• রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮, ৪ ভাদ্র ১৪২৫
  • ||

বাংলা ভাষা চর্চায় অনাগ্রহ ও কর্পোরেট প্রজন্ম

প্রকাশ:  ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৪:৩৬ | আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৫:২৫
হাসান হামিদ
প্রিন্ট

ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের ছড়াটা আমরা মোটামুটি সবাই পড়েছি। তিনি সেখানে বলেছেন,

‘ইংলিশ ওর গুলে খাওয়া, ওটাই ফাস্ট ল্যাঙ্গুয়েজ

হিন্দি সেকেন্ড, সত্যি বলছি, হিন্দিতে ওর দারুণ তেজ।

কী লাভ বলুন বাংলা প’ড়ে?

বিমান ছেড়ে ঠেলায় চড়ে?

বেঙ্গলি ‘থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ’ তাই, তেমন ভালোবাসে না

জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না’।

আমাদের দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশ পাওয়া গিয়েছিল ২০১৪ সালে। সেই আদেশে বলা হয়েছিল: ইংরেজিতে থাকা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিজ্ঞাপন, গাড়ির নামফলক, সব ধরনের সাইনবোর্ড ও নামফলক বাংলায় লিখতে হবে। একই সঙ্গে বাংলা ভাষা প্রচলন আইনানুসারে সব ক্ষেত্রে অবিলম্বে বাংলা ভাষা ব্যবহারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলও দিয়েছিল আদালত। আগেও আমরা এমন নির্দেশনা দেখেছিলাম। কিন্তু যে দেশে আড্ডা বা চায়ের দোকানে বসে নিজের যোগ্যতা প্রকাশ করতে যার যা সাধ্যমতো ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করাটা নিত্য-নৈমিত্ত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, খাবারের বা কাপড়ের দোকানের নাম হয় ইংরেজি বা অন্য ভাষায়, সেলুনের নাম হয় অন্য ভাষায়; সে দেশে সেই আদেশ কতোটা কীভাবে কাজে লাগবে তা ভাবনার বিষয়।

আমাদের প্রাণের বাংলা ভাষা বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত রাষ্ট্রভাষা। এ ভাষার রয়েছে নিজস্ব বর্ণমালা। বাংলা সাহিত্যসম্ভার নিঃসন্দেহে বিশ্বমানের। এ সবকিছুই বাংলা ভাষার জন্য ইতিবাচক উপাদান। এ ছাড়া সারা বিশ্বে বর্তমানে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি। এর মধ্যে বাংলাদেশে ১৬ কোটি; ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা মিলিয়ে ১২ কোটি এবং পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকা বাঙালির সংখ্যা কম-বেশি এক থেকে দেড় কোটি। এই বিপুলসংখ্যক ভাষী নিয়ে একটি ভাষার টিকে থাকা অত্যন্ত সংগত ও ইতিবাচক। যেখানে শত শত ভাষা নিজস্ব ভাষী হারিয়ে বিপন্নতার মুখোমুখি, সেখানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জয়জয়কার সর্বত্র। এত অর্জনের পরও আমাদের ভালোবাসার বাংলা ভাষা তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে দিন দিন। এর জন্য মূলত দায়ী আমরাই।

একথা সত্য যে, বিশ্বজুড়ে মানুষে মানুষে যোগাযোগের উপায় হিসেবে ইংরেজি ভাষার স্থান সবার ওপরে। ইংরেজি ভাষার এই আধিপত্য বিস্তার সম্ভব হয়েছে ইংরেজদের ঔপনিবেশিক যাত্রার কারণে। ভারতবর্ষ তথা বাংলাদেশ থেকে ঔপনিবেশিক ধারার মূলোৎপাটন হলেও এর প্রভাব থেকে গেছে আমাদের অফিস-আদালত, শিক্ষা ও দৈনন্দিন কর্মপরিচালনায়। একসময় ফারসি ভাষা ভারতের দাপ্তরিক ভাষা ছিল, সে ভাষা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হলেও দাপ্তরিকভাবে ইংরেজি ভাষার হাত থেকে আমাদের মুক্তি মেলেনি। অথচ পৃথিবীতে এমন অনেক জাতি (যেমন জাপান ও কোরিয়া) রয়েছে ইংরেজি ভাষার প্রবল প্রতিপত্তিকে উপেক্ষা করে মাতৃভাষায় রাষ্ট্রীয়, দাপ্তরিকসহ সব কাজ সম্পন্ন করছে।

