• শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১১ ১৪২৫
  • ||
  • আর্কাইভ

জবাবদিহি আমাদেরকেই করতে হবে

প্রকাশ:  ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৩:১৯
রুনা নাছরীন
প্রিন্ট

আমরা মানুষ, আমরাই সৃষ্টির সেরা জীব।তাতো বটেই কিন্তু আমাদের কাজ কারবারে তা মনে হয় না।বিভিন্ন কাজেকর্মে আমাদের বিচার বুদ্ধি বিবেক বিবেচনা দেখে বরং  উল্টোটা প্রমাণিত হয়।আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মস্বার্থ সিদ্ধির জন্য যেকোন নীতি বিবর্জিত কাজ করতে আমরা একটুও দ্বিধা করি না।এতটাই অন্ধ হয়ে পড়েছি যে তাতে কার কি ক্ষতি হচ্ছে বা কে কি অসুবিধায় পড়তে পারে, তা খেয়াল করছি না।আসলে এতে যে শুধু নিজের ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, আশেপাশের মানুষের এবং ভবিষ্যৎ প্রজম্মের বিশাল ক্ষতি হচ্ছে, তা আমরা বুঝেও না বুঝার ভান করছি।

ইদানীং প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া আমাদের জন্য এক বিশাল ব্যাধি হয়ে গেছে।যেকোন পরীক্ষাই হউক, স্কুল কলেজ ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে সরকারি ও বেসরকারি চাকরি, সব পরীক্ষার ক্ষেত্রেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে।এর পিছনে যে বিশাল টাকা পয়সার কারবার চলে, তা সবাই বুঝি এবং জানি। আগে সবকিছুতে মামার দৌরাত্ম্য ছিল আর এখন হচ্ছে টাকা পয়সার।জীবনের জন্য অর্থ প্রয়োজন, তাই বলে কি এই টাকা অর্জনের জন্য মানুষের ন্যূন্নতম নৈতিকতা বোধ কাজ করবে না ? এই কাজটি যে করে এবং যারা করায় তাদের বোধহয় কোন বিবেক কাজ করে না।অবলীলায় তারা কতো মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা করে।জানাজানি হবার পর পরীক্ষা বাতিল বা স্থগিত করা হয়, যা পরিবার এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্য যতেষ্ট বিড়ম্বনার বিষয়। একমাত্র ভুক্তভুগী ছাড়া কে বোঝে কার কথা !! 

বেশ কিছুদিন আগের কথা ।ভীষণ অবাক হয়েছিলাম বাচ্চাদের পিএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবরটা পড়ে।কিছুতেই বিষয়টার কোন যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা করতে পারিনি।বুঝতে পারিনি কোন দায়িত্ববোধ থেকে এবং কি এমন দায় ছিলো যে বাচ্চাদের এই সামান্যতম পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল।এখানে তো জীবন-মরণের কোন দায় ছিলো না। 

আসলে এসব পরীক্ষার চাপ ও প্রতিযোগিতামুলক মনোভাব বাচ্চাদের শৈশবটাই কেড়ে নেয়।খুশী হয়েছিলাম পিএসসি বাতিল হবার খবর শুনে। অনেকটা জোড় করে চাপিয়ে দেওয়ার মত বিশাল বোঝাটা সরিয়ে নেয়া হয়েছিলো ওদের কাঁধ থেকে।খুবই প্রশংসনীয় একটি পদক্ষেপ।কিন্তু বাচ্চাদের ঐ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কাজটি যারা করেছেন, তাদের একপক্ষ এই কোমলমতী বাচ্চাদের শিক্ষক এবং অপরপক্ষ অভিভাবক, যাদের দ্বারা বাচ্চারা খুব সহজেই প্রভাবিত হয়। 

