• রবিবার, ২৭ মে ২০১৮, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
  • ||

রোহিঙ্গা ইস্যু থিতিয়ে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয় !

প্রকাশ:  ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১২:৩৫
মনজুর রশীদ
প্রিন্ট
গত বছরের ২৫ আগষ্ট থেকে মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর সেদেশের সেনাবাহিনী, উগ্র বৌদ্ধ মৌলবাদি গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসীদের চরম অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে সীমান্ত পথে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের আগমণ থেমে থেমে হলেও এখনো অব্যাহত আছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশ,উখিয়া ও টেকনাফের ১২টি আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের ৬টি ক্যাম্পে গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধনের হিসেব অনুযায়ী জানুয়ারী ২০১৮ পর্যন্ত ১০ লাখ ১০ হাজার ৮৮৭ জন রোহিঙ্গাকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে।এখনো এই নিবন্ধন সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে আমাদের দেশে আসা রোহিঙ্গাদের সঠিক সংখ্যা জানতে আরো অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এরই মধ্যে দেশের রাজনৈতিক ডামাডোলে বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিচারের রায় নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল দু’টির মধ্যে প্রচন্ড বাকবিতন্ডা, সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা, মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নানা চুক্তি হওয়ার পরেও তা বাস্তবায়নে বিশেষ কোন অগ্রগতি দৃশ্যমান না হওয়া, গণমাধ্যমসমূহের দৃষ্টিও ক্রমশ এদিক থেকে সরে আসা বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের আশংকার পথ তৈরি করে দিচ্ছে। এসব নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলেও বিশ্বজুড়ে জনমত গঠনের সেই গতিও যথেষ্ট শ্লথ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। রাষ্ট্রেরপৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাস দমনের নামে সে দেশেরইএকটি জাতি সমূলে উৎপাটনের ইতিহাসও সবাই ক্রমশ ভুলে যেতে শুরু করেছে। মিয়ানমার সরকার কেন রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর এতটা প্রতিহিংসাপরায়ন তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়।এই লেখাটিতে ঐতিহাসিক সেই কারণ/পটভূমি সম্পর্কে সামান্য কিছুটাদৃষ্টিপাত করা হয়েছে।
দীর্ঘকাল ধরে রোহিঙ্গাদের উপর যে বর্বর ও কাপুরুষোচিত আক্রমণ মিয়ানমারের সামরিক জান্তা নিষ্ঠুর কায়দায় চালিয়ে যাচ্ছে তা বাংলাদেশের জন্মের অনেক আগে এমন কি ভারতের জন্মের অনেক আগে থেকে জিইয়ে থাকা একটি বড় সংকটের ধারাবাহিকতা। ইতিহাস থেকে জানা যায়- নবম শতকে আরব, মোগল, তুর্কি ও পরে পর্তূগিজরা বার্মায়(এখনকার মায়ানমারে) বসতি গড়ে তোলে।বার্মিজরা তখন এই ভিনদেশীদের মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।১৪ শতকে তাদের বংশধরেরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। মোগল আমলে আরাকান ছিলো মোগল সাম্রাজ্যের অধীন স্বায়ত্বশাসিত একটি অঞ্চল। মুঘলদের পতন হলেও আরাকান তার স্বাধীনতা বজায় রাখে। ১৭৭৫ সালে মগরা আরাকানে আকস্মিক আক্রমন করে। ৩০ হাজার মগ সেনা আরাকানের প্রায় তিন হাজার মসজিদের সবক'টিই ধ্বংস করে দেয়। দুই লাখ রোহিঙ্গাকে রেঙ্গুন শাসকদের কাছে দাস হিসেবে বিক্রি করে। নিহত হয় প্রায় দেড় লাখ। ৩০৭ টি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামকে জনশূণ্য করে দেওয়া হয়। রোহিঙ্গারা ১৮২৫ সালে ইংরেজদের বার্মা আক্রমণে অনুপ্রাণিত করে। রোহিঙ্গাদের ধারনা ছিল বার্মা ইংরেজদের অধীনে গেলে তারা ইয়াঙ্গুনের নির্যাতন থেকে রক্ষা পাবে। ইংরেজরা ১৮২৫ সালে প্রায় বিনা বাঁধায় বার্মা দখল করে। এ সময় থেকে বার্মিজ বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিরব শত্রুতা বাড়তেই থাকে। এর প্রকাশ পায় ১৯৪২ সালে। জাপান ওই সময় বার্মা দখল করলে বার্মিজরা রোহিঙ্গাদের কচুকাটা করে। 