বাংলা ভাষাকে আজ জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক ভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয়েছে। এমনকি দেশের সরকারপ্রধানও বাংলায় জাতিসংঘে বক্তৃতা দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের এই সাধের ও প্রাণের ভাষা নিজ ভূমিতেই কতটা যে অবহেলার স্বীকার, তার নজির ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। আমাদের বিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যপুস্তক খুললে শিশুদের জন্য ভুল বানান আর ভুল বাক্যের ছড়াছড়ি দেখতে পাই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অধিকাংশ শিক্ষকেরই নেই প্রমিত বাংলা উচ্চারণদক্ষতা। ফলে আমাদের নতুন প্রজন্ম বিদ্যাপীঠ থেকে ভুল উচ্চারণ ও ভুল বানানে মাতৃভাষা শিখছে। উপরন্তু মহাবিপদ হয়ে উঠেছে হিন্দি ভাষার সিরিয়াল এবং হিন্দিতে ডাবিং করা কার্টুন ও অন্য অনুষ্ঠানগুলো। শহরের বাংলাভাষী অনেক মা-বাবাই আজ ঘরে শিশুর ইংরেজি কথোপকথনদক্ষতা বাড়াতে অনবরত ইংরেজি বলে যাচ্ছেন। তাই এই শিশুর কাছে আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল হয়ে উঠেছে জ্যাকফ্রুট।

আজ বাংলা ভাষা এফএম বেতার ও টিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রভাবে হিন্দি-উর্দু-ইংরেজি মিলিয়ে একটি মিশ্র ভাষারূপ অর্জনের পথে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। কেউ কেউ এর নতুন নামকরণের বিষয়ও উল্লেখ করেছেন। বাংলা ভাষার মর্যাদার জন্য এটা যে খুব সুখকর নয়, তা বলাই বাহুল্য।

একসময় গ্রিক, লাতিন ও সংস্কৃত খুব দাপটের সঙ্গে পৃথিবীতে চর্চা হয়েছে। এ ভাষার সাহিত্যসম্ভার পাঠ করে আজও আমরা আবেগাক্রান্ত হই, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এ ভাষা এখন সংগ্রহশালা আর গবেষণার ভাষা। শত বছর পর বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ ভেবে তাই আতঙ্কিত না হয়ে পারি না। শহুরে তরুণ প্রজন্মের মুখের ভাষায় বিস্মিত না হয়ে উপায় কী! তারা যেন বাংলা ‘র’ ধ্বনিটি ভুলেই গেছে। তার জায়গায় প্রিয় হয়ে উঠেছে ‘ড়’। আর ইংরেজি উচ্চারণে বাংলা বলার প্রবণতাও বাড়ছে।বিশ্ববাজারের দ্রুত সম্প্রসারণ অথবা মুক্তবাজার অর্থনীতির টাইফুন ঝড়ে আজ দেশীয় ঝালমুড়ি, চানাচুরের মোড়কগুলোও ভোল পাল্টেছে। দেশি ফলের গন্ধ ও স্বাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ম্যাঙ্গো ফ্লেভার’। ইংরেজি নাম ছাড়া যেন মুখে স্বাদ লাগে না। আমাদের অহেতুক বিদেশি ভাষাপ্রীতির কারণে আজ বাংলা নামের খাদ্য মানেই অখাদ্য যেন।

সরকারি অফিস-আদালত, বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, হোটেল-রেস্তোরাঁ— সবখানেই বাংলা হরফে ইংরেজি অথবা ইংরেজি হরফে বাংলা লেখা। ক্রমাগত বাড়ছে এই প্রবণতা। টিভি নাটক, চলচ্চিত্রের নামকরণেও আজ ইংরেজির আধিপত্য। আমাদের নীতিনির্ধারণী ব্যক্তিরা কি এগুলো নিয়ে ভাবছেন? ভবিষ্যতের বাংলা ভাষার জন্য কি কিছুই করণীয় নেই? এ দেশে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ আইন হচ্ছে, অথচ বাংলা ভাষায় যে যথেচ্ছচার চলছে, তা দেখার কেউ নেই।

বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এদেশ স্বাধীন ছিল না কোনো সময়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিদেশি কর্তৃক শাসিত হয়েছে বাংলাদেশ নামক জনপদটি। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশটি স্বাধীন হয়। স্বাধীন সার্বভৌম্ব বাংলাদেশটি কি তার নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ভাষার মাধ্যমে দৈনন্দিন কার্যকলাপ পরিচালনা করতে পারছে? এখনো এ দেশের মানুষের ঘাড়ে বিদেশি সংস্কৃতি এবং ভাষার ভূত চেপে বসে আছে। প্রায়ই দেখা যায়, কোথায় গল্প বা আড্ডায় অনেকেই নিজের আভিজাত্য প্রকাশের জন্য কথাগুলো ইংরেজিতে বলার চেষ্টা করেন, আসলে কি এতে নিজের আভিজাত্য প্রকাশ পায়? আমাদের দেশের মানুষের মনস্ত্মাত্ত্ব্বিকতায় ঢুকে আছে বিদেশি ভূত, কারণ রাজতন্ত্র বা উপনিবেশিক শাসন উভয়টাতে ক্ষমতায় বসে ছিল বিদেশিরা, এই শাসকদের ভাষা আয়ত্ত নিয়ে শাসকশ্রেণির সান্নিধ্য লাভ করতো অনেকেই। তাই নিজেদের উচ্চশ্রেণি বা শাসকগোষ্ঠীয় সমপর্যায়ের মানুষ হিসেবে প্রকাশ করতে তারা বিদেশি ভাষা ব্যবহার করতেন। ইংরেজি না জানলে ভালো কর্মসংস্থান হতো না, এই প্রচলিত প্রথাটা এখনো বহাল আছে, যদিও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজি কম জানলেও তেমন কোনো সমস্যা নেই তবে বেসরকারি চাকনির ক্ষেত্রে ইংরেজি জানাটা দরকার।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সব কার্যক্রম ইংরেজি ভাষাতেই চলে।কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের বাংলা শব্দগুলো ইংরেজি স্টাইলে উচ্চারণ করাটা অনেকটা মেনিয়ায় পরিণত হয়ে গেছে। যেসব পড়ুয়া ইংরেজি স্টাইলে বাংলা বলতে পারে না তাদের ক্ষেত হিসেবে সতীর্থ চিহ্নিত করে। আজকাল পাড়ার মোড়ে, রাস্ত্মা-ঘাটে, স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের মুখে একটি শব্দ শোনা যায় অসোম বা ওসম এজাতীয়, এর উচ্চারণগত দিকটা কি নিয়ে শ্রম্নতগত ত্রম্নটি হয়তো আমার থাকতে পারে কারণ একেকজন এই শব্দটা একেক ভাবে উচারণ করেন। এটা বাংলা না ইংরেজি না হিন্দি এ নিয়েও সংশয় দেখা দেয়, তাদের উচ্চারণের গতিবিধি দেখে। এই শব্দটি ব্যবহার করে বর্তমানে নিজেকে অভিজাত শ্রেণিভুক্ত করার একটি প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতি হয়েছে, যার ফলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছোট-বড় খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে। এই খাবারের দোকানগুলোর খাবারের তালিকাটিও ইংরেজি অক্ষরে লেখা। বড় হোটেলগুলোরও বেলায় তো কথাই নেই সবাই মেনু্য কার্ড ইংরেজিতে লেখেন। তা ছাড়া দেশীয় খাবারগুলোকে বিদেশি শব্দের মাধ্যমে নানা স্টাইলে পরিবেশন করা হয় বড় বড় খাবারের দোকানগুলোতে। বাংলাদেশের একটি বিভাগীয় শহরের এক খাবার দোকানে একদিন ভাত খেতে গিয়েছিলাম, চেয়ারে বসে যিনি খাবার পরিবেশন করেন তাকে ভাত দিতে বললাম, আর ওই খাবার পরিবেশনকারী উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন এক পেস্নট চাল, প্রথমে একটু ধাক্কা খেলাম তারপর মনে হলো দিলিস্নতে খাবারের দোকানগুলোয় ভাতকে চাল বলে। তাহলে কি বাংলাদেশেও ভাতকে চাল বলতে হবে। বাংলাদেশে বিদেশি কিছু শব্দ আত্মীয়করণ হয়ে এখন বাংলা শব্দের মতো প্রচলিত, কিন্তু এভাবে প্রতিনিয়ত বিদেশি শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশের ফলে এ দেশের ভাষার শুধু নয়- এ দেশের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির মারাত্মক ক্ষতি করছে।

