• বুধবার, ২০ জুন ২০১৮, ৬ আষাঢ় ১৪২৫
  • ||
শিরোনাম

শেষবেলায় তাজিন ও তার মায়ের পাশে দাঁড়ায়নি কেউ

প্রকাশ:  ২৭ মে ২০১৮, ২০:৩৮ | আপডেট : ২৮ মে ২০১৮, ০৮:০৩
রুবি হাফিজ
প্রিন্ট

অসময়ে চলে যাওয়া অভিনেত্রী তাজিন আহমেদের জনপ্রিয়তা টের পাওয়া গেছে মৃত্যুর পরে। তার সহকর্মী শিল্পীদেরও হুশ ফিরে যখন তাজিন চলে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ বেঁচে থাকতে কেউ তাজিন আর তার লেখক ও নাট্যকার মায়ের দিকে ফিরেও তাকাননি। তাজিনের মা উকিলদের দেবার পয়সা যোগাড় করতে না পেরে ষড়যন্ত্রমূলক মামলার বিরুদ্ধে যে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারেননি তা কয়জন জানে? মাকে জেলে রেথে একজন মেয়ে কিভাবে ভালো থাকে- জীবনের শেষভাগে কেমন ছিলেন অভিনেত্রী তাজিন, এ বিষয়ে পাঠকদের ধারণা দিতেই এ লেখা।

অভিনেত্রী তাজিন আহমেদ ইডেন কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর করেন । পড়ালেখা শেষে শখের বশে অভিনয় শুরু করেন, করেছেন সাংবাদিকতাও। টেলিভিশনের জন্য নাটকও লিখেছেন। ছিলেন মঞ্চকর্মীও। দাম্পত্য জীবনেও অসুখী ছিলেন তাজিন। প্রথম জীবনে তাজিন আহমেদ ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন নাট্যনির্মাতা এজাজ মুন্নাকে। কিন্তু সে সংসার খুব বেশিদিন টেকেনি। এরপর তিনি বিয়ে করেন একজন মিউজিশিয়ানকে। এই সংসারেও ঝামেলা ছিল। এই ভদ্রলোক স্বভাবে ছিল বহুরূপী। তাজিনের জন্য তিনি একসময় হয়ে ওঠেন বোঝা। জীবন প্রদীপ নিভে যাবার আগে দ্বিতীয় স্বামীকেও কাছে পাননি তাজিন আহমেদ। একসময় তিনি ভোরের কাগজ, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। আনন্দ ভুবন ম্যাগাজিনের কলামিস্টও ছিলেন । পরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পাবলিক রিলেশন অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

মা দিলারা ডলি রচিত ও শেখ নিয়ামত আলী পরিচালিত ‘শেষ দেখা শেষ নয়’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে অভিনয় জীবন শুরু করেন তাজিন। ১৯৯৬ সালে নাটকটি বিটিভিতে প্রচার হয়। ওই সময়ে বিটিভির দর্শকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় একটি নাম হয়ে উঠেন তাজিন। জাহিদ হাসান, আজিজুল হাকিম, আজাদ আবুল কালাম, তৌকির আহমেদ, টনি ডায়েসদের সঙ্গে জুটি বেঁধে নিয়মিত একের পর এক নাটকে অভিনয় করেন তাজিন। অসংখ্য নাটক-টেলিছবি দর্শকদের উপহার দিয়েছেন তিনি। হুমায়ূন আহমেদের নাটক ‘নীলচুড়ি’তে অভিনয় করেও বেশ আলোচিত হন তাজিন। তার সর্বশেষ অভিনীত ধারাবাহিক নাটক ‘বিদেশি পাড়া’।

দীর্ঘদিন থিয়েটারেও অভিনয় করেছেন তাজিন। ‘নাট্যজন’ থিয়েটারের হয়ে বেশ কিছু নাটকে তিনি অভিনয় করেন। এরপর ‘আরণ্যক’ নাট্যদলের হয়ে ‘ময়ূর সিংহাসন’ নাটকে তাজিন কাজ করেন। এতে তিনি বলাকা চরিত্রে অভিনয় করেন। তার সর্বশেষ অভিনীত মঞ্চনাটক এটি। শুধু অভিনয়ে নয়, মডেলিং করেও নাম কুড়িয়েছিলেন তিনি। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন অভিনেত্রী তাজিন। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি মিডিয়া থেকে দূরে ছিলেন। অভিনয়ের বাইরে লেখালেখির কাজেও যুক্ত ছিলেন তাজিন। লিখেছেন একাধিক নাটক। আর নিয়মিত মিডিয়ায় সময় দিতে না পারলেও উপস্থাপনায় ছিলেন বেশ দাপুটে।

