• বুধবার, ২০ জুন ২০১৮, ৬ আষাঢ় ১৪২৫
  • ||
শিরোনাম

জেনারেলের কালোসুন্দরী ও পাঠ সমালোচনা

প্রকাশ:  ২১ এপ্রিল ২০১৮, ০২:৪২ | আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৮, ০২:৫৩
মালেকা আক্তার চৌধুরী
প্রিন্ট

ব্যক্তি জীবনের  নানা ব্যস্ততা , দ্বন্দ্ব- সংঘাত , প্রতিকূলতার মাঝেও "জেনারেলের  কালো  সুন্দরী" উপন্যাসটি পড়ে  শেষ করেছি ৷ তারপরও পড়েছি তো  পড়েছি ৷ গ্রন্থটির  পরতে পরতে বাহারী তথ্য আর মনোযোগ আকর্ষণের নানামুখী  উপাদান বিদ্যমান৷ এটি লিখেছেন প্রখ্যাত - প্রথিতযশা একজন  রাজনৈতিক  রিপোর্টার  এবং  বিশ্লেষক , একজন একনিষ্ঠ - পাঠকপ্রিয় সাংবাদিক  জনাব পীর হাবিবুর  রহমান ৷ 

আমি নিজেও তার শব্দ মূর্ছনার  একজন  ভক্ত পাঠক৷ উপন্যাসটি পড়তে পড়তে  কিছু লিখার একটা তাগাদা  অনুভব করেছি হৃদয় থেকেই৷ বিংশ শতাব্দীর  প্রায় শেষের দিকে ঘটে যাওয়া  মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গ্রন্হটি তিনি  রচনা করেছেন৷ অনিরুদ্ধ এবং মাধবী মাঝবয়সী লিভটুগেদার করা দু"জন প্রেমিক - প্রেমিকার খু্নঁসুটিপূর্ণ  কথোপকথনে উঠে এসেছে সেই  সময়কার যৌনদানবখ্যাত  গণহত্যার মহানায়ক প্রেসিডেন্ট  জেনারেল  আগা মোহাম্মদ  ইয়াহিয়া খানের  হেরেমের  জানা - অজানা , বলা না বলা জীবনের নোংরা চালচিত্র৷ অনিরুদ্ধ - মাধবী দু"জনই পরস্পরের প্রেমে অন্ধ , তারপরও দু"জনের রয়েছে ব্যক্তিত্বের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব ৷ অনিরুদ্ধ  যাপিত জীবনে নারী পুরুষের স্বাভাবিক  মেলামেশায় কিছুটা রক্ষণশীল হলেও মাধবী তার  বিপরীত৷ অনিরুদ্ধ রুচিবান এবং  ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হিসেবে প্রতিভাত কিন্ত মাধবী খোলামেলা যৌন আলোচনায় অত্যন্ত পারদর্শী , যেটি অনিরুদ্ধের মোটেই পছন্দ নয়৷  এসব  দ্বন্দ্ব- সংঘাত, বিভেদ- মতানৈক্য , আস্হা - অনাস্হার  প্রেক্ষাপটে লেখক অত্যন্ত সচেতনভাবে এগিয়ে  নিয়েছেন তার  লিখনীকে ৷ অনবদ্য শব্দচয়ন , ঘটনার ধারাবাহিকতা , তথ্য - উপাত্তের  নানান ব্যঞ্জনাধর্মী গাঁথুনির মিশ্রণে গ্রন্হটিতে সামগ্রিক রুপের পরিসমাপ্তিও ঘটেছে ৷
 
