• বুধবার, ২০ জুন ২০১৮, ৬ আষাঢ় ১৪২৫
  • ||
শিরোনাম

দেশে এতো কেনো ভুয়া ডাক্তার!

প্রকাশ:  ১১ জুন ২০১৮, ০৬:৪৩ | আপডেট : ১১ জুন ২০১৮, ০৭:০১
মাহমুদ মানিক
প্রিন্ট
চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ দেশের মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রায়ই প্রতারণার শিকার । কারণ দেশজুড়ে  ভুয়া ডিগ্রিধারী ডাক্তারের ছড়াছড়ি। বাড়ছে তাদের সীমাহীন দৌরাত্ম্য। বিভিন্ন নামের বাহারি ডিগ্রি ব্যবহার করে চকচকে সাইনবোর্ড সেঁটে নিরীহ ও সাধারণ রোগীদের প্রতারিত করে আসছে তারা। ফলে জনস্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এক চরম অরাজকতা বিরাজ করছে। প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভুয়া ডাক্তারের ভুল চিকিৎসার খবর মিলছে। দেশজুড়ে এই অবস্থা এখন উদ্বেগজনক। চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন প্রদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নীরব দর্শকের ভূমিকায় অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। 

বিএমডিসির হিসাবে শুধু রাজধানীতে আড়াই সহস্রাধিক ভুয়া ডাক্তার রয়েছেন। সারা দেশে এই সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি। তবে বাস্তবে বিএমডিসির দেওয়া পরিসংখ্যানের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ভুয়া ডাক্তার দেশজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। ভুয়া ডাক্তারের পাশাপাশি জাল ডিগ্রিধারী ‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের’ সংখ্যাও কম নয়। তারা এমবিবিএস পাসের পর নামের আগে-পরে দেশ-বিদেশের ভুয়া উচ্চতর ডিগ্রি ব্যবহার করে বছরের পর বছর রোগী দেখছেন, হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের ফি। 

ভুয়া ডাক্তার-দালালদের দৌরাত্ম্য: ভুল চিকিৎসা, অবহেলা আর চিকিৎসা-বাণিজ্যের নির্মমতায় একের পর এক রোগী মারা যাচ্ছেন। গত বছর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে দুই শতাধিক রোগীর ‘ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু’ ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সময়সীমায় র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের উদ্যোগে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে অর্ধশতাধিক ভুয়া ডাক্তারকে আটক এবং তাদের জেল-জরিমানা করা হয়। ভুয়া ডিগ্রিধারী চিকিৎসকদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্যেরে সত্যতা স্বাস্থ্য মহাপরিচালক দীন মো. নূরুল হক নিজেও নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, চিকিৎসা সেক্টরে ভুয়া ডাক্তার ও অপচিকিৎসা ব্যবস্থাটি বছরের পর বছর ধরে দুরারোগ্য ক্যানসারের মতোই চেপে আছে। এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার লক্ষ্যে বিএমডিসিকে ঢেলে সাজানোর বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

হাতুড়েরাও যখন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার! : রাজধানীর উত্তরার একটি অভিজাত হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরিচয়ে দায়িত্ব পালন করতেন ডা. মোহাম্মদ শহিদুর রহমান। তার ভুল চিকিৎসার বিষয়টি সন্দেহজনক হলে শহিদুর রহমানের সার্টিফিকেট যাচাই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চিত করে, ওই নামের কোনো শিক্ষার্থী ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেনি। অবশেষে প্রতিষ্ঠানটি স্বঘোষিত ওই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে বরখাস্ত করলেও আর কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শহিদুর রহমানের মতো হাতুড়ে ডাক্তার হয়েও সাইনবোর্ডে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরিচয়ে রাজধানীসহ সর্বত্রই রমরমা প্রতারণা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। ঢাকার বিখ্যাত একটি হাসপাতালেও জাল সনদধারী ভুয়া ডাক্তারের মাধ্যমে চিকিৎসা প্রদানের দৃষ্টান্ত রয়েছে। ভুয়া ডাক্তারি সনদপত্র নিয়ে বিশেষায়িত ওই হাসপাতালে দীর্ঘ চার বছর ডাক্তারি পেশায় নিয়োজিত ছিলেন কাজী তানভীর জামান। একপর্যায়ে তার চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপত্র অনুসন্ধানী শাখা ও মেডিকেল কাউন্সিল কাজী তানভীর জামানের সনদপত্র জাল প্রমাণ করে। এসব জাল সনদপত্রের ভিত্তিতে টানা চার বছর তিনি চিকিৎসা প্রদান করছিলেন। কুমিল্লার লাকসামে সজল কর্মকার নামে এক ভুয়া ডাক্তারকে রোগী দেখা অবস্থায় আটক করে তার ব্যবস্থাপত্র জব্দ করেন কুমিল্লার সিভিল সার্জন। লাকসাম পৌর শহরের বাইপাস এলাকায় রাশেদা কমপ্লেক্সের নিচ তলায় ওই ভুয়া ডাক্তারকে আটক করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন সিভিল সার্জন। খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসিতে র‌্যাব-৬, খুলনা, র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এইচ এম আনোয়ার পাশা এবং খুলনার সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মাসুদ সাত্তারের সমন্বয়ে মোবাইল কোর্টের অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় এমবিবিএস ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পরিচয়ে রোগী দেখার সময় সাতজনকে হাতেনাতে আটক করে তৎক্ষণাৎ জরিমানা ছাড়া কারাদণ্ড প্রদান করে খুলনা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। দণ্ডিত ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তাররা স্বীকার করেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ সারা দেশে তাদের মতো আড়াই শতাধিক ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তার রয়েছেন। তারা প্রায়ই স্থান পরিবর্তন করেন এবং কৌশলে সহজ-সরল মানুষকে ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। 