বেসরকারি হিসেবে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সাল এই দুই বছরে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। ১৯৪৪ সালে ইংরেজরা আবার বার্মা দখল করে। রোহিঙ্গারা আবার স্বায়ত্বশাসন ফিরে পায়। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা পায় বার্মা। ওই সময় আরাকান পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে আবেদন করে। কিন্তু জিন্নাহ তাতে রাজী না হলে আরাকান বার্মার হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পরই বার্মা রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করে। শুরু হয় সরকারি মদদে রোহিঙ্গা নিধন। তবে ভয়াবহতা লাভ করে ১৯৬২ সালে বার্মায় সামরিক শাসন জারির পর। সেনাবাহিনী, পুলিশসহ সকল সরকারি চাকরিতে রোহিঙ্গাদের নিয়োগ লাভ নিষিদ্ধ হয়। ভূমিতে তাদের অধিকারকে অস্বীকার করা হয়। ৭১ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। তাদের বলা হয় - বার্মায় বসবাসকারী, কিন্তু সে দেশের নাগরিক নয়। 

১৯৭৪ সালে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেওয়া হয়। ১৯৭৮ সালে সামরিকজান্তা যে নাগরিক আইন করে তাতে রোহিঙ্গাদের নাগরিক হওয়ার সুযোগ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। মূলত তখন থেকেই তৎকালীন বার্মার শাসনকর্তাদের সাথে স্বাধীন ভূখন্ড প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ নিজেদেরকে সংগঠিত করতে থাকে এবং মাঝে মাঝে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ঘাটিতে চোরাগোপ্তা আক্রমণ শুরু করে। 

সে সময় থেকে মিয়ানমারে চলে আসা সামরিক শাসনের পিছনে প্রত্যক্ষ ইন্ধন দাতা দেশটি হল চীন। কথিত আছে, চীনের কমিউনিস্ট সরকারের একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল গণচীনের মতো মিয়ানমারকেও কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা(এবং অনেকের মতে তাদেরকে নাস্তিক্যবাদে দীক্ষিত করা)।কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের থেরবাদে বিশ্বাসী মিয়ানমারের জনগন আসলেই খুব মৌলবাদী। চীনাপন্থি সামরিক শাসনের বেড়ার মধ্যে থেকেও তারা তাদের মৌলবাদীত্ব বজায় রেখেছে। মিয়ানমারের সামরিক শাসক কিংবা অহিংস মানবতাবাদী গৌতম বুদ্ধের অনুসারী মিয়ানমারের জনগণও রাখাইনের এই রোহিঙ্গাদের কখনো মেনে নেয়নি। তাদের মতে - রোহিঙ্গারা তাদের শারীরিক কাঠামো, গায়ের রঙ কিংবা চেহারা, কিছুতেই মিল রাখে না। বরং তারা বাংলাদেশ কিংবা ভারতের আসামের লোকদের সাথে মিলে যায় বেশ। আবার চট্রগ্রামের আঞ্চলিক বাংলায় কথা বলে। সবচেয়ে বড় পার্থক্য তারা মুসলিম। তাই মিয়ানমারের কি সামরিক জান্তা কি জনগন কেউই রোহিঙ্গাদের সে দেশের বলে মেনে নেয়নি কখনো, বরং সবসময়ই শত্রু মনে করে এসেছে। এবার আসা যাক বর্তমান প্রসংগে।