এনটিভিতে প্রচারিত ‘টিফিনের ফাঁকে’ অনুষ্ঠানে টানা ১০ বছর উপস্থাপনা করেন তাজি। একাত্তর টিভিতেও ‘একাত্তরের সকালে’ হাজির হয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে (এনডিএম) যোগ দিয়েছিলেন তাজিন আহমেদ। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির বিভাগীয় সম্পাদক (সাংস্কৃতিক) পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। মা দিলারা ডলির প্রোডাকশন হাউজ ছিল। মায়ের হাত ধরেই অভিনয় জগতে প্রবেশ তাজিন আহমেদর। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় উত্তরা একটা ভাড়া বাসায় একা বসবাস করে আসছিলেন তাজিন। চেক ডিজঅর্নার মামলায় দুই বছর ধরে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী আছেন তাজিন আহমেদের মা দিলারা আহমেদ জলি, আর সেই মাকে অর্থের অভাবে নিয়মিত দেখতে যেতে পারতেন না এক সময়কার জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী।

৫০০ টাকার অভাবে মায়ের জন্য খাবার কিনেও পাঠাতে পারতেন না তাজিন আহমেদ। গত ৩টা বছর ধরে কি অমানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। পরে কত কত মানুষ তার মৃত মুখটা দেখতে এমেছেন, কিন্তু জীবিত অবস্থায় যদি একবারের জন্যও এই মানুষগুলো পাশে দাঁড়াতো তাহলে অন্তত এভাবে নীরবে চলে যেতে হত না। পরপর ২টা চাকরি চলে গেল, কেউ ঐভাবে কাজেও ডাকতো না, মাঝে মাঝে ২ থেকে ৩ হাজার টাকার জন্য কত জনের কাছে হাত পেতেছেন, চাকরি জন্য কতো জনার কাছে গিয়েছেন কেউ পাশে দারায়নি, ৫০০ টাকা হলে মায়ের জন্য কারাগারে খাবার পাঠানো যায়, সেই টাকাটাও থাকতো না মাঝে মাঝে। যেতে যেতেই অভিমানে বিদায়। মরে গিয়ে বেঁচে গেলেন তাজিন আহমেদ।

একজন শিল্পীর অপমৃত্যুর জন্য আমরাই দায়ী।গত তিন বছর ধরে অর্থনৈতিকভাবে খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে ছিলেন তিনি। না ছিল চাকরি, না ছিল শুটিং। ধারণা করা হচ্ছে আর্থিক সঙ্কট, জেলবন্দী মা, স্বামীর সঙ্গে দূরত্ব, কাজ না থাকা ইস্যুতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন তাজিন।আরো ছিল এই অভিনেত্রীর জীবনের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ছিল। তাজিন আহমেদ এ্যাজমা ছিল । স্বাসকষ্টে জন্য মাঝে মাঝে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো, কিন্তু টাকার অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কখনোই সম্ভব হয়নি। 

 চেক জালিয়াতির মামলায় ২০১৬ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হয়  তাজিনের মা দিলারা ডলি। তাকে প্রথমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে, পরে কাশিমপুর মহিলা কারাগারে রাখা হয়।  মায়ের  কারাগারে যাওয়ার দায় ভোগ করতে হয় তাজিনকে, মিউজিশিয়ন দ্বিতীয় স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যায়। তাজিন আহমেদের দ্বিতীয় স্বামীর বাসা ধানমন্ডি-৫ নম্বরে রুপায়ন টাওয়ার। কিন্তু ওই বাসায় তাজিনের জায়গা হয়নি। মা দিলারা ডলি কারাগারে যাওয়ার পর উচ্চ আদালতে আপিল করার টাকা ছিল না তাজিন আহমেদের হাতে।  ফুফু অভিনেতী দিলারা জামানকে ফোন করে, তার মায়ের আইনি সহযোগিতার জন্য কিছু টাকা চান। অভিনেতী দিলারা জামান টাকা দিবেন তো দুরের কথা তার সাথে কোনোরকম যোগাযোগ করতেই নিষেধ করে দেন । তার পর যতো বার ফোন দিয়েছে ফোন রিসিভ করেনি। 

তাজিন আহমেদের পৈত্রিক বাড়ি নোয়াখালী। ঢাকায় তার দাদা চারতালা বাড়ি বানিয়েছিল।পৈত্রিকসূত্রে ওই বাড়ির মালিকানা তাজিনের বাবাও পান। চার বছর বয়সে তাজিনের বাবা মারা যান।ওইসময়  তাজিনের মাকে ঠকিয়ে ঢাকার চার তলা বাড়ি আর গ্রামের দাদার সব জমাজমি চাচা ফুফুরা নিজেদের নামে করে নেয় । এ নিয়ে তাজিনের নানী মামলা করে কিছু টাকা পান । তাজিন আহমেদ তখন ছোট ছিল বলে বাড়ি ফ্ল্যাট পাযনি কিছু টাকা পেয়েছিল। ও্ইসময় থেকেই তাজিন চাচা ফুফুদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায়। তাজিন আহমেদ তার মায়ের সঙ্গে নানা বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন।