আমাদের দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ দেশের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসটাকে পুঁজি করেও বিদেশি শব্দের প্রবেশ ঘটছে বাংলা ভাষায়। কওমি মাদ্রাসাসহ দেশের অনেক ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উর্দু ভাষাকে সম্ভ্রান্ত্ম ভাষা হিসেবে ধরে নেয়া হয়। দেশের বিশিষ্ট আলেম বা ওলামারা নিজেকে যোগ্যতর হিসেবে প্রকাশ করার জন্য ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে উর্দুতে বয়ান করেন। এই কৌশলটা তারা নিয়ে থাকেন নিজেকে জ্ঞানী হিসেবে প্রকাশ করার জন্য। দেশের ধর্মীয় আলেম ওলামাদের এরকমভাবে ধর্মীয় রীতি-নীতি বয়ান করলে সাধারণ মানুষ কতটা বোঝে এ নিয়েই সংশয় তো থেকেই যায়। আরেকটা বিশেষ প্রবণতা বাংলাদেশের হিন্দু বা মুসলিম ধর্মযাজকদের তারা ধর্মীয় শব্দগুলো বাংলায় বলতে চান না। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মযাজকরা তাদের পা-িত্য প্রসার বা জাহিরের জন্য সংস্কৃত শব্দ আর ইসলাম ধর্মের আলেমরা তা উর্দুতে তা প্রকাশ করেন। ধর্মীয় বিষয়গুলো বাংলা প্রচলন করলে ধর্মের জন্যই ভালো হতো আর এই কারণে ধর্মীয় বিষয়গুলোর গোড়ামি বা কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হচ্ছে না। মিলাদ বা অন্য কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যে শব্দগুলো বাংলায় বলা যায় সেগুলোকেও উর্দুতে বলার একটা চেষ্টা করেন হুজুররা। অফিস আদালতে গেলে দেখা যায় ইংরেজি বলার প্রবণতা।

ভুল শুদ্ধ যাই হোক স্টাইল করে ইংরেজি বলতে পারলে দেখবেন অফিসের কর্তাব্যক্তিটি আপনাকে মূল্যায়ন একটু বেশি করছেন। অফিসিয়াল কিছু নির্দেশনাও সাধারণের মধ্যে বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন অফিস কর্তারা, কারণ নিজেকে বড় মাপের কর্তাব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরার জন্য তা ইংরেজিতে বলেন। দেশের বণিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় স্মার্টনেসের বিষয়টা অত্যাবশকীয় আর এই স্মার্টনেস প্রকাশ করতে এই প্রতিষ্ঠাগুলোতে কর্মরতদের দেখা যায় বাংলা শব্দগুলোকে বিকৃতভাবে ইংরেজি স্টাইলে উচ্চারণ করছেন। এটা অনেকটা কাকের স্বরে কোকিলের কথা বলার মতো। এদেশে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো বাংলা ভাষাকে বিকৃতি করছে, সেটগুলোর অপসনে বাংলার ব্যবহার ইংরেজি শব্দের অনুবাদের সমার্থক অর্থ বহন করে না, তারপরও তারা এ ধরনের একটা কাজ করে বাংলা ভাষার প্রতি উদারতা দেখাতে চেয়েছেন।

মোবাইল কোম্পানিগুলোর গ্রাহকসেবা কেন্দ্রগুলোর নাম কাস্টমার কেয়ার সেন্টার। আপনি কোনো মোবাইল কোম্পানির নাম বলে তার গ্রাহকসেবা কেন্দ্রটি কোথায় জানতে চাইলেন, দেখবেন কেউ বলতে পারবে না, আর যদি বলেন কাস্টমার কেয়ার সেন্টার তখন দেখবেন সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে চিনিয়ে দিচ্ছি। গ্রাহক সেবা কেন্দ্রটি কাস্টমার কেয়ার সেন্টারে পরিণত হয়েছে যে কারণে সে কারণটি হলো মোবাইল কোম্পানিগুলো শুরম্নতেই তাদের গ্রাহক সেবা কেন্দ্রটির সামনে কাস্টমার কেয়ার সেন্টার নামে বড় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছেন আর সেই সঙ্গে বিদেশি ইংরেজি কাস্টমার কেয়ার সেন্টার শব্দটি বাংলায় প্রচলিত শব্দে পরিণত হতে চলেছে। গ্রাহক সেবা কেন্দ্রগুলোতে কর্মরত কর্মীরা একটু বিদেশি কায়দায় বিনয় প্রকাশ করে থাকেন গ্রাহকদের সঙ্গে, তাদের কথা বলার ধরনটাও ব্যতিক্রম, এরা স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের মতো এতটা ইংরেজি স্টাইলে বাংলা শব্দ উচ্চারণ না করলেও বাংলা শব্দকে ইংরেজিকরণের সাধ্যমতো চেষ্টা করে থাকেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বাংলাদেশের মানুষের উর্দু বলাটা ছিল গৌরব বা আভিজাত্যের প্রতীক। পাকিস্ত্মান আমলে বিশেষ করে ধনীরা বাংলা বলতো না। পাকিস্ত্মানের শাসকশ্রেণির সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবারগুলোর পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু। তারা বাঙালি পরিবার হয়েও পরিবারের সদস্যরা একে অন্যের সঙ্গে উর্দুতে কথা বলতো। তাই দেখা যায়, ভাষা আন্দোলনে যেসব ভাষাসৈনিকরা রয়েছেন সবাই মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধনী পরিবারগুলোর পারিবারিক ভাষা ইংরেজি হয়ে গেছে। ইংরেজ আমলে বাংলাকে ছোট জাতের ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় শাসকগোষ্ঠী আর সেই সময় শাসকশ্রেণির দলভুক্ত অনেক ধনীরা তা মেনে নেয়। আর এ ধরনের একটি প্রক্রিয়ায় বিদেশি ভাষা অনুশীলন হতে হতে বিদেশি ভাষায় কথা বলাটা একটা আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা অভিজাত হিসেবে যুগ যুগ ধরে দাবি করে আসছেন তাদের এ দেশ স্বাধীন করার পেছনে কোনো অবদান নেই বললেই চলে।