বাংলাদেশের প্রায় সকলেই এবং বহির্বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের চলতি নৃশংস ঘটনার জন্য যাকে সবচেয়ে বেশী দায়ী করে তিনি হলেন নব্বই এর দশকে বিশ্বজুড়ে 'দ্য লেডি' হিসাবে খ্যাত, মানবাধিকার আর গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে পরিচিত আং সান সুচি। সুচিকে যখন মিয়ানমারের সামরিক শাসকরা রেঙ্গুনে গৃহবন্দী করে রেখেছিল, তখন তার সঙ্গে কথা বলার জন্য, তার সাহসী প্রতিরোধের কাহিনী তুলে ধরার জন্য অনেক সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে। তার মুক্তির জন্য বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে কত না মিছিল সংগ্রাম হয়েছে। তবে ক্ষমতায় যাবার পর থেকে সেই আং সান সুচির সবকিছু যেন কেমন দ্রুত গতিতে পাল্টে যেতে শুরু করলো। মিয়ানমারের সরকারে তিনি নিজের জন্য তৈরি করেছেন এক ক্ষমতাধর পদ। প্রেসিডেন্টেরও উর্ধ্বে তথাকথিত এই 'স্টেট কাউন্সেলর' বা 'রাষ্ট্রীয় পরামর্শকের' পদটি থাকলেও অনেকের ধারণা আসল শয়তানগুলো ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে - যাদেরকে আসলে জবাবদিহি করার সাহস নাকি আং সান সুচিরও নেই! নিশ্চয়ই প্রধান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সুচির রোহিঙ্গা সংকটে বিস্তর দায়ভার আছে। কিন্তু মূলত যিনি পদ্ধতিগতভাবে রোহিঙ্গাদের নির্মূল কর্মসূচি পরিচালনা করছেন এবং কেবল রাখাইন রাজ্যে নয় মিয়ানমারের  কাচিন ও শান রাজ্য সহ প্রায় পুরো দেশজুড়ে বিভিন্ন জাতিসত্তার উপর চূড়ান্ত দমনাভিযান পরিচালনা করছেন - তিনি হলেন দেশটির সেনা কমান্ডার জেনারেল মিঙ অং হেইং (Min Aung Hlaing)। যেহেতু বিগত বছরগুলোতে পুরো বিশ্বের ক্ষোভ সুচির উপর দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে, সে কারণে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধ কার্যত আড়ালেই পড়ে থাকছে। কিন্তু সকলেরই মনে রাখা উচিত হবে যে, এই দেশটাতে সাংবিধানিকভাবেই সশস্ত্র বাহিনীর উপর সুচি’র কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। উপরন্তু আর্মি সেখানে পুলিশ বাহিনী, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, কারা ব্যবস্থা ইত্যাদিও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। পার্লামেন্টেও রয়েছে তাদের ২৫ শতাংশ সদস্য এবং ভেটো ক্ষমতা। ফলে মিয়ানমারের ক্ষমতার প্রধানতম ভরকেন্দ্র কার্যত এখনও সশস্ত্র বাহিনী এবং তার প্রধান হিসেবে জেনারেল মিঙ অঙ এর উপরই বেশী বর্তায়।

এ অবস্থায় পুরানো ইতিহাসের জের টেনে একদিকে যেমন মিয়ানমার সরকার ও সেদেশের জনগণ বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মোটেও আগ্রহী নয় – আন্তর্জাতিক চাপে তারা যতই লোকদেখানো উদ্যোগ গ্রহণ করুক না কেন, অন্যদিকে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গারাও নানা কিছু বিবেচনায় এনে সেদেশে ফিরে যেতেআগ্রহী নয়। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপ সামলানোর মত অবস্থা কোনভাবেই আমাদের দেশের নেই। বড় ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি পরিবেশগত ও উগ্র জঙ্গীবাদের মত পরিস্থিতি আগামী দিনের সম্ভাবনার বাংলাদেশকে নানাভাবে বিপর্যস্ত করে তোলার আশংকা থেকেই যাচ্ছে।

সেক্ষেত্রে কেবল রোহিঙ্গা ইস্যুই নয়, মিয়ানমারের সকল নিপীড়িত জাতিসত্তার স্বার্থে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর উচিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী - বিশেষ করে জেনারেল মিঙ অঙ-এর যুদ্ধাপরাধের তদন্ত ও বিচার দাবি করা।বাংলাদেশ যদি মিয়ানমার প্রশ্নে তার প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ফোকাস ঠিক করতে পারে তাহলে ঐ দেশের ভেতর থেকে অনেক জাতিসত্তার সমর্থনও আদায় করতে সক্ষম হবে। আর তখনই কেবল কিছুটা সম্ভাবনা তৈরি হবে এদেশের বুকে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের তাদের স্বদেশ ভূমিতে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা। তা না হলে আটকে পড়া বিহারীদের মত রোহিঙ্গাদের ভারও বহন করতে হবে আমাদেরকেই।

লেখকঃ সামাজিক গবেষক ও বিশ্লেষক।