• রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮, ৪ ভাদ্র ১৪২৫
  • ||

আমাদের রাজনৈতিক মন : ইফতার পার্টি

প্রকাশ:  ৩১ মে ২০১৮, ১৬:০১
হাসান হামিদ
প্রিন্ট

রমজান মাস এলেই আমাদের সমাজ বা ব্যক্তি জীবনে অন্য এক আবহ তৈরি হয়। রোজা রাখা শুধু নয়, এর সাথে আমাদের অনেক ধর্মীয় আবেগ জড়িয়ে থাকে। সেই সাথে অনেক অসঙ্গতিও আশে পাশে দেখি। সব না হয় বাদ দিলাম। কিন্তু ইফতার পার্টি নাম দিয়ে সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া বা আলোচনা সভা করার যে সংস্কৃতি আমাদের এখানে চালু হয়েছে, তা শুধু দৃষ্টিকটু নয়; এই নোংরামো আমাদের মুল ধর্মীয় আবেগে সামান্য হলেও কালি মাখায়।

কয়েক দিন ধরে অফিসে কাজের চাপ। আমার খুব প্রিয় এক কাজিন অসুস্থ। মন একেবারেই ভালো নেই। ঈদ সংখ্যার লেখা দিতে অনেক পত্রিকায় কথা দিয়েও এবার সেটা রক্ষা করতে পারিনি। এদিক ওদিক করে চারটিতে লেখা দিতে পেরেছি। তার মাঝে প্রতিদিন বাসের ধাক্কায় মানুষের হাত পা যাবার খবর আমাদের আরও হতাশা বাড়িয়ে দেয়। এই নগরীতে চলাফেরা কী যে নিরাপত্তাহীন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, তার নির্মম ব্যাখ্যা দেয়া কঠিন।

নাগরিকদের মধ্যে দুটো ভাগ আছে। প্রাচীন রোমে প্যাট্রিসিয়ান আর প্লিবিয়ানে সমাজটা বিভক্ত ছিল। আমাদের দেশেও আছে ‘আশরাফ’ আর ‘আতরাফ’। নাগরিক সমাজে আছেন ‘আমজনতা’ এবং ‘বিশিষ্ট নাগরিক’। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে বিশিষ্ট নাগরিকদের অনেক কদর। তাঁরা কেউ কেউ দলের জন্য কাজ করেন, দলকে নানা পরামর্শ দেন এবং অনেকেই ভাড়া খাটেন। তারাও আবার দুই শিবিরে ভাগ হয়ে আছেন। একদল আওয়ামী লীগের ইফতার মজলিশে দাওয়াত পান, আরেক দল দাওয়াত পান বিএনপির মজলিশে। সেখানে রাজনীতি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়। প্রতিযোগী কিংবা প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের প্রতি উষ্মা দেখানোর এবং কটু কথা বলার কমতি থাকে না।

সম্প্রতি ঢাকায় কর্মরত বিদেশী কূটনীতিকদের সম্মানে ইফতার পার্টির আয়োজন করে বিএনপি। রোববার রাজধানীর গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে এ ইফতার পার্টি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা অংশ নেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা কারাবন্দী থাকায় ইফতার মাহফিলে আগত অতিথিদের অভ্যর্থনা জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

দলের চেয়ারপারসনকে কারাগারে রেখে রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেলসমূহে ইফতার পার্টিতে মেতে উঠেছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। তবে পত্রিকায় পড়েছি, অন্তঃকোন্দলের জের ধরে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ন মহাসচিব এবং তারেকপন্থী নেতা রুহুল কবীর রিজভী ইফতার পার্টিতে অংশগ্রহণ করেননি। এরপর আরেক ইফতার পার্টিতে দেশের জাতীয় নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গণতন্ত্র উদ্ধার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। গণতন্ত্র রক্ষায় এগিয়ে আসি। রাজধানীর ইস্কাটনে ঢাকা লেডিজ ক্লাবে রাজনীতিকদের সম্মানে বিএনপির ইফতার মাহফিলে তিনি একথা বলেন। বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, ‘আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই। সরকারের ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলায় তাকে কারাগারে ইফতার করতে হচ্ছে। দেশের এই দুঃসময়ে, গণতন্ত্রের সংকটে আমরা সবাই প্রত্যাশা করি, আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ তাদের মূল্যবান অবদান রাখবেন। জাতিকে এই সংকট উত্তরণে তারা নেতৃত্ব দেবেন।’ এই বক্তব্য কি ইফতার পার্টিতে দেয়া জরুরি?

আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলো মাসজুড়েই ইফতার পার্টির নামে নিজেদের দৃশ্যমান রাখে। ছোট দলগুলোর আর্থিক সংগতি কম। তারা দলের অফিসে কিংবা ছোটখাটো জায়গা ভাড়া করে এক সন্ধ্যার জন্য হলেও একটা জমায়াতের চেষ্টার করেন। কিন্তু বড় দলগুলোর আয়োজন থাকে প্রায় প্রতিদিন। এরও একটা রুটিন বা ফর্মুলা আছে। শুরু হয় অনাথ শিশু-কিশোরদের ডেকে এনে তাদের সঙ্গে ইফতার করা। সঙ্গে থাকেন আলেম-ওলামা।

তারপর একে একে চলে দলের নানা স্তরের লোক, জোটের সদস্য, কূটনীতিক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কিংবা সার্টিফিকেটধারী অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আয়োজন। সুশীলরাও বাদ পড়েন না। সাংবাদিক নেতারা তো ‘ক্রস-কাটিং’ গোষ্ঠী। তারা সব দাওয়াতেই যান। তারা না গেলে খবর ছাপবেন বা প্রচার করবেন কারা। রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কিংবা পেশাজীবী গোষ্ঠীও এ মাসে একবার হলেও ইফতার পার্টির আয়োজন করে থাকে। সেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা সব দলের কিংবা সব ধর্মের প্রতিনিধিদের দেখা পাই। এগুলো অনেকটাই সর্বজনীন ইফতার পার্টির মতো।

যাক, এবার রমজান মাস নিয়ে কিছু বলি। আমাদের মাঝে রহমত, মাগফেরাত এবং নাজাত সম্মৃদ্ধ বরকতময় রমযান মাস অতিবাহিত হচ্ছে। এ পবিত্র মাসে মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে তার সকল রোযাদার বান্দাহের প্রতি করুনার ফল্গুনধারায় বর্ষিত হয়। রমযানের প্রত্যেকটি নেক আমলের সওয়াব স্বয়ং স্রষ্টা কয়েকগুন বৃদ্ধি করে দেন । আল্লাহ তায়ালা হাদীসে কুদসীতে ঘোষণা করেছেন, রোযা আমার জন্য এবং এর প্রতিদান আমি নিজ হাতে দিব । রমযান মাসের মর্যাদার কোন সীমা পরিসীমা নেই।

এ মাসে যেমন অতীতে কৃতগুনাহ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় তেমনি অগণন সওয়াবের অধিকারী হওয়া যায়। এ মাসের প্রত্যেকটি আমল তার পূর্বেরকার আমলের চেয়ে কয়েকগুন বেশি তাৎপর্য বহন করে। এ মাসে রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং আল্লাহ তায়ালা তারা বান্দাদেরকে অবারিত সুযোগ দান করেন। আল্লাহর দেয়া সে সুযোগ যারা গ্রহন করে তারা আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তিতে পরিনত হয়। রোযা পালনের মাধ্যমে যেমন শারীরীক উপকার সাধিত হয় তেমনি আত্মিক পবিত্রতা অর্জিত হয়। রোযা মানুষকে পাপাচার থেকে বিরত রাখে এবং অধিক সওয়াব হাসিলের সুযোগ করে দেয়। সেহরি থেকে শুরু করে ইফতার গ্রহন আবার ইফতার গ্রহন থেকে শুরু করে সেহরি গ্রহন পর্যন্ত প্রতিটি সৎ কাজেই মানুষ আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত প্রাপ্ত হয়। দিনে পানাহার থেকে বিরত এবং রাতে আল্লাহর স্মরণে নামাজে দাঁড়ানোর মধ্যে অসংখ্য ফায়দা লুকায়িত। রোজার মাসে যে সকল কাজের মাধ্যমে অধিক সওয়াব হাসিল করা যায় তার মধ্যে অন্য রোযাদারকে ইফতারি করানো অন্যতম।

