিলে আন্দোলনকারী ছাত্রদের ওপর হামলা চালায়। যেখানে সরকার ও প্রশাসন সমস্যার সমাধানে বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখানে ছাত্রলীগের মতো ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে হৃষ্টপুষ্ট, বর্ণাঢ্য ও গৌরবের মুকুট পরিহিত ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা দলীয় ক্ষমতার দাম্ভিকতায় সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের বিরুদ্ধেই নয়, তাদের ওপর শারীরিক হামলা চালায়, তখন ঐতিহাসিকভাবে সেটি অমার্জনীয় ও দুঃখজনক ঘটনা হিসেবে ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে রক্তক্ষরণ ঘটায়। সরকার যেখানে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে সামাল দিয়ে ভোটের পথে হাঁটছে, আন্দোলন দূরে থাক মাথা তুলে দাঁড়াতে দিচ্ছে না, সেখানে ঢাকা-রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগের নামে এই গুণ্ডামি, এই হামলা সরকারের জন্যই ক্ষতি ডেকে আনবে। রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে কখনো হামলা-মামলা কিংবা দমননীতির পথে এ দেশের কোনো শাসক ছাত্রসমাজকে বা তারুণ্যের শক্তিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ছাত্রসমাজের কণ্ঠকে দমন-পীড়ন, হামলায় যে স্তব্ধ করা যায় না, ইতিহাসে সেই সত্য ছাত্রলীগ কালের যাত্রাপথে বহন করে আসছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যাই নন, ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আওয়ামী লীগের মতো ৬৯ বছরের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটির ৩৭ বছর ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনবার দলকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এনেছেন। বহুবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরেছেন। বর্ণাঢ্য সংগ্রামমুখর রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই সাম্প্রতিককালে যে কোনো ইস্যুতে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে সমাধান দিচ্ছেন। বাজেটের পর ব্যাংকের সুদের হার কমানোর যে ঘোষণা এসেছে তাও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণেই হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন আরেক দফা বারুদের মতো জ্বলে ওঠার আগেই তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে নয় সদস্যের কমিটি করেছেন। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তারা কোটা সংস্কার ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের আলোকে প্রজ্ঞাপনসহ আইন সংশোধনের খসড়া নিয়ে প্রতিবেদন উত্থাপন করবেন। এ কাজটি অনেক আগেই করা যেত। কিন্তু প্রমাণিত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতটা আন্তরিক, যতটা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ত্বরিত ততটা যেন আর কেউ নন। ভাবখানা এমন, সব সামাল দিয়ে ক্ষমতায় আনবেন শেখ হাসিনা, ভোগ করব আমরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের গৌরবের ঠিকানাই নয়, সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের ঐতিহ্যের সূতিকাগারও। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার সংগ্রামের পথ ধরে সুমহান মুক্তিযুদ্ধই নয়, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বার বার সব গণতন্ত্র ও ছাত্রসমাজের অধিকার আদায়ে বার বার জ্বলে উঠেছে। এমনকি ওয়ান-ইলেভেন সরকারের পতন ঘণ্টাও এখানকার বিদ্রোহই বাজিয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একসময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুকে বলা হতো সেকেন্ড পার্লামেন্ট। এ বিশ্ববিদ্যালয় আজ দুটোই হারিয়েছে। সব ঐতিহ্য মুখ থুবড়ে পড়েছে কবে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ ডাকসু নেই ২৮ বছর। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ থেকে সমাজের বিভিন্ন মহল আকুতি জানালেও, উচ্চ আদালত নির্দেশনা দিলেও ডাকসু নির্বাচন হয় না। ছাত্রসমাজের ন্যায়সংগত এই দাবি আদায়ে সব ছাত্র সংগঠন এক হয়ে কথা বলে না। এই দাবিতে আন্দোলনে নামে না। কিন্তু সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে নামলে সেখানে ছাত্রলীগ হোক আর ছাত্রসমাজের একটি অংশই হোক, প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে দ্বিধা করে না। এমনকি ছাত্রছাত্রীদের ওপর ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের দ্রোহ, বিপ্লব ও বিদ্রোহের চেতনার তীর্থভূমিতে নির্লজ্জভাবে সব লাজ-লজ্জা ভুলে যেভাবে হামলা করেছে, এই সমাজ আজ তাও সহ্য করার মতো বোধহীন হয়ে পড়েছে। ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা, তাদের নিরাপত্তা বিধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লোকসংস্কৃতি গবেষক সুম্মিতা চক্রবর্তী তার ফেসবুকের স্ট্যাটাসে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘এসব ছবি দেখছি আর নিজেকে বেহায়া লাগছে, শিক্ষক হিসেবে অপারগতা টের পেয়ে কেবল মাথা নুয়ে আসে।’ কী করুণ দশা আমাদের শিক্ষাঙ্গনের, আহা! এই অসহায়ত্ব একজন সুম্মিতার নয় আজ বিবেকবান সবারই।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা গ্রেফতার হয়, রিমান্ডে যায়। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলাকারীরা প্রকাশ্য দিবালোকে নির্দয় নির্যাতন, শ্লীলতাহানিসহ আইন হাতে তুলে নেওয়ার মতো দিনেদুপুরে যারা ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, গুণ্ডামি করেছে তাদের গ্রেফতার করা হয় না। কেন হয় না? হামলাকারীরা সরকার সমর্থক ছাত্রলীগ বলে? না হয় কেন হবে না? এরা অন্য ছাত্র সংগঠনের বা সাধারণ ছাত্র হলে কি গ্রেফতার হতো না? আইন সবার জন্য এখানে সমান হয় না। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্দোলনকারীদের যে চোখে দেখে হামলাকারীদের সেই চোখে দেখে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বোবা হয়ে বসে থাকে। একটা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক থেকে সামাজিক শক্তিসমূহ বোধহীন হয়ে বসে আছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ দূরে থাক কণ্ঠ ছেড়ে কথাও বলতে পারে না। এমন নয় যে, হামলাকারীদের চেনা যাচ্ছে না। তাদের নাম, ছবি গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। তবু তারা কেউ গ্রেফতার হয় না। আন্দোলনকারীরা মারও খায়, গ্রেফতারও হয়। যারা বলছেন এ আন্দোলন শিবিরের ষড়যন্ত্রের তবু তাদের মানতে হবে এটা সত্য হলেও সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখবে কিন্তু দলীয় কর্মীদের আইন হাতে তুলে নিয়ে হামলা, গুণ্ডামি, সন্ত্রাস গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এমনকি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কেউ যদি প্রধানমন্ত্রী, সরকার নিয়ে সংবিধান, আইনবিরোধী উসকানিমূলক, ষড়যন্ত্রমূলক স্ট্যাটাস ফেসবুকে দেয় তাকেও আইনের আওতায় আনা হোক। কিন্তু এভাবে হামলা শিক্ষাঙ্গনে গ্রহণযোগ্য নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু আজ থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে এই নৈরাজ্য দেখা যেত না। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই। কোটা সংস্কারের এই আন্দোলন শুরুতে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা তথা সমঝোতার পথ নিতে বিলম্ব হয়েছে বলে এপ্রিলে উত্তাল আন্দোলন দেখতে হয়েছে, তেমনি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় বেলুনের মতো সেটি চুপসেও গেছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সেই সময় সরকারের আমলারা দায়িত্বশীল পদক্ষেপ ও ভূমিকা রাখলে এই সময়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন ঘিরে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা দেখতে হতো না।