আরও আতংকের বিষয় হলো, শিক্ষকরা প্রশ্নপত্র মোবাইলে ছবি তুলে নির্ধারিত ব্যক্তির কাছে পাঠিয়েছেন এবং বাচ্চাদের অভিভাবকরা টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্রটি সংগ্রহ করেছেন এবং দলবেঁধে প্রশ্নপত্রের উত্তর তৈরী করে আবার পরীক্ষাহলে পাঠিয়েছেন তাদের বাচ্চাদের জন্য।দলগত এ মহান কাজের একটা ছবিও দেখেছিলাম।শরীর মন বিষিয়ে উঠেছিলো।কিভাবে তারা বাচ্চাদের সাথে এ কাজটি করতে পারলো ? এই ঘটনাগুলো যে বাচ্চাদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে, তাতে সন্দেহ নেই এবং এরাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।এ ঘটনাই যতেষ্ট এদের কোমল মন-মানসিকতাকে অসুস্থ ও বিকলাঙ্গ করে দেবার জন্য এবং  এই বয়সের স্মৃতিগুলি মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে।জানতে ইচ্ছে করছে, ঐ ঘটনার পর কিভাবে অভিভাবকরা এবং শিক্ষকরা বাচ্চাদের মুখোমুখি হয়েছেন।উনাদের এই মহান কৃতকর্মের জন্য উনারা  কি কোন আত্মগ্লানিতে ভুগেছেন নাকি আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছেন ? 

আমরা কি দিনে দিনে অসুস্থ হয়ে পড়ছি ? মনে হচ্ছে, নিজের বাচ্চার জন্য মঙ্গলকর কি হবে, সে স্বাভাবিক চিন্তাভাবনাও আমরা আর করতে পারছি না । ঘুণে ধরা এই সমাজব্যবস্থা থেকে কবে বের হয়ে আসতে পারবো আমরা ? সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেবার বদলে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় বাচ্চাদেরকে ঠেলে দিচ্ছি । অসৎ অন্যায়ের বীজ বুনে দিচ্ছি তাদের মনে।যে করেই হউক ভালো রেজাল্ট করতেই হবে।ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে, সেটা যে কোন পন্থায় হউক।তবেই সমাজে প্রতিষ্টিত এবং গণ্যমান্য মানুষ বলে বিবেচিত হবে।প্রকৃত মানুষ হবার জন্য যে মানবিক গুনাবলী দরকার তা থাকুক আর না থাকুক, কিছু যায় আসে না । সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবার প্রতিযোগিতায় এসব বাবা-মা শুধু যে সন্তানের ক্ষতি করছেন তা নয়, দেশ ও জাতিরও অপূরণীয় ক্ষতি করছেন এবং এ দায়ভার আমাদেরকেই বহন করতে হবে।

আজকাল মানুষ যেকোন অবৈধ আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে বা অনৈতিক কাজের চুক্তি করতে রাখঢাক করে না । এমনকি কোন কাজের জন্য কত টাকা লাগবে বা কত টাকায় কাজটি করবে, তা সরাসরি জানিয়ে দেয় । জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় ভোগান্তি এড়াতে অনৈতিক জেনেও মানুষ টাকা দিয়ে কাজটি করাতে চায় । কিন্তু এখানেও নিস্তার নেই । হয়তো দেখা গেলো, কাজটি যে করবে সে একই কাজের জন্য আরো দশজনকে আশায় রেখেছে এবং কাজটি করে দেবার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাদের সবার কাছ থেকেও টাকা নিয়েছে । এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তি কাজটি না করলে ভুক্তভুগী জোড়ালো কোন প্রতিবাদ করতে পারে না কারণ দুইপক্ষ ভালো করে জানে কাজটি অনৈতিক । জানাজানিতে মানসম্মান ও অপদস্থ হবার সম্ভাবনা বেশী । মনে হয়, আজকাল তাতেও মানুষের কিছু যায় আসে না । মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ যে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা পরিস্থিতিতে না পড়লে বুঝা যায় না । এসব অবৈধ আদানপ্রদান কোনটাই সমর্থনযোগ্য নয় কিন্তু ইদানীং তা যেন অতি স্বাভাবিক একটা ব্যাপার হয়ে গেছে সবার কাছে ।