অভিজাত হিসেবে দাবিদাররা নানাভাবে এ দেশকে বিদেশিদের গোলাম বানিয়ে নিজেরা বিদেশিদের তাবেদারি করছেন, আজও কথিত এই অভিজাত শ্রেণি নানাভাবে এ দেশকে বিদেশিদের বাজারে পরিণত করার প্রয়াস চালাচ্ছে। ভাষা হলো মানুষের নিজস্ব সত্তা। মানুষ জন্মের পর প্রকৃতিগতভাবে ভাষাটা শেখে তাই ভাষার সঙ্গে নিজের স্বকীয়তাটা জড়িত। সুতরাং আভিজাত্য প্রকাশের জন্য যারা বিদেশি ভাষার মাধ্যমে নিজেকে অভিজাত বানাতে চান তারা বোকার স্বর্গে বাস করেন। এতে আভিজাত্য প্রকাশ পায় না, পায় চরম গোলামী। আর গোলামরা কোনোদিন অভিজাত শ্রেণি হতে পারে না। সুতরাং যারা বাংলাকে বিকৃত ইংরেজি ভাষায় উচ্চারণ করেন তারা নিজেকে অপমান করছেন, সেই সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদের প্রতিই অবজ্ঞা দেখাচ্ছেন। হনিজের ভাষার উৎকর্ষতা বাড়ানোর জন্য বিদেশি ভাষা শেখার প্রয়োজন রয়েছে কিন্তু তা সমাজে প্রচলন করার জন্য নয়। আভিজাত্য এবং ভাবমূর্তির আপন ভাষার ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারাটা গৌরবের বিষয়। তাই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ন রাখার জন্য তার বিকৃত রোধ এখন সময়ের দাবি।

আমরা জানি, কিছুদিন আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকার আইন করে রাজ্যের সব বিলবোর্ডে বাংলা লেখা বাধ্যতামূলক করেছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালে দুই বছর আগে তাদের সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম বিদেশি ভাষা পরিত্যাগ করে স্থানীয় ভাষায় রাখার আদেশ জারি করেছে। দুই মাসের মধ্যে নাম পরিবর্তন না করলে অধিভুক্তি বাতিলসহ শাস্তি প্রদানের কথাও বলা হয়েছে। সেখানে ‘ইস্টার্ন স্কুল’ যদি হিমালয় বিদ্যালয় হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে প্রায় ৯০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যেগুলোর মাত্র কয়েকটি বাদে সবই ইংরেজি নামে চলছে, সরকার চাইলেই সেগুলোর (মন্ত্রণালয় বা মঞ্জুরি কমিশন প্রস্তাব করতে পারে) বাংলা নাম দেওয়া সম্ভব।সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে দেশ ও জাতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে অহংকার করে, সে দেশে ভাষাচর্চাকে উৎসাহিত করার জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় নীতি নেই।

এটা দুর্ভাগ্যজনক।আমরা চাই এটা এই সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা হোক এবং সবাই মিলে সেটা বাস্তবতার নিরিখে দৈনন্দিন জীবনের সমান্তরালে নিয়ে আসুক। ভালো থাকুক আমার দুঃখিনী বর্ণ মালা, হাজার কোটি বছর বেঁচে থাকুক আমার বাংলা মা।

লেখক- তরুণ কবি ও গবেষক সদস্য, জাতীয় গ্রন্থাগার।