প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে কোটা সংস্কার নিয়ে প্রতিবেদন দাখিলের যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন এতে একটি কার্যকর সুরাহা হবে এবং আন্দোলনকারীরা পড়ালেখার টেবিলে নিশ্চিন্তে ফিরে যাবে— এটা আমরা আশা করতেই পারি। সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের ইতিহাস গৌরব ও ঐতিহ্যের। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার-স্বাধীনতার পথ ধরে সুমহান মুক্তিযুদ্ধে এই সংগঠনের ভূমিকা ঐতিহাসিক। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও ছাত্রসমাজের দাবি আদায় ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অনন্য সাধারণ ভূমিকা রেখেছে।

পাকিস্তান আমলে ছাত্রসমাজের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে আইয়ুব খানের দালাল মোনায়েম খানের ছাত্র সংগঠন এনএসএফের ভূমিকা ছিল নিন্দিত, ঘৃণিত ও লজ্জার। ছাত্রসমাজের গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলন-সংগ্রামের বিরুদ্ধে হামলা ও রুখে দাঁড়াতে গিয়ে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। সামরিক শাসকদের জমানায় তাদের আশীর্বাদপুষ্ট ছাত্র সংগঠনগুলোও ছাত্রসমাজের আন্দোলন-সংগ্রামের বিরুদ্ধে অস্ত্রবাজি ও হামলার রাজনীতি দিয়ে রুখতে গিয়ে নিঃশেষ হয়েছে। ছাত্র সংগঠনের জনপ্রিয়তার মূল উৎসই হচ্ছে, ছাত্রসমাজের আবেগ-অনুভূতি লালন ও ধারণ করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রসমাজের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের আবেগ-অনুভূতিকে লালন করে যেখানে অভিভাবকত্বের জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, সেখানে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হামলায় জড়িয়ে পড়ে কীভাবে? ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদেরও সিদ্ধান্ত নিতে হবে, গণতান্ত্রিক, আদর্শিক, ঐতিহ্যের ধারায় পথ হাঁটবে, নাকি স্বৈরশাসকদের ছাত্র সংগঠনগুলোর মতো নষ্ট রাজনীতির ভ্রান্তপথে পা বাড়াবে।

রাজনৈতিক ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হামলা, নির্যাতন, গুণ্ডামি ও দমন-পীড়নের পরিণতি কখনো শুভ হয় না। পরিণতি হয় ভয়াবহ। আমাদের রাজনীতিবিদরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে বলেন। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষাই হচ্ছে যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেন না। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশের পর কোটা সংস্কার আন্দোলনও আর চলতে পারে না। যে কোনো আন্দোলন হঠকারী ও উগ্রপন্থা গ্রহণ করলে যেমন সাফল্য বয়ে আনে না, তেমনি দমন-পীড়ন এবং হামলাও রাজনৈতিক শক্তির জন্য গণসমর্থন এনে দেয় না।

বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বাসভবনে রাতের অন্ধকারে যেভাবে নারকীয় তাণ্ডব হয়েছিল, সে ঘটনার তদন্ত ও অপরাধীদের গোটা সমাজ শাস্তি চেয়েছে। তাদের শাস্তি হওয়া উচিত। তেমনি যারা দিনে-দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর নির্দয় আক্রমণ করেছে তাদেরও আইনের আওতায় এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। আইন কাউকেই কোনো ক্ষমতা বলে তার ঊর্ধ্বে যেতে দিতে পারে না।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

পীর হাবিবুর রহমান