মানবতার মুক্তির দুত, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ট রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ঘোষণা করেছেন, কোন রোযাদার ব্যক্তি যদি অন্য রোযাদার ব্যক্তিকে ইফতার করায় হোক সে একটি খুরমা দ্বারা কিংবা এক গ্লাস পানি দ্বারা তবে সে ব্যক্তি ঐ রোযাদার ব্যক্তির সমপরিমান সওয়াবের অধিকারী হবে। আমাদের সমাজে এ মহিমান্বিত হাদিসখানা বাস্তবায়ণ করার অনেক ধরনের পন্থা লক্ষ করা যায়। এসকল পন্থার মধ্যে কিছু পন্থা ইসলাম আদৌ সমর্থন করে কিনা তা নিয়ে ধর্ম বিশেষজ্ঞদের সংশয় প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়।

আমাদের দেশে গ্রামে যেরকম দোয়া-কালামের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত আগে, এখন আর সেভাবে শহরে দেখা যায় না। শহরে আয়োজন করার হয় বর্ণিল ইফতার পার্টির । রাজনৈতিক নেতারা থেকে শুরু করে শহরের মজুর শ্রেণী পর্যন্ত সকলের সাধ্যের মানভেদে একই ঘারানার অনুষ্ঠানের আয়োজন। বাহারি খাবারের পশরা সাজিয়ে আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে পাশাপাশি ডাইনিং টেবিলে ডজন ডজন চেয়ারে বসে ইফতার পার্টি। সারা শহর খুজলেও গ্রামের মত পাটি বিছানো অবস্থার কাউকে ইফতারী করতে দেখা যায় না। শহরে রাজনৈতিক দলগুলোকেই বেশিরভাগ ইফতার পার্টির আয়োজন করতে দেখা যায়। ইফতার পার্টির সবচেয়ে বড় আকর্ষন মিডিয়া কভারেজ।

বিভিন্ন মিডিয়ায় ইফতার পার্টির খবর প্রচার-প্রকাশ করার ব্যবস্থা করা হয়। কোন দলের ইফতার পার্টিতে বেশি লোক হয়েছিল তা নিয়ে হম্বিতম্বি আরও কত কী ? যে সকল নেতারা সমাজের নিচু স্তরের লোকদের বছরেও একবার খোঁজ নেন না তাদেরকেও ঘটা করে ইফতার পার্টিতে নিয়ে আসা হয়। শুধু অসহায়দেরকেই নয় বড় বিত্তবানসহ সকলেই পালাক্রমে ইফতার পার্টিতে আমন্ত্রিত হন। এ ইফতার পার্টির পিছনে বিভিন্ন প্রকার উদ্দেশ্য থাকলেও সওয়াব অর্জনকেই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়!

ইফতার পার্টিতে যদি রমযানের পবিত্রতা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাতে তবে সে পার্টি এড়ানো আবশ্যক। তবে যদি শরীয়ত বর্জিত কোন কাজ না হওয়ার নিশ্চয়তা থাকে তবে সে পার্টিতে অবশ্যই সওয়াব হবে এবং আমন্ত্রন পেলে সে ইফতার পার্টিতে শরীক হওয়াও জরুরী। রোযা যদি শুধু না খেয়ে থাকার নাম হয় তবে মানুষ ছাড়াও বিশ্বের অনেক প্রাণী রোযা রাখে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, কেবল না খেয়ে থাকার নাম রোযা নয় বরং এটাকে উপোস বলা যেতে পারে। ইফতার পার্টিকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উৎসব করে তোলাতে আমার ঠিক যতোটা আপত্তি ঠিক ততোটাই সংশয়, ধর্মীয় অনুশাসন কি এভাবে মানা হয়? নাকি হয় না?

রাজনৈতিক,ইফতার