 আলোচ্য গ্রন্থে মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় ভারতের অস্হায়ী  সদর দফতর সেই সময়কার থিয়েটার রোড যা বর্তমানে শেকসপিয়র  স্মরণিখ্যাত জায়গাটির সাথে  পাঠক সহজেই পরিচিত হতে  পারবেন ৷"জেনারেলের কালো সুন্দরী "-গ্রন্হটির নামকরণ হলেও , কালো সুন্দরীর  প্রেম-  প্রণয়োপ্যাখান ছাড়াও রয়েছে সেই সময়কার  উচ্চাভিলাষী নারীদের অন্ধকার জগতের নোংরা কাহিনী , যেটি লেখকের ভাষায় "ইয়াহিয়ার হেরেমের " সুন্দরীখ্যাত নামী - দামী- বেনামী রমণীরা ৷ কারো কারো আবার ঢাকা টু করাচি , করাচি টু ঢাকায় উড়াল প্রবণতাও দৃশ্যমান ছিলো ৷ একদিকে পূর্ববাংলায় ভয়াবহ মুক্তিযুদ্ধ অন্যদিকে রমণীমোহন লম্পট- মাতাল - কুচক্রী ইয়াহিয়ার অবারিত নষ্ট -ভ্রষ্ট-সস্তা যৌনলীলায় উষ্ণ উত্তাপ জুগিয়েছে ক্ষমতালোভী ,ধুরন্ধর , অর্থলোভী , আভিজাত্য লোভী  একশ্রেণির রমণী ৷লেখকের ভাষ্য তথা অনিরুদ্ধের জবানিতে আমরা জানতে পারি  ইতিহাসের কালো সুন্দরীখ্যাত "শামীম ""তখনকার মেধাবী ছাত্র ক্যামব্রিজ পড়ুয়া প্রধান বিচারপতির কন্যা ৷ ভালো ইংরেজি জানা কালো সুন্দরী শেকসপিয়র  বাইরন,কীটস এর বহুমাত্রিক  রসবোধসম্পন্ন গল্পে মজাতেন জেনারেল ইয়াহিয়াকে ৷ সেজন্য হেরেম সুন্দরীদের মধ্যে ইয়াহিয়ার  কাছে  তার আবেদন ছিলো অন্যমাত্রার ৷

উপন্যাসে পাওয়া যায় আরো বিভিন্ন  নারীচরিত্র , সঙ্গীত শিল্পী  নূরজাহান , জেনারেল রানী, অভিনেত্রী  তারানা সকলেই ছিলেন এই গোত্রের ৷  তবে হ্যা , শতাব্দীর পর শতাব্দী , যুগের পর যুগ পরিক্রমায়  আধিপত্যবাদী পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্হায় নারীদেরকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমন নোংরাভাবে উপস্হাপন করা হয়েছে ৷ সেদিক থেকে এই গ্রন্হটির দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্ন নয়৷ এক্ষেত্রে প্রথাগত নারী ভাবনার উত্তরণ ঘটেনি৷  এসব আপত্তিজনক বিষয়গুলিতে সমাজের উঁচুতলার নারীদেরকে বড়ো সিদ্ধহস্ত বলে ধরে নেয়া হলেও উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের সেন্টিমেন্টের মধ্যেই ঘুরপাক খেতে দেখা গিয়েছে এসব  নারীদের কুটিল চরিত্রের বন্ধন বিপর্যয়ের বহুমাত্রিক আয়োজন৷ তবুও সার্বিক নারীচরিত্রকে অপমানিত হতে হচ্ছে  বলেই আমার বিশ্বাস ৷ হেরেম সুন্দরীরা  পরস্পরকে সতীনের মতো হিংসে  করতো এবং নিজেরা নিজেদেরকে সতী - সাধ্বী বলে প্রমাণ করার যে অপচেষ্টা চালাতো সেটিও  নারী মর্যাদার  পরিপন্থী ৷ তবে এ প্রসঙ্গে মাধবীর এক প্রশ্নের উত্তরে অনিরুদ্ধের কটাক্ষ করা উক্তিটি ছিলো --- "তুমি কি মনে করো একজন লম্পট - মাতাল , দুশ্চরিত্র পুরুষ ও লোভী রমণী  টানা পাঁচ ঘন্টা বাসর শয্যার মতো সাজানো কক্ষে পাকিস্তানের ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন৷" কথাগুলো হাস্যরসের অবতারণা করলেও সত্যতা এবং সততার চাদরেও  মোড়ানো নয়  ৷তবে, নারী জীবনের নানামাত্রিক পটভভূমে বিন্যস্ত সময়- প্রেক্ষিত - পরিস্থিতি ও বাস্তবতার জীবনঘনিষ্ঠ দার্শনিক ব্যাখ্যা পুরোপুরি অন্যরকম৷ 