তাজিন আহমেদের মা দিলারা ডলি বিসিআইসিতে চাকরি করতেন। তিনি একজন ফ্রি ল্যান্স সাংবাদিক ছিল। জাতীয়  প্রেসক্লাবের মেম্বারও হয়েছিলেন। অথচ একজন দিনের পর দিন জেল খাটছেন ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে। তাজিন আহমেদের নানী তার মৃত্যুর আগে দিলারা ডলিকে একটি ফ্ল্যাট লিখে দিয়ে যান । নানী মারা যাওয়ার ওই  ফ্ল্যাটে থাকতেন। তাজিন তখন অভিনয় আর পড়াশোনায় ব্যস্ত। এরই মধ্যে একই এলাকা কিছু ছেলে তাজিনের মাকে ফাঁদে ফেলে দেয়।  তারা বলে, আন্টি আপনার ফ্ল্যাটে আমরা ব্যাবসা করি আপনিও পাটনার থাকবেন। তাজিন আহমেদের মা রাজি হয়ে যান। ওইসময় মালিকানার জাল কাগজপত্র তৈরি করে ফ্ল্যাটটি ব্যাংকে মর্টগেজ রেখে মোটা অংকের টাকা তুলে ওই যুবকরা লাপাত্তা হয়ে যায়। এদিকে ব্যাংক থেকে আসতে থাকে লোন পরিশোধের চাপ। ব্যাংক থেকে কিস্তি পরিশোধের চাপ আসায় তাজিনের মা দিলারা ডলি ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কিস্তি পরিশোধের নিশ্চয়তা হিসেবে কয়েকটি চেক দেন। কিন্তু সময় মতো টাকা পরিশোধ করতে না পারায় ব্যাংক তার নামে  চেক জালিয়াতি মামলা করে এবং ওই মামলায় তার জেল হয়ে যায়।

আগামী মাসে জুনের ২২ তারিখ  তাজিন আহমেদের মাায়ের জেল থেকে বের হওয়ার কথা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. জাহাঙ্গীর কবির জানান, ঢাকার জজ আদালতে চেক জালিয়াতির চারটি মামলায় ৬২ বছর বয়সী দিলারা আহমেদ জলির দুইটা মামলায় সাজা হয় একটায় আড়াই বছর আর একটায় এক বছর আর ও দুইটা মামলা বিচারধিন আছে। ২০১৮ সালের ২২জুন তার সম্ভাব্য মুক্তির দিন। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় নারী কারাগারের জেলার সালমা বেগম জানান, বুধবার সকাল ৮টার দিকে তাজিন আহমেদের লাশবাহী গাড়ি কারাগারের ফটকে আসে। দিলারা আহমেদ জলি ওই কারাগারেই গত দুই বছর ধরে বন্দি। সালমা বেগম বলেন, “কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে লাশবাহী গাড়ি কারাগারের ফটকে নিয়ে আসা হয়। সেখানে মেয়ের লাশ দেখে দিলারা আহমেদ জলি কান্নায় ভেঙে পড়েন। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে একমাত্র মেয়ের মৃত্য মেনে নিতে পারছেন মা। গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকেই মেয়েকে শেষ বিদায় জানালেও মায়ের সেই কান্না এখন্র চলছেই। 

তাজিন আহমেদের মা দিলারা আহমেদ ডলি ছোট সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহপাঠী ছিলেন। তাকে ক্লাশে সবাই পেন্টিন বক্স নামে ডাকতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও  তাকে পেন্টিন বক্স নামে চিনতেন বলে দিলারা ডলি জানান। প্রধানমন্ত্রীর সহপাঠী প্রতারণামূলক মামলায় সাজা খেটে জেল থেকে বের হবেন, তখন তার আপন বলতে দুনিয়ায় কেউ আপন বলে থাকবেন না। বের হবেন নিঃস্ব অবস্থায়। তাজিন জীবিত অবস্থায় আাত্মীয়-স্বজন ও সহকর্মীদের কেউ তার পাশে দাঁড়াননি। মৃত্যুর পর সবাই সহানুভূতি জানিয়েছেন। মেয়ের মতো কি মা দিলারা ডলিও কি বেঁচে থাকতে কারো সহযোগিতা পাবেন না। মৃত্যুর সহানুভুতি আর দুঃখ প্রকাশে কি আসে যা!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব সম্ভব তার বান্ধবী প্যান্টিন বক্স দিলারা ডলি ও তার মেয়ে তাজিন আহমেদের করুন কাহিনী জানেন না, কেউকি প্রধানমন্ত্রী কানে তা  পৌছে দিতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী জানতে পারলে নিশ্চয়ই তার শৈশবের বান্ধবীর পাশে দাঁড়াবেন।

 

(লেখক: প্রয়াত অভিনেত্রী তাজিন আহমেদের ঘণিষ্ঠজন)

 

তাজিন আহমেদ অভিনীত একটি নাটকের অংশবিশেষ