ডিগ্রির ছড়াছড়ি : র‌্যাবের এক অভিযানে ঢাকার গাবতলী থেকে মেডিকেল ডিপ্লোমা ট্রেনিং একাডেমি নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ ভুয়া ডাক্তারি সার্টিফিকেটসহ মিসেস জলি (৩৫) ও ডা. মো. জাহাঙ্গীরকে (৪৫) গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ওই ট্রেনিং একাডেমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এমবিবিএস, ডেন্টাল ডিপ্লোমা, বিডিএস কোর্স, নার্সিং ডিপ্লোমা, রেডিওলজি ডিপ্লোমা ইত্যাদি কোর্সে ছাত্র ভর্তি করে ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে আসছিল। শতকরা ৯০ ভাগ ভুয়া ডিগ্রিধারী ডাক্তার দ্বারাই বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক-নার্সিং হোমের চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হচ্ছে। বাণিজ্যের লক্ষ্যে ভুয়া ডাক্তাররা নামের পেছনে এফআরএসএইচ, এমএসিপি, এফএসিপি, পিজিটি, এমডি ও এফসিপিএস (ইনকোর্স) ও পার্ট-১ অথবা পার্ট-২-সহ বিভিন্ন ডিগ্রি উল্লেখ করেন। শুধু তাই নয়, ভুয়া ডিগ্রির সঙ্গে লন্ডন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে শিক্ষালাভের কথাও উল্লেখ করা হয়। এ কারণে সাধারণ রোগীরা এসব ডাক্তারকে বিদেশি ডিগ্রিপ্রাপ্ত বলে মনে করেন। এত এত ডিগ্রি দেখে সরল মনে ভুয়া ডাক্তারদের দেখানোর জন্য ভিড় জমান। এই সুযোগে ভুয়া ডাক্তাররা রোগীপ্রতি ফি নেন ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। বিএমডিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এমবিবিএস পাস করার পর তিন বছর ট্রেনিং ও এক বছর কোর্স করার পর এফসিপিএস শেষ হয়। কিন্তু অনেক ডাক্তার এফসিপিএস পার্ট-১ শেষ হওয়ার পর তা নামের পেছনে ‘ডিগ্রি’ হিসেবে সংযুক্ত শুরু করে দেন। অনেক ক্ষেত্রে এফসিপিএস (চূড়ান্ত পর্ব) লেখাও থাকছে নামের পেছনে। পাশাপাশি ওই ডিগ্রিধারীদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ রয়েছে তা জানা নেই দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের। দেশে ভুয়া ডিগ্রির অভাব নেই, টাকা দিলেই পাওয়া যাচ্ছে সব মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের জাল সনদপত্র। 

টাকার বিনিময়ে ডাক্তার হওয়া! : পড়াশোনা না জানলেও যে কেউ পেয়ে যান সব ধরনের সার্টিফিকেট। সামান্য কিছু টাকা খরচ করলে তারা হতে পারবেন সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত ডাক্তার। পড়াশোনা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত থাকলেও চলবে। খরচের পরিমাণও নাগালের মধ্যেই। ভারত বা অন্য দেশের সার্টিফিকেট পেতে ১৫-২০ হাজার টাকা খরচ করলেই হবে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘেঁষা এলাকা থেকে এসব সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে সব মিলিয়ে ৫-৬ হাজার টাকা লাগে। ডেন্টাল কলেজের সার্টিফিকেটের জন্য ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা হলেই চলবে। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সার্টিফিকেট পেতে হলে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা গুনতে হয়। 
ভারত থেকে এমবিবিএস ও মেডিসিন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি এমডির সার্টিফিকেট মাত্র ১২ হাজার টাকায় কিনে এনে কথিত ডা. গোলাম কিবরিয়া পাঁচ বছর ধরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেজে প্র্যাকটিস চালিয়ে আসছিলেন। ভেজালবিরোধী মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে র‌্যাব-৪-এর সদস্যরা মিরপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন পিসিল্যাব নামের একটি বিলাসবহুল প্রাইভেট চেম্বারে অভিযান চালিয়ে গোলাম কিবরিয়াকে গ্রেফতার করেন। এরপর র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা রাজধানীর অলিগলি ও অভিজাত এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে গোলাম কিবরিয়ার মতো আরও দেড় শতাধিক ভুয়া ডাক্তারের সন্ধান পান। 

বিএমডিসির নতুন আইন : ভুয়া ডাক্তাররা এমন সব পরিচয় ব্যবহার করেন, যার কোনো অস্তিত্ব নেই। একইভাবে বিএমডিসি আইনে অনুমোদন করে না এরকম পদ-পদবি ও ডিগ্রির ব্যবহারও করছেন। এক্স-অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, এক্স-প্রফেসর সংযুক্তি প্রসঙ্গে বিএমডিসির সভাপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. আবু শফি আহমেদ আমিন বলেন, এরকম কোনো পদ নেই। এটা সে ফ বাণিজ্যিক প্রয়োজনে লেখা হয়। তিনি সভাপতি বলেন, ‘চিকিৎসকদের মেধা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে ঘাটতির কারণে এসব ঘটনা বাড়ছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ হলে কথিত ওই চিকিৎসকের সনদ বাতিলের এখতিয়ার আমাদের রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালিত হয়। এসব নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে বিএমডিসি। ’ সভাপতি জানান, বিএমডিসির নতুন আইনে অভিযুক্ত চিকিৎসকদের শাস্তির মাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অভিযুক্তকে ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা তিন বছর জেল অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

লেখক: ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট এবং ব্লগার