• বুধবার, ২০ জুন ২০১৮, ৬ আষাঢ় ১৪২৫
  • ||
শিরোনাম

একরাম হত্যার সুষ্ঠু তদন্তে উজ্জ্বল হবে ভাবমূর্তি

প্রকাশ:  ০৪ জুন ২০১৮, ১৫:৪২
শেখ আদনান ফাহাদ
প্রিন্ট
ফাইল ছবি
ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টার পুরোপুরি আইনসিদ্ধ না হলেও কখনো কখনো এই প্রক্রিয়া অবলম্বনের প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরনের সমর্থন থাকে।

মানুষ বুঝতে পারে ও জানে যে ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টার সাধারণ প্রক্রিয়া নয়। ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারকে সমর্থন করা সাধারণ মানুষদের ভেতরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পর্যন্ত আছেন।

মানুষ সবসময় যুক্তি বা আইন মেনে চলে না। অপরাধীদের বর্বরতা বা ভয়াবহতা কখনও কখনও রবীন্দ্র সাহিত্যপ্রিয় শান্তিপ্রিয় মানুষকেও নিষ্ঠুর করে দেয়।

সিনেমা দেখে হোক বা পারিপার্শ্বিক কারণে হোক, আমাদের অনেকের মধ্যে সহিংস হয়ে উঠার কিছু উপাদান আছে এবং এ নিয়ে আমাদের কোনো অনুতাপ নেই। অসির চেয়ে মসী বড়, এই কথা আমরা মানি এবং চর্চা করি। দীর্ঘমেয়াদে সমাজ থেকে সবধরণের অপরাধ দূর করতে জ্ঞান ও নৈতিকতা-ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।

শিশুদের আমরা আলোকিত করে নির্মাণ করতে পারলে, সমাজ হবে আরও সুন্দর আর শান্তির। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ থাকে যারা সব হিসাবের বাইরে চলে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের মা-বাবা পর্যন্ত তাদের মৃত্যু কামনা করে। এসব দুর্বৃত্তকে আদালতে পাঠিয়েও লাভ হয় না।

আদালত থেকে হয় মুক্ত হয়ে আসে অথবা সামান্য সাজা ভোগ করে আবার অপরাধের জগতে ফিরে যায়। তবে এরা সমাজে খুব বেশি নয় সংখ্যায়। এদেরকে ক্রসফায়ারে দিলে বা এনকাউন্টার করলে সাধারণ মানুষ খুশিই হয়। যদিও প্রক্রিয়াটি সভ্যতা-বিবর্জিত।

কিন্তু আমরা যে পুরোপুরি সভ্য নই, এর দায় কিন্তু এই সমাজেরই। খানিকটা এই অসভ্যতা থেকেই আমরা অনেকে চলমান মাদক-বিরোধী অভিযানকে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু এটা আমি নিশ্চিত বলতে পারি, আমি যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কমান্ডিং অফিসার হতাম, আমার নির্দেশে বা আমার হাতে একজনও নিরাপরাধ মানুষ অযথা গুলি খেয়ে আহত বা নিহত হতো না। বুলেট পরিচালনায়ও নীতি-নৈতিকতা আছে, আইন-কানুন আছে।

টেকনাফের একরাম নিয়ে এত কথা হচ্ছে। আমিও মনে মনে খুব অস্বস্তিতে আছি। বলতে পারেন বিবেক দংশন করছে। কারণ অনেকেই চলমান অভিযানকে সমর্থন করেছে পরিচিতজনদের মধ্যেই।

এনকাউন্টারকে সমর্থন করা মানুষগুলো হতে পারে খানিকটা অপরিণত, অসভ্য বা ফ্যাসিস্ট। এরপরেও এই প্রক্রিয়া আমরা সাধারণেরা অনেকে সাপোর্ট করেছি। সাপ যখন আপনাকে কামড়াতে আসবে তখন আপনি নীতি কথা বা আইনের কথা বললে কাজ হবে না। সাপ মেরে ফেলতে হবে।