প্রাসাদ রাজনীতির আর এক খলনায়ক লারকানার জুলফিকার আলী ভুট্টো ৷ বিশ্বনন্দিত চিত্রনায়িকা মধুবালা - ভুট্টো , অন্যদিকে ভুট্টো - হোসনা শেখের প্রেম - প্রণয় এবং পরিণয়ের উপাখ্যানও উঠে এসেছে মাধবী - অনিরুদ্ধের আলাপচারিতায় ৷ এক্ষেত্রেও মধুবালা বঞ্চিত ভুট্টোর হৃদয়াবেগ থেকে আর হোসনা শেখকে গতানুগতিকভাবে ধান্ধাবাজ , চরম স্বার্থান্বেষী হিসেবে দেখানো হলেও ভুট্টোর প্রতি ছিলো তার গভীর প্রেম ৷ভুট্টোও ছিলেন হোসনা প্রেমে অন্ধ ৷ 

পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখার দক্ষতা আমার নেই , তারপরও মনে হয়েছে কিছু  অবাঞ্ছিত শব্দচয়নে উপন্যাসটি আভিজাত্য হারিয়েছে বলেই আমার  বিশ্বাস ৷ কেননা তরুণ প্রজন্মের জন্য গ্রন্হটি যথেষ্ট  মূল্যবান এবং চিন্তার উদ্রেককারী ৷
  
গ্রন্থটির পরবর্তী অংশে  লেখক অত্যন্ত দক্ষতা এবং বাস্তবতার নিরিখে চমৎকারভাবে  মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাত্যহিক ঘটনাবলী  সাবলীলভাবে তুলে এনেছেন ৷ উঠে এসেছে রাজনৈতিক  ঈর্ষাপরায়ণতা ,  হঠকারিতা , অহমিকা , বাগাড়ম্বর মানসিকতার এক দুর্দান্ত চিত্র ৷প্রতিশোধের তীব্রতায় ইয়াহিয়া ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে , যার অমোঘ সত্যতা পাঠক জানতে পারে ভুট্টোর  স্বীকারোক্তির মাধ্যমে ৷ ধর্মের নামে বিভাজিত রাজনীতিতে পাকিস্তানি  সামরিক জান্তারা নিজেরাই বিভ্রান্তির শৃঙ্খলে আটকা পড়েছিলো  ৷ ধর্মকে  ব্যবহার করেছে সাধারণ পণ্য হিসেবে , হীন স্বার্থসিদ্ধির  চরম  পারাকাষ্ঠারুপে  ৷ গ্রন্হটিতে  একদিকে মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ  , ধর্ষণ , লুন্ঠন , অগ্নিসংযোগ নানা ধরণের অনিয়ম , ব্যাভিচার, অত্যাচার , নৃশংসতার ক্রমিক বিবরণ উঠে এসেছে তেমনি পাঠক হৃদয়কে তৃপ্ত করতে লেখক অজানা -অর্ধজানা - না জানা অনেক তথ্য উপস্হাপনের নিরন্তর  প্রচেষ্টা অব্যাহত  রেখেছেন ৷ 