যুদ্ধের ময়দানে শত্রু যখন সামনাসামনি বুলেট মারবে, আপনি তখন দেশাত্মবোধক গান গাইলে বা কবিতা আবৃত্তি করলে সেই বুলেট ফিরে চলে যাবে না। আবার যুদ্ধ জয়ে গান/কবিতার গুরুত্বও অপরিসীম। কিন্তু বুলেট এর জবাব তো বুলেট দিয়েই দিতে হবে।

কিন্তু যুদ্ধেরও একটা নিয়ম থাকে। সে নিয়ম ভঙ্গ করে মানুষ মারলে বলা হয় মানবতাবিরোধী অপরাধ।

বন্দুকযুদ্ধের নামে কোনও নিরীহ, নিরাপরাধ মানুষ মারলে সেটিও অপরাধ। একরামের হত্যাকে আমরা কীভাবে দেখছি? শুধুই কি ভুল করে হত্যা করা হয়েছে (যদি একরাম আসলেই নিরাপরাধ হয়ে থাকেন)? একরাম যদি নিরাপরাধ হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে হত্যা করা হল কেন?

এটা কি কোনও নতুন ষড়যন্ত্র? মাদক ব্যব্যসায়ীদেরকে বাঁচিয়ে দেয়ার জন্য একজন ভালো মানুষকে মেরে ফেলা হলো না তো? তাও আবার আওয়ামী লীগেরই এক নেতা তিনি। বিএনপির কাউকে মারলে তো আওয়ামী লীগ এর লোকজন মুখ খুলে কিছু বলত না। চলমান মাদক-বিরোধী অভিযান নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগের ভেতরেই যেন ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, সরকার প্রধানের উপর চাপ সৃষ্টি হয় সেজন্যই কি একরামকে টার্গেট করা হলো?

শেখ হাসিনা যেমন দেশপ্রেমিক, সৎ, উদ্যমী, কর্মঠ নেতা, তাঁর দলের বা সরকারের অনেকে কি তার ধারে কাছেও আছে? এটা আমরা সকলেই জানি।

বিতর্কিত এমপি বদি সাহেব তো তো আওয়ামী লীগেরই একজন নেতা। তিনি সাহেব বিদেশ চলে গেছেন, তাও আবার পবিত্র মক্কা-মদিনায়।

আমরা তো ইচ্ছে করলেই কোথাও যেতে পারি না। আমাদের আয় সীমিত, আমরা অবৈধ কিছু করি না। চাকুরি করি, খাই-দাই, কর দেই। আমাদের দেশ বলতে একটাই- বাংলদেশ। পুরো পৃথিবীতে আমাদের একটাই থাকার জায়গা। আমরা চট করে কোথাও পালিয়েও যেতে পারব না। এদেশেই আমরা থাকব।

তাই আমরা চাই, একরাম হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত হউক। যেমন নারায়ণগঞ্জে হয়েছিল।

র‍্যাবকে আমরা ভালোবাসি, তবে প্রতিষ্ঠান হিসেবে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে র‍্যাবের অনেক অর্জন আছে। জঙ্গি দমন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় র‍্যাবের ভূমিকা ইতিহাস হয়ে থাকবে।

কিন্তু কোনো অফিসার বা সদস্য যদি আইনের অপপ্রয়োগ করে তখন তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করাও দরকার। এর আগে কয়েকটি ঘটনায় বিচার সরকার করেছেও। এই ঘটনারও আমরা তদন্ত চাই। সরকারের ভেতরে যেনো কোনও সরকার সৃষ্টি হতে না পারে, সেদিকেও সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে। আমরা চাই, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হোক। যারা ক্রসফায়ার বিরোধী, তারাও এটাই চায়। শেখ হাসিনা একজন মানবতাবাদী নেতা। তাই র‍্যাবের কেউ যদি কোনো অপরাধ বা ভুল হয়ে থাকে, সেটি চিহ্নিত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হউক। এতে প্রতিষ্ঠান হিসেবে র‍্যাবের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, এটা আমি নিশ্চিত বলতে পারি। সূত্র: ঢাকা টাইমস

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।