এ উপন্যাসে স্তব্ধ - পাথর সময় , অস্হিতিশীল সমাজে নানামুখী মানবিক সংকট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসম- শক্তি- সাহস আর শৌর্য  - বীর্যের ঐতিহাসিক তথ্যাদি সন্নিবেশিত হয়েছে ৷বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের  মাষ্টার মাইন্ড  জেনারেল রাও ফরমান আলী , বেলুচিস্তানের কসাইখ্যাত টিক্কাখানদের নিষ্ঠুরতার - নির্মমতার চিত্র তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সফলভাবে ৷  "হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড " গ্রন্হটিতে জেনারেল রাও ফরমান আলীর নির্লজ্জ আত্মপক্ষ সমর্থন শুধু তাদের জন্য মর্যাদা হানিকরই নয় ইতিহাসের আস্তাকুড়ে প্রক্ষেপণও বটে ৷তখনকার সভ্যতাবিরোধী  নৃশংসতার আত্মগ্লানি থেকে মুক্তি  পেতে খুনীদল এক এক জন আত্মজীবনীকার হয়ে  উঠেছিলো৷ যা রীতিমতো আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল ৷ মুক্তিযুদ্ধের আলোকে লিখিত  গ্রন্হটি গ্রন্হমর্যাদায় যে কোনো বিচারে উঁচুমানের ৷মহান মুক্তিযুদ্ধের  প্রেক্ষাপট রচনা থেকে  শুরু করে পুরো মার্চ মাসের  ধারাবাহিক ঘটনাগুলি অত্যন্ত সাবলীল এবং চমৎকারভাবে সন্নিবেশিত করা হয়েছে ৷এছাড়াও  রাজনীতির  অবিসংবাদিত মহানায়কের শেখ মুজিব থেকে  বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার অনুপুঙ্খ বর্ণনা পাঠককে এক অভূতপূর্ব চিন্তার জগতের সন্ধান দেবে  ৷

বঙ্গবন্ধু এবং ভুট্টোর কথোপকথন ইতিহাসে এক বিরল চিত্র এবং  সময়ের চেতনায় - চঞ্চলতায় , আত্মবিশ্বাসের প্রগাঢ়তায় পরিপূর্ণ যা আজও প্রতিধ্বনিত হয় বিশ্ব - রাজনীতির  অলিগলিতে ৷  মিয়ানওয়ালী কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে ৯মাস ১৪ দিন কারাভোগের পর যখন ইয়াহিয়ার রোষানল থেকে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে ভুট্টোর নির্দেশে শহুল্যা শহরে নিরাপদ স্হানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো তখন ভুট্টোর সাথে  কথোপকথনের এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে বলেছিলেন - "ভুট্টো  টেল মি ফার্স্ট হোয়দার আই অ্যাম এ ফ্রি ম্যান অর প্রিজনার ? তখন ভুট্টো  উত্তর  দিয়েছিলেন , "নাইদার ইউ আর এ প্রিজনার নর ইউ আর এ ফ্রি ম্যান "৷ তখন শেখ মুজিব বলেন, "ইন দ্যাট কেস আই উইল নট টক টু ইউ"। তখন জুলফিকার আলী ভুট্টো  বলতে বাধ্য হলেন - "ইউ আর এ ফ্রি ম্যান "৷  এসব জীবন্ত স্বপ্নঘেরা  স্মৃতি আজ ঐতিহ্যের সোনালি সোপানের মতোই  বিশ্ব- সমাজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে পর্বতপ্রমাণ  উচ্চতায় স্হাপন করবে ৷ যিনি দৃশ্যমান না থেকেও মুক্তিকামী  জনতার অনন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে দিশেহারা  মানুষকে পথ দেখিয়েছেন ৷

সার্বিক  বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের  স্মারকে লিখিত গ্রন্হটি  আগ্রহী পাঠক  সমাজে নির্মল আনন্দ দানের পাশাপাশি সে সময়কার বাঙালি চেতনা, পাকিস্তানি  হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার প্রেক্ষিতে নির্মম পরিণতির নিষ্ঠুর নিয়তিবরণ, বিশ্ব- সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি  এবং সর্বোপরি জয় বাংলার একচ্ছত্র সাম্যবাদী আহ্বান যুগ যুগ ধরে  আর্ত- পীড়িত , শোষিত  বঞ্চিতদের  অনন্ত প্রেরণায় কালের  সাক্ষী হয়ে জেগে থাকবে ৷

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা